চীনের বেইদু স্যাটেলাইট ব্যবস্থার বৈশ্বিক সম্প্রসারণে গতি

পড়তে 10 মিনিট
চীনের বেইদু স্যাটেলাইট ব্যবস্থার বৈশ্বিক সম্প্রসারণে গতি

বেইদুকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব বেইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইটের বৈশ্বিক ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে পদক্ষেপ নিচ্ছে চীন। হুনান প্রদেশে এক শিল্প সম্মেলনে ভাইস প্রিমিয়ার ডিং শুয়েশিয়াং বলেন, তিন দশকের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পরিসর বাড়ানো হবে। চীনের অভ্যন্তরীণ অবস্থান নির্ণয় ও নেভিগেশন ভোক্তা বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি ইতোমধ্যে বেইদুর দখলে। সরকারি শিল্পবিষয়ক ব্লুবুকে ২০২৮ সালের মধ্যে বেইদু-সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন টার্মিনাল ও ডিভাইসের সংখ্যা ৪০ কোটির বেশি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. বেইদুকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে নতুন উদ্যোগ
  2. বেইদুকে আলাদা করে কী
  3. নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতার উন্নতি যেভাবে
  4. জিপিএস ও অন্য ব্যবস্থার সঙ্গে আন্তঃকার্যক্ষমতা
  5. চীনে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার
  6. বৈশ্বিক সম্প্রসারণে গতি
  7. যেখানে ব্যবহার চোখে পড়ছে
  8. নীতিকৌশল ও কূটনীতি
  9. নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
  10. ব্যবহারকারীদের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
  11. অর্থনীতি ও সেবায় সুবিধা
  12. বাস্তবায়নের বাধা
  13. এরপর কী
  14. মূল বিষয়গুলো

১৯৯৪ সালে পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেইদুর যাত্রা শুরু হয়। তৃতীয় প্রজন্মের স্যাটেলাইট সমষ্টির মাধ্যমে ২০২০ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক সেবা চালু করে। চীনে এখন বেইদুকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্মার্টফোন, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিপণ্য, যানবাহন, ড্রোন এবং শেয়ারড মোবিলিটি সেবায় এটি যুক্ত রয়েছে। সাম্প্রতিক এক শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে বেইদু-সক্ষম ডিভাইস ও সরঞ্জামের সংখ্যা ২০০ কোটির বেশি ছিল; একই সময়ে চীনে চিপ ও মডিউল সরবরাহের সংখ্যা ছিল ২৩০ কোটি। দেশটির মানচিত্রসেবা সরবরাহকারীরা গত বছর প্রতিদিন ১ লাখ কোটির বেশি অবস্থান-সংক্রান্ত অনুরোধ প্রক্রিয়া করেছে। নেভিগেশন সেবার নির্দেশনায় দৈনিক যাতায়াতের পরিমাণ ছিল ৪০০ কোটি কিলোমিটারের বেশি।

সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এর গুরুত্ব অনেক। স্যাটেলাইট নেভিগেশন অবস্থান, দিকনির্দেশনা ও সময়সংক্রান্ত তথ্য দেয়, যা সংক্ষেপে পিএনটি (PNT) নামে পরিচিত। এসব সংকেতের ওপর নির্ভর করে বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ব্যাংকের সময়মুদ্রা, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি এবং দুর্যোগ মোকাবিলা। যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে বেইদুকে এগিয়ে নিচ্ছে চীন। অন্য বৈশ্বিক স্যাটেলাইট সমষ্টির সঙ্গে এর আন্তঃকার্যক্ষমতাও রয়েছে। বেইদু-সম্পর্কিত পণ্য ১৪০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে রপ্তানি হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক সংস্থাসহ ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থার মানদণ্ডে ব্যবস্থাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিদেশে আরও ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করার বৃহত্তর প্রচারের ভিত্তি এখন এই অর্জন।

বেইদুকে আলাদা করে কী

সহজভাবে বললে, বেইদু বিশ্বের চারটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার একটি। অন্য তিনটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস, ইউরোপের গ্যালিলিও এবং রাশিয়ার গ্লোনাস। এসব ব্যবস্থা থেকে নির্ভুল সময় ও কক্ষপথের তথ্য সম্প্রচার করা হয়, যা রিসিভার ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করে। দুটি দিক থেকে বেইদু আলাদা। এর স্যাটেলাইট সমষ্টিতে মাঝারি পৃথিবী কক্ষপথ, হেলানো ভূসমলয় কক্ষপথ এবং ভূস্থির কক্ষপথের স্যাটেলাইট রয়েছে। এই মিশ্র বিন্যাস এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কভারেজ ও সংকেতের প্রাপ্যতা বাড়ায়। মৌলিক নেভিগেশনের বাইরেও এতে রয়েছে বিল্ট-ইন সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠানোর সুবিধা এবং এশিয়ার অনেক এলাকায় সমর্থিত রিসিভারের জন্য বিনা মূল্যের উচ্চ-নির্ভুলতার সেবা।

নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতার উন্নতি যেভাবে

নির্ভুলতা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর; যেমন বহু-কম্পাঙ্কের সংকেত, স্থলভিত্তিক সহায়ক নেটওয়ার্ক এবং একটি রিসিভার কতটি স্যাটেলাইটের সংকেত পায়। বড় সব ব্যবস্থাই উন্নত করা হচ্ছে। জিপিএস আরও শক্তিশালী সংকেতসম্পন্ন জিপিএস-৩ স্যাটেলাইট চালু করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন গ্যালিলিও স্যাটেলাইট এবং উচ্চ-নির্ভুলতার সেবা যুক্ত করছে। বেইদুর তৃতীয় প্রজন্মে নতুন উন্মুক্ত সংকেত এবং উচ্চ-নির্ভুলতার সেবা যুক্ত হয়েছে, যা এশিয়ায় উপযুক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে ডেসিমিটার পর্যায়ের নির্ভুলতা দিতে পারে। চীন দেশে ও বিদেশে বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ ও সহায়ক নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে। দেশের অভ্যন্তরে এখন শহর ও গ্রামের প্রায় সব সড়কে লেন-পর্যায়ের নেভিগেশন সুবিধা রয়েছে। শিল্প খাতের ব্যবহারকারীরা শহর ও বন্দরে দ্রুততর সংকেত স্থিতিশীল হওয়া এবং আরও ধারাবাহিক অবস্থান নির্ণয়ের কথা জানিয়েছেন।

জিপিএস ও অন্য ব্যবস্থার সঙ্গে আন্তঃকার্যক্ষমতা

ফোন, যানবাহন ও ড্রোনের অধিকাংশ আধুনিক চিপ একই সময়ে একাধিক ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণ করে। আন্তঃকার্যক্ষমতা-সংক্রান্ত চুক্তি ও অভিন্ন সংকেত নকশার ফলে রিসিভার জিপিএস, গ্যালিলিও, বেইদু ও গ্লোনাসের সংকেত একত্রে ব্যবহার করতে পারে। এতে বিদ্যমান স্যাটেলাইট সমষ্টির সুবিধা অক্ষুণ্ণ রেখে বেইদু যুক্ত করতে চাওয়া দেশ ও কোম্পানির বাধা কমে। এটি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতাও বাড়ায়। কোনো একটি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা আঞ্চলিক বিভ্রাট হলে, একাধিক ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণকারী ডিভাইস অন্য সংকেতে চলে যেতে পারে বা সেগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চীনে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার

নিজ দেশে চীনের সম্প্রসারণ দেখায়, কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যাপক পর্যায়ে পৌঁছালে তা কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাজারে থাকা প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ স্মার্টফোনে বেইদুর অবস্থান নির্ণয়ের সুবিধা ছিল, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রির ৯৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে চীনে ৪১ কোটির বেশি স্যাটেলাইট নেভিগেশন টার্মিনাল বিক্রি হয়েছে। সড়কপথে পণ্য পরিবহন, ডাক ও দ্রুত পার্সেল সেবা এবং রেল খাতে পরিবহন বহরে ১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি বেইদু-সজ্জিত ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে। নির্ভুল সময়ের ওপর নির্ভরশীল ৫ লাখের বেশি ডিভাইস বিদ্যুৎ খাতে মোতায়েন করা হয়েছে। বড় বন্দরগুলোতে বেইদুর নির্দেশনায় চলা স্বচালিত ট্রাক পরিচালন দক্ষতা ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এই ব্যাপক ব্যবহারকে সমর্থন দিচ্ছে ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীনে বেইদু-সামঞ্জস্যপূর্ণ চিপ ও মডিউলের ক্রমপুঞ্জীভূত সরবরাহ প্রায় ২৩০ কোটি ইউনিটে পৌঁছেছে। স্যাটেলাইট নেভিগেশন খাতে পেটেন্টের ক্রমপুঞ্জীভূত আবেদন ১ লাখ ২৯ হাজার ছাড়িয়েছে। নিয়ন্ত্রক কর্মসূচির উপযোগী করে সরঞ্জামও তৈরি করছে সরবরাহকারীরা। পর্যটকবাহী বাস, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী কোচ এবং বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনকারী যানবাহনের নিরাপত্তা প্রকল্পে কোম্পানিগুলো দ্বৈত-ব্যবস্থার বেইদু ও জিপিএস সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। এসব যন্ত্রে যানবাহনের টেলিমেটিকস বক্স ও অনবোর্ড ডায়াগনস্টিকসের সঙ্গে বেইদুর অবস্থান নির্ণয় যুক্ত থাকে, ফলে নিয়ন্ত্রকেরা গতি, রুট ও চালকের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই এমন প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমানের মডেলগুলো বিকল্প হিসেবে বেইদুর সংক্ষিপ্ত বার্তা যোগাযোগ ব্যবহার করে সতর্কবার্তা ও অবস্থানের তথ্য পাঠাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক সম্প্রসারণে গতি

বিদেশি অংশীদারদের প্রতি বেইজিংয়ের বার্তা হলো, নির্ভুলতা বাড়াতে, খরচ কমাতে এবং স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা করতে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি বেইদু গ্রহণ করা যায়। বেসামরিক বিমান চলাচল, সামুদ্রিক নেভিগেশন এবং মোবাইল যোগাযোগের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্যবস্থাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো ১৪০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে বেইদু রিসিভার, চিপ এবং সেবা রপ্তানি করে। নতুন অবকাঠামোয় অর্থায়ন বা উন্নয়ন চলছে এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে, এমন জায়গায় এটি গ্রহণ করা সবচেয়ে সহজ। আফ্রিকায় জাতীয় কর্মসূচির স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সহায়তা, স্থলকেন্দ্রের অর্থায়ন এবং প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীন। পাশাপাশি নির্ভুল কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও আবহাওয়া সেবায় বেইদুকে সহজলভ্য প্রযুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। ২০১৮ সালে তিউনিসিয়ায় প্রথম বিদেশি বেইদু কেন্দ্র চালু করে চীন। আফ্রিকান ইউনিয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সমন্বয়েও উৎসাহ জুগিয়েছে দেশটি।

যেখানে ব্যবহার চোখে পড়ছে

বেইদু ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা প্রথম বিদেশি দেশ পাকিস্তান। দেশটির সরকার বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা, নির্ভুল কৃষি, সরবরাহের পণ্য অনুসরণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং যোগাযোগে এর ব্যবহারের কথা জানিয়েছে। উচ্চতর নির্ভুলতার জন্য স্থানীয় সহায়ক ব্যবস্থার সঙ্গে বেইদুকে যুক্ত করা, স্থলভিত্তিক কভারেজ বাড়ানো, আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে মানচিত্রায়ন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির জাতীয় কেন্দ্র স্থাপন, অবস্থান নির্ণয়, দিকনির্দেশনা ও সময়সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের পরিকল্পনার কথা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যৌথ প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় দক্ষতা বাড়বে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিকে সহায়তা মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, পেরুর নতুন চানকাই টার্মিনালসহ লাতিন আমেরিকার বন্দরগুলোতে বেইদু-সক্ষম সরঞ্জামভিত্তিক স্মার্ট নেভিগেশন ও ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা সমাধান গ্রহণ করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবহারকারীরা সামুদ্রিক টহল, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় বেইদু ব্যবহার করেন। আফ্রিকার কয়েক ডজন দেশ বেইদুর সংকেতের উপযোগী করে তৈরি একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণকারী রিসিভার দিয়ে নির্ভুল কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কথা জানিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিপিএসের সঙ্গে বেইদুও ব্যবহার করা হয়। একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণকারী রিসিভার সরকারগুলোকে ঝুঁকি সামলাতে ও সেবার মান বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে সরঞ্জাম বিক্রেতারাও বড় বাজারে সেবা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নীতিকৌশল ও কূটনীতি

দেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় দিকনির্দেশনা এবং বিদেশে তুলনামূলক বাজারনির্ভর পদ্ধতির সমন্বয়ে চীন তার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। চীনে উচ্চপর্যায়ের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মাধ্যমে বেইদুকে হ্যান্ডসেট, যানবাহনের বহর, বন্দর এবং সরকারি সেবায় যুক্ত করা হয়েছে। বিদেশে চীনা সংস্থা ও কোম্পানিগুলো বৃহত্তর অবকাঠামোগত উদ্যোগের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রিসিভার এবং সহায়ক সেবা একত্রে দিচ্ছে; এর অনেক কিছুই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত। ভর্তুকি, অর্থায়ন এবং সরঞ্জামের প্যাকেজ গ্রহণের খরচ কমায়। আন্তঃকার্যক্ষমতা বিদ্যমান ডিভাইস ও নেটওয়ার্কে বেইদু যুক্ত করার জটিলতা কমায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পেতেও সহায়তা করে।

মহাকাশে সক্ষম অন্যান্য দেশ ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গেও সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। নেভিগেশন সহযোগিতা ও যৌথ প্রকল্প নিয়ে চীন ও রাশিয়ার সংস্থাগুলো কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় সম্পৃক্ততা বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সেবায় একক বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো, চীনা সরঞ্জাম ও মানদণ্ডের বাজার বিস্তৃত করা এবং চীন ও তার অংশীদারদের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোই কৌশলগত লক্ষ্য। কিছু সরকার ও গবেষক তথ্যনিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা এবং নেভিগেশন প্রযুক্তির দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বর্তমানে মহাকাশ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিতর্ক প্রায়ই দেখা যায়।

নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

শান্তি ও সংকট, উভয় সময়েই অবস্থান, দিকনির্দেশনা ও সময়সংক্রান্ত তথ্য কৌশলগত সম্পদ। চীনের জন্য বেইদু নিশ্চিত করে যে বিদেশি সংকেতে প্রবেশাধিকার সীমিত বা বন্ধ হলেও সামরিক বাহিনী, জরুরি সেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণকারী রিসিভার অন্য দেশগুলোর স্থিতিস্থাপকতাও বাড়ায়। হস্তক্ষেপের সময় ডিভাইসগুলো সংকেত একত্রে ব্যবহার করতে বা এক সংকেত থেকে অন্যটিতে যেতে পারে। প্রধান সব ব্যবস্থা সংকেত-জ্যামিং প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য জোরদার করছে এবং সংকেত জালিয়াতি ঠেকাতে সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতিও এ প্রেক্ষাপটের অংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় বেইদুর বিস্তার চীনের অংশীদারদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে জটিল করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভারতীয় বিশ্লেষকেরা। সেখানকার ভাষ্যকারেরা বলেছেন, দুর্গম ভূখণ্ডে চলাচলের সমন্বয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বেইদু ব্যবহার করে থাকতে পারে। এতে আরও শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা এবং উন্নত নজরদারি সরঞ্জামের দাবিও জোরালো হয়েছে। ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটির সরকারগুলো বেসামরিক সুবিধা ও নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

ওয়াশিংটন ও মিত্র দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে বেইদুর উত্থানকে বৃহত্তর প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জিপিএস আধুনিক করছে এবং জ্যামিং ও সংকেত জালিয়াতির বিরুদ্ধে বেসামরিক ও সামরিক সুরক্ষা বাড়াচ্ছে। স্থল বা সমুদ্রের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের মতোই মহাকাশে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মহাকাশে ভিড় বাড়া এবং চীন, রাশিয়া ও ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কারণে স্বচ্ছতা ও সংকটকালে যোগাযোগের প্রয়োজন বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবহারকারীদের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতি ও সেবায় সুবিধা

বেইদু যুক্ত করলে দেশগুলো আরও বেশি স্যাটেলাইটের সংকেত, অতিরিক্ত সংকেত এবং নতুন সেবা পায়। এতে কৃষি ও নির্মাণকাজে নির্ভুলতা বাড়তে পারে, সংযুক্ত যানবাহনের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা উন্নত হতে পারে এবং ঝড় বা ভূমিকম্পের পর জরুরি সাড়া দ্রুত করা যায়। সংযুক্ত ট্রাক, ইয়ার্ড ক্রেন এবং ইলেকট্রনিক সিলের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে অনুসরণ করতে পারে বন্দরগুলো। পাকিস্তানের প্রত্যাশা, নেভিগেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন বাণিজ্য করিডর ও ডিজিটাল সেবায় সহায়তা করবে। আফ্রিকায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সাশ্রয়ী রিসিভার ক্ষুদ্র কৃষক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের আগে না পাওয়া তথ্য ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারে।

বাস্তবায়নের বাধা

আপনা-আপনি ব্যবহার শুরু হয় না। উচ্চ-নির্ভুলতার রিসিভার ও বেস স্টেশনের দাম বেশি। সহায়ক নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তথ্য সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও গোপনীয়তা কীভাবে সামলানো হবে, সংস্থাগুলোকে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও সফটওয়্যার হালনাগাদ নিয়ে চুক্তিতে স্পষ্ট প্রত্যাশা নির্ধারণ করা দরকার। অনেক সরকার একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা এড়িয়ে বিকল্প খোলা রাখতে চায়। তাই একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার পরিকল্পনা ও স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। নেভিগেশন প্রযুক্তির দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্যতা সামলাতে স্পষ্ট নিয়ম এবং বিশ্বাসযোগ্য তদারকি প্রয়োজন।

এরপর কী

চীনের পরবর্তী পর্যায় মূল্যায়ন করা হবে সীমান্তের বাইরে সেবার ধারাবাহিকতা ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। ২০২৮ সালের মধ্যে বেইদু-সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন টার্মিনাল ৪০ কোটির বেশি হবে বলে সরকারি পূর্বাভাসে ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থাই আধুনিক হচ্ছে, আর দ্রুত আসছে নতুন ধারণা। শহরে নির্ভুলতা বাড়াতে এবং সংকেত বাধাগ্রস্ত হওয়া কমাতে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককে সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের পরীক্ষা করছেন গবেষকেরা। বিনা মূল্যে উচ্চ-নির্ভুলতার সেবা, সংকেত জালিয়াতি ঠেকাতে সংকেতের সত্যতা যাচাই এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরেও কাজ করে এমন সরাসরি ডিভাইসে বার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন সেবাদাতারা। ফাইভজি ও ক্লাউড সেবার সঙ্গে একীভূতকরণ বাড়ছে। ড্রোন ও ভবিষ্যতের এয়ার ট্যাক্সির মতো নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতিতে নতুন প্রয়োগও দেখা দিচ্ছে।

মানদণ্ড নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় নজর রাখা জরুরি। বেসামরিক বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রকেরা ঠিক করবেন, নতুন রিসিভার ও সেবা কোথায় এবং কীভাবে সনদ পাবে। পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ও ফোনে অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা বিবেচনা করবে টেলিযোগাযোগ খাতের সংগঠনগুলো। সরকারি ক্রয় ও জরুরি পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে এমন অবস্থান, দিকনির্দেশনা ও সময়সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করছে জাতীয় সংস্থাগুলো। কাছের ভবিষ্যতে নজর রাখা দরকার বিমান চলাচলে ব্যবহার, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থায় আরও বিস্তৃত প্রয়োগ, সহায়ক সেবার পরিধি এবং স্থানীয় ব্যবহারকারীদের নির্ভুলতা বাড়াতে স্থলভিত্তিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের সম্প্রসারণের দিকে।

মূল বিষয়গুলো

  • ৩১ বছরের উন্নয়নের পর বিশ্বজুড়ে বেইদুর ব্যবহার দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনা বেইজিংয়ের।
  • চীনের নেভিগেশন ভোক্তা বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি বেইদুর দখলে।
  • ২০২৮ সালের মধ্যে বেইদু-সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন টার্মিনাল ৪০ কোটির বেশি হবে বলে আশা করছে চীন।
  • এক শ্বেতপত্রে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বেইদু-সক্ষম ডিভাইস ও সরঞ্জামের সংখ্যা ২০০ কোটির বেশি বলা হয়েছে।
  • ২০২৪ সালে চীনের প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ স্মার্টফোনে বেইদু ব্যবহারের সুবিধা ছিল, যা বিক্রির প্রায় ৯৮ শতাংশ।
  • ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেইদু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ১৪০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে রপ্তানি হয়।
  • বিমান চলাচল, কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও যোগাযোগে পাকিস্তান বেইদু গ্রহণ করেছে।
  • বেইদুর ব্যবহার সম্প্রসারণে আফ্রিকায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও স্থলভিত্তিক স্থাপনা রয়েছে।
  • একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সংকেত গ্রহণকারী চিপ জিপিএস, গ্যালিলিও, বেইদু ও গ্লোনাসের সংকেত একত্রে কাজে লাগিয়ে নির্ভুলতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
  • তথ্য ব্যবস্থাপনা, দ্বৈত-ব্যবহারের ঝুঁকি এবং একাধিক ব্যবস্থার বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে নিরাপত্তা বিতর্কের মূল বিষয়গুলো আবর্তিত।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে