জাপান ও ভারতের কৌশলগত পরিবর্তন: পুরোনো প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর, এলসিডি ও ব্যাটারি উৎপাদন ভারতে স্থানান্তর
বিশ্বের প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়ে জাপান ও ভারত জাপান থেকে ভারতে পুরোনো প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এলসিডি পর্দা ও ব্যাটারি উৎপাদন স্থানান্তরের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বদলে পরিণত উৎপাদনপ্রযুক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য চীনের উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানো, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর খাতে দুই দেশকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা।
সূচিপত্র
- জাপান ও ভারতের কৌশলগত পরিবর্তন: পুরোনো প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর, এলসিডি ও ব্যাটারি উৎপাদন ভারতে স্থানান্তর
- পুরোনো প্রযুক্তির উৎপাদন স্থানান্তর কেন? কৌশলগত কারণ
- অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
- জাপান-ভারত প্রযুক্তি হস্তান্তর পরিকল্পনার বিস্তারিত
- ভারতের সেমিকন্ডাক্টর উচ্চাকাঙ্ক্ষা: আমদানিনির্ভরতা থেকে উৎপাদনকেন্দ্র
- পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল: শিল্পের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
- সেমিকন্ডাক্টর খাতে জাপানের পুনরুত্থান: শিক্ষা ও সীমাবদ্ধতা
- প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মেধাস্বত্ব: ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
- দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা
- বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব
- সামনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
- সংক্ষেপে
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) ও কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির তৈরি এ পরিকল্পনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাপান সফরে তাঁর সমকক্ষ শিগেরু ইশিবার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের সময় প্রকাশ করা হবে। সময় নির্বাচন থেকে বোঝা যায়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশগুলো প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস বহুমুখী করার বিষয়ে ক্রমেই বেশি তাগিদ অনুভব করছে।
পুরোনো প্রযুক্তির উৎপাদন স্থানান্তর কেন? কৌশলগত কারণ
পুরোনো প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর—পরিণত ও সুপ্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় তৈরি চিপ—অসংখ্য দৈনন্দিন প্রযুক্তির ভিত্তি। এগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ইনভার্টার এবং শিল্পকারখানার সরঞ্জামে ব্যবহৃত হয়। স্মার্টফোন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজে ব্যবহৃত সর্বাধুনিক ২ ন্যানোমিটার চিপের মতো আলোচনার কেন্দ্রে না থাকলেও, এসব পুরোনো চিপ বৈশ্বিক শিল্পের কার্যক্রম সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রভাবশালী জাপানের ১৯৮০-এর দশকে বৈশ্বিক বাজারের ৫০ শতাংশ হিস্যা ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত রপ্তানি বিধিনিষেধ, চীনের তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশেষায়িত চিপ নির্মাতাদের উত্থানে দেশটির আধিপত্য কমেছে। বর্তমানে উপকরণ, রাসায়নিক দ্রব্য ও উৎপাদন সরঞ্জামে জাপানের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা থাকলেও, কম খরচে চিপ উৎপাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পুরোনো প্রযুক্তির চিপের ব্যাপক উৎপাদনে তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে দেশটিকে।
পুরোনো প্রযুক্তির উৎপাদন ভারতে সরিয়ে জাপান এসব বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে, ভারতের সাশ্রয়ী শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ঠেকাতে চায়। ভারতের জন্য এই অংশীদারত্ব ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে স্বনির্ভরতার পথে বড় অগ্রগতি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জন্য চীন থেকে আমদানির ওপর দেশটির ব্যাপক নির্ভরতা কমবে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই সহযোগিতা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি গভীরভাবে জড়িত। কোভিড-১৯ মহামারি ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাদের মিত্ররা আরও স্থিতিস্থাপক ও বহুমুখী প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চতুর্দেশীয় নিরাপত্তা সংলাপের (কোয়াড) সদস্য ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিকের সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেও জাপানের এই পদক্ষেপ ভূমিকা রাখবে এবং চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিকল্প দেবে। বিশেষ করে ভারত যখন নতুন মার্কিন শুল্কসহ জটিল বাণিজ্যিক সম্পর্ক সামলাচ্ছে, তখন এ উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
জাপান-ভারত প্রযুক্তি হস্তান্তর পরিকল্পনার বিস্তারিত
চীনের কম দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে জাপানে যেসব পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা কমছে, সেগুলোর উৎপাদন স্থানান্তরই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। সেমিকন্ডাক্টরের বাইরেও এর আওতায় রয়েছে:
- তরল স্ফটিক পর্দা (এলসিডি)
- সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম
- শক্তি সঞ্চয়ের ব্যাটারি
- কম্প্রেসর ও অন্যান্য শিল্প-উপাদান
