রাখাইনে আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা: আঞ্চলিক ও মানবিক সংকটের মধ্যে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে

পড়তে 9 মিনিট
রাখাইনে আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা: আঞ্চলিক ও মানবিক সংকটের মধ্যে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে

আরাকান আর্মির দ্রুত অগ্রগতিতে রাখাইন ও মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের চিত্র বদলে যাচ্ছে

মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। আরাকান আর্মি (এএ) সেখানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একসময় প্রান্তিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এএ এখন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজ্যের রাজধানী সিত্তে ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিয়াউকফিউ বন্দরসহ অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক জান্তার সঙ্গে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এই পরিবর্তন শুধু মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের চেহারাই বদলে দিচ্ছে না, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে এবং এমন এক মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে, যা লাখো মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সূচিপত্র
  1. আরাকান আর্মির দ্রুত অগ্রগতিতে রাখাইন ও মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের চিত্র বদলে যাচ্ছে
  2. আরাকান আর্মি এত শক্তিশালী হলো কীভাবে?
  3. মানবিক সংকট: অবরোধ, অনাহার ও রোহিঙ্গা সংকট
  4. নির্যাতন ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ
  5. ভূরাজনৈতিক স্বার্থ: চীন, ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থান
  6. চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ
  7. ভারতের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা
  8. কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ
  9. সামরিক কৌশল: এএ কেন অগ্রযাত্রা থামিয়েছে
  10. এএর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শাসন ও চ্যালেঞ্জ
  11. আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
  12. রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
  13. সংক্ষেপে

এএর উত্থান ঘটেছে দ্রুত, আর তা ছিল কৌশলগতভাবে হিসাব-নিকাশ করা। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক ঘাঁটি ও সীমান্তচৌকি দখল করেছে। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আওতায় অন্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে জোটও কাজে লাগিয়েছে তারা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যা তাতমাদো নামে পরিচিত, কঠোর অবরোধ ও বিমান হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে। তবে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এএর আঞ্চলিক দখলদারির ফলে তারা ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় পক্ষ হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব মিয়ানমারের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত।

আরাকান আর্মি এত শক্তিশালী হলো কীভাবে?

রাখাইন জনগণের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন আদায়ের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে এএ প্রতিষ্ঠিত হয়। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের উপেক্ষিত মনে করে আসছেন রাখাইনের মানুষ। বছরের পর বছর ধরে গোষ্ঠীটি শক্তিশালী লড়াকু বাহিনী গড়ে তুলেছে, অন্য জাতিগত বাহিনীর সঙ্গে জোট করেছে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শাসন পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর, যা মিয়ানমারকে বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত করে, এএর সামরিক সাফল্য তাদের দ্রুত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।

থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স—যার সদস্য এএ, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি—২০২৪ সালের শেষ দিকে অপারেশন ১০২৭ শুরু করে। এই অভিযানের সাফল্য জান্তার দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে এএকে সক্ষম করে। এর মধ্যে ছিল আন শহর, যেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের সদর দপ্তর অবস্থিত। এএ এখন আনুমানিক ১০ হাজার যোদ্ধার বাহিনী পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, জান্তার উপস্থিতি গুটিকয়েক সুরক্ষিত শহরে সীমিত হয়ে পড়েছে।

নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করার পাশাপাশি রাখাইনের বড় অংশে কার্যত সরকার হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে এএ। তারা বিচার পরিচালনা করছে, মৌলিক সেবা দিচ্ছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা করছে। তবে এই নতুন কর্তৃত্বের সঙ্গে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ—সম্পদের সীমাবদ্ধতা, চলমান সংঘাত এবং বৈচিত্র্যময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈধতা অর্জনের প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

মানবিক সংকট: অবরোধ, অনাহার ও রোহিঙ্গা সংকট

এএর অগ্রযাত্রায় তীব্র মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর অবরোধে রাখাইনের ২০ লাখের বেশি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে পড়েছেন। খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী, আর সিত্তের মতো অবরুদ্ধ শহরে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। এখন রাজধানীতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ সমুদ্র ও আকাশপথ; অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার খবরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে সহায়তা না পৌঁছালে আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা জানিয়েছে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো।

রাখাইনের জটিল জাতিগত বাস্তবতা সংকটকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের নিপীড়নের শিকার মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়েছেন। ২০১৭ সালে সামরিক দমন-পীড়নের ফলে ৭ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এখন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সেখানে জনাকীর্ণ শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছেন। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এএ ও সামরিক বাহিনীর লড়াইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষেরা নতুন করে সহিংসতা, জোরপূর্বক নিয়োগ ও বাস্তুচ্যুতির মুখে পড়ছেন।

নির্যাতন ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে এএ ও সামরিক বাহিনী—উভয়ের বিরুদ্ধেই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, হত্যাকাণ্ড ও জোরপূর্বক নিয়োগের খবর দিয়েছে। এএকে মোকাবিলায় সামরিক বাহিনী কিছু রোহিঙ্গাকে অস্ত্র দিয়েছে, আর বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এএ, তবে পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, "মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ক্রমবৃদ্ধি ২০১৭ সালের আগস্টের নৃশংসতার ভীতিকর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়... আরাকান আর্মি অগ্রসর হয়ে আরও এলাকা দখল করার পাশাপাশি নৃশংসতার অভিযোগেরও মুখে পড়ছে।"

বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থীশিবিরের আবাসস্থল কক্সবাজারে ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে দেশটি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে সরকার এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরিতে রাখাইনে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে রাখাইনে চলমান অস্থিতিশীলতা ও বিভক্ত শাসনব্যবস্থার কারণে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।

বিজ্ঞাপন

ভূরাজনৈতিক স্বার্থ: চীন, ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থান

রাখাইনের লড়াই কেবল স্থানীয় বিষয় নয়; এটি চীন, ভারত ও বাংলাদেশকে জড়িয়ে একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ অঞ্চলে প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।

চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) রাখাইনের মধ্য দিয়ে গেছে। কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন চীনকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এএ কিয়াউকফিউ ঘিরে ফেলায় দ্বিধায় পড়েছে বেইজিং: নিজেদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে, তবে সম্পদ সুরক্ষিত থাকলে এএর নিয়ন্ত্রণ মেনেও নিতে পারে। কিয়াউকফিউতে হাজার হাজার চীনা কর্মী ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন, ফলে এএর সরাসরি হামলা ঝুঁকিপূর্ণ। এর বদলে অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে এএ। চীনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করে জান্তাকে আলোচনার মাধ্যমে সরে যেতে বাধ্য করাই তাদের লক্ষ্য।

ভারতের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা

রাখাইনে ভারতের স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প, যা সিত্তে বন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তার জন্য প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে চলমান সংঘাত এর সমাপ্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জান্তা ও এএ—উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখেছে ভারত। দেশটি জোর দিয়ে বলেছে, তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনুদানভিত্তিক এবং মিয়ানমারের জনগণের কল্যাণে পরিচালিত। নিরাপত্তার কারণে সিত্তে থেকে নিজেদের কর্মীদের ইয়াঙ্গুনে সরিয়ে নিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। সহিংসতা বন্ধ এবং মিয়ানমারের নেতৃত্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, "মিয়ানমারের জনগণের কল্যাণে পরিচালিত বেশ কয়েকটি অনুদানভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পে ভারত সমর্থন অব্যাহত রেখেছে... সহিংসতা বন্ধ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃত ফেডারেল গণতন্ত্রের মাধ্যমে জাতিগত সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে ভারত; এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান ধারাবাহিক।"

জান্তাকে চীনের আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক ভারত। বিশেষ করে এএর নিয়ন্ত্রণ উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি বিস্তৃত হওয়ায় পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে দেশটি।

কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ

রাখাইনের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের, ফলে সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশটির ওপর। মংডু ও অন্যান্য সীমান্তবর্তী শহর দখলের মাধ্যমে পুরো সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে এএ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতার সঙ্গে এএর সঙ্গে সংলাপে বসেছে ঢাকা। রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতা এবং শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে এএর কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্পর্শকাতর স্বার্থ এবং পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বিবেচনায় এমন পদক্ষেপ নিতে হলে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সামরিক কৌশল: এএ কেন অগ্রযাত্রা থামিয়েছে

দ্রুত অগ্রগতি সত্ত্বেও জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অবশিষ্ট শহর সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউংয়ে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেনি এএ। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে:

  • বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষা: কিয়াউকফিউতে চীনের বড় প্রকল্প রয়েছে, অন্যদিকে ভারতের স্বার্থের জন্য সিত্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি হামলায় অবকাঠামোর ক্ষতি হতে পারে এবং বিদেশি নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে; এতে বেইজিং ও নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
  • স্থানীয় বৈধতা অর্জন: আরও অগ্রসর হওয়ার আগে শাসনব্যবস্থা সুসংহত করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘু ও রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনে মনোযোগ দিচ্ছে এএ।
  • সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত বিস্তার: দীর্ঘস্থায়ী অভিযান এএর সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সামরিক বাহিনীর পাল্টা হামলার মুখে ফেলতে পারে। সামরিক বাহিনী এখনো আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

এর বদলে শহরগুলো ঘিরে অবরোধ আরোপ করেছে এএ, যাতে জান্তাকে আলোচনার মাধ্যমে সরে যেতে চাপ দেওয়া যায়। প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো থেকে সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং জান্তার পাল্টা অভিযান প্রতিরোধেও কাজ করছে গোষ্ঠীটি।

এএর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শাসন ও চ্যালেঞ্জ

রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসার পর দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্ট (এপিআরজি) প্রতিষ্ঠা করেছে এএ। এর আওতায় মৌলিক সেবা দেওয়া, শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও বিচার পরিচালনার কাজ রয়েছে। কিছু বাসিন্দা নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা বেড়েছে বলে জানালেও, অন্যরা মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং বিতর্কিতভাবে সম্পত্তি জাতীয়করণের জন্য এএর সমালোচনা করছেন। বিদ্রোহী বাহিনী থেকে বিশ্বাসযোগ্য কর্তৃপক্ষে রূপান্তরের পথে কার্যকরভাবে শাসন পরিচালনার সক্ষমতা এএর জন্য বড় পরীক্ষা হবে।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

এএর উত্থানে মিয়ানমারের রাজনৈতিক চিত্র বদলে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এএর মতো অরাষ্ট্রীয় পক্ষ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে কার্যত স্বীকৃতি পাচ্ছে। এই বিভক্তি কেন্দ্রীভূত ইউনিয়ন কাঠামো থেকে সরে এসে একাধিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে পারে, যেখানে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা ও বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।

চীন ও ভারতের জন্য রাখাইনের স্থিতিশীলতা তাদের কৌশলগত প্রকল্প ও আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দুই দেশই সতর্কভাবে এএর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অন্যদিকে, মানবিক দায়বদ্ধতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রেখে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান খুঁজতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক দ্বিধার মুখে। জবাবদিহি ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বান জোরালো হলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা খুব সামান্যই অগ্রগতি এনেছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো কথিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং বিমান হামলায় সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত বিমান জ্বালানি আমদানি স্থগিত করার পক্ষে কথা বলেছে। তবু সহায়তা ও চাপের মাত্রা সংঘাতের গতিপথ বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ক্ষমতার পালাবদলে রোহিঙ্গাদের জন্য আশার আলো খুব কম। অনেকেই এখনো রাষ্ট্রহীন, সহায়-সম্বলহীন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন। চলমান সহিংসতা ও ঐক্যবদ্ধ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অবনতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী আশ্রিত রয়েছেন; আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জর্জটাউন জার্নাল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষক বলেছেন, "রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চীন ও ভারত মানবিক উদ্বেগের চেয়ে নিজেদের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি ক্রমেই ফাঁপা মনে হচ্ছে।"

সংক্ষেপে

  • আরাকান আর্মি এখন রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং গৃহযুদ্ধের চিত্র বদলে দিচ্ছে।
  • এএর উত্থানে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে; লাখো মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে।
  • রাখাইনের স্থিতিশীলতায় চীন, ভারত ও বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ রয়েছে। এএ ক্ষমতা সুসংহত করার সময় প্রত্যেকেই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ অনুসরণ করছে।
  • বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে, বৈধতা অর্জন করতে এবং সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর দিকে অগ্রযাত্রা থামিয়েছে এএ।
  • এএর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শাসনব্যবস্থা বিকশিত হচ্ছে, তবে নির্যাতনের অভিযোগ এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনের প্রয়োজনসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
  • রোহিঙ্গারা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো সংকট সমাধানে হিমশিম খাওয়ায় নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
  • মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ একাধিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সমন্বয়ে গড়া কাঠামোতে নির্ধারিত হতে পারে। রাখাইনে এএর সাফল্য দেশটির বাকি অংশের জন্য দৃষ্টান্ত—এবং সতর্কবার্তা—হয়ে উঠতে পারে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে