ভিয়েতনামের ২০২৬ সালের কর সংস্কার: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ওলটপালট এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ভবিষ্যৎ

পড়তে 10 মিনিট
ভিয়েতনামের ২০২৬ সালের কর সংস্কার: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ওলটপালট এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ভবিষ্যৎ

ভিয়েতনামের কর বিপ্লব: ব্যবসা ও অর্থনীতির নতুন যুগ

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক কর সংস্কারের দ্বারপ্রান্তে ভিয়েতনাম। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটি ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য দীর্ঘদিনের এককালীন কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করবে। ফলে নিবন্ধিত সব প্রতিষ্ঠানকেই—তা যত ছোটই হোক—আনুষ্ঠানিক রিটার্নভিত্তিক কর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই বড় পরিবর্তন বৃহত্তর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ, যার লক্ষ্য ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে আধুনিক করা, সরকারি রাজস্ব বাড়ানো এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে এশিয়ার পরবর্তী “টাইগার অর্থনীতি” হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা পূরণে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।

সূচিপত্র
  1. ভিয়েতনামের কর বিপ্লব: ব্যবসা ও অর্থনীতির নতুন যুগ
  2. ভিয়েতনাম কেন করব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করছে?
  3. এককালীন কর থেকে রিটার্নভিত্তিক ব্যবস্থা: কী বদলাচ্ছে?
  4. ২০২৬ সালের কর সংস্কারের প্রধান দিকগুলো
  5. মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট): স্বস্তি ও জটিলতা
  6. করপোরেট আয়কর: প্রণোদনায় কঠোরতা ও বৈশ্বিক মান
  7. বিশেষ ভোগকর: স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কর-অনুবর্তিতা
  8. প্রশাসনিক সরলীকরণ ও ডিজিটাল রূপান্তর
  9. ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর প্রভাব: সুযোগ, নাকি অতিরিক্ত বোঝা?
  10. প্রশাসনিক সংস্কার: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে, নাকি বাড়বে?
  11. বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
  12. আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ
  13. সংক্ষেপে

তবে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকের জন্য এই সংস্কার অনিশ্চয়তা, নতুন ব্যয় এবং আরও জটিল করব্যবস্থা সামলানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। সরকারের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী: এমন একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা করবে এবং ভিয়েতনামের অবকাঠামো ও সামাজিক খাতের চাহিদায় অর্থ জোগাবে। কিন্তু সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—ভিয়েতনাম কি তার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে ক্ষুদ্রতম উদ্যোক্তাদের বাস্তবতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে?

ভিয়েতনাম কেন করব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করছে?

১৯৮০-এর দশক থেকে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক রূপান্তর অসাধারণ। একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি থাকলেও দেশটি এখন উৎপাদনশিল্পের শক্তিকেন্দ্র এবং লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে এনেছে। কিন্তু রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় এবং বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, জলবায়ু ঝুঁকি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিকূলতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায়, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দেশটির নেতারা বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর ভরসা করছেন।

এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে রেজল্যুশন ৬৮, যা ২০২৫ সালের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি পাস করে। এতে বেসরকারি ব্যবসাকে অর্থনীতির “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি” ঘোষণা করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বিদেশি করপোরেশনের তুলনায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান শক্তিশালী করা। এতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, পুঁজিতে আরও ভালো প্রবেশাধিকার এবং সম্পত্তির অধিকার ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য আইনি সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজন খাতে অর্থায়নের জন্য কর-রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিয়েতনামের কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে। ২০২৩ সালে এটি ছিল মাত্র ১৬.৮%—এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৯.৫% গড়ের চেয়ে অনেক কম এবং ওইসিডির ৩৩% থেকে বেশ দূরে। সরকারি ঋণের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আর ব্যয় দ্রুত বাড়তে চলেছে—শুধু অবকাঠামো খাতেই ২০২৫ সালে ব্যয় প্রায় ৪০% বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াচ্ছে। তাই সরকারি কোষাগারে অর্থ জোগাড়ের নতুন পথ খুঁজতে হচ্ছে সরকারকে। রাজস্ব বাড়ানো এবং কুখ্যাতভাবে অস্বচ্ছ কর দপ্তরগুলোতে দুর্নীতি কমানো—দুই লক্ষ্যেই করব্যবস্থার সংস্কারকে অপরিহার্য মনে করা হচ্ছে।

এককালীন কর থেকে রিটার্নভিত্তিক ব্যবস্থা: কী বদলাচ্ছে?

কয়েক দশক ধরে ভিয়েতনামের ২০ লাখ পারিবারিক ব্যবসার অধিকাংশই সরলীকৃত এককালীন পদ্ধতিতে কর দিত। অনুমিত আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হতো, যা প্রায়ই স্থানীয় কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হতো। পদ্ধতিটি ব্যবহার করা সহজ হলেও এতে আয় কম দেখানো, পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতির সুযোগ ছিল। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে মাত্র প্রায় ৬ হাজার ব্যবসা আরও কঠোর রিটার্নভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এককালীন কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে। আকার যা-ই হোক, সব নিবন্ধিত ব্যবসাকে রিটার্নভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এতে বিস্তারিত হিসাবরক্ষণ, আনুষ্ঠানিক খাতাপত্র সংরক্ষণ এবং নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সরকারের যুক্তি, এতে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে, প্রত্যেকে ন্যায্য অংশের কর দেবে এবং আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটবে।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকদের জন্য এই রূপান্তর কঠিন। অনেককে বেশি কর দিতে হবে, নগদ রেজিস্টার ও হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার কিনতে হবে এবং নতুন নিয়ম মানার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনেক খাত এখনো কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা সামলে উঠছে। একই সঙ্গে ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তাও মোকাবিলা করছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের কর সংস্কারের প্রধান দিকগুলো

২০২৬ সালের কর সংস্কার শুধু এককালীন কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), করপোরেট আয়কর, বিশেষ ভোগকর এবং ব্যক্তিগত আয়কর—এসব ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ন্যায্যতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভিয়েতনামের করব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাই এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট): স্বস্তি ও জটিলতা

ভিয়েতনামের জাতীয় পরিষদ অধিকাংশ পণ্য ও সেবার ওপর ২% ভ্যাট হ্রাসের মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে আদর্শ হার ১০% থেকে কমে ৮% হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রথম চালু হওয়া এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ব্যবসায় সহায়তা, ভোগ বাড়ানো এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। ভ্যাট কমানোর ফলে সরকারি রাজস্ব ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, এতে উৎপাদন স্থিতিশীল হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

একই সঙ্গে, ভ্যাট ক্রেডিট দাবি করতে হলে সব কেনাকাটার মূল্য নগদবিহীন উপায়ে পরিশোধের নতুন নিয়ম করা হয়েছে। ভুয়া চালান ঠেকানো এবং করব্যবস্থার সততা জোরদার করাই এর উদ্দেশ্য। পারিবারিক ব্যবসার ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ব্যক্তিগত আয়করের দায়বদ্ধতার সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে ২০২৬ সাল থেকে বছরে ২০০ মিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং (প্রায় ৮ হাজার ডলার)-এর বেশি আয় করলেই কেবল কর দিতে হবে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে এখন বিক্রেতাদের অর্থ পরিশোধের আগে কর কেটে রাখতে হবে, যাতে অনলাইন ও অফলাইন ব্যবসার সঙ্গে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত হয়।

করপোরেট আয়কর: প্রণোদনায় কঠোরতা ও বৈশ্বিক মান

সংশোধিত করপোরেট আয়কর (সিআইটি) আইন ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এতে সিআইটির আদর্শ হার ২০% রাখা হয়েছে, তবে কর প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্যতার শর্ত কঠোর করা হয়েছে। যেসব কোম্পানি ইতিমধ্যে প্রণোদনা পায়, তাদের সহযোগী ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সুবিধার যোগ্য হবে না। এর ফলে করপোরেট গোষ্ঠীর মধ্যে করছাড়ের সুবিধা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাবে। করভিত্তি ক্ষয় ও মুনাফা স্থানান্তর (বিইপিএস) বিষয়ে ওইসিডির বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি কর ফাঁকি রোধের ব্যবস্থাও জোরদার করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলোকে এখন নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের স্থানীয় কার্যক্রম নতুন অর্থনৈতিক সারবস্তুর শর্ত পূরণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্থানান্তর মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা যথাযথ। এসব পরিবর্তনের ফলে ভিয়েতনামের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোকে তাদের করপোরেট কাঠামো ও কর পরিকল্পনার কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ ভোগকর: স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কর-অনুবর্তিতা

ভিয়েতনামের হালনাগাদ বিশেষ ভোগকর (এসসিটি) আইনও ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে। এতে বিশেষ ভোগকর প্রযোজ্য পণ্য ও সেবার তালিকা বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগারেট, অ্যালকোহল, বিয়ার, নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং চিনিযুক্ত পানীয়। স্বাস্থ্যকর ভোগাভ্যাস গড়ে তোলা, পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা এবং কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই এ আইনের লক্ষ্য। তামাক ও অ্যালকোহলের মতো পণ্যে করের হার বাড়ানোর সময়সূচি রয়েছে। তবে রপ্তানি উৎপাদন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহৃত পণ্যে ছাড় থাকবে।

এসসিটি সংস্কারের লক্ষ্য হলো নিয়মগুলো আরও স্পষ্ট ও স্বচ্ছ করা। এতে বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস এবং কর বাড়ানোর আগাম ঘোষণা থাকবে, যাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা করতে পারে। তবে অ্যালকোহল ও কোমল পানীয়ের মতো বেশি করের আওতায় পড়া শিল্পগুলোকে মানিয়ে নিতে হবে। এর জন্য পণ্যের উপাদান নতুন করে সাজানো বা স্বাস্থ্যকর বিকল্পের দিকে ঝোঁকার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রশাসনিক সরলীকরণ ও ডিজিটাল রূপান্তর

কর পরিপালনে ব্যয় ও সময় কমানো সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ২০২৬ সালের মধ্যে ২০২৪ সালের তুলনায় কর পরিপালনের সময় ও ব্যয় ৫০% কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যোগ্য সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন সরকারি সেবা হিসেবে দেওয়া হবে। কর প্রশাসন ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৬০%-এর বেশি প্রক্রিয়া অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৯০% আবেদন ইলেকট্রনিকভাবে জমা পড়েছে।

ব্যক্তিগত কর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসছে। কর শনাক্তকরণ নম্বরের বদলে ১২ অঙ্কের ব্যক্তিগত পরিচয় নম্বর ব্যবহার করা হবে। ঝুঁকি ও জালিয়াতি আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে করের নথি জনসংখ্যা, সামাজিক বিমা, ভূমি ব্যবহার ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। প্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং অপ্রয়োজনীয় বোঝা কমাতে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর প্রভাব: সুযোগ, নাকি অতিরিক্ত বোঝা?

সংস্কারের লক্ষ্য ন্যায্য ও দক্ষ করব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর এর প্রভাব গভীর এবং বিতর্কিত। অনেকের কাছে এককালীন কর ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার অর্থ বেশি কর, নতুন প্রশাসনিক ব্যয় এবং জটিল হিসাবরক্ষণের নিয়ম রপ্ত করার প্রয়োজন। বিপর্যস্ত দোকানমালিকদের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু বাজারের ৮০% পর্যন্ত দোকান বন্ধ হয়েছে, যদিও কর্মকর্তারা এর জন্য শুধু কর পরিবর্তনকে দায়ী করার বিরোধিতা করেছেন।

ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকদের এখন:

  • নগদ রেজিস্টার ও হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার কিনতে হবে
  • নিজেদের ও কর্মীদের খাতাপত্র সংরক্ষণ এবং কর পরিপালনের প্রশিক্ষণ দিতে হবে
  • নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং বিক্রির বিস্তারিত হিসাব রাখতে হবে
  • চালান দেওয়া ও ভ্যাট পরিশোধের নতুন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে

মহামারি থেকে এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাপে থাকা কিছু খাতের আশঙ্কা, নতুন শর্তগুলো তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদের ভয়, বাড়তি নজরদারি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে তাদের আরও ঘন ঘন নিরীক্ষা ও জরিমানার মুখে পড়তে হবে, বিশেষ করে এমন একটি ব্যবস্থায় যেখানে দুর্নীতি ও অবৈধ সুবিধা আদায় দীর্ঘদিনের সমস্যা।

তবে সরকারের যুক্তি, ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এবং আধুনিক বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তা করতে সংস্কারগুলো জরুরি। কর দেওয়ার আয়ের সীমা বাড়িয়ে এবং ভ্যাট অব্যাহতি সম্প্রসারণ করে কর্তৃপক্ষ ক্ষুদ্রতম ব্যবসার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বড় ও বেশি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে করের আওতা বাড়াতে চায়।

বিজ্ঞাপন

প্রশাসনিক সংস্কার: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে, নাকি বাড়বে?

ভিয়েতনামের নেতারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং কর পরিপালন সহজ করার অঙ্গীকার করেছেন। কর-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং একবারে ঘোষণাপত্র জমা দেওয়ার দিকে এগোনো—সবকিছুর লক্ষ্য প্রক্রিয়া সহজ করা। ২০২৬ সালের মধ্যে যোগ্য সব প্রক্রিয়া অনলাইনে চালুর পাশাপাশি কর পরিপালনে সময় ও ব্যয় ৫০% কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

তবে রূপান্তরের সময়টা কঠিন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসার দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মতো সম্পদ বা দক্ষতা নেই। সরকার প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু লাখ লাখ প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করা এই পরিবর্তনের বিপুল ব্যাপ্তির কারণে স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি ও হতাশা অনিবার্য।

বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

কর সংস্কার ভিয়েতনামের বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি অংশ মাত্র। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের পথ অনুসরণ করে ২০৪৫ সালের মধ্যে এশিয়ার টাইগার অর্থনীতিগুলোর সারিতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে দেশটির। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু করব্যবস্থার আধুনিকায়ন নয়, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ভিয়েতনাম দ্রুতগতির রেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করছে। দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অবসরের বয়স বাড়ানোর কাজও করছে। জলবায়ু পরিবর্তন বড় হুমকি। টাইফুন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের পথে ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের বার্ষিক জিডিপির ১৪.৫% পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।

ভিয়েতনামের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে এখন বেসরকারি উদ্যোগ। ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০টি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি চুক্তিতে অগ্রাধিকার এবং বিদেশে সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া হবে। শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং আমলাতন্ত্র কমাতে মন্ত্রণালয় একীভূত করা ও প্রদেশগুলোর পুনর্বিন্যাসের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চলছে।

আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ

বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও ভিয়েতনামের কর সংস্কারের লক্ষ্য। বৈশ্বিক ন্যূনতম কর চালু, স্থানান্তর মূল্য নির্ধারণের কঠোর নিয়ম এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা এবং করভিত্তি ক্ষয় ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আসিয়ানের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে ভিয়েতনাম। গবেষণা ও উন্নয়নে প্রণোদনা দিচ্ছে এবং সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ জ্বালানির মতো উচ্চপ্রযুক্তির খাতকে সহায়তা করছে।

এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ব্যবসায়ী মহল নিয়মকানুন নমনীয়ভাবে প্রয়োগ, জরিমানার ক্ষেত্রে আলোচনাভিত্তিক পদ্ধতি এবং করদাতাদের ওপর চাপ আরও কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে। সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সঙ্গে আস্থা গড়ে তোলার সরকারের সক্ষমতার ওপর।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • ভিয়েতনামের ২০২৬ সালের কর সংস্কারে এককালীন কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে। সব ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক রিটার্নভিত্তিক কর দাখিল করতে হবে।
  • বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনীতি আধুনিক করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ এই সংস্কার।
  • প্রধান পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ভ্যাট ২% কমানো, করপোরেট কর প্রণোদনায় কঠোরতা, বিশেষ ভোগকরের আওতা বাড়ানো এবং কর প্রশাসন ডিজিটাল করা।
  • ক্ষুদ্র ব্যবসাকে বেশি কর পরিপালন ব্যয় ও নতুন প্রশাসনিক বোঝা সামলাতে হবে। এতে ব্যবসা বন্ধ হওয়া ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
  • ২০২৬ সালের মধ্যে কর পরিপালনে সময় ও ব্যয় ৫০% কমানো এবং কর-সংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া অনলাইনে চালুর লক্ষ্য সরকারের।
  • ভিয়েতনামের বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা ২০৪৫ সালের মধ্যে এশিয়ার পরবর্তী টাইগার অর্থনীতি হয়ে ওঠা। এ জন্য ধারাবাহিক সংস্কার, বিনিয়োগ এবং জলবায়ু সহনশীলতা প্রয়োজন।
  • সাফল্য নির্ভর করবে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং সরকারি রাজস্বের চাহিদার সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসার বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষার ওপর।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে