মার্কিন শুল্কে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে দক্ষিণ কোরিয়া

পড়তে 9 মিনিট
মার্কিন শুল্কে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে দক্ষিণ কোরিয়া

মার্কিন শুল্কে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে দক্ষিণ কোরিয়া

এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের অন্যতম রপ্তানি শক্তি দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির রপ্তানি পণ্যে ব্যাপক নতুন শুল্ক আরোপের পর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শেষ মুহূর্তের একটি বাণিজ্য চুক্তি আঘাতের তীব্রতা কমালেও, দক্ষিণ কোরীয় পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক শূন্য থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (KORUS) অধীনে কয়েক বছরের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অবসান ঘটেছে। ব্যাংক অব কোরিয়া (BOK) এবং শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এসব পদক্ষেপ প্রবৃদ্ধি কমাবে, শিল্প খাতকে ব্যাহত করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।

সূচিপত্র
  1. মার্কিন শুল্কে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে দক্ষিণ কোরিয়া
  2. দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর মার্কিন শুল্ক কীভাবে বদলেছে?
  3. অর্থনৈতিক প্রভাব: প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প খাতে অভিঘাত
  4. আর্থিক বাজার ও নীতিগত পদক্ষেপ
  5. যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক আরোপ করল কেন?
  6. বৈশ্বিক অভিঘাত: বাণিজ্যযুদ্ধ ও পাল্টা পদক্ষেপ
  7. আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
  8. বৃহত্তর তাৎপর্য: বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে শিক্ষা
  9. সংক্ষেপে

দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর মার্কিন শুল্ক কীভাবে বদলেছে?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্বে ফেরার পর থেকে কয়েক ডজন দেশকে লক্ষ্য করে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন। আগে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা অধিকাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে এখন সার্বিকভাবে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদারের ওপর বর্তমানে প্রযোজ্য ১০ শতাংশ ভিত্তি শুল্কের তুলনায় এটি অনেক বেশি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বাণিজ্যনীতি কার্যকরের আগে দক্ষিণ কোরিয়াকে যে শুল্কের মুখে পড়তে হতো, তার চেয়েও এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ব্যাংক অব কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কঠিন দর-কষাকষির ফলেই নতুন শুল্কের হার নির্ধারিত হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে সিউল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চুক্তি হয়, যাতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ১৫ শতাংশ ধার্য করা হয়। এর আগে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেই হুমকির চেয়ে নতুন হার কম হলেও, আগের ব্যবস্থার তুলনায় তা অনেক বেশি। BOK-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকারী ৫০টি বড় দেশের মধ্যে প্রাথমিক হুমকির তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া নবম বৃহত্তম শুল্ক-হ্রাস পেয়েছে। তবুও জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অর্ধেকের বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের চেয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর শুল্ক বেশি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে দক্ষিণ কোরিয়া ঝুঁকির মুখে, বিশেষত গাড়ি, ইস্পাত, সেমিকন্ডাক্টর ও যন্ত্রপাতি খাতে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক আরোপের প্রভাব দেশটিতে বিশেষভাবে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এখন সেই শুল্কের বদলে প্রায় সব খাতকে প্রভাবিত করছে বিস্তৃত পরিসরের শুল্ক।

অর্থনৈতিক প্রভাব: প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প খাতে অভিঘাত

ব্যাংক অব কোরিয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন মার্কিন শুল্ক চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৪৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং ২০২৬ সালে ০.৬০ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে ২০২৫ সালের জন্য মাত্র ০.৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জন্য ১.৬ শতাংশ করেছে। মহামারির পর এটিই হবে সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধি। রপ্তানির চাহিদা কমে যাওয়া এবং আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ভোক্তা মূল্যস্ফীতিও চলতি বছর ০.১৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং আগামী বছর ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ধাক্কার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাড়িশিল্প। হুন্দাই, কিয়া ও জিএম কোরিয়ার মতো দক্ষিণ কোরীয় গাড়ি নির্মাতারা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছে। দেশটির মোট গাড়ি রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই যাত্রীবাহী গাড়ি থেকে আসে। ২০২৪ সালে হুন্দাই, জেনেসিস ও কিয়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৭ লাখ গাড়ি বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ৭ লাখ গাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছিল, আর বাকিগুলো কোরিয়া ও মেক্সিকো থেকে রপ্তানি করা হয়েছিল। বিস্তৃত ১৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ঘোষিত গাড়ি ও যন্ত্রাংশে নতুন ২৫ শতাংশ শুল্ক কোরিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করার হুমকি তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

উদাহরণস্বরূপ, হুন্দাই ও কিয়া তাদের যন্ত্রাংশের উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সংগ্রহ করে এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতে কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবুও শুল্কের কারণে আমদানি করা গাড়ি ও যন্ত্রাংশের খরচ বাড়ছে। এতে মুনাফার ওপর চাপ পড়ছে এবং মার্কিন ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিজেদের উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা জিএম কোরিয়া অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে, কারণ প্রবেশের বাধা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। কোরীয় সরকার গাড়িশিল্পের জন্য ৩ ট্রিলিয়ন কোরীয় ওনের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে শিল্পনেতারা সতর্ক করেছেন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ঝুঁকিতে রয়েছে।

অন্যান্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি সেমিকন্ডাক্টর, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিকস—সবই নতুন মার্কিন শুল্কের আওতায় পড়েছে। ক্ষতি শুধু সরাসরি রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ নয়: ভিয়েতনাম ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে উৎপাদনকেন্দ্র থাকা দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ ওই দেশগুলো থেকে আসা পণ্যের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে।

আর্থিক বাজার ও নীতিগত পদক্ষেপ

শুল্কের অভিঘাতে দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শুল্ক ঘোষণার পর হুন্দাইয়ের শেয়ারের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে, যার ফলে KOSPI সূচকে ৫.২ শতাংশ পতন হয়েছে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে ব্যাংক অব কোরিয়া তাদের নীতিগত সুদের হার ২.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। গভর্নর রি চ্যাং-ইয়ং ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকলে আরও মুদ্রানীতি শিথিল করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে অতিরিক্ত উত্তপ্ত আবাসন বাজারে অতিরিক্ত তারল্য জোগানোর বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।

শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে পণ্য পাঠাতে কোম্পানিগুলো তাড়াহুড়ো করায় জুলাইয়ে রপ্তানি সাময়িকভাবে বেড়েছিল। তবে বিশ্লেষকেরা আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি কমার আশঙ্কা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য সরকার আরও সহায়তার ব্যবস্থা প্রস্তুত করছে এবং অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক আরোপ করল কেন?

শুল্কের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি তাঁর “আমেরিকা ফার্স্ট” বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দাবি, শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বাড়াবে, মার্কিন কর্মসংস্থান রক্ষা করবে এবং বিদেশি পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমাবে। প্রশাসনের দাবি, শুল্ক থেকে শত শত কোটি ডলার রাজস্ব আসবে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, বাস্তব প্রভাব আরও জটিল। শুল্ক মূলত আমদানি করা পণ্যের ওপর কর, যার খরচ প্রায়ই মার্কিন ভোক্তা ও উৎপাদকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে দাম বাড়তে পারে, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে। বিবিসি-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুল্ক সাধারণত কোনো পণ্যের মূল্যের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে ধার্য হয়। খরচ নিজেরা বহন করা, দাম বাড়ানো বা কম পণ্য আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোম্পানিগুলো।

ট্রাম্পের শুল্ক কৌশলে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তাও রয়েছে। বহু শুল্ক ঘোষণা, সংশোধন, স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাণিজ্য আলোচনায় শুল্ককে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রশাসন এবং কম শুল্কের বিনিময়ে অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকে ছাড় দাবি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে তীব্র দর-কষাকষির ফলে ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হলেও, তা আগের মুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি।

বৈশ্বিক অভিঘাত: বাণিজ্যযুদ্ধ ও পাল্টা পদক্ষেপ

দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর মার্কিন শুল্ক বৃহত্তর বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাতের অংশ। জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ফিলিপাইনের মতো মিত্রসহ কয়েক ডজন দেশের ওপর ট্রাম্প ১০ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। ব্রাজিল ও ভারতের মতো কিছু দেশ পাল্টা পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে, অন্যরা শুল্ক থেকে অব্যাহতি বা ছাড় আদায়ের চেষ্টা করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাব দিয়েছে, ইউরোপীয় গাড়ির ওপর মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপণ্যে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মেক্সিকো। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ এই সংঘাতের মধ্যে পড়েছে। ৮০০ ডলার পর্যন্ত মূল্যের ছোট আমদানি প্যাকেজের শুল্কমুক্ত সুবিধা তুলে নেওয়ায় এখন কম দামের পণ্যেও ১০ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাচ্ছে এবং কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্য সংগ্রহ ও বিনিয়োগ কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করছে। শুল্ক এড়াতে কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিচ্ছে, অন্যরা নতুন বাজার খুঁজছে বা বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা—দুই প্রতিষ্ঠানই শুল্ক ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক উদ্যোগ

