এই শুদ্ধি অভিযান এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ
গুরুতর দুর্নীতির সন্দেহে চীন দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদমর্যাদার জেনারেল হে ওয়েইদং এবং সাবেক রাজনৈতিক প্রধান অ্যাডমিরাল মিয়াও হুয়াকে, আরও সাতজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বহিষ্কার করেছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নয়জনকেই কমিউনিস্ট পার্টি ও সামরিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সম্ভাব্য ফৌজদারি অভিযোগের জন্য তাঁদের মামলা সামরিক কৌঁসুলিদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর এই প্রথম দায়িত্বরত কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) একজন ভাইস চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হলো। সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী দলীয় সংস্থা সিএমসির এই সদস্য একই সঙ্গে ২৪ সদস্যের পলিটব্যুরোতেও ছিলেন। ফলে শি জিনপিংয়ের আমলে নেতৃত্বে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো এই পদক্ষেপ। গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে এই সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া ইঙ্গিত দেয়, শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে।
সূচিপত্র
- এই শুদ্ধি অভিযান এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ
- সময়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
- যাঁদের সরানো হয়েছে
- বেইজিংয়ের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া
- শির ক্ষমতা সংহতকরণ ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন
- শুদ্ধি অভিযান সামরিক প্রস্তুতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে
- সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও সরঞ্জাম নিয়ে উদ্বেগ
- নেতৃত্বে রদবদল ও প্রতিরোধক্ষমতা
- তাইওয়ান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
- নিখোঁজ হওয়া ও পদে রদবদলের ধারা
- চতুর্থ প্লেনামে এরপর কী
- মূল বিষয়গুলো
কর্তৃপক্ষ বলেছে, অপরাধগুলো গুরুতর, অর্থের অঙ্ক ছিল অত্যন্ত বড় এবং এর পরিণতি হয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর। পিপলস লিবারেশন আর্মিতে (পিএলএ) দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য হিসেবে কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। যৌথ অভিযান থেকে রাজনৈতিক কাজ, রকেট বাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ পর্যন্ত বিভিন্ন শাখায় জড়িত ব্যক্তিদের পদমর্যাদা ও দায়িত্বের বিস্তৃতি দেখায়, সামরিক ক্ষমতার মূল ক্ষেত্রগুলো জুড়েই এই অভিযান চলছে।
সময়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের (চতুর্থ প্লেনাম) আগে এই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটল। সাধারণত এ ধরনের বৈঠকে কর্মী নিয়োগ ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়; কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের শূন্য পদ পূরণেরও সুযোগ তৈরি হয়। মার্চের পর থেকে হেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। চীনের অস্বচ্ছ ব্যবস্থায় এমন অনুপস্থিতিকে প্রায়ই আনুষ্ঠানিক শাস্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়। ২০২৫ সালের শুরুর দিক থেকে কমিশন স্বাভাবিকের চেয়ে কম সদস্য নিয়ে কাজ করছে। এই রদবদল শি জিনপিংকে কমান্ড কাঠামোর শীর্ষ পদগুলোতে নতুন নিয়োগের সুযোগ করে দিচ্ছে।
যাঁদের সরানো হয়েছে
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন শাখার নয়জন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির নাম ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সর্বশেষ জানা পদগুলো থেকে এই শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপ্তি বোঝা যায়।
- হে ওয়েইদং, কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও পলিটব্যুরোর সদস্য; এর আগে ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের কমান্ডার ছিলেন
- মিয়াও হুয়া, সিএমসির রাজনৈতিক কর্মবিষয়ক বিভাগের পরিচালক এবং পিএলএ নেভির জ্যেষ্ঠ অ্যাডমিরাল
- হে হংজুন, সিএমসির রাজনৈতিক কর্মবিষয়ক বিভাগের নির্বাহী উপপরিচালক
- ওয়াং শিউবিন, সিএমসির যৌথ অভিযান কমান্ড কেন্দ্রের নির্বাহী উপপরিচালক
- লিন শিয়াংইয়াং, ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের সাবেক কমান্ডার
- ছিন শুতং, পিএলএ আর্মির রাজনৈতিক কমিশার
- ইয়ুয়ান হুয়াঝি, পিএলএ নেভির রাজনৈতিক কমিশার
- ওয়াং হৌবিন, পিএলএ রকেট বাহিনীর কমান্ডার
- ওয়াং ছুনিং, পিপলস আর্মড পুলিশের সাবেক কমান্ডার
সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানে বারবার দেখা যাওয়া একটি ধরন অনুযায়ী, তাঁদের কয়েকজনকে কয়েক মাস ধরে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। নয়জনের মধ্যে আটজনই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ফলে আসন্ন বৈঠকে তাঁদের শূন্য পদগুলো পূরণ করা যাবে।
বেইজিংয়ের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মামলাগুলোকে অত্যন্ত গুরুতর বলে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলো দলের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্যের প্রতিনিধিত্ব করে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নথিগুলো সামরিক প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরের অপরাধের বিচার করেন এই বিশেষ কৌঁসুলিরা। চীনের ব্যবস্থায় এটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পথে একটি প্রচলিত ধাপ; সেখানে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের মামলা প্রায়ই ফৌজদারি অভিযোগের আগে আসে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং এই পদক্ষেপকে স্পষ্ট বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন যে বাহিনীর ভেতর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা হবে। দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পর তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও সংহতি জোরদার করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।
এই শাস্তি স্পষ্ট করে দেয়, সামরিক বাহিনীর ভেতরে দুর্নীতিগ্রস্তদের লুকিয়ে থাকার কোনো জায়গা একেবারেই নেই।
পিএলএর প্রধান পত্রিকা অস্বাভাবিকভাবে কঠোর ভাষায় এই বিচ্যুতিকে অস্ত্রের ওপর দলের নিয়ন্ত্রণের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছে। দলের প্রতি আনুগত্য ও বাহিনীর ঐক্য নিয়ে লেখা সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি নয়জনের বিরুদ্ধে মূলনীতি ও নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ করেছে।
তাঁরা ছিলেন অনুগতিহীন এবং পবিত্রতা হারিয়েছিলেন; দলীয় সদস্য হিসেবে তাঁদের বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পতন ঘটেছিল।
এই ভাষা থেকে বোঝা যায়, অভিযানটি একই সঙ্গে আইনি ও রাজনৈতিক, দুই ফ্রন্টে চলছে। আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে সামরিক কৌঁসুলি ও আদালত। রাজনৈতিক দিকটিতে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর দলের নিরঙ্কুশ নেতৃত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা শির এমন একটি পিএলএ-র ভাবনার মূল ভিত্তি—যে বাহিনী হবে শৃঙ্খলাবদ্ধ, অনুগত এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
শির ক্ষমতা সংহতকরণ ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন
কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন চীনের সশস্ত্র বাহিনীর স্নায়ুকেন্দ্র। এর চেয়ারম্যান শি জিনপিং। হে ওয়েইদং ছিলেন দুই ভাইস চেয়ারম্যানের একজন। প্রথা ও প্রভাবের বিচারে তাঁর অবস্থান ছিল শির ঠিক পরেই এবং প্রবীণ জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার ওপরে। হেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মিয়াওকে এ বছরের শুরুতে কমিশন থেকে সরানো হয়েছে। ফলে প্লেনামে শি পদগুলো পূরণ এবং দায়িত্ব বণ্টন নতুন করে সাজানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ঝাং ইউশিয়া, শৃঙ্খলা বিষয়ক প্রধান ঝাং শেংমিন এবং যৌথ স্টাফ বিভাগের প্রধান লিউ ঝেনলি—এই জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা বাহিনীর দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
হের উত্থান তাইওয়ান ও যৌথ অভিযানের ওপর শির বিশেষ মনোযোগের প্রতিফলন। ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের প্রধান হিসেবে হে তাইওয়ান প্রণালির মুখোমুখি থাকা বাহিনীগুলোর তদারকি করতেন। ২০২২ সালে তাঁকে সরাসরি সিএমসির ভাইস চেয়ারম্যান ও পলিটব্যুরোর পদে উন্নীত করা হয়; কেন্দ্রীয় কমিটিতে পূর্ণ মেয়াদ কাজ করার প্রচলিত ধাপটি এড়িয়ে যান তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শূন্য পদগুলো শিকে অভিযান, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং রাজনৈতিক কাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাঁর আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার আরেকটি সুযোগ করে দিচ্ছে।
চীনা রাজনীতির গবেষক ওয়েন তি সুং বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের এই পরিবর্তন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শির নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার এবং সংবেদনশীল সময়ে নেতৃত্বের পরবর্তী সারি নতুন করে সাজানোর প্রচেষ্টাকে জোরদার করছে।
শি যে প্রশাসনকে ঢেলে সাজাচ্ছেন, তা নিশ্চিত। হে ও মিয়াওকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরানোর মানে হলো, প্লেনামে তিনি কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের নতুন সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি পিএলএকে আধুনিক যৌথ যুদ্ধের উপযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার বহু বছরের প্রচেষ্টার অংশ। এর মধ্যে রয়েছে থিয়েটার কমান্ড পুনর্গঠন, অতি বড় সদর দপ্তরের ইউনিট ছোট করা এবং প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান। সিএমসির শূন্য পদগুলোতে কারা আসবেন, তা আগামী বছরগুলোতে পদোন্নতি থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম কেনা পর্যন্ত নানা অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলবে।
শুদ্ধি অভিযান সামরিক প্রস্তুতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে
এই অভিযান বাহিনীর সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোকে স্পর্শ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক কাজ, যৌথ অভিযান, রকেট বাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ। অভিযানের সমর্থকদের যুক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক ভেঙে দিলে শৃঙ্খলা ও দক্ষতা বাড়বে। সমালোচকেরা সতর্ক করে বলেন, নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তন এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনিয়ম প্রকাশ্যে আসায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হতে পারে। দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি, এমন কমান্ড সংস্কৃতিতে এর ফলে সতর্কতা বেড়ে যেতে পারে।
সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও সরঞ্জাম নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তদন্তের কেন্দ্রে ছিল সামরিক সরঞ্জামের উন্নয়ন এবং রকেট বাহিনী, যারা প্রচলিত ও পারমাণবিক—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই পরিচালনা করে। সাবেক দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফু ও ওয়েই ফেংহে সামরিক সরঞ্জাম কেনার সঙ্গে আংশিকভাবে জড়িত দুর্নীতির অভিযোগে বহিষ্কৃত হয়েছেন। ২০২৩ সালে রকেট বাহিনীর নেতৃত্ব বদলে দেওয়া হয়। সেই নতুনদের একজন, অ্যাডমিরাল ওয়াং হৌবিন, এখন বহিষ্কৃতদের তালিকায় রয়েছেন। প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা শিল্প ও সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে ত্রুটি গোপন করা, সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। এসবই সামরিক প্রস্তুতিকে দুর্বল করে।
চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ নিল থমাসের মতে, এই অভিযান নিয়ন্ত্রণ বাড়ালেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে।
ব্যবস্থাটি আরও পরিচ্ছন্ন ও বেশি অনুগত হয়, তবে একই সঙ্গে আরও সতর্ক এবং কখনো কখনো আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
নেতৃত্বে রদবদল ও প্রতিরোধক্ষমতা
শীর্ষ পর্যায়ে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে সামরিক মতবাদ প্রণয়ন ধীর হতে পারে, বড় মহড়া পিছিয়ে যেতে পারে এবং মধ্যম পর্যায়ের কমান্ডাররা উদ্যোগ নিতে দ্বিধা করতে পারেন। বেইজিংয়ের জবাব হলো, শৃঙ্খলা সংহতি গড়ে তোলে। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, দুর্নীতি নির্মূল করলে কমান্ডের ঐক্য এবং সময়ের সঙ্গে যুদ্ধক্ষমতা বাড়ে। ২০২৫ সালের হুমকি মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা সাইবার, মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র খাতে চীনের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করেছে। নতুন প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ ও অভিযানে যুক্ত করার চেষ্টা চালানোর সময় নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং নির্ভরযোগ্য সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা এ থেকে স্পষ্ট হয়।
তাইওয়ান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
হে ওয়েইদংয়ের কর্মজীবন চীনের তাইওয়ানকেন্দ্রিক মনোযোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের প্রধান হিসেবে ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইপে সফরের পর শুরু হওয়া বড় আকারের গুলি চালানোর মহড়া পরিকল্পনা ও তদারকিতে ভূমিকা রাখার কৃতিত্ব তাঁকে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা। ওই মহড়ায় অবরোধ ও হামলার অনুশীলন করা হয়েছিল। যেকোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড কতটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে, তা এতে স্পষ্ট হয়। হেকে সরিয়ে দেওয়ায় এমন একজন কমান্ডারকে হারাল চীন, যাঁর ওপর শির আস্থা ছিল এবং ওই অঞ্চলে যাঁর অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতাও ছিল।
সিএমসির রাজনৈতিক কর্মবিষয়ক প্রধান হিসেবে মিয়াও হুয়ার দায়িত্বের আওতায় ছিল মতাদর্শ, কর্মীদের আনুগত্য এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন ইউনিটের তদারকি। তাইওয়ান প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরে কাজ করা বাহিনীগুলোর ওপর দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় শির জোর দেওয়ার সঙ্গে মিয়াওর অপসারণের সম্পর্ক রয়েছে। বিরোধপূর্ণ জলসীমায় আইন প্রয়োগ, ধূসর অঞ্চলের কৌশল এবং বার্তা দেওয়ার কাজ পরিচালনায় কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগে ধারাবাহিকতা ছিল না। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক কম হলে ঘনবসতিপূর্ণ আকাশ ও সমুদ্রপথে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ে। চীনের নেতৃত্বে রদবদলের ফলে অন্য দেশের সামরিক বাহিনীর কাছে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও যোগাযোগের পথ বদলে যেতে পারে, যা তাদের পক্ষে প্রতিপক্ষের নেতৃত্ব কাঠামো বোঝা কঠিন করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা চীনকে এখনো সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেন। ফলে ওয়াশিংটন অন্যান্য বৈশ্বিক অগ্রাধিকার সামলালেও দুই পক্ষ সংকট ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধের ওপর মনোযোগ বজায় রাখছে।
নিখোঁজ হওয়া ও পদে রদবদলের ধারা
শির অধীনে বারবার শুদ্ধি অভিযান চলার পাশাপাশি পিএলএকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফু ও ওয়েই ফেংহেকে অপসারণ, রকেট বাহিনীর নেতৃত্ব বদল এবং মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের নির্বাহীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান—সব মিলিয়ে নজরদারির নতুন এক পর্যায় শুরু হয়েছে। বেসামরিক নেতারাও এর বাইরে নন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিন গাংকে ২০২৩ সালে সরিয়ে দেওয়ার আগে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতিকে কোনো কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়ার আগাম ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। শির বর্তমান মেয়াদে তাঁর নিয়োগ দেওয়া এক ডজনেরও বেশি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে বা তাঁদের জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সংস্কার যুগে এমন নজির আগে ছিল না। অপসারণের ঘোষণা দেওয়ার ধরন প্রায়ই একই রকম: দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি, সরকারি বিবৃতিতে তাঁদের বিষয়ে নীরবতা, তারপর হঠাৎ বহিষ্কারের ঘোষণা ও মামলা কৌঁসুলিদের কাছে পাঠানো।
শীর্ষ পর্যায়ে এই রদবদল চললেও পিএলএ নৌবহর গড়ে তোলা, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চালিয়ে গেছে। দল-নিয়ন্ত্রিত আইনসভা এ বছর সরকারি প্রতিরক্ষা বাজেট ৭.২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ২৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে অনুমোদন দিয়েছে। বিদেশি মূল্যায়নে বলা হয়, বাজেটের বাইরের খাতগুলো হিসাব করলে প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি। বিনিয়োগ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অভিযানের এই সমন্বয় দ্বিমুখী কৌশলের প্রতিফলন: সামরিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ করা, পাশাপাশি তা বাস্তবায়নকারী ব্যবস্থার ওপর নজরদারি চালানো।
চতুর্থ প্লেনামে এরপর কী
সপ্তাহের শুরুতে বেইজিংয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসবে। আলোচ্যসূচিতে রয়েছে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত পরিবর্তন। শুদ্ধি অভিযানে বহিষ্কৃত নয়জন কর্মকর্তার মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির আটজন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের অপসারণের ফলে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনসহ দলের শীর্ষ সংস্থাগুলোতে নতুন নিয়োগের পথ খুলেছে। অভিযান, যৌথ কার্যক্রম এবং কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য আস্থাভাজন কমান্ডার ও রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ এখন শির হাতে।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা আসতে পারেন থিয়েটার কমান্ড, যৌথ স্টাফ বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর রাজনৈতিক কর্মবিষয়ক ব্যবস্থা থেকে। শি কোনো উত্তরসূরির ইঙ্গিত দেননি। যৌথ প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা ও আনুগত্যের পরিচয় আছে, এমন কর্মকর্তাদেরই তিনি সাধারণত এগিয়ে দেন। নতুন নিয়োগগুলো ২০২০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত পিএলএর অভিযান পরিচালনার গতি এবং বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করবে।
বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ হলো, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের গতি বজায় রেখে নতুন নেতারা সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারির কারণগুলো মোকাবিলা করতে পারবেন কি না। মামলাগুলো সামরিক আদালতে নেওয়া, সামরিক সরঞ্জাম কেনার হিসাব-নিরীক্ষার ধারা কঠোর করা এবং কমান্ড কাঠামোতে পূর্বানুমেয়তা ফিরিয়ে আনা—এসবের ওপর নির্ভর করবে বেইজিংয়ের এই বয়ানের সাফল্য: নেতৃত্বের শুদ্ধি বাহিনীকে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করে।
মূল বিষয়গুলো
- দুর্নীতির অভিযোগে চীন সিএমসির ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েইদং ও সাবেক রাজনৈতিক কর্মবিষয়ক প্রধান অ্যাডমিরাল মিয়াও হুয়াসহ নয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেছে
- সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর এই প্রথম দায়িত্বরত সিএমসি ভাইস চেয়ারম্যানকে সরানো হলো; হে পলিটব্যুরোরও সদস্য ছিলেন
- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, মামলাগুলো সামরিক কৌঁসুলিদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং অপরাধগুলো অত্যন্ত গুরুতর
- পিএলএ ডেইলি ঘটনাটিকে দলের প্রতি অবিশ্বস্ততা হিসেবে তুলে ধরে ঐক্য ও অস্ত্রের ওপর দলের নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে
- চতুর্থ প্লেনামের কয়েক দিন আগে এই শুদ্ধি অভিযান ঘটায়, কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনে নতুন সদস্য নিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন শি
- সামরিক প্রস্তুতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কেউ সতর্কতামূলক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন, আর কর্মকর্তারা বলছেন এতে সংহতি বাড়বে
- হের অপসারণ তাইওয়ান-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে, কারণ ২০২২ সালের বড় মহড়ার পেছনে ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের সাবেক প্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল
- সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও রকেট বাহিনীর নেতাদের পতনের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়া ও শুদ্ধি অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে
- চীনের সামরিক আধুনিকায়ন চলছে; এ বছর সরকারি প্রতিরক্ষা বাজেট ৭.২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে






