চীনের মানবসদৃশ গর্ভধারণকারী রোবট: প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নাকি নৈতিক জটিলতার ক্ষেত্র?
বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হওয়া এবং তীব্র বিতর্কের জন্ম দেওয়া এক উদ্যোগে, চীনের একটি প্রযুক্তি কোম্পানি বিশ্বের প্রথম এমন মানবসদৃশ রোবট তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে, যাতে থাকবে কৃত্রিম জরায়ু এবং যা নিষেক থেকে জন্ম পর্যন্ত গর্ভধারণ সম্পন্ন করতে পারবে। গুয়াংজুভিত্তিক কাইওয়া টেকনোলজির নেতৃত্বে প্রকল্পটির লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করা। এর আনুমানিক দাম প্রায় ১৪ হাজার ডলার, যা অনেক দেশে প্রচলিত সারোগেসির খরচের চেয়ে অনেক কম। সফল হলে, এই উদ্ভাবন মানব প্রজনন, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা, এমনকি মাতৃত্ব-পিতৃত্বের সংজ্ঞাও আমূল বদলে দিতে পারে।
সূচিপত্র
- চীনের মানবসদৃশ গর্ভধারণকারী রোবট: প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নাকি নৈতিক জটিলতার ক্ষেত্র?
- মানবসদৃশ গর্ভধারণকারী রোবট কী?
- প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করবে?
- চীন কেন কৃত্রিম জরায়ু তৈরি করছে?
- বৈজ্ঞানিক বাধা: পূর্ণ কৃত্রিম গর্ভধারণ কতটা কাছাকাছি?
- আংশিক বহিঃগর্ভধারণ বনাম পূর্ণ কৃত্রিম জরায়ু
- নৈতিক ও আইনি দ্বিধা: মা-বাবা কে?
- জনমত: আশা, সংশয় ও ভয়
- বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: কৃত্রিম জরায়ু ও প্রজননের ভবিষ্যৎ
- সম্ভাব্য সুফল
- ঝুঁকি ও উদ্বেগ
- এরপর কী?
- সংক্ষেপে
তবে বিজ্ঞান বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক, আইনি ও সামাজিক প্রশ্নগুলোও দ্রুত বাড়ছে। এটি কি প্রজনন প্রযুক্তির নতুন যুগের সূচনা, নাকি আমরা এমন এক অজানা, সম্ভাব্য বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছি?
মানবসদৃশ গর্ভধারণকারী রোবট কী?
২০২৫ সালের বেইজিং ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্সে উন্মোচিত ধারণাটি যেমন দুঃসাহসী, তেমনি বিতর্কিত। কাইওয়া টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা ড. ঝাং ছিফেং এমন একটি পূর্ণাঙ্গ মানবসদৃশ রোবটের কথা বলেছেন, যার পেটে থাকবে কৃত্রিম জরায়ু। এই কৃত্রিম জরায়ু মানুষের গর্ভধারণের স্বাভাবিক পরিবেশের অনুকরণে তৈরি; এতে কৃত্রিম অ্যামনিওটিক তরল ও পুষ্টি সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করে পূর্ণ ১০ মাসের গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের বিকাশে সহায়তা করা হবে। শেষ পর্যন্ত রোবটটি একটি শিশুর জন্ম দেবে, যা নিজে সন্তান ধারণে অক্ষম বা অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য জৈবিক গর্ভধারণের বিকল্প হতে পারে।
ড. ঝাংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম জরায়ুর মূল প্রযুক্তি ইতোমধ্যে পরীক্ষাগারে, প্রধানত প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো, এই ব্যবস্থাকে এমন মানবসদৃশ রোবটে যুক্ত করা, যা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং গর্ভধারণের জটিল প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে পারে।
প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করবে?
কৃত্রিম জরায়ুটি মানুষের জরায়ুর মূল কাজগুলো অনুকরণ করার জন্য তৈরি:
- কৃত্রিম অ্যামনিওটিক তরল: ভ্রূণ তরলভরা একটি প্রকোষ্ঠে বিকশিত হবে, যা প্রাকৃতিক জরায়ুর সুরক্ষামূলক পরিবেশের কাছাকাছি।
- পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ: নলের একটি ব্যবস্থা পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করবে, যা স্বাভাবিক গর্ভাবস্থায় নাভিরজ্জুর ভূমিকার অনুরূপ।
- তাপমাত্রা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ: ভ্রূণের বিকাশ অনুকূল করতে রোবটটি তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিবেশের অন্যান্য উপাদান নিয়ন্ত্রণ করবে।
বৈশিষ্ট্যগুলো ভবিষ্যৎমুখী মনে হলেও, এগুলো নবজাতকের ইনকিউবেটর ও আংশিক কৃত্রিম জরায়ু নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নজির হলো ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেন’স হসপিটালে ২০১৭ সালের “বায়োব্যাগ” পরীক্ষা, যেখানে অপরিণত মেষশাবকদের কয়েক সপ্তাহ কৃত্রিম জরায়ুতে সফলভাবে লালন করা হয়েছিল। তবে ওই প্রযুক্তি নিষেক থেকে জন্ম পর্যন্ত নয়, গর্ভধারণের কেবল একটি পর্যায় পর্যন্ত ভ্রূণকে সহায়তা করতে পেরেছিল।
ড. ঝাংয়ের দাবি, কাইওয়ার ব্যবস্থা নিষেক ও ভ্রূণ স্থাপন থেকে পূর্ণ মেয়াদে প্রসব পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে প্রথম হবে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, প্রাণীর ওপর পরীক্ষা এবং আংশিক গর্ভধারণ থেকে সম্পূর্ণ মানব গর্ভধারণে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই বিশাল এক অগ্রগতি।
চীন কেন কৃত্রিম জরায়ু তৈরি করছে?
কৃত্রিম জরায়ু প্রযুক্তির প্রতি চীনের আগ্রহের পেছনে রয়েছে জনমিতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত নানা কারণের সম্মিলন। দেশটি দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জন্মহার হ্রাসের মুখোমুখি। ২০০৭ সালে বন্ধ্যত্বের হার ছিল ১২ শতাংশ, যা ২০২০ সালে বেড়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে অনেক নারী সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছেন বা এড়িয়ে যাচ্ছেন; অন্যদিকে, চীনা আইনে সারোগেসি অবৈধ।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. ঝাং খোলাখুলি কথা বলেছেন। নিউজউইক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:
কেউ কেউ বিয়ে করতে চান না, কিন্তু স্ত্রী চান; কেউ কেউ গর্ভবতী হতে চান না, কিন্তু সন্তান চান। তাই আমাদের রোবট-স্ত্রীর একটি কাজ হলো গর্ভধারণ করা।
সারোগেসি ও প্রথাগত গর্ভধারণের প্রযুক্তিগত বিকল্প দেওয়ার মাধ্যমে কাইওয়া টেকনোলজি সম্ভাব্য মা-বাবার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং চীনের বৃহত্তর জনমিতিক চ্যালেঞ্জ—দুটিই মোকাবিলা করতে চায়।
এই উদ্যোগ চীনের উদ্ভাবনের বৃহত্তর ধারার অংশ, যেখানে জটিল সামাজিক সমস্যা সমাধানে রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানো হচ্ছে। একই ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্সে গবেষকেরা ফসলের জাত উন্নয়নের গতি বাড়ানো ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত রোবট জিইএআইআর-ও পরিচয় করিয়ে দেন। এতে একাধিক ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞান ও রোবোটিকসের সমন্বয়ে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়।
বৈজ্ঞানিক বাধা: পূর্ণ কৃত্রিম গর্ভধারণ কতটা কাছাকাছি?
দৃঢ় দাবি সত্ত্বেও, অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গর্ভধারণকারী রোবট তৈরি সম্ভব কি না, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে গভীর সংশয় রয়েছে। কৃত্রিম জরায়ু অপরিণত প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে আশার আলো দেখালেও, মানুষের গর্ভধারণের পুরো প্রক্রিয়ার অনুকরণ করা অনেক বেশি জটিল চ্যালেঞ্জ।
আংশিক বহিঃগর্ভধারণ বনাম পূর্ণ কৃত্রিম জরায়ু
বর্তমান কৃত্রিম জরায়ুগুলো উন্নত ইনকিউবেটরের মতো কাজ করে; গর্ভধারণের আংশিক পর্যায়ের পরই কেবল জীবনধারণে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালের বায়োব্যাগ পরীক্ষায় মানুষের গর্ভাবস্থার ২৩–২৪ সপ্তাহের সমতুল্য পর্যায়ে থাকা মেষশাবকগুলোকে কয়েক সপ্তাহ বাঁচিয়ে রাখা ও বিকশিত হতে সহায়তা করা হয়েছিল। তবে এসব ব্যবস্থা নিষেক, ভ্রূণ স্থাপন বা ভ্রূণের বিকাশের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় সামলায় না।
পূর্ণ বহিঃগর্ভধারণ—অর্থাৎ সম্পূর্ণ শরীরের বাইরে নিষেক থেকে জন্ম পর্যন্ত মানবশিশুর বিকাশ—এখনো তাত্ত্বিক ধারণা। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ভ্রূণ স্থাপন: নিষিক্ত ভ্রূণকে কৃত্রিম জরায়ুর আস্তরণে সফলভাবে স্থাপন করা। স্বাভাবিক গর্ভধারণেও এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনো ভালোভাবে জানা যায়নি।
- গর্ভফুলের কার্যকারিতা: পুষ্টি বিনিময়, হরমোন উৎপাদন ও রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে গর্ভফুলের জটিল ভূমিকার অনুকরণ করা।
- হরমোন ও রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার পারস্পরিক ক্রিয়া: মানবমায়ের দেওয়া জটিল হরমোন সংকেত ও রোগপ্রতিরোধী সুরক্ষার অনুকরণ করা।
- দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা: কৃত্রিম জরায়ুতে জন্ম নেওয়া শিশুরা দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করা।
উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও জনমিতিবিদ ড. ই ফুশিয়ান নিউজউইক-কে বলেন:
গর্ভধারণ অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া; এর প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ। রোবটটি সম্ভবত কেবল লোকদেখানো উদ্যোগ, আর শেষ পর্যন্ত সন্তান জন্ম দিতে পারলেও এর সঙ্গে বহু স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।
অন্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সবচেয়ে উন্নত প্রাণী-গবেষণাতেও নিষেক থেকে পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত গর্ভধারণ সম্ভব হয়নি। মানুষের গর্ভধারণে এমন কিছু স্বতন্ত্র জৈবিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যা যন্ত্রের মাধ্যমে সহজে অনুকরণ করা যায় না।
নৈতিক ও আইনি দ্বিধা: মা-বাবা কে?
মানবসদৃশ রোবটের গর্ভে মানবশিশু বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা গভীর নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:
- মাতৃত্ব-পিতৃত্ব ও আইনি মর্যাদা: কোনো শিশু যদি রোবটে বেড়ে ওঠে, তাহলে আইনি মা-বাবা হিসেবে কাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে? জিনগত উপাদানদাতাদের? রোবটের মালিককে? নাকি রোবটটি নির্মাণকারী কোম্পানিকে?
- শিশুর অধিকার: যন্ত্রে জন্ম নেওয়া শিশুর কী অধিকার থাকবে, এবং বিদ্যমান আইনে তার মর্যাদা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
- আবেগগত ও সামাজিক বন্ধন: রোবট কি মা ও ভ্রূণের আবেগগত বন্ধনের অনুকরণ করতে পারে? এভাবে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য এর মানসিক প্রভাব কী হতে পারে?
- প্রজননের বাণিজ্যিকীকরণ: এই প্রযুক্তির কারণে কি সন্তান জন্মদান লেনদেননির্ভর বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, কিংবা সমালোচকদের ভাষায় “সস্তা শিশুর উৎপাদন লাইন” তৈরি হতে পারে?
- অপব্যবহারের আশঙ্কা: কৃত্রিম জরায়ু কি মানব পাচার, জিনগত বাছাই বা অন্য অনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হতে পারে?
ড. ঝাং এসব উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, নৈতিক ও আইনি নির্দেশিকা তৈরিতে কাইওয়া টেকনোলজি গুয়াংডং প্রদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। নীতিগত প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে, তবে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো নেই। চীনে বর্তমান আইন অনুযায়ী, কৃত্রিম জরায়ুতে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভ্রূণ বিকশিত করা নিষিদ্ধ; প্রযুক্তিটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে সতর্কতার প্রতিফলন এই আইন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিতর্ক তীব্র। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলে রোবটের মাধ্যমে সারোগেসি অবৈধ, আর ভ্রূণ গবেষণা ও জিনগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোর আইন রয়েছে। কৃত্রিম জরায়ুর দিকে এগোতে হলে জনসাধারণ, চিকিৎসা ও আইনি মহলে ব্যাপক বিতর্ক প্রয়োজন হবে।
জনমত: আশা, সংশয় ও ভয়
গর্ভধারণকারী রোবটের ঘোষণা চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা জায়গায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ওয়েইবোর মতো প্ল্যাটফর্মে খবরটি দ্রুত আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। বন্ধ্যত্বে ভোগা দম্পতিদের জন্য নতুন বিকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে সমাজের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর অস্বস্তি—মতামত ছিল নানা রকম।
সমর্থকেরা এই প্রযুক্তিকে সন্তান ধারণে বা গর্ভধারণে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য যুগান্তকারী বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, এটি নারীদের সন্তান জন্মদানের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বোঝা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাঁরা যুক্তি দেন, কৃত্রিম জরায়ু মাতৃত্ব-পিতৃত্বের সুযোগ সবার কাছে আরও সহজলভ্য করতে এবং প্রজনন অধিকার এগিয়ে নিতে পারে।
তবে সমালোচকেরা মাতৃত্বের বন্ধন দুর্বল হওয়া থেকে শুরু করে মানবজীবনের বাণিজ্যিকীকরণ পর্যন্ত নানা বিপদের কথা বলেন। কিছু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতে, মা ও ভ্রূণের আবেগগত ও হরমোনগত পারস্পরিক ক্রিয়া সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য, আর যন্ত্র দিয়ে এর অনুকরণ করা সম্ভব নয়। অন্যদের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি ইউজেনিকসের কাজে অপব্যবহার হতে পারে বা নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
ক্রেনশেয়ার্সের বিপণন বিভাগের প্রধান জোসেফ ডুব নিউইয়র্কে মানবসদৃশ রোবটের একটি প্রদর্শনী নিয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করে বলেন:
আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের চোখে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি বা প্রথম গাড়ির আবির্ভাব দেখছি। মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। কেউ কেউ আতঙ্কিতও হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল ভীষণ মিশ্র।
বিজ্ঞানীদের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে, প্রকল্পটি সত্যিকারের অগ্রগতি, নাকি প্রচারের কৌশল। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, নিষেক ও জন্ম বাস্তবে কীভাবে ঘটবে সে বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং মানবদেহে পরীক্ষার কোনো প্রকাশিত তথ্যও নেই।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: কৃত্রিম জরায়ু ও প্রজননের ভবিষ্যৎ
কৃত্রিম জরায়ু প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা একমাত্র দেশ চীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরায়েলের গবেষক দলগুলোও উন্নত ইনকিউবেটর এবং আংশিক বহিঃগর্ভধারণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। এগুলোর মূল লক্ষ্য অত্যন্ত অপরিণত শিশুদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করা। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সটেন্ড ব্যবস্থা মেষশাবক ও শূকরের ভ্রূণের বিকাশে সহায়তার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। অতি অপরিণত শিশুদের নিয়ে মানবদেহে পরীক্ষা শিগগিরই শুরু হতে পারে।
তবে এখনো কোনো দলই প্রাণীর ক্ষেত্রে নিষেক থেকে জন্ম পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদের গর্ভধারণ সম্ভব করতে পারেনি, মানুষের ক্ষেত্রে তো নয়ই। বর্তমান গবেষণার বেশির ভাগই এমন ভ্রূণকে সহায়তা করার দিকে কেন্দ্রীভূত, যারা বেঁচে থাকার সক্ষমতার প্রান্তে রয়েছে—সাধারণত মানুষের গর্ভাবস্থার ২২–২৪ সপ্তাহের সমতুল্য পর্যায়ে। নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যার বর্তমান ব্যবস্থায় এ পর্যায়ে বেঁচে থাকার হার সবচেয়ে কম।
কৃত্রিম জরায়ু প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারের মূল্য ইতোমধ্যে ১৫০ থেকে ২২০ কোটি ডলার। নবজাতকের চিকিৎসা ও প্রজনন চিকিৎসায় উদ্ভাবন এগোলে এই বাজার আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পূর্ণ কৃত্রিম গর্ভধারণ সম্ভব হলে সমাজ, চিকিৎসা ও আইনের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
সম্ভাব্য সুফল
- বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা: বন্ধ্যত্বে ভোগা বা যেসব শারীরিক অবস্থায় গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ, এমন দম্পতিদের জন্য কৃত্রিম জরায়ু নতুন আশার আলো হতে পারে।
- মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানো: প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মতো জটিলতাসহ গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের শারীরিক ঝুঁকি এড়াতে পারবেন নারীরা।
- বৈজ্ঞানিক গবেষণা: নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম গর্ভধারণের মাধ্যমে গর্ভাবস্থার জটিলতা, জিনগত রোগ এবং মা ও ভ্রূণের পারস্পরিক ক্রিয়া বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করা সম্ভব হতে পারে।
- জনমিতিক সমাধান: জন্মহার কমে যাওয়া দেশগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।
ঝুঁকি ও উদ্বেগ
- নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়: এই প্রযুক্তি প্রথাগত পারিবারিক কাঠামো, লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং মাতৃত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
- আইনি অনিশ্চয়তা: মাতৃত্ব-পিতৃত্ব, উত্তরাধিকার এবং যন্ত্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন সামলানোর জন্য বিদ্যমান আইন যথেষ্ট নাও হতে পারে।
- স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা: কৃত্রিম জরায়ুতে জন্ম নেওয়া শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অজানা; কোনো ত্রুটি ঘটলে তার পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে।
- বৈষম্যের আশঙ্কা: খরচ বা নিয়ন্ত্রণের কারণে এই প্রযুক্তি সবার নাগালের বাইরে থেকে যেতে পারে, যা সামাজিক বিভাজন আরও বাড়াবে।
এরপর কী?
আপাতত কাইওয়া টেকনোলজির গর্ভধারণকারী রোবট একটি উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা মাত্র। কোম্পানিটি এক বছরের মধ্যে প্রোটোটাইপ উন্মোচনের আশা করছে। তবে প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক, নিয়ন্ত্রক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে হবে। কৃত্রিম জরায়ু প্রাণীর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলেও, মানুষের ওপর পরীক্ষা শুরু করতে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নৈতিক তদারকি এবং সম্ভবত আরও বহু বছরের গবেষণা প্রয়োজন হবে।
এদিকে, জীবপ্রযুক্তি ও রোবোটিকসের অগ্রগতিতে কল্পবিজ্ঞান ও বাস্তবতার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হওয়ায় কৃত্রিম জরায়ু নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ড. ঝাং ও তাঁর দল এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে—প্রযুক্তিটি কাজ করে কি না, তা দেখার পাশাপাশি মানবজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এটি যে গভীর প্রশ্নগুলো তুলেছে, সেগুলোর মুখোমুখি হতেও।
সংক্ষেপে
- চীনের কাইওয়া টেকনোলজি এমন একটি মানবসদৃশ রোবট তৈরি করছে, যাতে কৃত্রিম জরায়ু থাকবে এবং যা নিষেক থেকে জন্ম পর্যন্ত গর্ভধারণ সম্পন্ন করতে পারবে।
- প্রকল্পটির লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে প্রোটোটাইপ তৈরি করা এবং এর দাম প্রায় ১৪ হাজার ডলার রাখা; এটি বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ও সারোগেসিতে বিপ্লব আনতে পারে।
- বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ এখনো বিপুল, কারণ প্রাণী বা মানুষের ক্ষেত্রে পূর্ণ কৃত্রিম গর্ভধারণ এখনো সম্ভব হয়নি।
- মাতৃত্ব-পিতৃত্বের সংজ্ঞা, শিশুর অধিকার ও অপব্যবহারের আশঙ্কাসহ নানা নৈতিক, আইনি ও সামাজিক প্রশ্ন রয়েছে।
- জনমত গভীরভাবে বিভক্ত: প্রজননের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আশার পাশাপাশি অমানবিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের ভয়ও রয়েছে।
- জনমিতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জীবপ্রযুক্তির সমন্বয়ের বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন এই প্রযুক্তি।
- গর্ভধারণকারী রোবট বাস্তবে রূপ নিক বা বিতর্কিত কল্পনা হয়েই থাকুক, কৃত্রিম প্রজননের সম্ভাবনা ও বিপদ নিয়ে সমাজকে ভাবতে বাধ্য করছে এটি।






