তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তনের ৮০ বছর পূর্তি পালন করবে বেইজিং, দাবি প্রত্যাখ্যান তাইপের

পড়তে 9 মিনিট
তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তনের ৮০ বছর পূর্তি পালন করবে বেইজিং, দাবি প্রত্যাখ্যান তাইপের

চীন এখন কেন ৮০ বছর পূর্তি পালন করছে

১৯৪৫ সালে জাপানের কাছ থেকে দ্বীপটি চীনা প্রশাসনের হাতে হস্তান্তরের ঘটনাকে তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তন বলা হয়। এই ঘটনার ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে চীন। পূর্ব এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের সংবেদনশীল এক অধ্যায় এবং তাইওয়ান প্রণালির দুই পারে ইতিহাসের স্মৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চলমান বিরোধকে সামনে আনছে এই অনুষ্ঠান। তাইওয়ানের লোকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবে কোন শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নেবেন বা চূড়ান্ত কর্মসূচি কী হবে, তা বেইজিং প্রকাশ্যে জানায়নি।

সূচিপত্র
  1. চীন এখন কেন ৮০ বছর পূর্তি পালন করছে
  2. অনুষ্ঠান কখন ও কোথায়
  3. প্রত্যাবর্তনের অর্থ ও ১৯৪৫ সালে এর সূচনা
  4. প্রণালির দুই পারে পাল্টাপাল্টি বয়ান
  5. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রয়ে যাওয়া আইনি বিতর্ক
  6. ২০২৫ সালে রাজনীতি ও ঐক্যফ্রন্টের কৌশল
  7. আমন্ত্রিত কারা, অংশ নেবেন কারা
  8. তাইপেতে প্রাইড সপ্তাহান্তে ভিন্ন আবহ
  9. আঞ্চলিক গুরুত্ব ও বিশ্বের নজর
  10. মূল বিষয়গুলো

বেইজিংয়ের কাছে এই বার্ষিকী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ৮০ বছর পূর্তির ধারাবাহিক নানা আয়োজনের অংশ। চীনা কর্মকর্তারা তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তনকে চীনা জনগণের সম্মিলিত বিজয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন, যে বিজয়ে তাইওয়ানের মানুষও অন্তর্ভুক্ত, এবং একে যুদ্ধোত্তর বন্দোবস্তের ফল বলে বর্ণনা করেন। তাইওয়ান সরকার এর বিরোধিতা করেছে এবং প্রত্যাবর্তন-সংশ্লিষ্ট চীনের অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে। তাদের যুক্তি, ১৯৪৫ সালে দ্বীপটি হস্তান্তর করা হয়েছিল চীন প্রজাতন্ত্রের (আরওসি) কাছে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কাছে নয়। মূল ভূখণ্ডে গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠান কখন ও কোথায়

কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি শনিবার সকালে (২৫ অক্টোবর) গ্রেট হল অব দ্য পিপলে হওয়ার কথা। তবে বক্তাদের পূর্ণ তালিকা বেইজিং প্রকাশ করেনি। ২০১৫ সালে একই ধরনের সর্বশেষ অনুষ্ঠানে তৎকালীন চীনের চতুর্থ শীর্ষ নেতা ইউ ঝেংশেং বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং এতে বিদেশি প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছিলেন। এ বছরের অনুষ্ঠানটি হচ্ছে প্রণালির দুই পারে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধকালীন ইতিহাসের বয়ান নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে।

প্রত্যাবর্তনের অর্থ ও ১৯৪৫ সালে এর সূচনা

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানের অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৮৯৫ সালের শিমোনোসেকি চুক্তির আওতায় ছিং চীন তাইওয়ানকে জাপানের কাছে ছেড়ে দেয়। জাপান ৫০ বছর দ্বীপটি শাসন করে; এ সময় অবকাঠামো ও প্রশাসনে বিনিয়োগের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণও জারি রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। মিত্রশক্তির নেতারা ১৯৪৩ সালে কায়রো ঘোষণা জারি করেন এবং ১৯৪৫ সালের পটসডাম ঘোষণায় এর শর্ত পুনর্ব্যক্ত করেন। এতে বলা হয়, আত্মসমর্পণের পর জাপানকে চীনের কাছ থেকে দখল করা ভূখণ্ড, যার মধ্যে তাইওয়ানও রয়েছে, ফিরিয়ে দিতে হবে।

জাপানের পরাজয়ের পর জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের জেনারেল অর্ডার নম্বর ১-এ তাইওয়ানে থাকা জাপানি বাহিনীকে চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের কাছে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর জাপানের গভর্নর জেনারেল রিকিচি আন্দো তাইপেতে চীন প্রজাতন্ত্রের দূত চেন ই-এর কাছে কর্তৃত্ব হস্তান্তর করেন। আরওসি তাইওয়ানকে একটি প্রদেশ হিসেবে সংগঠিত করে এবং দিনটিকে প্রত্যাবর্তন দিবস ঘোষণা করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পরিস্থিতিটিকে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ফলে সার্বভৌমত্ব নিয়ে পরবর্তী আইনি বিতর্কের অবকাশ থেকে যায়। দ্বীপের মানুষের জন্য আরওসি শাসনের অধীনে নতুন যুগে দ্রুত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসে।

বিজ্ঞাপন

প্রণালির দুই পারে পাল্টাপাল্টি বয়ান

বেইজিংয়ের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর প্রত্যাবর্তনকে সব চীনা মানুষের সম্মিলিত সাফল্য এবং বৃহত্তর চীনা জাতির মধ্যে তাইওয়ানের অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরে। চীনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যুদ্ধকালীন ফলাফল এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাস ও আইনের দিক থেকে তাইওয়ান চীনের অংশ—এ দাবির ভিত্তি।

তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র ঝু ফেংলিয়ান এই বার্ষিকীকে ঐক্যের মুহূর্ত এবং যুদ্ধকালীন অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা প্রণালির দুই পারেই পালন করা উচিত। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে তাইওয়ান থেকে অংশগ্রহণকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

ঝু ফেংলিয়ান বলেন, প্রত্যাবর্তন ছিল প্রতিরোধযুদ্ধে বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের মানুষেরই তা স্মরণ করা উচিত।

প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দ্বীপটিকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সঙ্গে যুক্ত করার বয়ান প্রত্যাখ্যান করে তাইওয়ান সরকার। তাদের বক্তব্য, তাইপেতে আজকের সরকার চীন প্রজাতন্ত্র মিত্রশক্তির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাইপে প্রত্যাবর্তন-সংশ্লিষ্ট চীনা অনুষ্ঠানে কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে।

তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডবিষয়ক পরিষদের প্রধান চিউ চুই-চেং বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাসের অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অংশ নিলে এমন এক বয়ানকে সমর্থন জোগানো হতে পারে, যা চীন প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব মুছে দেয়।

চিউ চুই-চেং বলেন, বেইজিং বারবার মিথ্যা বয়ান তৈরি করেছে এবং প্রত্যাবর্তন-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানগুলোতে তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অংশ—এমন দাবি বানানোর চেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, চীন প্রজাতন্ত্রকে বিলুপ্ত করা এবং তাইওয়ানকে সংযুক্ত করাই এর চূড়ান্ত লক্ষ্য।

দুই পক্ষের অবস্থান ইতিহাস ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিয়ে আরও গভীর মতবিরোধের প্রতিফলন। বেইজিং নিজেকে চীন প্রজাতন্ত্রের উত্তরসূরি বলে দাবি করে এবং জোর দিয়ে বলে, ১৯৪৫ সালেই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়েছে। তাইপের জবাব, আরওসি এখনো বিদ্যমান, তারা কখনো নিজেদের সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়নি এবং হস্তান্তরের সময় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অস্তিত্বই ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রয়ে যাওয়া আইনি বিতর্ক

১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবরকে তাইওয়ানে জাপানি কর্তৃপক্ষের আরওসির কাছে আত্মসমর্পণের দিন হিসেবে ব্যাপকভাবে স্মরণ করা হয়। তবে এই হস্তান্তরের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাকি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হওয়া পর্যন্ত শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বদলেছিল—তা নিয়ে আইনজীবী ও ইতিহাসবিদদের বিতর্ক চলছে। ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত সান ফ্রান্সিসকো শান্তিচুক্তিতে জাপান তাইওয়ানের ওপর সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করে, কিন্তু কোন রাষ্ট্রের কাছে তা হস্তান্তর করা হচ্ছে, তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। এই অনুল্লেখ যুদ্ধোত্তর শুরুর বছরগুলোতে দ্বীপটির চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের জন্ম দিয়েছে।

চীন প্রজাতন্ত্র ও জাপান ১৯৫২ সালে তাইপে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে তাইওয়ানের ওপর জাপানের সার্বভৌমত্ব ত্যাগের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং যুদ্ধকালীন ঘোষণাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছিল তাইওয়ান চীনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তাইপে মনে করে, এই চুক্তি আগের হস্তান্তরকে নিশ্চিত করেছে। তবে বেইজিং সান ফ্রান্সিসকো চুক্তিকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তারা এর পক্ষ ছিল না। পাশাপাশি, ১৯৪৯ সালের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চীন সরকার হিসেবে নিজেদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তাইওয়ানের ওপর চীনা সার্বভৌমত্বের উত্তরাধিকার দাবি করে।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব (১৯৭১), যার মাধ্যমে জাতিসংঘে চীনের আসন আরওসির কাছ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কাছে যায়। বেইজিংয়ের বক্তব্য, প্রস্তাবটি চীনের প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং সেই সূত্রে তাইওয়ানের চীনের অংশ হওয়ার অবস্থানও স্বীকৃতি পেয়েছে। তাইওয়ান এবং অনেক আইনজ্ঞ পাল্টা যুক্তি দেন, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে শুধু জাতিসংঘে চীনের আসন কে পাবে, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়েছে; তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের নয়। আইনি এসব মতভিন্নতা ব্যাখ্যা করে কেন প্রত্যাবর্তন দিবসের বার্ষিকীগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়—এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে রয়ে যাওয়া অমীমাংসিত প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।

২০২৫ সালে রাজনীতি ও ঐক্যফ্রন্টের কৌশল

তাইওয়ানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ২০২৫ সালে ৮০ বছর পূর্তির তিনটি উপলক্ষ—জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীনা জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধের সমাপ্তি, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তন—ব্যবহার করে বেইজিং দেশে ও বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচার করছে। তাদের মতে, লক্ষ্য হলো যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থাকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে প্রমাণ হয় তাইওয়ান চীনের অংশ, এবং বিশিষ্ট তাইওয়ানিদের সেই বক্তব্য সমর্থনে আমন্ত্রণ জানানো। এ বছর বড় পরিসরে নানা স্মরণানুষ্ঠানের আভাস দিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয়ের ৮০ বছর উপলক্ষে সেপ্টেম্বরে বড় সামরিক কুচকাওয়াজ।

তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডবিষয়ক পরিষদ এ বছর দ্বীপটির ওপর বাড়তি চাপের ঘটনাগুলোও তালিকাভুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মির ঘেরাও মহড়া, তাইওয়ানের স্বাধীনতার সমর্থকদের লক্ষ্য করে নতুন আইনি কৌশল ও বক্তব্য, কর্মরত বা সাবেক তাইওয়ানি সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, প্রণালির মধ্যরেখার আরও কাছ দিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচলের রুট পরিবর্তন এবং বেইজিংয়ের ভাষায় স্বাধীনতাপন্থী সংগঠনগুলোর ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা। তাইপে বলেছে, দ্বীপটির বিরুদ্ধে পরিচালিত রাজনৈতিক ও তথ্য-প্রচারণার মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় তারা বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমন্ত্রিত কারা, অংশ নেবেন কারা

পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাইওয়ানের কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রত্যাবর্তন দিবস ২৫ অক্টোবরের সঙ্গে সময় মিলিয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা। কোন জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তৃতা দেবেন, তা বেইজিং নিশ্চিত করেনি। এক দশক আগে অনুষ্ঠানে চীনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের একজন বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং বিদেশি অতিথিরা অংশ নিয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, বেইজিং বার্ষিকীটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বার্তা দেওয়ার উপলক্ষ—দুইভাবেই দেখে।

তাইপের নিষেধাজ্ঞা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষকেও অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাইওয়ানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, অংশ নিলে এমন একটি বয়ানকে বৈধতা দেওয়া হবে, যা তারা প্রত্যাখ্যান করে। তাইওয়ান সরকারকে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাওয়া তাইওয়ানিদের ভয় দেখানো এবং ইতিহাস বিকৃত করার অভিযোগ এনেছে বেইজিং। এই মতবিরোধ প্রণালির দুই পারে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে গভীর স্থবিরতা ও বাড়তে থাকা অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

তাইপেতে প্রাইড সপ্তাহান্তে ভিন্ন আবহ

বেইজিংয়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পিত সপ্তাহান্তেই তাইপেতে পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম প্রাইড মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সমতা ও বৈচিত্র্যের এই উদযাপনে পুরো অঞ্চল থেকে অংশগ্রহণকারীরা আসেন। ২০১৯ সালে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ করে তাইওয়ান এশিয়ায় এলজিবিটিকিউ অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একই সময়ে দুই আয়োজন হওয়ায় প্রণালির দুই পারের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের পার্থক্য স্পষ্ট হয়: তাইপের নাগরিক সমাজ যেখানে অন্তর্ভুক্তি ও জনসমক্ষে মতপ্রকাশে গুরুত্ব দেয়, সেখানে বেইজিংয়ের স্মরণানুষ্ঠানের কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধকালীন ইতিহাস ও রাষ্ট্রের বয়ান।

দুটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও একই সময়ে আয়োজন হওয়ায় পরিচয় ও মূল্যবোধ নিয়ে দুই সমান্তরাল গল্প সামনে আসে। তাইওয়ানি কর্মকর্তারা প্রাইড উদযাপনকে গণতান্ত্রিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের কাছে যুদ্ধকালীন বার্ষিকীর স্মরণানুষ্ঠান জাতীয় ঐক্য জোরদার এবং যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে চীনকে তুলে ধরার উপায়।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক গুরুত্ব ও বিশ্বের নজর

বেইজিংয়ের অনুষ্ঠান এবং তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়ার দিকে বড় শক্তিগুলো নিবিড়ভাবে নজর রাখবে, কারণ এই বিরোধ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তাইওয়ান সম্পর্ক আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবে বলপ্রয়োগ করে স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাইওয়ানের আশপাশে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয় উপলক্ষে গত মাসে বড় কুচকাওয়াজ করেছে।

প্রত্যাবর্তন দিবসের স্মরণানুষ্ঠান প্রতীকী হলেও প্রণালির দুই পারের রাজনীতিতে প্রতীকের গুরুত্ব রয়েছে। বেইজিং অনুষ্ঠানটিকে ঐতিহাসিক বন্দোবস্তের স্বীকৃতি হিসেবে দেখে। তাইপের চোখে, যুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত একটি ভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে সেই বন্দোবস্তকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা এটি। অনুষ্ঠানটি এসব মতবিরোধের সমাধান করবে না, তবে তাইওয়ান প্রশ্নের সামরিক, আইনি ও কূটনৈতিক দিকগুলো যখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন সেগুলোকে সামনে আনবে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তনের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছে চীন। তাইওয়ানের লোকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবে কোন নেতারা অংশ নেবেন তা এখনো জানানো হয়নি।
  • প্রত্যাবর্তন-সংশ্লিষ্ট চীনা অনুষ্ঠানে কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে তাইওয়ান; তাদের অভিযোগ, বেইজিং যুদ্ধকালীন ইতিহাস বিকৃত করছে।
  • বেইজিং প্রত্যাবর্তনকে চীনা জনগণের সম্মিলিত বিজয় এবং তাইওয়ানের চীনের অংশ হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে, তাইপে বলছে, ১৯৪৫ সালে তাইওয়ান হস্তান্তর করা হয়েছিল চীন প্রজাতন্ত্রের কাছে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কাছে নয়।
  • ১৯৫১ সালের সান ফ্রান্সিসকো শান্তিচুক্তিতে জাপান তাইওয়ানের ওপর সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করলেও কোন রাষ্ট্রের কাছে তা হস্তান্তর করা হচ্ছে, তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৫২ সালের তাইপে চুক্তিতে জাপানের সার্বভৌমত্ব ত্যাগের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত হয়। ফলে ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ রয়ে গেছে।
  • ১৯৭১ সালের জাতিসংঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে জাতিসংঘে চীনের আসন আরওসির কাছ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়; তবে এতে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের নিষ্পত্তি হয়নি।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় উপলক্ষে বড় কুচকাওয়াজসহ এ বছরের চীনা স্মরণানুষ্ঠানগুলো বৃহত্তর বার্তা প্রচারের অংশ, যাকে তাইওয়ানি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক চাপ বলে অভিহিত করেছেন।
  • কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, অনুষ্ঠানটি ২৫ অক্টোবর হওয়ার কথা। ২০১৫ সালের সর্বশেষ বড় স্মরণানুষ্ঠানে চীনের শীর্ষ এক নেতার বক্তৃতা ছিল।
  • একই সপ্তাহান্তে তাইপেতে পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম প্রাইড মার্চ অনুষ্ঠিত হবে, যা প্রণালির দুই পারের ভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে