ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চলে অবৈধ খনন বন্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু
বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমির দেশ ইন্দোনেশিয়া বনাঞ্চলে অবৈধ খনন ও বাগান কার্যক্রম বন্ধে উচ্চাভিলাষী ও বিতর্কিত অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে একটি সরকারি টাস্কফোর্স প্রায় ৪২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর বনভূমিতে যথাযথ অনুমতিপত্র ছাড়া পরিচালিত খনিগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাবে—যে আয়তন সুইজারল্যান্ডের চেয়েও বড়। বছরের শুরুতে অবৈধ পাম তেল বাগানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযান চালানোর পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর অধীনে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চলে অবৈধ খনন বন্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু
- ইন্দোনেশিয়া কেন অবৈধ খনন ও বাগান কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে?
- কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে অভিযান?
- কোন খনিজ ও পণ্য এর আওতায় পড়ছে?
- অভিযানে কারা লাভবান, কারা ক্ষতিগ্রস্ত?
- আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর প্রভাব
- করপোরেট জবাবদিহি ও বাছাই করে আইন প্রয়োগ
- সরকারের জবাব ও যুক্তি
- মানবাধিকার ও সামরিকীকরণ: বাড়ছে বিতর্ক
- অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব
- সংক্ষেপে
সামরিক বাহিনী, পুলিশ, সরকারি কৌঁসুলি ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত বহু সংস্থার টাস্কফোর্স এই অভিযান পরিচালনা করছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ইন্দোনেশিয়ার খনিজ ও কৃষিসম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফা যেন পুরো জাতির উপকারে আসে, তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ এটি। তবে অভিযানের পদ্ধতি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব এবং ইন্দোনেশিয়ার বন ও সম্পদশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া কেন অবৈধ খনন ও বাগান কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে?
প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বে প্রভাবশালী একটি দেশ। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক এবং তাপীয় কয়লা, নিকেল, টিন ও তামার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। এসব শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এগুলো থেকে রপ্তানি আয় হিসেবে বছরে শত শত কোটি ডলার আসে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হয়। তবে কয়েক দশকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে অবৈধ খনন ও বাগান কার্যক্রম বিস্তার লাভ করেছে, প্রায়ই যার মূল্য দিতে হয়েছে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু অবৈধ খননের কারণেই কর, রয়্যালটি ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন থেকে বছরে ৩০০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার) পর্যন্ত রাজস্ব হারায় ইন্দোনেশিয়া। পরিবেশের ক্ষতিও গুরুতর: অবৈধ কার্যক্রমে বন উজাড় হয়, নদী দূষিত হয়, আবাসস্থল ধ্বংস হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যথাযথ অনুমতি ছাড়াই পাম তেল খাতের জন্য ৩০ লাখ হেক্টরের বেশি বনভূমিকে বাগানে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার অঙ্গীকার দুর্বল হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে দেশটি।
ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ থেকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও জাতীয় সুবিধা সর্বোচ্চ করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি করেছেন এই অভিযানকে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি ১ হাজারের বেশি অবৈধ খননকেন্দ্র বন্ধ এবং বেআইনি শোষণ থেকে লাখ লাখ হেক্টর বনভূমি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেন।
কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে অভিযান?
সরকারের এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও সমন্বয় নজিরবিহীন। প্রেসিডেন্টের বিধিমালায় গঠিত টাস্কফোর্সে রয়েছে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, সরকারি কৌঁসুলি এবং বন, জ্বালানি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আইনি, প্রশাসনিক এবং প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপের সমন্বয়ে অবৈধ খনি ও বাগান কার্যক্রম শনাক্ত, জব্দ ও পরিচালনার দায়িত্ব তাদের।
অভিযানের প্রধান দিকগুলো হলো:
- জব্দ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হস্তান্তর: অবৈধভাবে পরিচালিত খনি ও বাগান রাষ্ট্র জব্দ করে এবং সাময়িক ব্যবস্থাপনার জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করে। পাম তেল খাতে পুনরুদ্ধার করা জমির বড় একটি অংশ নতুন রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আগ্রিনাস পালমা নুসান্তারার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
- আর্থিক জরিমানা: অবৈধ কার্যক্রমের মালিকদের মুনাফা রাষ্ট্রকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সব ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা না হলেও হারানো রাজস্ব পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের লঙ্ঘন ঠেকানো সরকারের লক্ষ্য।
- সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ: অভিযান কার্যকরে সামরিক সদস্যদের ব্যবহার একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধ এবং অবৈধ কার্যক্রমের ব্যাপকতার কারণে এটি প্রয়োজন বলে কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছেন।
- প্রযুক্তিগত নজরদারি: অবৈধ কার্যক্রম শনাক্ত ও বিধি মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট চিত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
- আইনি সংস্কার: ফাঁকফোকর বন্ধ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার অনুমতিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করছে, শাস্তি কঠোর করছে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে বিধিমালার সামঞ্জস্য আনছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায়, মধ্য সুলাওয়েসিতে কর্তৃপক্ষ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ সোনার খনন বন্ধ করে ভারী যন্ত্রপাতি জব্দ এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করেছে। প্রাণঘাতী বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত ক্ষতির কারণে অভিযানটি চালানো হয়, যা আইন প্রয়োগের জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি তুলে ধরে।
কোন খনিজ ও পণ্য এর আওতায় পড়ছে?
কোন কোন খনিজকে লক্ষ্য করা হয়েছে, সরকার তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ার অবৈধ খনন খাত উচ্চমূল্যের যেসব পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেয়, তার মধ্যে রয়েছে:
- নিকেল: ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে অপরিহার্য; বিশ্বের বৃহত্তম নিকেল মজুত রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়।
- কয়লা: রপ্তানির একটি প্রধান পণ্য, যদিও এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।
- টিন, তামা ও সোনা: ইলেকট্রনিকস, নির্মাণ ও গয়নাশিল্পে ব্যবহৃত হয়।
- পাম তেল: ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক, তবে অবৈধ বাগানের কারণে ব্যাপক বন উজাড় হয়েছে।
এই অভিযানে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা—বিশেষ করে নিকেল, কয়লা ও পাম তেলের সরবরাহ—ব্যাহত হতে পারে। এতে দামের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়তে পারে।
অভিযানে কারা লাভবান, কারা ক্ষতিগ্রস্ত?
পরিবেশ সুরক্ষা ও সম্পদ থেকে অর্জিত সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে অভিযানটি প্রয়োজনীয় বলে সরকার তুলে ধরছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এর বাস্তবায়ন সব ক্ষেত্রে সমানভাবে হয়নি এবং কখনো কখনো তা অন্যায্য হয়েছে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর প্রভাব
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বনাঞ্চলে বসবাস ও কাজ করে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর অভিযানের প্রভাব এর সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি। নাগরিক সমাজের সংগঠন ও পরিবেশবাদী বেসরকারি সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লঙ্ঘন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার তাগিদে করা কর্মকাণ্ডের মধ্যে অভিযানটি প্রায়ই পার্থক্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, আচেহ প্রদেশে টাস্কফোর্স ১৫ হাজার হেক্টর জমি জব্দ করেছে। এর বড় একটি অংশে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ডুরিয়ান ও ক্যান্ডেলনাটের মতো ফসল ফলাত। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, ক্ষুদ্র কৃষক ও আদিবাসী গোষ্ঠী উচ্ছেদ ও জীবিকা হারানোর মুখে পড়লেও একই এলাকায় কাজ করা বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, এসব ব্যবস্থা শোষণমূলক এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে না।
পশ্চিম কালিমান্তান ও রিয়াউতে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই প্রথাগত জমি জব্দ করা হয়েছে এবং হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। স্কুল বন্ধ হওয়া এবং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ হুমকির মুখে পড়ার খবরও পাওয়া গেছে। সমালোচকদের যুক্তি, এই বিধিমালা প্রথাগত ভূমি ব্যবহারের রীতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে এবং ভূমির বৈষম্য আরও বাড়াচ্ছে। এতে অন্তর্নিহিত অন্যায়ের সমাধান না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হচ্ছে।
“বিধিমালায় করপোরেট ও জনগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর ফলে বড় করপোরেশনগুলোকে রেহাই দিয়ে আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে,” বলেছেন ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম পরিবেশবাদী বেসরকারি সংস্থা ওয়ালহির আচেহ শাখার অ্যাডভোকেসি প্রধান আফিফুদ্দিন আচাল।
করপোরেট জবাবদিহি ও বাছাই করে আইন প্রয়োগ
আন্দোলনকারীরা বাছাই করে আইন প্রয়োগের একটি প্রবণতার কথাও তুলে ধরছেন। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে এমন প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ অভিযানের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ছোট ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের ওপর। ব্যাপক লঙ্ঘন সত্ত্বেও ২০২০ সাল থেকে অবৈধ বাগান পরিচালনার দায়ে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়নি। পাম তেল ব্যবসায়ী সুরিয়া দারমাদির বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত তদন্তের মতো দুর্নীতির ঘটনা করপোরেট অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে।
বিধিমালাটি যেন দমন-পীড়নের হাতিয়ার বা করপোরেটদের দায়মুক্তির উপায়ে পরিণত না হয়, সে জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন নজরদারি সংস্থা আইন প্রয়োগের পদক্ষেপে আরও স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশিকা ও সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে এই অভিযান গণতন্ত্র ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে সমালোচকদের সতর্কতা।
সরকারের জবাব ও যুক্তি
কয়েক দশকের পরিবেশ বিপর্যয় ও সরকারি রাজস্ব হারানোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে অভিযানটির পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, এই অভিযান ইন্দোনেশিয়ার ১৯৪৫ সালের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। ওই অনুচ্ছেদে জনগণের সমৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে অবৈধ খননকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন। তিনি জানান, খনিশিল্প থেকে ইন্দোনেশিয়ার সরকারি আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে।
কৌশলগত পণ্য—উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা খনিজসহ—এর ব্যবস্থাপনা ও অনুমতিপত্র প্রক্রিয়া উন্নত করতে প্রেসিডেন্ট প্রবোও মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। তিনি অঙ্গীকার করেছেন, রাজনৈতিক অভিজাত বা সরকারি কর্মকর্তাসহ কাউকেই আইন প্রয়োগ থেকে রেহাই দেওয়া হবে না। টেকসই চর্চা নিশ্চিত করতে সরকার আইনি কাঠামো উন্নত করা, অনুমতিপত্রের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নজরদারি কর্মসূচি চালুর কাজও করছে।
“লক্ষ্য হলো পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজস্ব নিশ্চিত করা,” বলেছেন মন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া। অবৈধ খননের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমর্থকদের যুক্তি, এই অভিযান বিধি মেনে চলা ব্যবসায়ীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং ব্যাটারি উৎপাদন ও পরিশোধিত ধাতুর মতো পরবর্তী ধাপের শিল্প গড়ে তুলে ইন্দোনেশিয়াকে মূল্যশৃঙ্খলের আরও ওপরের দিকে উঠতে সহায়তা করবে।
মানবাধিকার ও সামরিকীকরণ: বাড়ছে বিতর্ক
বেসামরিক আইন প্রয়োগে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ফলে ইন্দোনেশিয়ার গণতান্ত্রিক গতিপথ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে। নতুন বিধিমালায় বেসামরিক বিষয়ে সামরিক বাহিনীর “দ্বৈত ভূমিকা” ফিরিয়ে আনা হয়েছে—দুই দশকেরও বেশি আগে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর যে চর্চার অবসান হওয়ার কথা ছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতা, আইন প্রয়োগের সামরিকীকরণে নিপীড়নের ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে পাপুয়ার মতো ভূমি সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে এমন অঞ্চলে। আশঙ্কা রয়েছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদকে বৈধতা দিতে, আদিবাসীদের ভূমি ব্যবহারের রীতিকে অপরাধ হিসেবে দেখাতে এবং ভিন্নমত দমনে অভিযানটি ব্যবহার করা হতে পারে। পর্যবেক্ষকদের যুক্তি, বনভূমিকে জনগোষ্ঠীর সম্পদ হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করলে গণতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষার দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
“বন ও এর আশপাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীই প্রকৃত রক্ষক; তাদের ক্ষমতায়ন করা উচিত, উচ্ছেদ নয়,” বলেছেন ইন্দোনেশিয়ান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল-এর বন ও ভূমি শাসনবিষয়ক প্রধান দিফা শাফিরা।
আদিবাসীদের ভূমির অধিকার স্বীকৃতি, পরিবেশগত পুনরুদ্ধার বাধ্যতামূলক করা এবং করপোরেট লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহি এড়াতে সহায়তা করা আইনি ফাঁকফোকর বন্ধে নতুন বন আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মতে, ন্যায়বিচার ও কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে আইনি কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার জরুরি।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি, পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সুনামের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এই অভিযানের। অবৈধ সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করে সরকারি রাজস্ব বাড়ানো, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং পরিবেশগত ফলাফল উন্নত করাই সরকারের প্রত্যাশা। তবে অনানুষ্ঠানিক খনন ও বাগানের কাজের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এই পরিবর্তন কষ্টকর হতে পারে।
বিশ্ববাজারের নজর রয়েছে পরিস্থিতির দিকে, বিশেষ করে নিকেল ও পাম তেলের মতো খাতে, যেখানে ইন্দোনেশিয়া প্রধান সরবরাহকারী। কঠোর আইন প্রয়োগ ও সরবরাহে বিঘ্নের ফলে দাম বাড়তে পারে এবং ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজতে পারেন। অন্যদিকে, উন্নত শাসনব্যবস্থা ও টেকসই মানদণ্ড আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
বন পুনরুদ্ধার ও অনুমতিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া কঠোর করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। তবে তাঁদের সতর্কতা, প্রকৃত টেকসই উন্নয়নের জন্য জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সম্মান জানানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরুদ্ধার করা জরুরি। জব্দ করা জমির একাংশে পুনরায় বনায়নের সরকারি পরিকল্পনা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর কতটা পুনরুদ্ধার করা হবে, আর কতটা রাষ্ট্রীয় বাগান বা অন্য কাজে রাখা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সংক্ষেপে
- ইন্দোনেশিয়া বনাঞ্চলে অবৈধ খনন ও বাগান কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বড় অভিযান শুরু করছে; লক্ষ্য ৪০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি।
- সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণে বহু সংস্থার একটি টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার, হারানো রাজস্ব আদায় ও পরিবেশ সুরক্ষা এর লক্ষ্য।
- সরকার অভিযানটিকে টেকসই উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের পথে পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর প্রভাবশালী করপোরেশনগুলো রেহাই পাচ্ছে।
- আইন প্রয়োগের সামরিকীকরণ ও নিপীড়নের ঝুঁকি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় আইনি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
- নিকেল ও পাম তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এই অভিযানে ব্যাহত হতে পারে, যার অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব হবে উল্লেখযোগ্য।
- করপোরেট ও জনগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করা এবং পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।






