থাইল্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব: চীনা বিনিয়োগের জোয়ার
দীর্ঘদিন ধরে "দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডেট্রয়েট" নামে পরিচিত থাইল্যান্ডের গাড়ি শিল্পে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। একসময় জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের আধিপত্য থাকলেও, দেশটি এখন নতুন এক ঢেউয়ের কেন্দ্রবিন্দু—বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বিপ্লব, যার প্রধান চালিকাশক্তি চীনা বিনিয়োগ। মাত্র কয়েক বছরে চীনা ইভি নির্মাতারা থাইল্যান্ডে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, কারখানা গড়েছে, সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং আঞ্চলিক গাড়ি শিল্পের প্রচলিত চিত্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
সূচিপত্র
- থাইল্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব: চীনা বিনিয়োগের জোয়ার
- চীনা ইভি নির্মাতারা কেন থাইল্যান্ডে ভিড় করছেন?
- চীনা ইভি কীভাবে থাইল্যান্ডের গাড়ি শিল্পে পরিবর্তন আনছে
- মূল্যযুদ্ধ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজারের চ্যালেঞ্জ
- ইভি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা: সুযোগ ও ঝুঁকি
- স্থানীয় শিল্পের উদ্বেগ ও নীতিগত পদক্ষেপের আহ্বান
- থাইল্যান্ডের ইভি উচ্চাকাঙ্ক্ষা: পরিবেশবান্ধব লক্ষ্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
- আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
- সামনের চ্যালেঞ্জ: টেকসইতা, প্রতিযোগিতা ও এগিয়ে চলার পথ
- সংক্ষেপে
এই বিনিয়োগের ঢল শুধু সড়কে নতুন গাড়ি নামানোর বিষয় নয়। এটি থাইল্যান্ডের শিল্প কাঠামো, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরে দেশটির ভূমিকার মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই গল্পের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও রয়েছে—তীব্র মূল্যযুদ্ধ, স্থানীয় শিল্পে বিঘ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে।
চীনা ইভি নির্মাতারা কেন থাইল্যান্ডে ভিড় করছেন?
গত এক দশকে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি খাত দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে সরকারের উদার ভর্তুকি এবং তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বাজার। দেশে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় এবং পশ্চিমা বাজারগুলো বাণিজ্যিক বাধা তৈরি করায়, চীনা গাড়ি নির্মাতারা নতুন সুযোগের সন্ধানে বিদেশমুখী হতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত গাড়ি শিল্প, কৌশলগত অবস্থান এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে থাইল্যান্ড দ্রুতই তাদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে।
বেশ কয়েকটি কারণে থাইল্যান্ড বিশেষভাবে আকর্ষণীয়:
- সরকারি প্রণোদনা: বিদেশি ইভি নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে থাই সরকার ভর্তুকি, করছাড় এবং উৎপাদন প্রণোদনার নানা ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি গাড়িতে সর্বোচ্চ ১৫০,০০০ বাথ নগদ ভর্তুকি এবং আমদানির বদলে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার শর্ত।
- কৌশলগত অবস্থান: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত থাইল্যান্ড বড় আঞ্চলিক বাজার এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ ও পরিবহন নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
- গাড়ি শিল্পের ঐতিহ্য: আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার ফলে থাইল্যান্ডে দক্ষ কর্মী এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা রয়েছে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে তা পেট্রলচালিত গাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
- বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই): বিআরআইয়ের আওতায় চীন ও থাইল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব চীনা বিনিয়োগের পথ আরও সুগম করেছে। সহযোগিতার অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ইভিকেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর ফলে বিওয়াইডি, এমজি, গ্রেট ওয়াল মোটর, চ্যাংআন এবং ওমোডা অ্যান্ড জেকুর মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলো থাইল্যান্ডে বড় আকারের উৎপাদন বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বা কার্যক্রম শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, রায়ংয়ে বিওয়াইডির নতুন কারখানায় বছরে ১৫০,০০০ গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় ১০,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা রয়েছে।
চীনা ইভি কীভাবে থাইল্যান্ডের গাড়ি শিল্পে পরিবর্তন আনছে
চীনা বিনিয়োগের প্রভাব দ্রুত এবং গভীর হয়েছে। মাত্র দুই বছরে চীনা ব্র্যান্ডগুলো থাইল্যান্ডের ইভি বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করেছে; এগিয়ে রয়েছে বিওয়াইডি, নেটা ও এমজি। এখন ব্যাংককের মহাসড়কজুড়ে চীনা ইভির বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড দেখা যায়, আর সারা দেশে এসব ব্র্যান্ডের শোরুম বাড়ছে।
এই উত্থান জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে ওলটপালট করে দিয়েছে। সুবারু ও সুজুকির মালিকানাধীন কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা উৎপাদন কমাচ্ছে, আর হোন্ডা ও নিশানও উৎপাদন কমাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে উৎপাদিত সব গাড়ির ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নিয়েছে থাই সরকার। চীনা বিনিয়োগের সুবাদে এখন লক্ষ্যটি অর্জনযোগ্য বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই রূপান্তর যে বিনা কষ্টে হচ্ছে, তা নয়। ইভিতে রূপান্তরের ফলে ৫৩ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি (আইসিইভি) শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এ খাতে উৎপাদন ২০ শতাংশ কমেছে এবং বিক্রি নেমেছে ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। স্থানীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীরা, বিশেষ করে যারা পেট্রল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ তৈরি করে, খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে। থাই অটো পার্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরবরাহকারীদের সামান্য অংশই নতুন ইভি সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবে; এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
থাই কর্মীদের কাছে এই পরিবর্তন উদ্বেগজনক। গাড়ি শিল্পে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। উদ্বেগ হলো, চীনা কোম্পানিগুলো—যারা প্রায়ই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতি কম সহনশীল—তাদের জাপানি পূর্বসূরিদের মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ বা কাজের পরিবেশ নাও দিতে পারে।
মূল্যযুদ্ধ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজারের চ্যালেঞ্জ
চীনা ইভির ঢলের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি হলো তীব্র মূল্যযুদ্ধ। বাজারের অংশীদারত্ব বাড়াতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দাম কমিয়েছে। এতে থাই ক্রেতাদের জন্য ইভি আরও সাশ্রয়ী হয়েছে, তবে সব গাড়ি নির্মাতার মুনাফার মার্জিনে চাপ পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, বিওয়াইডি তাদের ডলফিন মডেলে বড় ছাড় দিয়েছে। এ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তদন্ত করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো অনিয়মের প্রমাণ পায়নি।
এই তীব্র প্রতিযোগিতা এক বৈপরীত্য তৈরি করেছে: ইভি বিক্রি বাড়লেও—এ বছর যা ১ লাখ গাড়ি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—সামগ্রিক থাই গাড়ির বাজারে মন্দা চলছে। পরিবারের উচ্চ ঋণ, ঋণপ্রাপ্তির কঠোর শর্ত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা চাহিদা কমিয়েছে। আরও দাম কমার আশায় অনেক ক্রেতা গাড়ি কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে নেটার মতো কয়েকটি চীনা ব্র্যান্ড স্থানীয় উৎপাদনের শর্ত পূরণে সমস্যায় পড়েছে এবং আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
থাই সরকার ভর্তুকি কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে এর জবাব দিয়েছে। এখন গাড়ি নির্মাতারা স্থানীয় উৎপাদনের অঙ্গীকার পূরণের হিসাবে রপ্তানির জন্য তৈরি গাড়িও গণনায় ধরতে পারে। এতে কোম্পানিগুলোকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও এর বাইরের বাজারে রপ্তানির ভিত্তি হিসেবে থাইল্যান্ডকে ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। নতুন কারখানাগুলোর বাড়তি উৎপাদন শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইভি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা: সুযোগ ও ঝুঁকি
চীনা বিনিয়োগ শুধু গাড়ি সংযোজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীনের গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতারা থাইল্যান্ডে তাদের উপস্থিতি তিন গুণ বাড়িয়েছে, বিশেষ করে দ্রুত প্রসারমান ইভি ব্যাটারি খাতে। এই সম্প্রসারণ থাইল্যান্ডকে আঞ্চলিক সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত করছে, যেখান থেকে এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ইভি সরবরাহব্যবস্থার সবচেয়ে মূল্যবান অংশ—ব্যাটারি সেল উৎপাদন এবং উন্নত গবেষণা ও উন্নয়ন—এখনো মূলত চীনেই রয়েছে। থাইল্যান্ডে গাড়ি সংযোজন ও ব্যাটারি প্যাক তৈরির প্রকল্প বাড়লেও মূল প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন চীনের হাতেই থাকছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বে ঘোষিত ইভি উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ চীনের বাইরে; বিদেশের প্রকল্পগুলোতে বাস্তবায়ন ঝুঁকি বেশি এবং কাজ শেষ হতে বেশি সময় লাগে।
এই পরিস্থিতি থাইল্যান্ডের সামনে যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও আনছে। একদিকে, স্থানীয় সংযোজন কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, এর ফলে থাইল্যান্ড আমদানি করা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে এবং চীনা কোম্পানির কৌশলগত পরিবর্তন বা বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার মুখে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্থানীয় শিল্পের উদ্বেগ ও নীতিগত পদক্ষেপের আহ্বান
থাই কর্মকর্তারা এসব ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবেই সচেতন। বিনিয়োগ বোর্ড চীনা কোম্পানিগুলোকে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত উপকরণ ও যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়াতে এবং থাই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গড়তে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করছে। লক্ষ্য হলো, ইভিতে রূপান্তরের সুফল যেন ব্যাপকভাবে ভাগাভাগি হয় এবং নতুন সবুজ অর্থনীতিতে থাইল্যান্ড যেন নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে।
এক সাক্ষাৎকারে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ডের মহাসচিব নারিত থের্ডস্টিরাসুকদি বলেন, "থাইল্যান্ডের শিল্প কাঠামোকে নতুন রূপ দিতে এবং দেশের কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।"
তবে স্থানীয় সরবরাহকারীরা দাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। কেউ কেউ ইভিতে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত যন্ত্রাংশের অনুপাত বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা আরোপের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যরা ইভি খাতে নতুন কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণে সহায়তা চাচ্ছেন।
থাইল্যান্ডের ইভি উচ্চাকাঙ্ক্ষা: পরিবেশবান্ধব লক্ষ্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি থাইল্যান্ডের আগ্রহ শুধু শিল্পনীতির বিষয় নয়—এর সঙ্গে জলবায়ু ও জ্বালানি কৌশলও জড়িত। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে উৎপাদিত গাড়ির ৩০ শতাংশকে শূন্য নিঃসরণকারী করার সরকারি লক্ষ্য কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে টেকসই পরিবহনে শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে থাইল্যান্ডের অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে।
চীনের নিজস্ব "বিআরআই ২.০"-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের এই সংস্করণ আরও পরিবেশবান্ধব এবং বাণিজ্যিকভাবে বেশি পরিচালিত। বিআরআই প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে কয়েক বছর ধরে সমালোচনার পর বেইজিং এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ২০২৪ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রযুক্তি চীনের জিডিপির রেকর্ড ১০ শতাংশে পৌঁছায়; এ খাতে বিক্রি ও বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
থাইল্যান্ডের জন্য এর অর্থ উন্নত ইভি প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির আঞ্চলিক কেন্দ্র হওয়ার সুযোগ। তবে এর পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, দামের অস্থিরতা এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকিও সামলাতে হবে। নীতিনির্ধারকদের দেশে উৎপাদন বাড়ানোর সুফল এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা ও কর্মীদের জন্য ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বাধার মুখে পড়ে চীনা গাড়ি নির্মাতারা থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ার মতো উদীয়মান বাজারের দিকে ঝুঁকছে। এসব দেশে বাণিজ্যিক বাধা কম এবং ভোক্তাদের চাহিদা বাড়ছে, ফলে চীনা সম্প্রসারণের জন্য এগুলো আকর্ষণীয় লক্ষ্যবাজার হয়ে উঠেছে।
চীনের কৌশল স্পষ্ট: প্রণোদনা পেতে স্থানীয় সংযোজন কারখানা গড়া, ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই পদ্ধতির ফলে চীন ইতিমধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। গত বছর প্রায় ৫০ লাখ গাড়ি বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশ ক্রমেই বাড়ছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ: টেকসইতা, প্রতিযোগিতা ও এগিয়ে চলার পথ
দ্রুত অগ্রগতি সত্ত্বেও ইভি খাতে থাইল্যান্ডের পথচলা মোটেই মসৃণ নয়। বাজারে পণ্যের আধিক্য, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা এখনো রয়েছে। কিছু চীনা ব্র্যান্ড টিকে থাকার লড়াই করছে, অন্যরা ভালো করছে। প্রত্যাশার চেয়ে ধীর চাহিদা এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, থাইল্যান্ডের উচিত মূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলা, প্রযুক্তি হস্তান্তরে উৎসাহ দেওয়া এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করা। ইভিতে রূপান্তরকে অনিবার্য বলে মনে করা হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে সতর্ক পরিকল্পনা, শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সদিচ্ছার ওপর।
অটোমোবিলিটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বিল রুশোর ভাষায়, "সাশ্রয়ী হওয়া একটি সর্বজনীন মূল্যপ্রস্তাব।" তিনি উল্লেখ করেন, চীনা নির্মাতারা শুধু ইভিই রপ্তানি করছে না; বিদ্যুতায়নের জন্য এখনো প্রস্তুত নয় এমন বাজারে অতিরিক্ত পেট্রলচালিত গাড়িও পাঠাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার সোপান হিসেবে তারা এই কৌশল ব্যবহার করছে।
শেষ পর্যন্ত, ঝুঁকি কমিয়ে ইভি বিপ্লবের সুফল কাজে লাগানোর থাইল্যান্ডের সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির যুগেও দেশটি "দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডেট্রয়েট" হিসেবে থাকতে পারবে কি না।
সংক্ষেপে
- চীনা ইভি নির্মাতারা থাইল্যান্ডে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, যা দ্রুত দেশটির গাড়ি শিল্পকে বদলে দিচ্ছে।
- থাইল্যান্ডের ইভি বাজারে এখন চীনা ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য, যা জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে।
- তীব্র মূল্যযুদ্ধ ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ভোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, তবে স্থানীয় সরবরাহকারী ও কর্মীদের জন্য চ্যালেঞ্জও এনেছে।
- রপ্তানি ও স্থানীয় উৎপাদনে উৎসাহ দিতে থাই সরকার নীতিতে পরিবর্তন এনেছে; ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনের ৩০ শতাংশ ইভি করার লক্ষ্য রয়েছে।
- ব্যাটারি ও গবেষণা-উন্নয়নের অধিকাংশ উচ্চমূল্যের কার্যক্রম এখনো চীনে রয়েছে, যা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
- পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বৈশ্বিক রূপান্তরের মধ্যে শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের জটিলতা থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।






