স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করে যুগান্তকারী আইন পাস দক্ষিণ কোরিয়ায়: বিতর্ক, প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণ

পড়তে 8 মিনিট
স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করে যুগান্তকারী আইন পাস দক্ষিণ কোরিয়ায়: বিতর্ক, প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণ

দক্ষিণ কোরিয়ার দেশব্যাপী স্কুলে ফোন নিষেধাজ্ঞা: এর অর্থ কী?

প্রশংসা ও বিতর্ক—দুই-ই উসকে দেওয়া এক পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়া একটি বিস্তৃত আইন পাস করেছে, যাতে সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইন দক্ষিণ কোরিয়াকে এমন ক্রমবর্ধমানসংখ্যক দেশের কাতারে ঠাঁই দিয়েছে, যারা তরুণদের স্মার্টফোনে আসক্তি, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের বিঘ্ন এবং শেখা ও সুস্থতার ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তির বৃহত্তর প্রভাব মোকাবিলায় উদ্যোগী হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. দক্ষিণ কোরিয়ার দেশব্যাপী স্কুলে ফোন নিষেধাজ্ঞা: এর অর্থ কী?
  2. ফোন নিষিদ্ধ কেন? আইনের পেছনের উদ্বেগ
  3. শ্রেণিকক্ষে বিঘ্ন ও পড়াশোনার চাপ
  4. আইনে আসলে কী বলা হয়েছে?
  5. বিদ্যালয়গুলো কীভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে?
  6. বিতর্ক ও বিভাজন: সমর্থক-সমালোচকদের বক্তব্য
  7. সমর্থকেরা: শেখা ও সুস্থতার সুরক্ষা
  8. সমালোচকেরা: অধিকার, বাস্তবতা ও মূল কারণ
  9. আইনি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত বিবেচনা
  10. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান কোথায়?
  11. দক্ষিণ কোরিয়ার আইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  12. এরপর কী? বাস্তবায়ন ও চ্যালেঞ্জ
  13. সংক্ষেপে

উপস্থিত ১৬৩ জনের মধ্যে ১১৫ ভোটে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই আইন শিক্ষার্থীজীবনে স্মার্টফোনের সর্বব্যাপী প্রভাব নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও আইনপ্রণেতাদের বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় প্রত্যেকেরই স্মার্টফোন রয়েছে—দেশটির ৯৮ শতাংশ মানুষের, যা জরিপ করা ২৭টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ফোন নিষিদ্ধ কেন? আইনের পেছনের উদ্বেগ

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত সমাজগুলোর একটি, তবে এই সংযোগের মূল্যও দিতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের এক সরকারি জরিপে দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী দক্ষিণ কোরীয়দের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্মার্টফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বলে বিবেচিত; এই হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এক-তৃতীয়াংশের বেশি কিশোর-কিশোরী স্বীকার করেছে, তারা স্ক্রিনে কাটানো সময় নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খায়। আর ২২ শতাংশ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পারলে তারা উদ্বিগ্ন বোধ করে।

আইনপ্রণেতা ও শিক্ষাবিদদের যুক্তি, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার শিক্ষাগত ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ বিঘ্নিত করে। অনেক অভিভাবকের আশঙ্কা, সার্বক্ষণিক সংযোগ সাইবার বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও উদ্বেগ বাড়ায়, পাশাপাশি সামনাসামনি মেলামেশা ও শেখার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করে। বিলটি উত্থাপনকারী বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা চো জং-হুনের কথায়:

আমাদের তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের বাচ্চাদের চোখ প্রতিদিন সকালে লাল থাকে। তারা রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্ত ইনস্টাগ্রামে থাকে।

এই উদ্বেগ শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার নয়। ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো স্কুলে ফোন ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে। এসব পদক্ষেপের পেছনে প্রায়ই মনোযোগের বিঘ্ন, আসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করেছে।

বিজ্ঞাপন

শ্রেণিকক্ষে বিঘ্ন ও পড়াশোনার চাপ

শিক্ষকেরা জানান, শ্রেণিকক্ষে বিঘ্নের একটি সাধারণ কারণ স্মার্টফোন। রক্ষণশীল কোরিয়ান ফেডারেশন অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যবহারের কারণে বিঘ্নের মুখে পড়েছেন। কিছু ঘটনা মৌখিক, এমনকি শারীরিক সংঘর্ষেও গড়িয়েছে। নতুন আইন শিক্ষকদের ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করার আরও দৃঢ় আইনি ভিত্তি দিয়েছে, যার লক্ষ্য শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা ও মনোযোগ ফিরিয়ে আনা।

তবে সমালোচকদের যুক্তি, আইনটি শিক্ষার্থীদের চাপ ও মনোযোগের সমস্যার মূল কারণের বদলে উপসর্গ—ফোন ব্যবহার—নিয়ে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুপরিচিত প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুনেউং পরীক্ষাকে ঘিরে তীব্র চাপ এর মধ্যে রয়েছে। কিছু শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীর বিশ্বাস, শুধু ফোন নিষিদ্ধ করলে পড়াশোনা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রয়োজনের মতো গভীর সমস্যার সমাধান হবে না।

আইনে আসলে কী বলা হয়েছে?

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা আইনের সংশোধনী হিসেবে এই আইন দেশজুড়ে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ে প্রযোজ্য। এর মূল ধারাগুলো হলো:

  • ক্লাস চলাকালে ব্যবহার নিষিদ্ধ: ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ। আইনে ফৌজদারি শাস্তির বিধান নেই, তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষমতা বিদ্যালয়ের প্রধান ও শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।
  • কর্তৃত্বের পরিধি: প্রয়োজন মনে করলে শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্মকর্তারা শুধু পাঠদানের সময় নয়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের অন্য স্থানেও ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করতে পারবেন।
  • ব্যতিক্রম: বিদ্যালয় কর্মকর্তাদের আগাম অনুমতি নিয়ে শিক্ষামূলক কাজে, জরুরি পরিস্থিতিতে অথবা প্রতিবন্ধী ও বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সহায়ক উপকরণ হিসেবে ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে।
  • ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে শিক্ষা: শুধু নিয়ম মানানোর বদলে দায়িত্বশীল অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যালয়গুলোকে প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ব্যবহার ও ডিজিটাল নাগরিকত্ব বিষয়ে পাঠ দিতে হবে।
  • কার্যকর হওয়া: নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সঙ্গে মিল রেখে ২০২৬ সালের ১ মার্চ আইনটি কার্যকর হবে।

অনেক বিদ্যালয়ে আগে থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহারে নিজস্ব বিধিনিষেধ ছিল। নতুন আইন দেশজুড়ে এসব নিয়মে একরূপতা এনেছে এবং তা কার্যকরের জন্য স্পষ্ট আইনি কাঠামো দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়গুলো কীভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে?

আইনের নির্দেশনার মধ্যে থেকে নিজস্ব নীতি নির্ধারণের সুযোগ থাকায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের দায়িত্ব মূলত পৃথক বিদ্যালয়গুলোর ওপর থাকবে। কিছু বিদ্যালয় দিনের বেলা শিক্ষার্থীদের ফোন লকারে বা নির্দিষ্ট সংরক্ষণস্থলে রাখতে বলতে পারে। অন্যরা ফোন সঙ্গে রাখার অনুমতি দিলেও ক্লাস চলাকালে ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে পারে। নিয়ম ভাঙলে সতর্ক করা, কাউন্সেলিং বা অন্য শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, তবে আইনটিতে শাস্তির চেয়ে পরামর্শ ও শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনটি শিক্ষার্থীদের অপরাধী করে না বা জরিমানা আরোপ করে না। বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সুস্থতার প্রতি সম্মান বজায় রেখে শৃঙ্খলার প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করে।

বিতর্ক ও বিভাজন: সমর্থক-সমালোচকদের বক্তব্য

আইনটি পাস হওয়ার পর শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর মতভেদ সামনে এসেছে।

সমর্থকেরা: শেখা ও সুস্থতার সুরক্ষা

অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক এই নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, মনোযোগের বিঘ্ন, আসক্তি ও সাইবার বুলিং থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষায় এটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, আইনটি শিক্ষার্থীদের শেখার অধিকার সুরক্ষিত করে এবং কার্যকরভাবে পড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সক্ষমতাকে সমর্থন করে। সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক গবেষণার কথাও তুলে ধরেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, ফোন নিষিদ্ধ করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শিক্ষাগত ফলাফল উন্নত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বেড়েছে।

সমালোচকেরা: অধিকার, বাস্তবতা ও মূল কারণ

তবে সবাই এ সিদ্ধান্তে একমত নন। কিছু শিক্ষক ইউনিয়ন ও যুব অধিকারকর্মী গোষ্ঠীর যুক্তি, আইনটি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল অধিকার, যোগাযোগের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করে। বামপন্থী জিনবো পার্টির সমালোচনা, এই পদক্ষেপ কিশোর-কিশোরীদের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে এবং ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখার সুযোগে বাধা দেয়। এক শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেছে:

ক্লাস চলাকালে ফোন নিষিদ্ধ করলে স্কুলের বাইরে আমরা কতটা ফোন ব্যবহার করি, সেই সমস্যার সমাধান হয় না। ফোন কেড়ে নেওয়া নয়, স্বাস্থ্যকর ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দরকার।

অন্যদের আশঙ্কা, এই আইন অতিরিক্ত নজরদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থ হবে।

বিজ্ঞাপন

আইনি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত বিবেচনা

আইনটি নিয়ে বিতর্কে সাংবিধানিক অধিকারও আলোচনায় এসেছে। বিরোধীদের যুক্তি, আইনে ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ যুক্ত করা শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার অধিকার ও সুখের অন্বেষণের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। তবে অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শেখা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করে, শিক্ষার উদ্দেশ্যে ফোন ব্যবহার সীমিত করা অধিকার লঙ্ঘন নয় বলে সম্প্রতি অবস্থান বদলেছে কোরিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান কোথায়?

তরুণদের ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশের উদ্বেগের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার পদক্ষেপটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আইনটির অবস্থান হলো:

  • ফ্রান্স: ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ; শিক্ষামূলক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
  • ফিনল্যান্ড: বিশেষ করে কমবয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য আংশিক নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে।
  • ইতালি, নেদারল্যান্ডস, চীন: বিদ্যালয়ে ফোন ব্যবহারে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
  • অস্ট্রেলিয়া: ভিক্টোরিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে সব শ্রেণিতে স্কুল চলাকালে ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাও সম্প্রতি সম্প্রসারিত করেছে অস্ট্রেলিয়া।

এসব দেশের গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ফোন নিষিদ্ধ করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়তে এবং শ্রেণিকক্ষে বিঘ্ন কমতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা প্রায়ই নির্ভর করে নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর সঙ্গে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বৃহত্তর শিক্ষার ব্যবস্থা আছে কি না, তার ওপর।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ কোরিয়ার আইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিদ্যালয় পর্যায়ের নীতি বা প্রশাসনিক নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল অনেক দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া নিষেধাজ্ঞাটিকে জাতীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে দেশজুড়ে অভিন্ন মানদণ্ড ও আইনি স্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, তবে অধিকার ও আইন কার্যকর করা নিয়ে বিতর্কের গুরুত্বও বেড়েছে। তরুণদের স্মার্টফোনে আসক্তি এবং এর পরিণতি নিয়ে ব্যাপক জনউদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বিরোধী ও ক্ষমতাসীন—দুই পক্ষের সমর্থনে আইনটি পাস হওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে বিরল ঐকমত্যের প্রতিফলন।

এরপর কী? বাস্তবায়ন ও চ্যালেঞ্জ

আইনটি ২০২৬ সালের মার্চে কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় বিদ্যালয়, শিক্ষক ও পরিবারগুলোর প্রস্তুতির জন্য সময় রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা ও সহায়ক উপকরণ প্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে থাকবে ডিজিটাল প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিয়ে পাঠ্যক্রম এবং আসক্তির সমস্যায় ভুগছে এমন শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ের উপকরণ।

সামনের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:

  • ন্যায্য ও ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা: বিদ্যালয়গুলোকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ব্যক্তিগত চাহিদার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, বিশেষ করে যাঁরা প্রতিবন্ধিতাজনিত কারণে ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল।
  • বিদ্যালয়ের বাইরের ব্যবহার মোকাবিলা: নিষেধাজ্ঞাটি শুধু ক্লাস চলাকালীন প্রযোজ্য হওয়ায় বাড়ি ও সমাজে প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিয়ে শিক্ষার্থী ও পরিবারকে সচেতন করতে আরও বিস্তৃত উদ্যোগ দরকার।
  • শিক্ষকদের সহায়তা: আইনটি ন্যায্য ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধ সামলাতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রয়োজন হবে।
  • প্রভাব মূল্যায়ন: নিষেধাজ্ঞার ফলে শিক্ষাগত ফলাফল, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশের উন্নতি হয়, নাকি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি দেখা দেয়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরা।

সংক্ষেপে

  • দক্ষিণ কোরিয়া সব বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ করে জাতীয় আইন পাস করেছে; এটি ২০২৬ সালের মার্চে কার্যকর হবে।
  • তরুণদের স্মার্টফোনে আসক্তি মোকাবিলা, পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং সাইবার বুলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দূর করাই আইনের লক্ষ্য।
  • নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষমতা শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে; শিক্ষামূলক ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতি ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম রয়েছে।
  • শিক্ষার্থীদের অধিকার, আইনের কার্যকারিতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সমস্যাগুলো এর আওতায় আসছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
  • ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়াও একই ধরনের বিধিনিষেধের বৈশ্বিক প্রবণতায় যোগ দিয়েছে।
  • নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা, অধিকার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ব্যবহারবিষয়ক শিক্ষার মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে