দেশে পরিশোধন শিল্প গড়তে ইন্দোনেশিয়ার উদ্যোগ
২০২৩ সালের জুন থেকে কার্যকর ইন্দোনেশিয়ার বক্সাইট রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কাঁচা আকরিক বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে দেশে খনিজ প্রক্রিয়াজাত করার জাতীয় উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি। এ নীতির লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিশোধন ও স্মেল্টিংয়ে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়াম ও বৈদ্যুতিক যানবাহন সরবরাহ শৃঙ্খলের কিছু অংশ দেশে প্রতিষ্ঠা করা। কর্মকর্তাদের যুক্তি, ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে কম মূল্যের আকরিক রপ্তানি করে পরে অ্যালুমিনা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য এ ধারা উল্টে দিয়ে বিনিয়োগকারীদের দেশে পরিশোধনাগার নির্মাণে উৎসাহিত করা, যাতে মূল্য সংযোজনের বড় অংশ ইন্দোনেশিয়ায় থাকে।
সূচিপত্র
- দেশে পরিশোধন শিল্প গড়তে ইন্দোনেশিয়ার উদ্যোগ
- নিষেধাজ্ঞার আওতা ও কার্যপদ্ধতি
- অগ্রগতি ও সক্ষমতার ঘাটতি
- বর্তমান স্মেল্টারগুলোর চিত্র
- আকরিক ও অ্যালুমিনার মধ্যে অসামঞ্জস্য
- খনি শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর চাপ
- অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধা
- নীতিতে পরিবর্তন ও শিথিলতার আলোচনা
- বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
- নিকেল খাতের শিক্ষা ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা
- ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের সম্ভাবনা
- মূল বিষয়গুলো
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া এ নীতিকে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন। অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের চাহিদা ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতার চেয়ে বেশি, তাই দেশটি এখনো বক্সাইট থেকে তৈরি অনেক পণ্য আমদানি করে। আধুনিক কারখানা নির্মাণের মাধ্যমে এ ব্যবধান পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগ চায় সরকার। খনিজের পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কয়লা প্রক্রিয়াকরণে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিমধ্যে কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এ উদ্যোগের নজির রয়েছে নিকেল খাতে: কাঁচা আকরিক রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণে গতি এসেছিল এবং রপ্তানি মূল্য বেড়েছিল।
নিষেধাজ্ঞার আওতা ও কার্যপদ্ধতি
২০২৩ সালের সিদ্ধান্তে অপরিশোধিত বক্সাইট আকরিক এবং ধোয়া বক্সাইটের চালান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ভিত্তি ২০০৯ সালের খনি আইন, যেখানে রপ্তানির আগে দেশে মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। ২০১৪ সালে ইন্দোনেশিয়া প্রথমবার কাঁচা খনিজ রপ্তানিতে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নতুন কারখানা নির্মাণের সময় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া এড়াতে ২০১৭ সালে নিয়ম শিথিল করা হয়। প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ২০২২ সালের শেষ দিকে নতুন করে বক্সাইট রপ্তানি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন। তিনি জানতেন, এতে রপ্তানি আয় কমার মতো স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি হবে। তবে তাঁর যুক্তি ছিল, দীর্ঘমেয়াদি সুফল সেই খরচের চেয়ে বেশি হবে। এর আগে নিকেল নীতিতেও একই হিসাব কাজ করেছিল, যার ফলে পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পাশাপাশি অ্যালুমিনিয়াম ও অ্যালুমিনা-নির্ভর শিল্পে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে চায় ইন্দোনেশিয়া। বক্সাইট থেকে প্রথমে অ্যালুমিনা তৈরি হয়, যা পরে স্মেল্টিংয়ের মাধ্যমে অ্যালুমিনিয়ামে রূপান্তরিত হয়। পরিবহন, নির্মাণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, প্যাকেজিং এবং ক্রমবর্ধমানভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির হালকা যন্ত্রাংশে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহৃত হয়। দেশে শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তি থাকলে স্থানীয় নির্মাতারা উপকৃত হবে এবং পশ্চিম কালিমান্তানের মতো বক্সাইটসমৃদ্ধ এলাকায় নতুন প্রকল্প আকৃষ্ট হতে পারে।
অগ্রগতি ও সক্ষমতার ঘাটতি
আকরিক রপ্তানিকারক থেকে প্রক্রিয়াজাতকারীতে রূপান্তর চলছে, তবে বক্সাইট থেকে অ্যালুমিনা পরিশোধনের সক্ষমতা এখনো আকরিক সরবরাহের তুলনায় পিছিয়ে। কর্মকর্তাদের হিসাবে, বক্সাইট আকরিক প্রক্রিয়াকরণের মোট স্থাপিত সক্ষমতা বছরে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টন। অ্যালুমিনা ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের চাহিদার সঙ্গে তুলনা করলে এ সক্ষমতা দেশের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। পরিশোধনাগারের ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকটি কারখানা চালু আছে, সেগুলোও খনি থেকে উৎপাদিত সব আকরিক প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না।
বর্তমান স্মেল্টারগুলোর চিত্র
বর্তমানে চারটি অ্যালুমিনা কারখানা চালু আছে বলে জানা গেছে। এগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা বছরে প্রায় ৪৩ লাখ টন অ্যালুমিনা। সরকার কোম্পানিগুলোকে আরও আটটি অ্যালুমিনা প্রকল্প সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। এগুলো চালু হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টন বক্সাইট ব্যবহার করে প্রায় ৮৫ লাখ টন অ্যালুমিনা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এসব প্রকল্প খাতটিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক ইনালুম উৎপাদন বাড়াতে এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। আগামী কয়েক বছরে তাদের লক্ষ্য অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সক্ষমতা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টনে উন্নীত করা।
আকরিক ও অ্যালুমিনার মধ্যে অসামঞ্জস্য
ইন্দোনেশিয়ায় বছরে ২ কোটি টনের বেশি বক্সাইট উত্তোলন করা সম্ভব। শিল্প সমিতিগুলোর দাবি, কোনো কোনো বছরে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ কোটি টনে পৌঁছেছে, অথচ চালু অ্যালুমিনা কারখানাগুলো এর সামান্য অংশই প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। রূপান্তরের অনুপাতটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আকরিকের মানের ওপর নির্ভর করে এক টন অ্যালুমিনা উৎপাদনে কয়েক টন বক্সাইট লাগে; সাধারণত প্রতি টন অ্যালুমিনার জন্য প্রায় তিন থেকে চার টন বক্সাইট প্রয়োজন হয়। আরও পরিশোধন সক্ষমতা না বাড়লে দেশে বক্সাইটের উদ্বৃত্ত অনিবার্য বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতারা। ২০২৫ সালে অনুমোদিত খনি পরিকল্পনায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টন বক্সাইট উৎপাদনের কথা রয়েছে। অথচ প্রায় ৫৩ লাখ টন অ্যালুমিনা উৎপাদনের কার্যকর সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টন বক্সাইট লাগবে। ফলে উদ্বৃত্তের ব্যবধান সামান্য হলেও পরিশোধনাগারগুলো পূর্ণ সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করলে দ্রুতই তা বেড়ে যেতে পারে।
খনি শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর চাপ
খনি কোম্পানিগুলোর দাবি, আকরিক সরবরাহ ও পরিশোধনাগারের চাহিদার ব্যবধান তাদের আর্থিক অবস্থাকে সংকুচিত করেছে। রপ্তানি বন্ধ এবং দেশের ভেতরে ক্রেতা কম থাকায় মজুত বেড়েছে, আর ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমেছে। নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা ও লোকসান কমাতে কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমিয়েছে বা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর সতর্কতা, দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিক ও স্থানীয় সরবরাহকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে পশ্চিম কালিমান্তানসহ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে খনি কার্যক্রমের ওপর মানুষের জীবিকা ও আঞ্চলিক অর্থনীতি নির্ভরশীল।
পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ার আগ পর্যন্ত খনিগুলো যাতে ব্যয় মেটাতে পারে, সে জন্য দেশীয় বাজারে বক্সাইট বিক্রির ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের কথা সরকারকে বিবেচনা করতে বলেছে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে অ্যালুমিনা কারখানাগুলোকে আকরিকের জন্য অন্তত নির্ধারিত মূল্য দিতে হবে। সমর্থকদের যুক্তি, ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের ফলে দামে লাগামহীন প্রতিযোগিতা ঠেকানো যাবে। এতে খনি কোম্পানিগুলোর স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়া এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি কমবে। ভারসাম্যহীনতার কথা স্বীকার করে কর্মকর্তারা বলেছেন, আরও পরিশোধনাগার চালু না হওয়া পর্যন্ত উদ্বৃত্ত সামলানোর একটি উপায় হলো উৎপাদন সীমিত করা। তবে খনি কোম্পানিগুলোর পাল্টা যুক্তি, এ ধরনের উৎপাদন হ্রাসে বেতন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য চালু কর্মসূচি ঝুঁকিতে পড়ে।
অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধা
পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি পূরণের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়ন। কালিমান্তানের সাতটি বড় অ্যালুমিনা প্রকল্প বিলম্বিত হয়েছে, ফলে পরিকল্পিত বিপুল সক্ষমতা এখনো কাগজেই রয়ে গেছে। প্রকল্প উন্নয়নকারীরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া ও বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রাথমিক খরচ বেশি, নির্মাণে দীর্ঘ সময় এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বন্দরে প্রবেশাধিকার, কস্টিক সোডা ও অ্যালুমিনা পরিশোধনে প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণের জটিল চাহিদাও রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ান বক্সাইট অ্যান্ড আয়রন ওর এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রোনাল্ড সুলিস্তিয়ান্তো বারবার সতর্ক করেছেন, দ্রুত মুনাফা ফেরত আসে এমন নিকেল প্রকল্পের তুলনায় অ্যালুমিনা প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো ঋণদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। তাঁর যুক্তি, অর্থায়নের পথ খুলে দিতে নীতিগত সহায়তা না থাকায় কোম্পানিগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে।
“একটি বক্সাইট স্মেল্টার ইউনিট নির্মাণে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার মূলধনি ব্যয় প্রয়োজন,” বলেন রোনাল্ড সুলিস্তিয়ান্তো। তিনি আরও বলেন, প্রকল্প এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে ব্যাংকগুলো রাজি হচ্ছে না।
খনিজ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায়ই নিয়ন্ত্রক নীতির স্পষ্টতার ওপর নির্ভর করে। প্রকল্প উন্নয়নকারীরা বলছেন, রপ্তানির অনুমতি, লাইসেন্স ও মূল্য নির্ধারণে ঘন ঘন নিয়ম পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো সতর্ক। স্পনসররা অংশীদার খোঁজা এবং জমি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করায় নাম জানা একাধিক প্রকল্পের জমি এখনো অনাবাদি পড়ে আছে। খনি লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর কালিমান্তানের একটি প্রকল্প থমকে যায়। এতে ঋণদাতাদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য অনুমোদন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে, কারণ তাঁদের ১৫ থেকে ২০ বছরের সময়সীমায় ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়। জ্বালানি সরবরাহও আরেকটি বাধা। অ্যালুমিনা পরিশোধনাগারে প্রচুর বিদ্যুৎ ও তাপ লাগে। খনির কাছে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা বা গ্রিডের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে বেশি মূলধন লাগে এবং নির্মাণের গতি কমতে পারে।
নীতিতে পরিবর্তন ও শিথিলতার আলোচনা
২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে খবর ছড়িয়েছে, পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ার আগ পর্যন্ত খনি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ কমাতে কর্মকর্তারা বক্সাইট রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারেন। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু রপ্তানির অনুমতি দিলে অতিরিক্ত আকরিকের জোগান শোষণ করা এবং উৎপাদকদের আয় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যদের আশঙ্কা, রপ্তানির সুযোগ দিলে দেশীয় পরিশোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; বেশি দামের কাঁচামালের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে। আপাতত নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে, আর নীতিগত মনোযোগ এখন দেশের ভেতরে মূল্য নির্ধারণ ও আকরিক ব্যবহারের ওপর।
মন্ত্রী বাহলিল দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপরই জোর দিচ্ছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণের কৌশল থেকে সরে আসবে না। তিনি বহুবার বাস্তবসম্মত ভাষায় এ নীতির যুক্তি তুলে ধরেছেন।
“দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা শিল্পের সক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় ইন্দোনেশিয়া এখনো অ্যালুমিনিয়ামের মতো বক্সাইট থেকে তৈরি অনেক পণ্য আমদানি করে। তাই বিনিয়োগকারীদের দেশে বক্সাইট স্মেল্টার নির্মাণ করতে হবে,” বলেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া।
২০২৫ সালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় খনিজ ও কয়লার জন্য এইচপিএম নামে পরিচিত দেশীয় বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু করে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত সূত্রে হিসাব করা মূল্যের সমান বা তার বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এর লক্ষ্য রাষ্ট্রের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করা। বড় খনি কোম্পানিগুলোর দাবি, এ সূত্রে নির্ধারিত দাম পরিশোধনাগারগুলোর দিতে চাওয়া দামের চেয়ে বেশি, ফলে বাজারে লেনদেন আটকে গেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি পিটি আনেকা তামবাং, যা আন্তাম নামে পরিচিত, আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে যে ক্রেতারা এইচপিএম অনুযায়ী বক্সাইট কিনতে চাইছেন না। কোম্পানিটি সতর্ক করেছে, এপ্রিলের শুরুতে ধোয়া বক্সাইট, এমনকি ফেরোনিকেলের বিক্রিও বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় রয়্যালটি ও নগদ অর্থপ্রবাহে।
“ক্রেতা ও স্মেল্টারগুলো বেঞ্চমার্ক দাম দিতে রাজি নয়, তাই বিক্রি লাভজনক হচ্ছে না। এইচপিএমের দাম অনেক বেশি এবং এতে প্রতিষ্ঠান-টু-প্রতিষ্ঠান দরকষাকষির নমনীয়তা কমে যাচ্ছে,” সংসদীয় শুনানিতে বলেন আন্তামের প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর নিকো কান্টার।
বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে খনি কোম্পানি ও পরিশোধনাগারগুলো সরকারকে এইচপিএম পুনর্নির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতে ছাড় বাড়ানো অথবা ধাপে ধাপে নীতি কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া মূল্য নির্ধারণের সূত্রটি অনিচ্ছাকৃতভাবে লেনদেন বন্ধ করে দিচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনার জন্য আইনপ্রণেতারা মন্ত্রণালয়গুলোকে অনুরোধ করেছেন।
বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। আগের বিধিনিষেধের আগে চীন ইন্দোনেশিয়ার বক্সাইটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করত; কোনো কোনো বছরে দেশটির আমদানির বড় অংশই আসত এ দ্বীপরাষ্ট্র থেকে। ইন্দোনেশিয়া আকরিক রপ্তানি বন্ধ করার পর চীনা ক্রেতারা অস্ট্রেলিয়া, গিনি, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকেছে। এখন চীনের আমদানিতে গিনিই প্রধান সরবরাহকারী। ইন্দোনেশিয়া আংশিক রপ্তানির অনুমতি দিলে আবারও বাণিজ্য প্রবাহ বদলে যাবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সমুদ্রপথে রপ্তানির জন্য ১ কোটি ৬০ লাখ টন ইন্দোনেশীয় বক্সাইট বাজারে এলে অন্যত্র ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন অ্যালুমিনা উৎপাদন সম্ভব হবে, যা বর্তমান বৈশ্বিক ঘাটতির একাংশ পূরণ করার জন্য যথেষ্ট।
বিশ্বের অ্যালুমিনা বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় পরিশোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং কয়েকটি বন্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালে গিনিতে কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে, যার মধ্যে একজন বড় উৎপাদকের রপ্তানি স্থগিতের ঘটনাও রয়েছে। এসব ধাক্কায় অ্যালুমিনার দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে তা স্পষ্ট হয়। ইন্দোনেশিয়ার জন্য এ পরিস্থিতি দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানির অনুমতি দিলে শক্তিশালী বৈদেশিক চাহিদা উদ্বৃত্তের বড় অংশ শোষণ করতে পারে। একই সময়ে, বাজারে সরবরাহের টান থাকায় উচ্চমূল্যের সুযোগ কাজে লাগাতে দেশে পরিশোধনাগার গড়ার যুক্তিও জোরালো হয়।
অ্যালুমিনিয়াম খাতে ইন্দোনেশিয়ার পরবর্তী ধাপের শিল্পায়নের লক্ষ্য বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। গাড়ি, উড়োজাহাজ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় অ্যালুমিনিয়ামের শক্তি ও হালকা ওজন কাজে লাগে। আকরিক উৎপাদন, অ্যালুমিনা পরিশোধন এবং স্মেল্টিংয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করতে পারলে ইন্দোনেশিয়া আরও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের দিকে এগোতে পারে। ইনালুম ও এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের পরিকল্পিত অংশীদারত্বের মতো উদ্যোগ দেখায়, প্রকল্পগুলোর আর্থিক সমাপনী হলে প্রযুক্তি ও মূলধন এ রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে পারে।
নিকেল খাতের শিক্ষা ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা
নিকেল খাতের অভিজ্ঞতা দেখায়, কী অর্জন সম্ভব। দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ বাধ্যতামূলক করার পর নিকেল রপ্তানির মূল্য দ্রুত বেড়েছে। স্মেল্টার ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। পরিশোধিত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাটারি উপকরণের সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। নীতিনির্ধারকেরা আশা করেন, বক্সাইট খাতেও একই ধরনের অগ্রগতি হবে: অ্যালুমিনা পরিশোধন, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রোলড ও এক্সট্রুড পণ্যের মতো পরবর্তী ধাপের উৎপাদন বাড়বে।
তবে দুই খাতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিকেল প্রকল্পগুলো সাধারণত দ্রুত অর্থায়ন পেয়েছে। উচ্চচাপের অ্যাসিড লিচ এবং রোটারি কিলন ইলেকট্রিক ফার্নেস প্রযুক্তিতে বিনিয়োগও অ্যালুমিনা পরিশোধনাগারের তুলনায় প্রায়ই দ্রুত লাভ ফেরত দিয়েছে। বক্সাইট পরিশোধনে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দরকার। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নীতি দ্রুত পাল্টানোর অভিজ্ঞতাও শিল্প খাতের মনে আছে; ওই সময় আকরিক রপ্তানির অনুমতি দিয়ে পরে আবার নিয়ম কঠোর করা হয়েছিল। প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকগুলো এ ইতিহাস বিবেচনায় নেয়। বড় ও মূলধননিবিড় পরিশোধনাগারের ক্ষেত্রে নিয়ম, মূল্য নির্ধারণ ও লাইসেন্সিং বিষয়ে আরও স্পষ্টতা প্রায়ই সিদ্ধান্তমূলক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাকৃতিক সম্পদসংক্রান্ত নীতি নিয়ে বিদেশেও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে ইন্দোনেশিয়া। এর মধ্যে নিকেল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় একটি বিরোধ রয়েছে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও দেশে মূল্য সংযোজনকে জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে সরকার এ কৌশলের পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে। বক্সাইট খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ সময়সীমা অনিশ্চয়তা কমাতে এবং অর্থায়নের খরচ নামাতে পারে।
২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের সম্ভাবনা
আগামী দুই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থমকে থাকা অ্যালুমিনা প্রকল্পগুলো অর্থায়নের চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলে ২০২৭ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টন হতে পারে। এতে দেশের আরও বেশি বক্সাইট ব্যবহার হবে এবং খনি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ কমবে। বাজারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পগুলো ফের শুরু হলে এবং নির্মাণে বড় বিলম্ব না হলে ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে বাজারে ভারসাম্য ফিরতে পারে। অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। এর উপায় হতে পারে মিশ্র অর্থায়ন, স্পষ্টতর রাজস্ব প্রণোদনা, বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নত রূপরেখা এবং দেশীয় মূল্য নির্ধারণের নিয়মে বাস্তবসম্মত সমন্বয়, যাতে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি খনি ও পরিশোধনাগারগুলোর মধ্যে লেনদেন সম্ভব হয়।
এর মধ্যে উৎপাদন পরিকল্পনা সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। ২০২৫ সালের অনুমোদিত খনি কোটায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টন বক্সাইট উৎপাদনের কথা রয়েছে। পুরো সক্ষমতায় চললে কার্যকর পরিশোধনাগারগুলোর প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টন আকরিক প্রয়োজন। তবে উৎপাদন বাড়ানোর প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক কারখানাই সর্বোচ্চ সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। পরিশোধনাগারে আকরিকের ঘাটতি তৈরি হওয়া কিংবা খনিতে মজুত ফুলে ওঠা, দুই-ই এড়াতে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় সরকারকে নিবিড় সমন্বয় করতে হবে। কখনো নিয়ন্ত্রিত সময়ের জন্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় ক্রেতাদের সুরক্ষায় রপ্তানির পরিমাণ সতর্কভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য অপরিবর্তিত: কাঁচা আকরিক থেকে অ্যালুমিনা ও অ্যালুমিনিয়াম, তারপর তৈরি অ্যালুমিনিয়াম পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মূল্য শৃঙ্খলে ওপরে ওঠা। বক্সাইট নিষেধাজ্ঞা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি হাতিয়ার। কৌশলগত অর্থায়ন, স্থিতিশীল নিয়ন্ত্রণনীতি ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো হলো অন্যগুলো। নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা এসব উপাদান সমন্বয় করতে পারলে অ্যালুমিনিয়াম শিল্প নিকেল খাতের পথ অনুসরণ করতে পারে, যদিও সময় লাগবে ভিন্ন।
মূল বিষয়গুলো
- দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ বাধ্যতামূলক করে উচ্চমূল্যের পণ্যের মূল্য দেশের ভেতরে রাখতে ২০২৩ সালের জুন থেকে বক্সাইট আকরিক রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ইন্দোনেশিয়া।
- অ্যালুমিনা উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা এখনো সীমিত। চারটি চালু পরিশোধনাগারে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ টন উৎপাদন সম্ভব; কালিমান্তানের কয়েকটি প্রকল্প বিলম্বিত।
- পরিশোধনাগারের চাহিদা আকরিক উৎপাদনের তুলনায় কম হওয়ায় দেশে বক্সাইটের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা দাম ও নগদ অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ ফেলছে।
- নতুন পরিশোধনাগার নির্মাণের সময় কর্মসংস্থান ও খনি কার্যক্রম ধরে রাখতে শিল্প খাতের গোষ্ঠীগুলো ন্যূনতম মূল্য এবং সহজ অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে।
- অর্থায়নই প্রধান বাধা। নিয়মের স্পষ্টতা ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া বড় অ্যালুমিনা প্রকল্পে অর্থ দিতে ব্যাংকগুলো অনিচ্ছুক।
- সরকার ২০২৫ সালে দেশীয় বেঞ্চমার্ক মূল্য চালু করেছে। খনি কোম্পানিগুলোর দাবি, এ মূল্যসূত্র অতিরিক্ত উঁচু হওয়ায় লেনদেন থমকে গেছে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি আন্তাম জানিয়েছে, বেঞ্চমার্ক দামে ক্রেতাদের অনাগ্রহের কারণে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বক্সাইট বিক্রি বন্ধ হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে রয়্যালটি ও আয়ে।
- রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আলোচনা উঠলেও কর্মকর্তারা দেশে অ্যালুমিনিয়ামের মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
- অস্ট্রেলিয়া ও গিনিতে বৈশ্বিক অ্যালুমিনা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দাম বেড়েছে, ফলে ইন্দোনেশিয়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
- বিলম্বিত প্রকল্পগুলো এগোলে ২০২৭ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অ্যালুমিনা উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এতে আকরিকের উদ্বৃত্ত কমবে এবং বৃহত্তর শিল্পায়নের লক্ষ্য এগোবে।






