যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের ২০২৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন: অভিযোগ, প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক বিতর্ক
২০২৫ সালের আগস্টে চীনের স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিস যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রেকর্ডের কঠোর সমালোচনা করা হয়। বিতর্কপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনের বছরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক বিরোধ আরও বাড়াচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য তীব্র করছে এবং মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে পাল্টাপাল্টি সমালোচনার পাশাপাশি মানবাধিকার নিয়ে প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতা, অধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনকে রাজনীতিকরণের বিষয় এবং এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সূচিপত্র
- যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের ২০২৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন: অভিযোগ, প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক বিতর্ক
- চীনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করা হয়েছে?
- বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ও চীনা দৃষ্টিভঙ্গি
- যুক্তরাষ্ট্রের জবাব কী? পররাষ্ট্র দপ্তরের নিজস্ব প্রতিবেদন
- পাল্টাপাল্টি সমালোচনা: অভিযোগের চক্র
- যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীনতা, বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষ
- বর্ণবৈষম্য ও সংখ্যালঘুদের অধিকার
- নারী ও শিশুর অধিকার: আন্তর্জাতিক সমালোচনা
- অভিবাসী সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তনীতি
- বন্দুক সহিংসতা ও পুলিশের বর্বরতা: দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ
- আন্তর্জাতিক প্রভাব: ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মানবাধিকার
- মানবাধিকার রেকর্ডের তুলনা: যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
- সংক্ষেপে
এই নিবন্ধে চীনের প্রতিবেদনের প্রধান দাবিগুলো, যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার চর্চার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার আলোচনায় এর প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে।
চীনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করা হয়েছে?
চীনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগপত্র। এতে বলা হয়েছে, মার্কিন মডেল নিজ দেশের নাগরিকদের অধিকারই রক্ষা করতে পারছে না, বৈশ্বিক মানদণ্ড হওয়ার কথা তো দূরের বিষয়। প্রতিবেদনের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
- রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব: প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অর্থের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি; ২০২৪ সালের নির্বাচনী চক্রে ব্যয় ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দলীয় স্বার্থ ও নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিজেদের সুবিধামতো পুনর্নির্ধারণ ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় ও অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন সংখ্যালঘু, প্রবীণ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে।
- সামাজিক বিভাজন ও রাজনৈতিক সহিংসতা: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে এবং গণতন্ত্র নিয়ে জনসাধারণের হতাশা তীব্র হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃত জরিপে দেখা যায়, অনেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, তাদের সরকার জনগণের বদলে অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষা করে।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪ কোটির বেশি মার্কিন নাগরিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং ২০২৩ সালের তুলনায় গৃহহীনতার হার ১৮.১ শতাংশ বেড়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অভাব ও চিকিৎসাব্যয়ের লাগামছাড়া বৃদ্ধির সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে মানুষ দেউলিয়া হচ্ছে এবং বৈষম্য আরও বাড়ছে।
- বন্দুক সহিংসতা ও পুলিশের বর্বরতা: চীনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বন্দুক সহিংসতায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ এবং পুলিশের গুলিতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে বলে এতে অভিযোগ করা হয়েছে।
- বর্ণবৈষম্য: নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, সংখ্যালঘুরা সহিংসতা, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের বেশি শিকার হন। আফ্রিকান আমেরিকান, এশীয় আমেরিকান ও আদিবাসী আমেরিকানদের ওপর পদ্ধতিগত বর্ণবাদ প্রভাব ফেলে।
- নারী ও শিশুর অধিকার: নারী ও শিশুর অধিকারবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদন না করায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে প্রতিবেদনটি। এতে যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা ও শিশুশ্রমের উচ্চ হারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
- অভিবাসী সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে মৃত্যু বেড়েছে, নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে এবং শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে।
- পররাষ্ট্রনীতি ও মানবিক বিপর্যয়: চীনের অভিযোগ, সামরিক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক সংঘাত বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায়।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, মার্কিন রাজনীতিকেরা মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, যা মৌলিক মূল্যবোধ ও নীতির পরিপন্থী। অন্যদের সমালোচনা করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ও চীনা দৃষ্টিভঙ্গি
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে উদ্ধৃত চীনা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এসব সমস্যার সমাধান কঠিন। তাঁদের দাবি, বৈশ্বিক মানবাধিকার প্রবক্তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং দ্বিমুখী নীতি ও ভণ্ডামি বলে তাঁরা যা মনে করেন, তা প্রকাশ করাই এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।
চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষক লু শিয়াং মন্তব্য করেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয়নি। বৈষম্য ও দারিদ্র্যের স্থায়ী সমস্যা শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।"
এ ধরনের বক্তব্য চীনের সরকারি ভাষ্যের বৃহত্তর বয়ানকে তুলে ধরে: যুক্তরাষ্ট্রের মডেল মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ এবং দেশটি যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেগুলো মোকাবিলায় অনুপযোগী।
যুক্তরাষ্ট্রের জবাব কী? পররাষ্ট্র দপ্তরের নিজস্ব প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র সরকারও প্রতিবছর নিজস্ব মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ২০২৪ সালের মানবাধিকার চর্চাবিষয়ক দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে চীনে উইঘুর ও তিব্বতিদের দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আন্তর্দেশীয় দমনের মতো নির্যাতনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের প্রতিবেদনটি নিজেই বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত করা হয়। নারী অধিকার, এলজিবিটিকিউ+ বিষয় এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেওয়া বা গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো হয়; মিত্র দেশগুলোর আচরণ নিয়েও সমালোচনা নরম করা হয়। সমালোচকদের মতে, এতে প্রতিবেদনটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও উপযোগিতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পর্যবেক্ষণ করেছে, "ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেওয়া এবং কিছু দেশের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে নিজেদের মতো করে তুলে ধরায় ২০২৫ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনটি অবমূল্যায়িত ও রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে প্রশাসন মানবাধিকারকর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলছে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা দুর্বল করছে।"
স্বাধীন বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকেরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয় দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদনকে রাজনীতিকরণ বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোর জন্য হুমকি।
পাল্টাপাল্টি সমালোচনা: অভিযোগের চক্র
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মানবাধিকার নিয়ে পাল্টাপাল্টি সমালোচনা নতুন নয়। দুই দেশের বার্ষিক প্রতিবেদন তথ্য নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি কূটনৈতিক বার্তাও দেয়। যুক্তরাষ্ট্র চীনে, বিশেষ করে শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরে; অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার ওপর জোর দেয়।
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি সমালোচনায় প্রায়ই ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর হংকংয়ের নতুন নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করলে হংকংয়ে বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দপ্তর প্রতিবেদনটিকে "জঘন্য" বলে অভিহিত করে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে।
হংকংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র হংকংয়ে চীনবিরোধী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তিগুলোকে নিয়ে পুরোনো অভিযোগগুলো আবার তুলেছে এবং প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন দিয়েছে। এতে মানবাধিকার ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরণ ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছে।"
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য মানবাধিকার নিয়ে প্রচারের ভূরাজনৈতিক দিকটি তুলে ধরে, যেখানে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতায় প্রতিবেদনগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীনতা, বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষ
চীনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান বিষয় যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীনতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ক্রমাবনতিশীল সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ও নগর উন্নয়ন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গৃহহীনতার হার নথি রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বড় শহরগুলোতে তাঁবুর শহর ও অস্থায়ী শিবির এখন সাধারণ দৃশ্য।
বেকারত্ব, সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যা গৃহহীনতার পেছনে ভূমিকা রাখে। তবে চীনা বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ পদ্ধতিগত: তাঁদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মডেল সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা বা কার্যকরভাবে দারিদ্র্য মোকাবিলার জন্য তৈরি হয়নি।
মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার বেনি জনসন লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রীয় এলাকাকে বর্ণনা করেছেন "তাঁবুর শহর, ময়লা-আবর্জনা, মাদক আর ভেঙে পড়া জীবনে ভরা" হিসেবে। তাঁর বর্ণনা দেখায়, ব্যাপক গৃহহীনতা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুর্লঙ্ঘ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়া ও মজুরি স্থবির থাকায় ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বিপর্যয়কর আঘাত হেনেছে। সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পদক্ষেপগুলো প্রায়ই সাময়িক উপশম দেয়; দারিদ্র্য ও বৈষম্যের অন্তর্নিহিত কারণগুলো সমাধান করতে পারে না।
বর্ণবৈষম্য ও সংখ্যালঘুদের অধিকার
যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্যের বিষয়টিকে চীনের প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে স্বাধীন সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানের প্রতিফলন রয়েছে। আইন প্রয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে আফ্রিকান আমেরিকান, এশীয় আমেরিকান ও আদিবাসী আমেরিকানরা এখনো বৈষম্যের মুখে পড়েন।
উদাহরণস্বরূপ, পুলিশের সহিংসতা ও কারাবাসের ক্ষেত্রে আফ্রিকান আমেরিকানরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশেষ করে এশীয় আমেরিকানরা বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। আদিবাসী আমেরিকানদের অধিকার ক্রমাগত লঙ্ঘিত হচ্ছে; তাঁদের মধ্যে দারিদ্র্য স্থায়ী এবং জরুরি পরিষেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত।
নাগরিক অধিকার আইন ও ইতিবাচক পদক্ষেপের মতো কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রগতি করলেও সমালোচকদের মতে, পদ্ধতিগত বর্ণবাদ গভীরভাবে প্রোথিত রয়ে গেছে।
নারী ও শিশুর অধিকার: আন্তর্জাতিক সমালোচনা
নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বা শিশু অধিকার সনদ অনুমোদন করেনি—এমন অল্প কয়েকটি দেশের একটি যুক্তরাষ্ট্র। চীনের প্রতিবেদন এ বিষয়টি তুলে ধরে বলেছে, এর ফলে নারী ও শিশুর অধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ করা বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতার উচ্চ হার, মাতৃত্বকালীন সেবার অভাব এবং শিশুশ্রম। ২০২৪ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে নারী অধিকার নিয়ে আলাদা অংশ না থাকায় অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এতে লিঙ্গভিত্তিক বিষয়গুলোকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিবাসী সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে মানবিক সংকটের অবনতি হচ্ছে বলে চীনের প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে; সেখানে মৃত্যু বেড়েছে, নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে এবং শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে। আশ্রয়প্রার্থী ও অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, পরিবার বিচ্ছিন্ন করা, দীর্ঘদিন আটক রাখা এবং বিপজ্জনক দেশে ফেরত পাঠানোর মতো নীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড লঙ্ঘন করে। এল সালভাদর ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশে নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তারিত অংশ ২০২৪ সালের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের ঝুঁকি কম করে দেখাচ্ছে।
বন্দুক সহিংসতা ও পুলিশের বর্বরতা: দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ
বন্দুক সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বতন্ত্র সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে; ২০২৪ সালে এতে ৪০ হাজারের বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ব্যাপক গোলাগুলি, পারিবারিক সহিংসতা ও আত্মহত্যা এ প্রাণহানির পেছনে ভূমিকা রাখে। বন্দুক নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থন ব্যাপক হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর তদবিরের কারণে আইন প্রণয়ন থমকে আছে।
পুলিশের বর্বরতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ২০২৪ সালে পুলিশের গুলিতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন; সংখ্যালঘুরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংস্কারের দাবিতে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন এলেও জাতীয় পর্যায়ের আইন পাসের প্রচেষ্টা তেমন এগোয়নি।
আন্তর্জাতিক প্রভাব: ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মানবাধিকার
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিবছরের মানবাধিকার প্রতিবেদন বিনিময় একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন: আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মানবাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। উভয় দেশই একে অপরকে ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতির জন্য অভিযুক্ত করে, পাশাপাশি বৈশ্বিক নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় চীন তার প্রভাব বাড়িয়েছে। স্বাধীন বেসরকারি সংস্থা ও মানবাধিকারকর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত করতে তারা প্রায়ই প্রক্রিয়াগত কৌশল ব্যবহার করে। ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ফর হিউম্যান রাইটসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের বেসরকারি সংস্থাবিষয়ক কমিটিতে বাধা সৃষ্টিকারী সদস্য হিসেবে চীন এখন শীর্ষে। সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে তারা আবেদন বিবেচনা স্থগিত রাখা ও অন্যান্য পদক্ষেপ ব্যবহার করে।
আইএসএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "স্বাধীন বেসরকারি সংস্থাগুলোকে জাতিসংঘে স্বীকৃতি পাওয়া, জাতিসংঘের প্রাঙ্গণে প্রবেশ, মানবাধিকার পরিষদে বক্তব্য দেওয়া বা কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টায় চীন নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগকারীদের বিরুদ্ধে বেইজিং ধারাবাহিকভাবে প্রতিশোধ নিয়েছে।"
প্রভাব বিস্তারের এই প্রতিযোগিতার বাস্তব দুনিয়ায় পরিণতি রয়েছে; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা দুর্বল করতে পারে এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাসম্পন্ন অন্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
মানবাধিকার রেকর্ডের তুলনা: যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
চীনের প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার ওপর জোর দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনে, বিশেষ করে শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরছে। ২০২৪ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত দমন, যথেচ্ছ আটক, নির্যাতন এবং মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিধিনিষেধের বিবরণ রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং চীনবিষয়ক কংগ্রেসনাল-এক্সিকিউটিভ কমিশনের মতো স্বাধীন সংস্থাও এসব অনুসন্ধানের সত্যতা সমর্থন করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ, চীনা সরকার নাগরিক সমাজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, ভিন্নমত দমন করে এবং বিদেশে সমালোচকদের ওপর আন্তর্দেশীয় দমন চালায়।
উদাহরণস্বরূপ, তিব্বতে জোরপূর্বক গুম, যথেচ্ছ আটক এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এখনো চলছে বলে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। হংকংয়ে ২০২৪ সালে নতুন নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পর ভিন্নমত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর আরও দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি প্রতিবেদন ও সমালোচনা বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে: কোনো দেশই নজরদারির ঊর্ধ্বে নয়, আর সব দেশই রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকে।
সংক্ষেপে
- চীনের ২০২৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ানো, বর্ণবৈষম্য এবং মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৪ সালের নিজস্ব প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দেওয়া ও রাজনীতিকরণের কারণে সমালোচিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে।
- যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীনতা, বন্দুক সহিংসতা, পুলিশের বর্বরতা ও অভিবাসী সংকট দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে; এগুলোর পদ্ধতিগত কারণ রয়েছে এবং অগ্রগতি সীমিত।
- চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি মানবাধিকার সমালোচনা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং অধিকার নিয়ে প্রচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রতিফলন।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্বাধীন নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
- স্বাধীন সংস্থাগুলো সব সরকারকে সর্বজনীন মানবাধিকার নীতি মেনে চলা এবং অধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনকে রাজনীতিকরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।