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের একটি ব্যাটারি নির্মাতা ভারতীয় অংশীদারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করতে যাচ্ছে। আর জাপানের একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নির্মাতা তামিলনাড়ুতে কম্প্রেসর কারখানা তৈরি করছে। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক দিক থেকে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হওয়ায়, চীনের প্রতিযোগিতার মুখে টিকে থাকতে চাওয়া জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এগুলো আকর্ষণীয়।
অন্যদিকে, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রযুক্তি ফাঁস ঠেকানো ও মেধাস্বত্ব রক্ষায় জাপানের মতো আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত।
ভারতের সেমিকন্ডাক্টর উচ্চাকাঙ্ক্ষা: আমদানিনির্ভরতা থেকে উৎপাদনকেন্দ্র
ভারতের ইলেকট্রনিকস শিল্প দীর্ঘদিন ধরে, বিশেষ করে চীন থেকে, মূল সেমিকন্ডাক্টর উপাদান আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২০১৪ সালে চালু হওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের লক্ষ্য দেশটিকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তর করা। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে প্রণোদনা দিতে সরকার প্রায় ৬২৯ বিলিয়ন ভারতীয় রুপি বরাদ্দ করেছে; মোট নির্ধারিত অর্থের পরিমাণ ৬৫০ বিলিয়ন রুপি। এ সহায়তা দেশি ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর জন্য।
টাটা ইলেকট্রনিকস, ফক্সকন, এইচসিএল, মাইক্রন টেকনোলজিসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে নতুন চিপ উৎপাদন ও সংযোজন কারখানায় বিনিয়োগ করছে। সরকার মোহালির সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরির মতো বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিক করছে এবং ডিজাইন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিমের মাধ্যমে স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে তৈরি প্রথম চিপ বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল: শিল্পের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
জাপান-ভারত অংশীদারত্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস বহুমুখী করার বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। গত এক দশকে চীনে শ্রমব্যয় বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে। ভারতের বিশাল দক্ষ জনশক্তি, ব্যয়গত সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনা দেশটিকে ক্রমেই আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করছে।
তবে ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে ভারতের তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। নিয়মকানুন সহজ করা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের কারণে বিদেশি উৎপাদন বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও অনির্দেশ্য নীতির কারণে কখনো কখনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংস্কারের লক্ষ্য এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।
এসব বাধা থাকা সত্ত্বেও ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারতের কৌশলগত অবস্থান এবং কোয়াডে অংশগ্রহণ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাওয়া দেশগুলোর কাছে ভারতকে স্বাভাবিক অংশীদারে পরিণত করেছে। কোভিড-১৯ মহামারি সরবরাহের উৎস অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত থাকার ঝুঁকি সামনে এনেছে। ডিজিটাল যুগের ‘নতুন তেল’ হিসেবে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর শিল্প জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সেমিকন্ডাক্টর খাতে জাপানের পুনরুত্থান: শিক্ষা ও সীমাবদ্ধতা
সেমিকন্ডাক্টর খাতে জাপানের নতুন করে মনোযোগ দেওয়া দেশটির বৃহত্তর শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশলের অংশ। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (মেটি) সেমিকন্ডাক্টরকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন জোরদারে ৭.৭ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে। সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে উন্নত ২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনে সফল হওয়া র্যাপিডাসের মতো প্রকল্প বিশ্ব চিপ বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ফিরে পাওয়ার জাপানের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে।
তবে জাপানের সবচেয়ে উন্নত কারখানাগুলোও স্যামসাং ও টিএসএমসির মতো শিল্পনেতাদের তুলনায় প্রায় এক দশক পিছিয়ে। ন্যান্ড মেমোরি, পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টর, মাইক্রোকন্ট্রোলার ও সিএমওএস ইমেজ সেন্সরের মতো ক্ষেত্রে দেশটি এখনও প্রতিযোগিতামূলক, কিন্তু ডিআরএএম বাজার থেকে প্রায় পুরোপুরি সরে গেছে। পুরোনো প্রযুক্তিতে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করলে জাপান অভ্যন্তরীণ সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের উদ্ভাবনে কাজে লাগাতে পারবে এবং একই সঙ্গে পরিণত প্রযুক্তির উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে রাখতে পারবে।
প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মেধাস্বত্ব: ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
জাপান-ভারত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো মেধাস্বত্ব রক্ষা ও প্রযুক্তি ফাঁস ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব। হস্তান্তরিত প্রযুক্তি যাতে অননুমোদিতভাবে ব্যবহার বা রপ্তানি না হয়, তা নিশ্চিত করতে ভারত জাপানের কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার আদলে আইন প্রণয়ন করবে। সেমিকন্ডাক্টরের অনেক প্রযুক্তির দ্বৈত ব্যবহারযোগ্যতার কারণে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ; এগুলোর বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের প্রয়োগই রয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থার লক্ষ্য জাপানি প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে আশ্বস্ত করা যে ভারতে তাদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান সুরক্ষিত থাকবে, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর সহযোগিতার পথ খুলে দেবে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা
জাপান ও ভারতের সমঝোতা স্মারকে শুধু উৎপাদন নয়, সেমিকন্ডাক্টর নকশা, সরঞ্জাম গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়ও রয়েছে। চিপ নকশায় ভারতের দক্ষ জনশক্তিকে বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উৎপাদন অবকাঠামোয় জাপানের দক্ষতা শক্তিশালী দেশীয় শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত করবে।
বশ, রেনেসাস ও পাওয়ারচিপ সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং করপোরেশনের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা চিপ নকশা, উন্নত প্যাকেজিং ও উৎপাদনে ভারতের সক্ষমতা ইতিমধ্যে জোরদার করছে। সরকারের ডিজাইন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিম পরবর্তী প্রজন্মের চিপের জন্য দ্বিমাত্রিক উপকরণের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে স্টার্টআপ ও গবেষণায় সহায়তা দেয়।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। উন্নত চিপ উৎপাদনে টিএসএমসি এখনও আধিপত্য ধরে রেখেছে, তবে পরিণত প্রযুক্তির চিপ উৎপাদনে ভারতের উত্থান শিল্পের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নিজস্ব চিপ প্রকল্পে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায়, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং এখন ভারতের নেতৃত্বে এশিয়াই উৎপাদন সক্ষমতার অগ্রভাগে রয়েছে।
২০২৬ সালের মধ্যে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর বাজার ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সক্ষমতার সমকক্ষ হতে ভারতের কয়েক বছর লাগতে পারে। তবে পরিণত প্রযুক্তির চিপে মনোযোগ দেওয়ার কৌশলটি গাড়ি, টেলিযোগাযোগ ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পের জন্য উপযোগী, যেখানে নির্ভরযোগ্যতা ও খরচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাইক্রন ও অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালসসহ বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশটির সম্ভাবনার প্রতি বাড়তে থাকা আস্থার ইঙ্গিত। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও নকশায় বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে ভারতের ভূমিকা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
আশাবাদ থাকলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ধরে রাখতে ভারতকে নিয়মকানুন আরও সহজ করা, অবকাঠামো উন্নত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা অব্যাহত রাখতে হবে। অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা—যারা ভারতের কিছু কারখানায় সংযোজনের কাজ সরালেও উচ্চমূল্যের অধিকাংশ উপাদান চীনেই তৈরি করে—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল স্থানান্তরের জটিলতা তুলে ধরে।
তা সত্ত্বেও জাপান-ভারত অংশীদারত্ব আরও বহুমুখী, স্থিতিস্থাপক ও নিরাপদ বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। জাপানের দক্ষতার সঙ্গে ভারতের ব্যয়গত সুবিধা ও জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশ ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের নতুন যুগের ভিত্তি গড়ে তুলছে।
সংক্ষেপে
- চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে জাপান ও ভারত পুরোনো প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর, এলসিডি ও ব্যাটারি উৎপাদন জাপান থেকে ভারতে সরানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
- এ উদ্যোগের লক্ষ্য গাড়ি ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিণত উৎপাদনপ্রযুক্তি; সর্বাধুনিক চিপ নয়।
- ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং স্থিতিস্থাপক প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস বহুমুখী করার যে বৃহত্তর প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই অংশীদারত্ব তারই অংশ।
- সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারত সরকার বড় অঙ্কের প্রণোদনা দিচ্ছে ও অবকাঠামো আধুনিক করছে। দেশে তৈরি প্রথম চিপ ২০২৫ সালের মধ্যে উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- জাপানের এই কৌশল দেশটিকে পরবর্তী প্রজন্মের উদ্ভাবনে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে এবং পুরোনো প্রযুক্তির উৎপাদন বন্ধুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে রাখবে।
- সহযোগিতার অংশ হিসেবে দুই দেশই মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
- চ্যালেঞ্জ থাকলেও জাপান-ভারত অংশীদারত্ব পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দুই দেশকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসছে।






