হুশ ঋণের নতুন শর্ত চাইছে কেন ইন্দোনেশিয়া
জাকার্তা-বান্দুং দ্রুতগতির রেলপথের অর্থায়নে নেওয়া ঋণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পে যাতায়াতের সময় কমেছে, তবে এখন তা আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। হুশ নামে পরিচিত ট্রেনটি রাজধানী থেকে পশ্চিম জাভায় যেতে সময় কমিয়ে এনেছে প্রায় ৪৫ মিনিটে। কিন্তু টিকিট বিক্রি থেকে আয় পরিচালন ব্যয় মেটানো এবং রেলপথ নির্মাণের ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। ঋণ পরিশোধের চাপ কমানো এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেশের নতুন সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারাকে দিয়েছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সূচিপত্র
- হুশ ঋণের নতুন শর্ত চাইছে কেন ইন্দোনেশিয়া
- কী পরিবর্তন চায় ইন্দোনেশিয়া
- প্রকল্পের অর্থায়ন ও ঝুঁকির দায় কার
- ব্যয় বৃদ্ধি ও বেশি সুদের ঋণ
- চাহিদা, ভাড়া ও আসন পূরণের ঘাটতি
- রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া
- চীনের সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনে কী কী থাকতে পারে
- বেইজিংয়ের অবস্থান ও আঞ্চলিক নজির
- হুশ কি জনসেবা হিসেবে পরিচালিত হতে পারে
- স্টেশন ঘিরে মূল্যবৃদ্ধি থেকে আয়
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও করদাতাদের জন্য ঝুঁকি
- সুরাবায়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ পর্যালোচনায়
- আগামী কয়েক মাসে যেদিকে নজর থাকবে
- মূল কথা
১৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭.২৭ বিলিয়ন ডলার। কয়েক বছর বিলম্ব এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি জনসাধারণের জন্য চালু হয়। ২০১৫ সালে জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাবের বদলে চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং একটি নীতিনির্ধারণী ব্যাংকের অর্থায়ন বেছে নেয় জাকার্তা। দ্রুত নির্মাণ এবং সার্বভৌম গ্যারান্টি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তখন আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। এক দশক পরও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কে প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে যাত্রীসংখ্যা পূর্বাভাসের চেয়ে কম এবং সুদ পরিশোধের অঙ্ক বাড়তে থাকায় আর্থিক হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রকল্পটির অন্যতম বড় অংশীদার এবং জাতীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়ার প্রধান আইনপ্রণেতাদের ঝুঁকির বিষয়ে অবহিত করার পর আর্থিক চাপের লক্ষণ প্রকাশ্যে আসে। পার্লামেন্টের শুনানিতে বিষয়টি তুলে ধরে ঋণ সমস্যার সমাধানে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী।
শুনানির আগে পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর ববি রাসিদিনকে রেলপথটির অর্থায়ন স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার নেতৃত্বদানকারী নির্বাহী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আইনপ্রণেতাদের বলেন, ঝুঁকি কমাতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে সার্বভৌম তহবিল ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
আমরা হুশের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছি; এটি সত্যিই সময়ের অপেক্ষায় থাকা একটি বিপদ। বিষয়টি সমাধান করতে আমরা দানান্তারার সঙ্গে সমন্বয় করব, এরপর বিদ্যমান পোর্টফোলিওগুলো উন্নত ও পুনর্গঠন করব।
২০ আগস্ট দেওয়া এই বক্তব্যের পর চীনা ঋণদাতাদের সঙ্গে ঋণের শর্ত পুনরায় আলোচনার উদ্যোগের পথ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মূলধন কাঠামো নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ঋণ পরিশোধের চাপে দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যাহত না হয়।
কী পরিবর্তন চায় ইন্দোনেশিয়া
কর্মকর্তারা কয়েকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছেন। ব্যয় বেড়ে যাওয়া সামাল দিতে নেওয়া ঋণের অংশে সুদের খরচ কমানো, বার্ষিক কিস্তির চাপ হ্রাসে ঋণের মেয়াদ বাড়ানো এবং মূলধন পরিশোধ দ্রুত বাড়ার আগে অতিরিক্ত সময় পাওয়া—এগুলোই অগ্রাধিকার। আরেকটি উদ্যোগে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যালান্স শিট পুনর্গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে। এতে নতুন ইকুইটি যুক্ত করা, কিছু দায় দানান্তারার কাছে স্থানান্তর করা কিংবা প্রতিযোগিতামূলক শর্তে ঋণের একাংশ স্থানীয় মুদ্রায় পুনঃঅর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। লক্ষ্য হলো যাত্রীসংখ্যা ও আনুষঙ্গিক আয় বাড়ার জন্য সময় কেনা, যাতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
প্রকল্পের অর্থায়ন ও ঝুঁকির দায় কার
নির্মাণের মূল প্যাকেজে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ ছিল, যা প্রাথমিক ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার, মেটায়। বাকি অর্থ এসেছে পিটি কেরেতা চেপাত ইন্দোনেশিয়া চায়না বা কেসিআইসি নামে পরিচিত যৌথ উদ্যোগে অংশীদারদের দেওয়া ইকুইটি থেকে। পিলার সিনেরগি বিইউএমএন ইন্দোনেশিয়ার অধীনে থাকা ইন্দোনেশীয় অংশীদারদের হাতে কেসিআইসির ৬০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে ৪০ শতাংশ। ইন্দোনেশীয় কনসোর্টিয়ামে সবচেয়ে বড় অংশীদার পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়া। এর সঙ্গে রয়েছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান উইজায়া কারিয়া, টোল সড়ক পরিচালনাকারী জাসা মারগা এবং একটি বাগান কোম্পানি।
জমি অধিগ্রহণ ও মহামারির কারণে বিলম্বে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি মেটাতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি বেশি সুদের হারে অতিরিক্ত ঋণ নেয়। মূল ঋণের অঙ্ক বেড়ে যাওয়া এবং সুদের হার বেশি হওয়ার ফলে কেসিআইসির ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে, অথচ পরিষেবাটি এখনও পুরোপুরি পরিণত হয়নি। আর্থিক প্রতিবেদন ও পার্লামেন্টে দেওয়া সাক্ষ্যে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বড় অঙ্কের লোকসানের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে কেসিআইসির লোকসান ছিল প্রায় ৪.২ ট্রিলিয়ন রুপিয়া এবং ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১.৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া। এই লোকসানের বড় অংশ বহন করেছে পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়া, যা প্রতিষ্ঠানটির অন্যথায় স্থিতিশীল মূল ব্যবসায় চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে।
ব্যয় বৃদ্ধি ও বেশি সুদের ঋণ
চূড়ান্ত হিসাবে ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়া, যা প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। মূল ঋণের সুদের হার ছিল প্রায় ২ শতাংশ, যা কৌশলগত অবকাঠামোয় নীতিনির্ধারণী ব্যাংকের অর্থায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যয় বৃদ্ধির ঘাটতি মেটাতে নেওয়া অতিরিক্ত ঋণের সুদের হার প্রায় ৩.৪ শতাংশ। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ঋণের সুদ সামান্য কমলেও প্রতি বছর নগদ অর্থের উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হতে পারে। ঋণের মেয়াদ বাড়ালে আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের পথও সহজ হবে, কারণ তাতে পরিশোধের সময়সূচি নতুন রেলপথের শুরুর বছরগুলোতে সাধারণত দেখা যাওয়া চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
চাহিদা, ভাড়া ও আসন পূরণের ঘাটতি
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে হুশে যাত্রী ছিলেন প্রায় ২.৯ মিলিয়ন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দুই অঙ্কের হারে বেশি। প্রবৃদ্ধি বাস্তব, তবে প্রাথমিক পূর্বাভাসের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা এখনও কম। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ভাড়া ও সংযোগকারী পরিবহনের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন ৫০ হাজার থেকে ৭৬ হাজার যাত্রীর সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল। বর্তমান যাত্রীসংখ্যা সেই হিসাবের অনেক নিচে। ঋণ নিয়ে আলোচনায় এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিচালন ও অর্থায়ন ব্যয় বহনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় টিকিট বিক্রির আয় এখনও পৌঁছায়নি।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অতি দ্রুতগতির রেল পরিষেবার জন্য এই রুটটি তুলনামূলকভাবে ছোট। জাকার্তা ও বান্দুংয়ের ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলোতে সব স্টেশন অবস্থিত নয়, ফলে অনেক যাত্রায় গন্তব্যে পৌঁছাতে সংযোগকারী পরিবহন লাগে। আন্তনগর ট্রেন, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিকল্পগুলো মূল্য-সচেতন যাত্রীদের কাছে এখনও আকর্ষণীয়, বিশেষ করে দলবদ্ধভাবে যাতায়াতকারী পরিবারের জন্য। যাত্রার শুরু ও শেষের সংযোগই ট্রেনে যাওয়ার সহজ সিদ্ধান্ত এবং গাড়ি ব্যবহার অব্যাহত রাখার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
নীতিগতভাবে সমাধানের পথ রয়েছে। জাকার্তার এমআরটি ও এলআরটি এবং আঞ্চলিক কমিউটার রেলের সঙ্গে আরও ভালো সমন্বয় করলে যানবদলের সময় কমানো সম্ভব। নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বান্দুংয়ের কেন্দ্র পর্যন্ত সংযোগকারী ট্রেন ও বাস চালানো, সমন্বিত টিকিট এবং ব্যস্ততাহীন সময়ে ছাড় দিলে আসন পূরণের হার বাড়তে পারে। ব্যস্ততাহীন সময়ে ট্রেন ভরাতে আসনভেদে ভাড়া নির্ধারণসহ আরও নমনীয় ভাড়া নীতিও একটি উপায়। হালিম, পাদালারাং ও তেগালুয়ারে দিকনির্দেশনা, পার্কিং এবং রাইড-হেইলিং গাড়ির ওঠানামার স্থান উন্নত করলেও অনিয়মিত যাত্রীদের জন্য পরিষেবাটি আরও সুবিধাজনক হবে।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ তদারককারী পার্লামেন্টের কমিশন ষষ্ঠ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও সার্বভৌম তহবিলকে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে বলেছে। আইনপ্রণেতারা নতুন ইকুইটি বিনিয়োগকারী আনা, ঋণের একাংশ দানান্তারার কাছে স্থানান্তর করা কিংবা লোকসান বেড়ে যাওয়ার চেয়ে সস্তা হলে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের দায়ভার গ্রহণ—এমন বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন। কমিশনের সদস্যরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সুদের ব্যয় ২০২৬ সাল থেকে জাতীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনে কী কী থাকতে পারে
ঋণ পুনরায় আলোচনার নানা ধরন হতে পারে। ব্যয় বৃদ্ধির জন্য নেওয়া ঋণের অংশে সুদের হার কমানো, ঋণের মেয়াদ বাড়ানো এবং নিকট ভবিষ্যতে নগদ অর্থের বহিঃপ্রবাহ কমাতে মূলধন পরিশোধে অবকাশ চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার। আরেকটি উপায় হলো ঋণের একাংশ সরকারি সংস্থার হাতে থাকা ইকুইটিতে রূপান্তর করা। এতে নির্দিষ্ট সুদ পরিশোধের দায় ভবিষ্যৎ মুনাফার ওপর পরিবর্তনশীল দাবিতে রূপ নেবে। যাত্রী ও স্টেশন থেকে আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে পরিশোধ বাড়ানোর সময়সূচিও বিবেচনা করা যেতে পারে। পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি নমনীয়তা থাকা দানান্তারা কিছু দায়ভার নিয়ে আরও ভালো শর্তে পুনঃঅর্থায়ন করতে পারে কি না, সেটিও কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন।
দুই পক্ষের জন্যই হিসাব-নিকাশের মতোই স্থিতিশীল অংশীদারত্ব বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রেলপথটি সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত এবং লাখো ইন্দোনেশীয়ের দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম। লক্ষ্য হলো এমন সমঝোতায় পৌঁছানো, যা নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল করবে, কিন্তু সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বা করদাতাদের ওপর অনিশ্চিত ঝুঁকি চাপাতে হবে না। দুই রাজধানীতেই প্রকল্পটির রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ছে।
বেইজিংয়ের অবস্থান ও আঞ্চলিক নজির
চীনা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড কাঠামোর আওতায় সহযোগিতা আন্তর্জাতিক রীতি মেনে চলে এবং ঋণের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ ভিত্তিহীন। বাস্তবে অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বড় প্রকল্পের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন বা পুনর্গঠন করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেখা গেছে, সরকারগুলো বাজেট ও যান চলাচলের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যয় কমিয়েছে বা পরিশোধের সময় বাড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান বরাবরই একই: সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, সার্বিক সার্বভৌম গ্যারান্টি এড়ানো এবং মূল পরিকল্পনার চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেলে আরও ন্যায্য শর্ত চাওয়া।
জাকার্তা-বান্দুং প্রকল্পের ইতিহাসে এই ভারসাম্য স্পষ্ট। মূল ঋণের গ্যারান্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তে আর্থিক পরিসর অক্ষুণ্ন ছিল। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, বেশি সুদের অতিরিক্ত ঋণের সঙ্গে এমন ব্যবহারপ্রবণতার সামঞ্জস্য করা, যা এখনও পরিণত হচ্ছে। সুদে ছাড়, ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং পরিচালনগত উন্নতির মাধ্যমে এই ভারসাম্য আনা যেতে পারে।
হুশ কি জনসেবা হিসেবে পরিচালিত হতে পারে
বিশ্বের অনেক সফল পরিবহন ব্যবস্থা শুধু ভাড়া থেকে আয় করে নিজেদের ব্যয় মেটায় না। এগুলো জনসেবার অংশ, যেখানে সময় সাশ্রয়, নিরাপদ যাতায়াত, যানজট কমানো ও নির্মল বাতাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক সেবা রুটে বাজেটের ভর্তুকি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যেই যাত্রীবাহী রেলকে সহায়তা করে। এই প্রেক্ষাপটে শুরুর বছরগুলোতে হুশের পরিচালন লোকসান অস্বাভাবিক নয়। বিতর্কটি হলো, প্রণোদনার ভারসাম্য বজায় রেখে পরিষেবাটিকে সহায়তা করার সর্বোত্তম উপায় কী।
সরাসরি ভাড়ায় ভর্তুকি দিলে মালিকানার অংশ অনুযায়ী বিদেশি অংশীদারসহ সব শেয়ারহোল্ডারই এর সুবিধা পাবেন। এ কারণেই সরকার সাধারণত সরকারি অর্থে ভাড়া কমানোর বদলে মূলধন জোগানো, স্টেশন ইজারা মওকুফ বা রেলগাড়ি সহায়তার মতো পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। স্টেশন ঘিরে জমির মূল্যবৃদ্ধি থেকেও আয় করা যেতে পারে; রেলপথের কারণে সম্পত্তির মূল্য বাড়লে উন্নয়নকারীরা সেই বাড়তি মূল্যের জন্য অর্থ দিতে পারেন। ব্যস্ত সময়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভাড়ার সংকেত অক্ষুণ্ন রেখেই সেই অর্থ নেটওয়ার্কে পুনর্বিনিয়োগ করা যাবে।
স্টেশন ঘিরে মূল্যবৃদ্ধি থেকে আয়
সবচেয়ে বড় আর্থিক লাভ রেলপথের বাইরের কর্মকাণ্ড থেকে আসতে পারে। হালিম, পাদালারাং ও তেগালুয়ারকে ঘিরে গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন আবাসন, অফিস ও খুচরা বিক্রির কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। এগুলো থেকে নিয়মিত ভাড়া, ফি এবং এককালীন জমির মূল্য পাওয়া যাবে। স্টেশনের খুচরা ব্যবসার ইজারা, পার্কিং আয় এবং বিজ্ঞাপন থেকে তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিয়মিত অর্থ আসবে। ভাড়া থেকে আয় ও মূলধনী ব্যয় পুনরুদ্ধারের মধ্যকার ঘাটতি মেটাতে এশিয়ার অনেক রেলপথ এই মডেলের ওপর নির্ভর করে। এর সাফল্য নির্ভর করে ভূমি ব্যবহারের বিধি, জমির অধিকারের এবং স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও করদাতাদের জন্য ঝুঁকি
পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়ার ব্যালান্স শিটে কিছুটা সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকলেও লোকসান বহনের সক্ষমতা সীমাহীন নয়। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের দায়, প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ এবং ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ইকুইটি দেখিয়েছে। দ্রুতগতির রেল প্রকল্পের ধারাবাহিক লোকসান এই সুরক্ষা কমিয়ে দেবে। প্রকল্পের দায় আলাদা রাখা এবং দানান্তারাকে প্রধান ঋণধারী হিসেবে ব্যবহার করলে ইন্দোনেশীয়দের দৈনন্দিন নির্ভরতার যাত্রী ও মালবাহী রেল পরিষেবাগুলো সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
ঋণ সার্বভৌম তহবিলে স্থানান্তর করলে দায় মুছে যাবে না; বরং সরকারি খাতের মধ্যেই তা অন্যের কাছে যাবে। এর সুবিধা হলো, বিনিয়োগ পরিচালনাকারী একটি সংস্থা আরও বিস্তৃত অর্থায়নের উৎস ব্যবহার করতে পারে, কৌশলগত অংশীদার যুক্ত করতে পারে এবং পরিচালনাকারী রেল প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নমনীয়ভাবে পরিশোধের কাঠামো সাজাতে পারে। রাষ্ট্র এ পথে গেলে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা বাজারের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সুরাবায়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ পর্যালোচনায়
দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়া পর্যন্ত পূর্বমুখী সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে জাকার্তার নেতারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য রাজধানীর সঙ্গে আরও দীর্ঘ করিডর যুক্ত করা, যা বেশি যাত্রী আকর্ষণ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুফল আনতে পারে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিকল্পনার আইনি কাঠামো তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁরা স্বীকার করেছেন, নিয়ন্ত্রক বাধা ও বিদ্যমান ঋণের বোঝা আগে সামলাতে হবে। সম্প্রসারণের জন্য নতুন অর্থায়ন এবং রুট, স্টেশনের অবস্থান ও নির্মাণের গতি নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন এবং স্থানীয় পরিবহনের সঙ্গে উন্নত সংযোগের মাধ্যমে প্রথম ধাপ স্থিতিশীল হলে, দীর্ঘতর রেলপথে আরও বেশি দূরপাল্লার যাত্রী আকৃষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি সরবরাহকাজে যুক্ত কর্মীদের দ্রুত যাত্রীবাহী পরিষেবার দিকে টেনে মাল পরিবহনের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে শৃঙ্খলাপূর্ণ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং প্রাথমিক নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর।
আগামী কয়েক মাসে যেদিকে নজর থাকবে
কয়েকটি লক্ষণ দেখে বোঝা যাবে আর্থিক ঝুঁকি কমছে কি না। দানান্তারা পুনর্গঠনের নকশা দেবে এবং ঋণদাতা ও চীনা অংশীদারদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুদের হার, পরিশোধে অবকাশ বা ঋণের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে যেকোনো সমঝোতা বাজার ও পার্লামেন্টের নজরে থাকবে। ছুটির সময় মৌসুমি যাত্রীচাপ দেখে বোঝা যাবে চাহিদা আগের পূর্বাভাসের মাত্রার দিকে বাড়তে পারে কি না। সংযোগকারী পরিবহনের উন্নতি থেকে সমন্বিত টিকিট চালু—পরিচালনগত নানা পরিবর্তন এতে সহায়তা করতে পারে। সুরাবায়া পরিকল্পনাকে কীভাবে ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে প্রথম রেলপথের আর্থিক সুস্থতা অগ্রাধিকার পাবে, সে বিষয়েও নীতিনির্ধারকেরা ইঙ্গিত দেবেন।
মূল কথা
- টিকিট বিক্রির আয় দিয়ে পরিচালন ও অর্থায়ন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না বলে জাকার্তা-বান্দুং দ্রুতগতির রেলপথের ঋণ পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নেবে ইন্দোনেশিয়া।
- ৭.২৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটির অর্থায়নের বেশির ভাগ এসেছে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণ থেকে। ব্যয় বেড়ে যাওয়া সামাল দিতে নেওয়া হয়েছে বেশি সুদের অতিরিক্ত ঋণ।
- যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও তা প্রাথমিক পূর্বাভাসের নিচে রয়েছে। ফলে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।
- পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়া ও সার্বভৌম তহবিল দানান্তারা সুদ কমানো, ঋণের মেয়াদ বাড়ানো এবং ইকুইটি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করছে।
- দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইনপ্রণেতারা সতর্ক করেছেন, সুদের ব্যয় জাতীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য পরিষেবার ওপর চাপ ফেলতে পারে।
- চীনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করে। এ অঞ্চলের অনেক বড় প্রকল্পের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন বা পুনর্গঠন করা হয়েছে।
- গণপরিবহনে প্রায়ই ভাড়ার বাইরের সহায়তা প্রয়োজন হয়। অর্থায়নের ঘাটতি মেটাতে জমির মূল্যবৃদ্ধি থেকে আয় ও স্টেশনের আয় তাই গুরুত্বপূর্ণ।
- কিছু দায় দানান্তারার কাছে স্থানান্তর করলে প্রকল্পটি সরকারি খাতের মধ্যে রেখেই মূল কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখা যেতে পারে।
- সুরাবায়া পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এখনও রয়েছে, তবে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রথম রেলপথ স্থিতিশীল করা এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর।
- সামনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণের শর্তে পরিবর্তন, ব্যস্ত যাতায়াতের সময়ে যাত্রীসংখ্যার প্রবণতা এবং স্থানীয় পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের অগ্রগতি।






