নতুন র্যাঙ্কিংয়ে প্রবাসী ও স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য
সিঙ্গাপুরের জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় পরিচিত খবর। তবে নতুন এক বিশ্লেষণে বিদেশি পেশাজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির গবেষকেরা এশিয়া, অস্ট্রেলেশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ৪৫টি শহর তুলনা করে দেখেছেন, ২০২৫ সালে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় সিঙ্গাপুরের অবস্থান চতুর্থ, নিউইয়র্ক, জুরিখ ও লস অ্যাঞ্জেলেসের পর। স্থানীয়দের জন্য শহরটির অবস্থান ২৮তম। এই ব্যবধানের পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যনির্ধারক এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব, যা স্থানীয় পরিবারের ব্যয়ের চেয়ে প্রবাসীদের বাজেটে বেশি সরাসরি পড়ে। আবাসন, যাতায়াত ও আন্তর্জাতিক স্কুলের ফি প্রবাসীদের ব্যয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠানামার প্রভাব।
সূচিপত্র
- নতুন র্যাঙ্কিংয়ে প্রবাসী ও স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য
- সিঙ্গাপুরে প্রবাসীদের ব্যয় বেশি কেন
- সবচেয়ে বড় ব্যয় আবাসন
- পরিবহন ও গাড়ির মালিকানার ব্যয়
- প্রবাসী পরিবারের জন্য শিক্ষার বাড়তি ব্যয়
- দৈনন্দিন ব্যয়: বাজারসদাই থেকে রেস্তোরাঁয় খাওয়া
- বিশ্বের অন্যান্য শহরের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের তুলনা
- প্রবাসীরা যেভাবে ব্যয় সামলাতে পারেন
- বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাসা ভাড়া
- যাতায়াতের বিকল্প
- পরিবারের বাজেট
- নীতিগত ইঙ্গিত ও ২০২৫ সালের পরিস্থিতি
- যা জানা জরুরি
গবেষণার পাঁচ বছরের সময়সীমায় প্রবাসীদের তালিকায় সিঙ্গাপুরের অবস্থান ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছে। ২০২১ সালে শহরটি ছিল ষষ্ঠ, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পঞ্চম এবং ২০২৫ সালে চতুর্থ। স্থানীয়দের তালিকায় শহরটি ২০২১ সালে ৩৩তম থেকে ২০২২ সালে ৩০তম, ২০২৩ সালে ২৯তম এবং ২০২৪ ও ২০২৫—দুই বছরেই ২৮তম হয়েছে। এশিয়ায় প্রবাসী ও স্থানীয়—উভয় তালিকাতেই সিঙ্গাপুর শীর্ষে, আর অঞ্চলটিতে হংকং দ্বিতীয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শীর্ষ দশ শহরে আবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। এতে বোঝা যায়, বিশ্বের বড় কেন্দ্রগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ধরন এখনো মূলত সম্পত্তির দামই নির্ধারণ করে।
গবেষকেরা ব্যয়ের পেছনে কাজ করা ভিন্ন প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরেছেন। প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। স্থানীয় ব্যয়ের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে দেশীয় নীতি এবং ভর্তুকি বা সরকারি পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ। সিঙ্গাপুরে এই ব্যবধান আবাসন, পরিবহন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে স্পষ্ট। প্রবাসী পরিবারগুলো সাধারণত বেসরকারি কনডোমিনিয়াম ভাড়া নেয়, গাড়ির মালিকানার পুরো ব্যয় বহন করে এবং প্রায়ই আন্তর্জাতিক স্কুলের ফি দেয়। অনেক স্থানীয় পরিবার ভর্তুকিযুক্ত সরকারি আবাসনের সুবিধা পায়, গণপরিবহন ব্যবহার করে এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
এই ফলাফল বিশ্বের অন্যান্য সাম্প্রতিক চিত্রের সঙ্গেও মেলে, যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তালিকায় সিঙ্গাপুরকে প্রায়ই শীর্ষে বা তার কাছাকাছি দেখা যায়। একই শহরে বসবাস করেও কেন দুজন মানুষের ব্যয়ের বাস্তবতা একেবারে আলাদা হতে পারে, তা-ও এটি স্পষ্ট করে। ইউরোপ থেকে আসা কোনো অর্থ নির্বাহী সিঙ্গাপুরে এমন ব্যয়চিত্র দেখবেন, যা নিউইয়র্ক বা জুরিখের সঙ্গে বেশি মেলে। অন্যদিকে, সরকারি আবাসনে থাকা সিঙ্গাপুরের কোনো পরিবারের ব্যয়ের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।
সিঙ্গাপুরে প্রবাসীদের ব্যয় বেশি কেন
ব্যয়ের তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি আবাসন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসীদের জন্য সিঙ্গাপুরের আবাসন ব্যয় ৪৫টি শহরের মধ্যে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ, অথচ স্থানীয়দের জন্য ২৩তম। এর কারণ কাঠামোগত। বেশির ভাগ প্রবাসী খোলাবাজারে, বিশেষত বিভিন্ন সুবিধাসম্পন্ন কনডোমিনিয়ামে, বাসা ভাড়া নেন। স্থানীয় নাগরিক ও অনেক স্থায়ী বাসিন্দা হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (এইচডিবি) ফ্ল্যাট কিনতে বা ভাড়া নিতে পারেন। এসব ফ্ল্যাটে ভর্তুকি থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে দাম বাড়ার হার নিয়ন্ত্রিত। ভাড়া বেড়ে গেলে প্রবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হন। অন্যদিকে, আগে কেনা বাড়ির দাম বা সরকারি আবাসনের সুযোগ অনেক স্থানীয় পরিবারকে সেই চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
দ্বিতীয় কারণ যাতায়াত। সিঙ্গাপুরের গণপরিবহন নেটওয়ার্ক দক্ষ ও সাশ্রয়ী। প্রতি যাত্রার ভাড়া সাধারণত S$1 থেকে S$3 এবং জনসাধারণের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাসিক পাসের দাম প্রায় S$120। গাড়ির মালিকানার চিত্র ভিন্ন। সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট (সিওই) ব্যবস্থায় ক্রেতাদের নিলাম থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের সনদ কিনতে হয়, যার মাধ্যমে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা সীমিত রাখা হয়। গাড়ির দাম ও করের সঙ্গে এই ফি যোগ হওয়ায় মোট ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যা অধিকাংশ বাসিন্দাকে গাড়ি কেনা থেকে বিরত রাখে। অন্য অনেক শহরের সমপর্যায়ের বাসিন্দাদের তুলনায় গাড়ি বেছে নেওয়া প্রবাসীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়।
তৃতীয় কারণ শিক্ষা। সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক স্কুলের ফি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম বেছে নেওয়া পরিবারগুলোকে বছরে এমন ফি দিতে হয়, যা বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের টিউশন ফির সমপর্যায়ের। স্থানীয় সরকারি স্কুলগুলোতে উচ্চমানের শিক্ষা দেওয়া হয়, তবে অনাবাসীদের জন্য আসন ও ফি-র কাঠামো ভিন্ন। অনেক প্রবাসী পরিবার সন্তানদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রাখতে আন্তর্জাতিক স্কুল বেছে নেয়।
সবচেয়ে বড় ব্যয় আবাসন
ভাড়ার অঙ্কেই চিত্রটি স্পষ্ট। বর্তমান মূল্য-পর্যবেক্ষণকারী সাইটগুলোর হিসাবে, শহরের কেন্দ্রস্থলে এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের গড় ভাড়া মাসে প্রায় S$4,032। কেন্দ্রের বাইরে এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের গড় ভাড়া প্রায় S$2,985। নতুনদের জন্য তৈরি গাইডগুলোতে কেন্দ্রস্থলের এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া ভবনের বয়স ও অবস্থানভেদে S$2,500 থেকে S$4,000-এর কাছাকাছি বলা হয়েছে। একই ধরনের অ্যাপার্টমেন্ট আরও দূরে হলে ভাড়া হতে পারে S$1,500 থেকে S$2,500। কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক জেলাগুলোতে নতুন সুযোগ-সুবিধাসহ এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের জন্য কিছু প্রবাসী S$4,000 থেকে S$6,000 পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার কথা জানান, বিশেষ করে অভিজাত টাওয়ারগুলোতে।
মহামারির পর নির্মাণকাজে বিলম্ব, বিদেশি কর্মীদের দ্রুত প্রত্যাবর্তন এবং স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ভাড়া বেড়ে যায়। প্রায় তিন বছরে ভাড়া সূচক প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছিল। এখন সেই ঊর্ধ্বগতি কিছুটা কমেছে। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর উদ্ধৃত বাজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার প্রান্তিকে ভাড়া সূচক প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে, যদিও সর্বশেষ প্রান্তিকে সামান্য বেড়েছে। প্রবাসীদের ভাড়াবাজার নিয়ে আলাদা এক গাইডের হিসাবে, ২০২৪ সালের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভাড়া প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমেছে। শূন্য বাড়ির হার বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় এলাকার উচ্চমূল্যের ইউনিটগুলোতে ভাড়ার দরকষাকষির সুযোগ বেশি।
এই পরিবর্তনে ভাড়াটেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে, তবে ২০২০ সালের পর থেকে হওয়া বড় বৃদ্ধির প্রভাব মুছে যায়নি। বাড়ির মালিকদের সম্পত্তিকর ও ঋণের খরচ বেড়েছে, তাই তাঁরা ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে চাইছেন না। বাজারে কত নতুন ইউনিট আসবে এবং নতুন অভিবাসীর সংখ্যা কেমন হবে, তার ওপর ফল নির্ভর করবে। নতুন সরবরাহ চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেলে ভাড়া আরও বাড়ার সুযোগ সীমিত হবে। অর্থ ও প্রযুক্তি খাতে আবার নিয়োগ বাড়লে কেন্দ্রীয় এলাকার ইউনিটগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হবে।
নতুন অনেক আগন্তুকের ধারণার চেয়ে আবাসনের বিকল্প বেশি। যোগ্যতা ও পাড়াভিত্তিক কোটা সাপেক্ষে বিদেশিরা এইচডিবি ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারেন। যৌথ বসবাসের আবাসনে ভাগাভাগির লাউঞ্জ ও রান্নাঘর থাকে, যেখানে কম মেয়াদের চুক্তি এবং নির্ধারিত খরচের সুযোগ মেলে। বেসরকারি বাসার চুক্তির মেয়াদ সাধারণত এক থেকে দুই বছর। এতে এক থেকে দুই মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ জামানত লাগে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কূটনৈতিক ধারা থাকতে পারে, যার মাধ্যমে কাজের নিয়োগ শেষ হলে আগেভাগে চুক্তি বাতিল করা যায়। ভাড়াটেদের সাধারণত চুক্তির ওপর স্ট্যাম্প শুল্ক দিতে হয়, ছোটখাটো মেরামতের দায়িত্ব নিতে হয় এবং চুক্তির শেষে বিরোধ এড়াতে বাসার অবস্থা ভালোভাবে নথিবদ্ধ করে রাখা উচিত। PropertyGuru ও 99.co-এর মতো পরিচিত পোর্টালে অধিকাংশ বিজ্ঞাপন থাকে। পাড়াভেদে সুবিধা-অসুবিধা বোঝেন এমন কোনো এজেন্টের সহায়তা নেন অনেক প্রবাসী।
পরিবহন ও গাড়ির মালিকানার ব্যয়
গাড়ি ছাড়া চলাফেরা সহজ। এমআরটি মেট্রো ও বাস নেটওয়ার্ক পুরো দ্বীপজুড়েই ভালোভাবে বিস্তৃত। গণপরিবহনের মাসিক পাসের দাম প্রায় S$120। রাইড-হেইলিং সেবা সহজে পাওয়া যায়। কেন্দ্রে বসবাসকারীদের জন্য মাসে রাইডের পেছনে খরচ গাড়ির মালিকানার তুলনায় কম হতে পারে। পেট্রলের দাম ও পার্কিংয়ের খরচ গাড়ি চালানোর ব্যয় বাড়ায়। বেসরকারি গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে করের কাঠামোও সাজানো হয়েছে। Numbeo-র মূল্যতালিকায় প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম প্রায় S$10.67 এবং গণপরিবহনের মাসিক পাসের দাম S$120। এতে গণপরিবহননির্ভর জীবনযাপন ও গাড়ি চালানোর ব্যয়ের পার্থক্য বোঝা যায়।
সিওই ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান নীতিগত হাতিয়ার। প্রতিটি নতুন গাড়ি নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের একটি সনদ বাধ্যতামূলক করে এটি গাড়ির সংখ্যা সীমিত রাখে। চাহিদা ও সরবরাহের ওপর সিওইর দাম ওঠানামা করে। চাহিদা বেশি থাকলে ফি বেড়ে যায়, ফলে গাড়ির মোট দাম অন্য দেশের প্রদর্শিত দামের চেয়ে অনেক বেশি হয়। অনেক প্রবাসীর কাছে এমআরটি ও বাসের গতি ও বিস্তৃতি, সঙ্গে মাঝেমধ্যে ট্যাক্সি ব্যবহারের সুবিধা, গাড়ির মালিকানাকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে।
প্রবাসী পরিবারের জন্য শিক্ষার বাড়তি ব্যয়
পরিবারের বড় ব্যয় হিসেবে স্কুলের খরচ ভাড়ার সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। Numbeo-র হিসাবে সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ফি প্রায় S$37,959। বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠান ও স্থানান্তরবিষয়ক গাইডগুলোর হিসাবে স্কুল ও শ্রেণিভেদে এই ফি বছরে কয়েক হাজার মার্কিন ডলার থেকে প্রায় US$40,000 পর্যন্ত হতে পারে। আবেদনের ফি, ভবন তহবিল, স্কুলের পরিবহন ও পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রমের খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়; এসবের জন্য আরও কয়েক হাজার ডলার লাগতে পারে।
সরকারি শিক্ষার মান উঁচু, তবে সুযোগ ও ফি বাসিন্দার মর্যাদাভেদে ভিন্ন। নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দারা ভর্তুকিযুক্ত হারে ফি দেন। বিদেশিদের জন্য মাসিক ফি বেশি এবং আসন সীমিত। বিশ্বজুড়ে স্থানান্তরের সময় পাঠ্যক্রমে ধারাবাহিকতা রাখতে অনেক প্রবাসী পরিবার আন্তর্জাতিক স্কুল বেছে নেয়। এতে স্থিতিশীলতা পাওয়া গেলেও খরচ বেশি, যা পরিবারের কোথায় বসবাস করা সম্ভব এবং কতটা বড় বাসা নেওয়া যাবে—দুটোর ওপরই বড় প্রভাব ফেলে।
দৈনন্দিন ব্যয়: বাজারসদাই থেকে রেস্তোরাঁয় খাওয়া
সিঙ্গাপুরে খাবারের দাম নানা রকম। হকার সেন্টারে স্থানীয় খাবারের দাম প্রতি বেলায় মোটামুটি S$5 থেকে S$10, যা অনেক পরিবারের বাজেটে সাশ্রয়ী খাবারের ভিত্তি তৈরি করে। মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় দুজনের খাবারে প্রায় S$100 খরচ হতে পারে। এক কাপ ক্যাপুচিনোর গড় দাম S$6-এর কিছু বেশি, আর পাড়ার কোনো পানশালায় এক বিয়ারের দাম প্রায় S$10। অ্যালকোহলের ওপর কর বেশি হওয়ায় হকার স্টলে খাবারের তুলনায় বাইরে রাতের খরচ অনেক বেশি মনে হতে পারে।
আমদানির ওপর শহরটির নির্ভরতা বাজারের দামে প্রতিফলিত হয়। সাম্প্রতিক মূল্যতালিকায় এক ডজন ডিমের দাম প্রায় S$4.18, এক পাউরুটির দাম প্রায় S$2.75 এবং এক গ্যালন দুধের দাম প্রায় S$15। ব্যবহার ও বাসার আকারভেদে সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টের ইউটিলিটি বিল মাসে S$150 থেকে S$300। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগের মাসিক প্যাকেজের দাম প্রায় S$45 থেকে S$50। অভিজাত জিমের মাসিক সদস্য ফি S$150 থেকে S$200 হতে পারে। বাজেটবিষয়ক গাইডের হিসাবে, আবাসনের পছন্দভেদে একজন প্রবাসীর মাসে প্রায় S$3,500 থেকে S$6,000 খরচ হতে পারে। জনসাধারণের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সূচকে অভিজাত বিকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকলে একজনের ব্যয় S$7,000 ছাড়ায়। চার সদস্যের পরিবারের মাসিক ব্যয়ের হিসাব S$6,000 থেকে S$12,000; আর আবাসনের আকার বড় ধরে তৈরি কিছু প্রবাসী মূল্যসূচকে তা প্রায় S$11,000 পর্যন্ত। এই পার্থক্য দেখায়, বাসার আকার, স্কুল, যাতায়াত ও অবসরযাপনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ব্যয়ের অঙ্ক নির্ধারণ করে।
আয় ও করও সাশ্রয়ক্ষমতার চিত্র বুঝতে সাহায্য করে। Numbeo-র হিসাবে মাসিক গড় কর-পরবর্তী বেতন প্রায় S$5,984। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ব্যক্তিগত আয়কর কম; বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে শূন্য থেকে ২২ শতাংশ। অনাবাসীদের ওপর ১৫ শতাংশ বা প্রগতিশীল হারে কর আরোপ করা হয়—যেটিতে করের অঙ্ক বেশি হয়, সেটি প্রযোজ্য। কম কর উচ্চ আয়ের মানুষের চাপ কমায়, যে কারণে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিঙ্গাপুরকে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
বিশ্বের অন্যান্য শহরের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের তুলনা
লি কুয়ান ইউ স্কুলের গবেষণায় প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর অধিকাংশই উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে। এশিয়ার প্রধান ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর ও হংকং। শুধু এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রবাসী ও স্থানীয়—উভয়ের জন্য সিঙ্গাপুর ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল। অঞ্চলটিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল হংকং। গবেষণায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই পরিবর্তনগুলো অনুসরণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, শীর্ষ দশ শহরেই আবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি, যা রিয়েল এস্টেটের কেন্দ্রীয় ভূমিকার প্রমাণ।
বিশ্বের অন্যান্য জরিপেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সূচকে প্রায়ই সিঙ্গাপুর বিশ্বের শীর্ষে বা তার কাছাকাছি থাকে। এর কারণ হিসেবে বলা হয় জমির স্বল্পতা, গাড়ির মালিকানার উচ্চ ব্যয় এবং কেন্দ্রের কাছাকাছি বাসার প্রবল চাহিদা। ভোক্তাদের জন্য তৈরি বিভিন্ন তালিকায় সিঙ্গাপুরের সঙ্গে প্রায়ই জুরিখ, জেনেভা, নিউইয়র্ক, হংকং, লন্ডন ও লস অ্যাঞ্জেলেসের নাম থাকে।
দেশভিত্তিক সাশ্রয়ক্ষমতার তালিকায় এশিয়ার মধ্যকার বৈপরীত্য উঠে আসে। InterNations Expat Insider 2025 গবেষণায় ভিয়েতনামকে সবচেয়ে সাশ্রয়ী দেশগুলোর শীর্ষে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থার দিক থেকে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার অবস্থানও ভালো। একই গবেষণায় প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে কম সাশ্রয়ী দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর রয়েছে, যা শহরটির উচ্চমূল্যের চিত্রের সঙ্গে মেলে। এ কারণে হালকা ব্যয়ের কোনো আঞ্চলিক কেন্দ্র চান এমন কিছু পেশাজীবী কুয়ালালামপুর বা ব্যাংককের মতো শহর বিবেচনা করেন। অন্যরা বেশি খরচ সত্ত্বেও উন্নত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও কর্মজীবনের সুযোগের জন্য সিঙ্গাপুর বেছে নেন।
প্রবাসীরা যেভাবে ব্যয় সামলাতে পারেন
শিরোনামের র্যাঙ্কিং দেখে যতটা মনে হয়, প্রবাসীদের খরচ কমানোর সুযোগ তার চেয়ে বেশি। আবাসন, যাতায়াতের অভ্যাস ও স্কুল নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব। সুবিধার বড় ক্ষতি না করেই ব্যয় কমানো প্রবাসীদের বাজেটে নিচের কৌশলগুলো প্রায়ই দেখা যায়।
বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাসা ভাড়া
কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক জেলার বাইরের পাড়াগুলোও বিবেচনা করুন। এমআরটি নেটওয়ার্কের কাছাকাছি প্রান্তিক এলাকায় থাকলে অভিজাত টাওয়ারের তুলনায় মাসে কয়েকশো, এমনকি কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত ভাড়া কমতে পারে। যোগ্যতা ও কোটা থাকলে এইচডিবি ফ্ল্যাট ভাড়ার কথা ভাবুন। এইচডিবি এলাকার অনেক পাড়া থেকে ট্রেনলাইন ও বাজার কয়েক পা দূরে, আর সাশ্রয়ও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। এক বছরের বেশি মেয়াদের চুক্তিতে কূটনৈতিক ধারা রাখার অনুরোধ করুন, যাতে কাজের নিয়োগ শেষ হলে আগেভাগে বাসা ছাড়তে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দুই মাসের জামানত, স্ট্যাম্প শুল্ক ও ছোটখাটো মেরামতের খরচের জন্য বাজেট রাখুন। বাসায় ওঠার সময় ছবি তুলে ইউনিটের অবস্থা নথিবদ্ধ করুন। PropertyGuru বা 99.co-এর মতো বিশ্বস্ত পোর্টাল ব্যবহার করুন এবং লাইসেন্সধারী এজেন্টের সঙ্গে কাজ করুন।
যাতায়াতের বিকল্প
গণপরিবহননির্ভর জীবনযাপনের পরিকল্পনা করুন। প্রায় S$120 দামের মাসিক পাসে নিয়মিত এমআরটি ও বাসে চলাচল করা যায়, যা গাড়ি চালানোর ব্যয়ের তুলনায় সাশ্রয়ী। গণপরিবহনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ট্যাক্সি বা রাইড-হেইলিং সেবা ব্যবহার করুন। কেন্দ্রে থাকলে এবং কাজ করলে প্রতিদিনের অনেক যাত্রা হেঁটেই সারা যায়। পরিবারের বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে গাড়ির মালিকানা এড়িয়ে চলুন, কারণ সিওই ব্যবস্থা ও করের কারণে মোট ব্যয় অন্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি।
পরিবারের বাজেট
পরিবারের বাজেট স্কুল নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক স্কুলগুলোর ফি, আবেদনের খরচ এবং বাসসেবার মতো অতিরিক্ত খরচে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিক স্কুল ঘুরে দেখুন এবং সব খরচসহ ফি-র তালিকা চান। কিছু খাতে এখনো প্রচলিত নিয়োগকর্তার শিক্ষা ভাতার সুবিধা বিবেচনা করুন। স্বাস্থ্যবিমাও বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই বেসরকারি বিমা থাকলে অপ্রত্যাশিত খরচ কমতে পারে, কারণ বিমা না থাকলে বিদেশি বাসিন্দাদের নিজ পকেট থেকে অনেক টাকা দিতে হতে পারে। দৈনন্দিন ছোটখাটো ব্যয়ও জমে বড় হয়। তাই সাশ্রয়ী খাবারের জন্য হকার সেন্টারে খান, সুপারমার্কেটের প্রচারমূলক ছাড় কাজে লাগান এবং গৃহস্থালির জিনিস অনলাইন বাজার থেকে কিনুন। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় মোবাইল প্যাকেজ ও বাসার ইন্টারনেটের দাম কম, যা নিয়মিত ব্যয় কমাতে সহায়তা করে।
নীতিগত ইঙ্গিত ও ২০২৫ সালের পরিস্থিতি
ভাড়াবাজার ২০২২ ও ২০২৩ সালের তীব্র সংকট থেকে সরে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার দিকে গেছে। নতুন সরবরাহ এসেছে, খালি বাসার হার কিছুটা বেড়েছে এবং দরকষাকষিতে ভাড়াটেরা আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর উদ্ধৃত বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, বাজারে বিপুলসংখ্যক ইউনিট না এলে ভাড়া ব্যাপকভাবে কমার সম্ভাবনা নেই। বাড়ির মালিকদের এখনো বেশি কর ও সুদের খরচ বহন করতে হচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধরনও গুরুত্বপূর্ণ হবে। মাঝারি ও উচ্চমূল্যের কনডোমিনিয়াম সাধারণত ভাড়া নেন এমন উচ্চ বেতনের পদে চাহিদা কমলে, দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাড়াটেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বজায় থাকতে পারে।
বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রবাসীদের বাজেটে প্রভাব ফেলতেই থাকবে। বিনিময় হারের ওঠানামায় সিঙ্গাপুরে ক্রয়ক্ষমতা রাতারাতি বাড়তে বা কমতে পারে। বাণিজ্য-অংশীদার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি খাবার থেকে গৃহস্থালির পণ্য—সব ধরনের আমদানি পণ্যের দামকে প্রভাবিত করে। আবাসন ও পরিবহন নিয়ে দেশীয় নীতিও স্থানীয় মূল্যকাঠামো গড়ে দেবে। আপাতত সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় মূল্যচাপ সহনীয় মনে হলেও, বিশ্বের যেকোনো মানদণ্ডে সিঙ্গাপুর এখনো উচ্চমূল্যের শহর। প্রবাসী ও স্থানীয়দের মধ্যকার নতুন র্যাঙ্কিং দেখায়, সবার জন্য দাম এক রকম নয়। কোন ব্যবস্থার সুবিধা আপনি পান এবং কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেন, তার ওপরই প্রায়ই পার্থক্য নির্ভর করে।
যা জানা জরুরি
- লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির গবেষকদের ৪৫টি শহর নিয়ে করা ২০২৫ সালের গবেষণায় প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় সিঙ্গাপুর চতুর্থ এবং স্থানীয়দের জন্য ২৮তম স্থানে ছিল।
- এই ব্যবধানের প্রধান কারণ আবাসন। প্রবাসীদের জন্য আবাসন ব্যয়ে সিঙ্গাপুর ষষ্ঠ এবং স্থানীয়দের জন্য ২৩তম। স্থানীয়রা সরকারি আবাসনের সুবিধা পান, আর প্রবাসীরা বেসরকারি বাসার ওপর নির্ভর করেন।
- পরিবহন ও শিক্ষা প্রবাসীদের ব্যয় বাড়ায়। গণপরিবহন সাশ্রয়ী হলেও সিওই ব্যবস্থার কারণে গাড়ির মালিকানা ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক স্কুলের ফি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
- তিন বছরে ভাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছিল, পরে গত চার প্রান্তিকে প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালে ভাড়াটেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে, আর উচ্চমূল্যের কনডোমিনিয়ামে ভাড়া নিয়ে নমনীয়তা বেশি।
- কেন্দ্রস্থলে এক শয়নকক্ষের বাসার ভাড়া সাধারণত S$2,500 থেকে S$4,000 বা তার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক জেলার বাসায় তা প্রায়ই S$4,000 থেকে S$6,000। কেন্দ্রের বাইরে এক শয়নকক্ষের বাসার গড় ভাড়া প্রায় S$2,985।
- দৈনন্দিন পণ্যের দামেও পার্থক্য রয়েছে। হকার সেন্টারে খাবার S$5 থেকে S$10, রেস্তোরাঁয় দুজনের খাবার প্রায় S$100 এবং গণপরিবহনের মাসিক পাস প্রায় S$120। ইউটিলিটি বিল সাধারণত মাসে S$150 থেকে S$300।
- মাসিক গড় কর-পরবর্তী বেতন প্রায় S$5,984। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ব্যক্তিগত আয়কর কম; বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হার ২২ শতাংশ।
- অন্যান্য জরিপেও জীবনযাত্রার ব্যয়ে সিঙ্গাপুরকে প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষে দেখা যায়। দেশভিত্তিক তালিকায় ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশীরা প্রবাসীদের জন্য বেশি সাশ্রয়ী।