মার্কিন শুল্কের অভিঘাতের মুখে শুধু দক্ষিণ কোরিয়াই নেই। আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা এবং নীতিগত পদক্ষেপ সমন্বয়ের জন্য চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আর্থিক সুরক্ষা বলয় শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি সুরক্ষায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। শিল্পমন্ত্রী আন ডাক-গুন শুল্ককে “দুঃখজনক” বলে বর্ণনা করলেও, অব্যাহত পরামর্শ ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, আরও ছাড় আদায়ের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ানো বা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মতো ছাড় দিতে পারে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শুল্কের আইনি বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। শুল্ক আরোপে প্রশাসনের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের বিরুদ্ধে করা চ্যালেঞ্জগুলো মার্কিন আদালতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সুপ্রিম কোর্টে আপিল হতে পারে। এর ফল নির্ধারণ করতে পারে, শুল্ক বহাল থাকবে নাকি ভবিষ্যতে প্রত্যাহার করা হবে।

বিজ্ঞাপন

বৃহত্তর তাৎপর্য: বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে শিক্ষা

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতির বৃহত্তর ঝুঁকি ও অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো হলেও বাস্তবে শুল্ক প্রায়ই ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়ায়, সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাহত করে এবং সীমান্তের উভয় পাশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর করে দেয়।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত শুল্কের মূল্যস্ফীতিমূলক প্রভাব সীমিত থেকেছে। এর একটি কারণ, নতুন হার কার্যকর হওয়ার আগে রপ্তানিকারকেরা পণ্য পাঠাতে তাড়াহুড়ো করেছেন এবং কিছু কোম্পানি নিজেরাই বাড়তি খরচ বহন করেছে। তবে পুরো প্রভাব দেখা দিতে সময় লাগতে পারে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, শুল্কের কারণে এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা পণ্যের দাম ১.৮ শতাংশ বাড়বে এবং দেশটিতে গড় শুল্কের হার এখন ১৯৩৪ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি। দেশটির রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেল বৈশ্বিক বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্র তার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। নতুন শুল্ক কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংহতিকে দুর্বল করার হুমকি দিচ্ছে। এর ফলে কোরীয় কোম্পানিগুলো নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা জোরদার করতে বা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উৎপাদনে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে বাধ্য হতে পারে।

অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের যুগে আন্তর্জাতিক জোটের ভঙ্গুরতাও এই পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়েছে। ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্চ শুল্ক কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে এবং আস্থা ক্ষয় করতে পারে—বিশেষত একতরফাভাবে আরোপ করা হলে বা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিরোধে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে।

সংক্ষেপে

  • KORUS-এর অধীনে বছরের পর বছর শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে দক্ষিণ কোরিয়া।
  • ব্যাংক অব কোরিয়ার পূর্বাভাস, শুল্কের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ০.৪৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং আগামী বছর ০.৬০ শতাংশ পয়েন্ট কমবে।
  • গাড়ি, ইস্পাত ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে; কর্মসংস্থান হারানো ও বিনিয়োগে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
  • জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনার মাধ্যমে সাড়া দিয়েছে কোরীয় সরকার।
  • মার্কিন শুল্ক বৃহত্তর বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাতের অংশ; সরবরাহব্যবস্থা, আর্থিক বাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়ছে।
  • অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, শুল্কের কারণে দাম বাড়ে, বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং প্রবৃদ্ধি ধীর হয়; এর পুরো প্রভাব সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হতে পারে।
  • ক্ষতি কমাতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে দক্ষিণ কোরিয়া ও তার আঞ্চলিক অংশীদারেরা নীতিগত পদক্ষেপ সমন্বয় করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে