আকাশপথে ভ্রমণের উন্মাদনায় বদলে যাচ্ছে চীনের পর্যটন
চীনে শহর ও মনোরম স্থান আকাশ থেকে দেখার নতুন সংক্ষিপ্ত নাম হয়ে উঠেছে ‘সিটিফ্লাই’। বাঁশবনের পাহাড়ের ওপর প্যারাগ্লাইডিং, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলরাশির ওপর স্কাইডাইভিং এবং গিরিখাদের ওপর হেলিকপ্টারে চক্কর দেওয়া—একসময়ের অভিনব অভিজ্ঞতাগুলো এখন ছুটির দিনে মূলধারার পরিকল্পনায় ঠাঁই পেয়েছে। তরুণ ভ্রমণকারীদের ক্রমবর্ধমান একটি অংশের কাছে শহরের রাস্তায় হাঁটার বদলে ভোরের আকাশে ওঠাই হয়ে উঠেছে ভ্রমণের পথ। চীনের দ্রুত বর্ধনশীল স্বল্প উচ্চতার পর্যটন খাত আকাশ থেকে দর্শনকে এমন একটি নিয়মিত, বুকিংযোগ্য পণ্যে পরিণত করছে, যা স্বল্পমেয়াদি ছুটি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভ্যাসের সঙ্গে মানানসই।
সূচিপত্র
- আকাশপথে ভ্রমণের উন্মাদনায় বদলে যাচ্ছে চীনের পর্যটন
- স্বল্প উচ্চতার পর্যটন কী?
- ঝেজিয়াং থেকে হাইনান, আকাশছোঁয়া চাহিদা
- নীতিগত ও বাজারগত গতি
- ইভিটিওএল ও আকাশ থেকে দর্শনের পরবর্তী ধাপ
- প্রযুক্তি কীভাবে আকাশপথে শৃঙ্খলা রাখে
- কারা উড়ছেন, খরচই বা কত
- ঝুঁকি, নিয়মকানুন ও শেখার প্রয়োজন
- গন্তব্যগুলোতে অর্থনৈতিক প্রভাব
- এরপর কোন পথে এগোবে এই প্রবণতা
- এক নজরে
এই উন্মাদনার পেছনে রয়েছে তুলনামূলক সস্তা ফ্লাইট, স্থানীয় নীতিগত জোরালো সমর্থন এবং নতুন ধরনের উড়োজাহাজের সমন্বয়। আগে যে ঘাঁটিগুলোতে হাতে গোনা কয়েকজন শৌখিন উড়ুক্কু যেতেন, ব্যস্ত মৌসুমে সেগুলো থেকেই এখন প্রতিদিন শত শত ফ্লাইট পরিচালিত হয়। অপারেটররা এক-দুই ঘণ্টার সুনির্দিষ্ট সময়সূচির অভিজ্ঞতা বিক্রি করেন, যার মধ্যে যাতায়াত, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিষয়টি এখন কম দুঃসাহসিক, আর বেশি মানুষের নাগালের রোমাঞ্চ। ভ্রমণকারীরা ওপর থেকে শহরের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ও পাহাড়ের নাটকীয় ছবি তোলেন, তারপর ব্যাপকভাবে শেয়ার করেন। এর ফলে চাহিদা নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং স্থানীয় সরকারগুলোকে নতুন রুট চালুর কথা ভাবতে উৎসাহিত করছে।
স্বল্প উচ্চতার পর্যটন কী?
স্বল্প উচ্চতার পর্যটন বলতে সাধারণত প্রায় ১,০০০ মিটারের নিচের আকাশসীমায় বেসামরিক যাত্রীদের জন্য অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত উড়ান-অভিজ্ঞতাকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে ট্যান্ডেম প্যারাগ্লাইডিং, স্কাইডাইভিং, প্যারামোটর ফ্লাইট, মনোরম দৃশ্য দেখার হেলিকপ্টার চক্কর এবং হ্রদ বা উপকূলের ওপর ছোট উড়োজাহাজ কিংবা উভচর সি-প্লেনে ভ্রমণ। একই উল্লম্ব আকাশপথে ড্রোন সেবা ও আকাশপথে চিত্রধারণও চলে, যা প্রায়ই পর্যটন অপারেটরদের সঙ্গে অবকাঠামো ভাগাভাগি করে। এসবের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, ভূমির কাছাকাছি স্বল্প দূরত্বে উড়ে যাত্রীদের স্থাপনা ও প্রাকৃতিক নিদর্শন বিস্তারিতভাবে দেখার সুযোগ দেওয়া।
ভূমিতে, বেশির ভাগ অভিজ্ঞতা শুরু হয় জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানের কাছে থাকা ছোট বিমানপথ, হেলিপ্যাড বা পাহাড়ের ঢালের প্ল্যাটফর্ম থেকে। কিছু শহর সংবেদনশীল এলাকা থেকে উড়ান চলাচল আলাদা রাখতে স্বল্প উচ্চতার আকাশপথ নির্ধারণ করে, এরপর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দিনের আলোয় নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের অনুমতি দেয়। ভ্রমণ অ্যাপে সময় বেছে নেওয়া, দ্রুত নিরাপত্তা তালিকা যাচাই করা এবং পরিচয়পত্র নিয়ে হাজির হওয়াই বুকিংয়ের জন্য যথেষ্ট। লক্ষ্য হলো, আঁটসাঁট ভ্রমণসূচির মধ্যে উড়ানের অনুভূতিকে নিরাপদ ও ছবি তোলার উপযোগী একটি স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় এনে দেওয়া।
ঝেজিয়াং থেকে হাইনান, আকাশছোঁয়া চাহিদা
পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশে এই উত্থান সহজেই চোখে পড়ে। দেছিং কাউন্টির মোগান পর্বতে ২০১৯ সালে চালু হওয়া একটি প্যারাগ্লাইডিং ঘাঁটিতে বার্ষিক দর্শনার্থীর সংখ্যা ১০ হাজারের কম থেকে বেড়ে এখন ১ লাখের বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর ব্যবস্থাপকেরা। সম্প্রতি জাতীয় দিবস ও মধ্য-শরৎ উৎসব উপলক্ষে টানা আট দিনের ছুটিতে দেছিংয়ের প্রশাসনিক কেন্দ্র হুজৌ পাহাড় ও হ্রদের সাতটি স্থান যুক্ত করে স্বল্প উচ্চতার ১৬টি উড়ান রুট চালু করে। দেছিং ও পার্শ্ববর্তী আনজি এখন স্বল্প উচ্চতার অর্থনীতির জন্য প্রাদেশিক পর্যায়ের পরীক্ষামূলক অঞ্চল। এটি ইঙ্গিত দেয়, টেকসই বাজার গড়তে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি অপারেটররা একসঙ্গে কাজ করছে।
প্রথমবার আকাশে ওড়া এই পর্যটকদের দলে রয়েছেন শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী ও পরিবার—যাঁরা একটি আকাশপথের রোমাঞ্চকে ঘিরে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। তাঁদের একজন, সাংহাইয়ের বিশের কোঠার শুরুর দিকের ভ্রমণকারী লি দু, মোগান পর্বতের শৈলশিরা থেকে প্রথমবার ট্যান্ডেম ফ্লাইটে ওড়ার অভিজ্ঞতাকে রোমাঞ্চকর বলে বর্ণনা করেছেন। তবে আকাশে ওঠার পর অভিজ্ঞতাটি ছিল আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত।
ঢেউখেলানো বাঁশবন ও চা-বাগানের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় কানে বাতাসের গর্জন শোনা—এ সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর। এতে আমি নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছি এবং অবিশ্বাস্য কিছু ছবি তুলেছি।
দক্ষিণে, হাইনানের অবকাশযাপন শহর সানিয়ায় স্কাইডাইভিং এখন বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার দর্শনার্থী স্বল্প উচ্চতার পর্যটনে অংশ নেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১২ শতাংশ বেশি। এতে ৭৩ কোটি ইউয়ানের বেশি আয় হয় এবং প্রায় ২ হাজার ৩০০টি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। সেখানকার একটি বড় স্কাইডাইভিং ঘাঁটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের গ্রাহক ছিল প্রায় ৬ হাজার; এরপর থেকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। উপকূল ও কাছাকাছি দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে মনোরম দৃশ্য দেখার হেলিকপ্টার চক্করও এখন পর্যটন পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে।
নীতিগত ও বাজারগত গতি
২০২৪ সালে বেইজিং স্বল্প উচ্চতার অর্থনীতিকে জাতীয় এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং একে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকা শক্তি বলে উল্লেখ করে। এই সমর্থনে স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, লাইসেন্স প্রদান ও বিনিয়োগের গতি বেড়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল পরিকল্পনাকারীদের ধারণা, ২০২৫ সালে এই খাতের আকার প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের দিকে বাড়তে পারে। নতুন ব্যবসা নিবন্ধনের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। চীনজুড়ে স্বল্প উচ্চতার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮৯ হাজার। ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে নিবন্ধিত হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৭০০টি নতুন প্রতিষ্ঠান—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা বিপুল বৃদ্ধি এবং ২০২৪ সালের পুরো বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সহজলভ্যতা বাড়ার সঙ্গে খরচ কমছে। চায়না ডেভেলপমেন্ট অবজারভেশনের অধীন বিমান চলাচল শিল্প গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ ঝাও ইউয়েহুয়া বলেন, এক দশক আগে দাম ছিল বড় বাধা, তবে এখন অনেক শহুরে ভ্রমণকারীর জন্য তা আর তেমন নয়।
এক দশক আগে জনপ্রতি ফ্লাইটের খরচ ছিল প্রায় ৩ হাজার ইউয়ান; এখন তা কমে প্রায় ১ হাজার ইউয়ানে নেমেছে।
প্রবেশমূল্য কমায় অপারেটররা আরও বেশি গ্রাহককে সেবা দিতে পারছেন। অন্যদিকে স্থানীয় সরকারগুলোও এমন উড়ানপথ যোগ করতে আগ্রহী, যা দর্শনার্থীদের বিভিন্ন মনোরম এলাকায় ছড়িয়ে দেয় এবং ছোট শহরগুলোতে নতুন ব্যয়ের প্রবাহ আনে। ঝেজিয়াং, হাইনানসহ অন্য প্রদেশগুলো কেন আকাশসীমা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করছে, তা এই চক্র ব্যাখ্যা করে।
ইভিটিওএল ও আকাশ থেকে দর্শনের পরবর্তী ধাপ
নতুন এক শ্রেণির উড়োজাহাজ এই প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে ইহ্যাং তাদের বৈদ্যুতিক উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণকারী উড়োজাহাজ EH216 S দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী বহনের নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পায়। গুয়াংজু ও হেফেইয়ে পরীক্ষামূলক সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নদীতীর ও ব্যবসায়িক এলাকার ওপর দিয়ে নির্ধারিত রুটে স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। এসব উড়োজাহাজে বিদ্যুৎ ও একাধিক ছোট রোটর ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রচলিত হেলিকপ্টারের তুলনায় শব্দ কম হতে পারে এবং ছোট হেলিপ্যাড থেকেও উড্ডয়ন সম্ভব হয়।
পর্যটন অপারেটররা দ্রুত এই বিকল্পকে সেবায় যুক্ত করছেন। কয়েকটি প্রদেশের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে ছোট বহরে ইভিটিওএল উড়োজাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা চলছে। শুরুতে থাকবে হাতে গোনা কয়েকটি, চাহিদা স্থিতিশীল থাকলে সংখ্যা বাড়িয়ে কয়েক ডজন করা হবে। এই ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে একটি পর্যবেক্ষণাধীন ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্ত থাকবে। আবহাওয়া যাচাই, যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও হেলিপ্যাডের নিরাপত্তা দেখবেন ঘটনাস্থলের কর্মীরা। দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণ হলো মসৃণ, প্রায় নিঃশব্দে ওপরে ওঠা এবং দীর্ঘ যাতায়াত ছাড়াই স্বল্প উচ্চতা থেকে বিস্তৃত দৃশ্য দেখা।
ঝেজিয়াংয়ে একটি সহযোগিতামূলক উদ্যোগের লক্ষ্য, খাড়া পাহাড়ের কাচের হাঁটাপথ ও গুহা উদ্যানের মতো পরিচিত আকর্ষণে ইভিটিওএল-ভিত্তিক দর্শনসেবা চালু করা। লক্ষ্য হলো এমন একটি স্মার্ট পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে টিকিট বিক্রি, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও আকাশপথের কার্যক্রম একই প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত হবে।
প্রযুক্তি কীভাবে আকাশপথে শৃঙ্খলা রাখে
আড়ালে থাকা ডিজিটাল ব্যবস্থা উড়োজাহাজ ও ড্রোনের সংঘর্ষ ঠেকায় এবং ফ্লাইটকে নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়া থেকে বিরত রাখে। চীন নেটওয়ার্কভিত্তিক চলাচল ব্যবস্থাপনা চালু করছে, যা নিয়ন্ত্রক ও অপারেটরদের কে কোথায় উড়ছে, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিক চিত্র দেয়। দূর থেকে শনাক্তকরণ বীকন, জিও-ফেন্সিং ও উচ্চতার সীমা দর্শনীয় ফ্লাইট ও ড্রোন—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়।
টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো ৫জি অ্যাডভান্সডে উন্নীত হচ্ছে, যা সরাসরি ভিডিও, টেলিমেট্রি ও নিয়ন্ত্রণ সংকেতের জন্য দ্রুততর ও নির্ভরযোগ্য সংযোগ দেয়। যেসব স্থানে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নেই, সেখানে অপারেটররা নিজস্ব রেডিও ব্যবস্থা ও ঘটনাস্থলের আবহাওয়া কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন। বেসামরিক বিমান চলাচলের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি বেসামরিক ড্রোন নিবন্ধিত হয়েছে এবং ড্রোন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। তাই বড় শহরের কাছাকাছি ব্যস্ত আকাশপথে সবার জন্য অভিন্ন মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারা উড়ছেন, খরচই বা কত
স্থান ও অভিজ্ঞতার ধরন অনুযায়ী দাম ভিন্ন হয়। পাহাড়ি কাউন্টিতে ট্যান্ডেম প্যারাগ্লাইডিং সাধারণত প্রায় ১ হাজার ইউয়ান থেকে শুরু হয়, যার মধ্যে সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষকের সময় অন্তর্ভুক্ত। সমুদ্রসৈকতের ওপর স্কাইডাইভিংয়ে উচ্চতা ও ছবি-ভিডিওর প্যাকেজ অনুযায়ী কয়েক হাজার ইউয়ান খরচ হতে পারে। বড় শহরে মনোরম দৃশ্য দেখার স্বল্প সময়ের হেলিকপ্টার ফ্লাইটে সাধারণত আসনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয়; সূর্যোদয় বা রাতের ফ্লাইটের বিকল্পও থাকে। প্রথমবারের যাত্রীদের কাছে বড় পরিবর্তন হলো, এখন সপ্তাহান্তের ভ্রমণ বাজেটেই আকাশপথের অভিজ্ঞতা রাখা সম্ভব।
বুকিংয়ের ধরন ভ্রমণের অন্যান্য অভিজ্ঞতার মতোই পরিচিত। সপ্তাহের কর্মদিবসে ছাড়ের সময়গুলো গ্রাহকসংখ্যা বাড়ায়, আর ছুটির দিনে ভাড়া থাকে সর্বোচ্চ। অপারেটররা নির্দিষ্ট সময়ের স্লট দেন এবং বাতাসের গতি, মেঘের উচ্চতা বা বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত বাতিলের নীতি স্পষ্ট করে জানান। পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণসূচি বানাতে অনেক দল স্পা, ওয়াইনারি বা উষ্ণ প্রস্রবণে থাকার সঙ্গে ফ্লাইটও যোগ করে।
ঝুঁকি, নিয়মকানুন ও শেখার প্রয়োজন
প্রতিটি কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা। প্যারাগ্লাইডিংয়ের আগে ক্রুরা হারনেস, অবতরণের ভঙ্গি ও হাতের সংকেত নিয়ে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেন। স্কাইডাইভিং প্রশিক্ষকেরা সরঞ্জাম পরার আগে হ্যাঙ্গারে উড্ডয়নের কৌশল ও প্যারাস্যুট নিয়ন্ত্রণ ব্যাখ্যা করেন। হেলিকপ্টার অপারেটররা ওজন ও ভারসাম্যের কঠোর সীমা এবং সিটবেল্ট যাচাই করেন। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে ফ্লাইট হয় না। দমকা হাওয়া বেড়ে গেলে বা মেঘের উচ্চতা নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমার নিচে নেমে এলে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়।
মান উন্নয়নে নিয়ন্ত্রকেরা অনুমতিপত্র ও নিরীক্ষা ব্যবহার করেন। অপারেটরদের সনদপ্রাপ্ত পাইলট ও প্রশিক্ষক রাখতে হয়, সময়সূচি অনুযায়ী উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় এবং যাত্রীদের সুরক্ষা দেয় এমন বিমা নিতে হয়। যাত্রীরা কোম্পানির সনদ যাচাই করে, বুকিং অ্যাপে নিরাপত্তা নির্দেশনা পড়ে এবং শরীরের সঙ্গে মানানসই পোশাক ও বন্ধ জুতা পরে নিজেদের সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারেন। ছবি তোলা যায়, তবে ক্রুর নির্দেশই সবার আগে।
গন্তব্যগুলোতে অর্থনৈতিক প্রভাব
স্বল্প উচ্চতার পর্যটনের বিস্তার হেলিপ্যাড বা উড্ডয়নস্থলের সীমানা ছাড়িয়ে সুফল ছড়ায়। পাইলট ও সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে আলোকচিত্রী, উড্ডয়নস্থলের কর্মী, ফ্লাইট প্রেরণকারী ও মেকানিক—বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। উড্ডয়নস্থলের কাছাকাছি ছোট ক্যাফে, অতিথিশালা ও পরিবহনসেবা নতুন যাত্রী পায়। গ্রামীণ কাউন্টিগুলোতে অপারেটরেরা প্রকৃতি উদ্যানের সঙ্গে ফ্লাইট মিলিয়ে অব্যবহৃত বিমানপথ ও পুরোনো জলাধারগুলোকে নতুন করে কাজে লাগিয়েছেন।
সানিয়ার উঝিঝৌ দ্বীপ পর্যটন অঞ্চলের কার্যক্রম পরিচালক লিয়াও জিয়ান বলেন, আকাশপথের এই উত্থান কোনো স্থানকে মানুষ যেভাবে উপভোগ করতে চায়, সেই চাহিদার একটি ঘাটতি পূরণ করছে।
ভ্রমণকে দ্বিমাত্রিক থেকে ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়ে স্বল্প উচ্চতার পর্যটন বাজারের একটি ঘাটতি পূরণ করেছে এবং পর্যটন ব্যয়ে নতুন গতি এনেছে।
এরপর কোন পথে এগোবে এই প্রবণতা
আরও শহর নদীতীর, ব্যবসায়িক এলাকা ও মনোরম পাহাড়কে যুক্ত করে বিশেষ স্বল্প উচ্চতার আকাশপথ চালু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফেরিঘাট ও মেট্রো সংযোগের পাশে ইভিটিওএল হেলিপ্যাড গড়ে উঠতে পারে, যাতে দর্শনার্থীরা কয়েক মিনিটের মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে যেতে পারেন। কয়েকটি প্রদেশ বিমানবন্দর, পর্যটন আকর্ষণ, চিকিৎসাকেন্দ্র ও জরুরি সাড়াদানকারী দলকে যুক্ত করে নেটওয়ার্ক গড়ার পরিকল্পনা করছে। এতে দর্শনীয় ফ্লাইটের সময়সূচিও আরও নির্ভরযোগ্য হবে।
শিল্প খাতের নেতারাও প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছেন। গুয়াংজুর একটি বড় প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে একজন অভিজ্ঞ বিমানকর্মী ও সাধারণ বিমান চলাচল খাতের নির্বাহী বলেন, বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য দক্ষ জনবল ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা সবার আগে নিশ্চিত করা উচিত।
বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলে স্বল্প উচ্চতার খাতের জন্য অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
এক নজরে
- ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে সানিয়ায় স্বল্প উচ্চতার পর্যটনে অংশ নেন প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১২ শতাংশ বেশি। এতে ৭৩ কোটি ইউয়ানের বেশি আয় এবং প্রায় ২ হাজার ৩০০টি কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
- ঝেজিয়াংয়ের মোগান পর্বতের প্যারাগ্লাইডিং ঘাঁটিতে বার্ষিক দর্শনার্থীর সংখ্যা ২০১৯ সালের ১০ হাজারের কম থেকে বেড়ে এখন ১ লাখ ছাড়িয়েছে।
- সম্প্রতি আট দিনের ছুটিতে হুজৌ সাতটি মনোরম স্থান যুক্ত করে ১৬টি নতুন ফ্লাইট রুট চালু করে।
- ২০২৪ সালের সরকারি কর্মপ্রতিবেদনে স্বল্প উচ্চতার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অন্তর্ভুক্ত হয়, যা স্থানীয় পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করে।
- দেশজুড়ে স্বল্প উচ্চতার খাতে প্রায় ৮৯ হাজার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৭০০টি।
- নিয়ন্ত্রকদের পূর্বাভাস, ২০২৫ সালে বাজারের আকার প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের দিকে বাড়বে।
- গত এক দশকে ফ্লাইটের গড় দাম জনপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ইউয়ান থেকে কমে প্রায় ১ হাজার ইউয়ানে নেমেছে, ফলে আরও বেশি মানুষের পক্ষে এই অভিজ্ঞতা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
- ২০২৫ সালের মার্চে ইহ্যাং তাদের EH216 S ইভিটিওএল দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী বহনের অনুমোদন পায়, যা শহরের মধ্যে স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটের পথ খুলে দেয়।






