যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের কঠিন পরীক্ষা: শুল্ক, লেনদেননির্ভর কূটনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ

পড়তে 10 মিনিট
যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের কঠিন পরীক্ষা: শুল্ক, লেনদেননির্ভর কূটনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ

সন্ধিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার জোট দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু ২০২৫ সালে এই অংশীদারত্ব নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফা শুল্ক, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে লেনদেননির্ভর কূটনীতির দিকে ঝোঁক এবং আঞ্চলিক চাপ বাড়তে থাকায় সিউলকে তার কৌশলগত অবস্থান ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। দুই দেশ দ্রুত বদলে যাওয়া বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তাদের জোটের সংজ্ঞা ও স্থায়িত্বও পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

সূচিপত্র
  1. সন্ধিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট
  2. এখানে এল কীভাবে? শুল্ক-উত্তেজনার পটভূমি
  3. চুক্তির খুঁটিনাটি: দক্ষিণ কোরিয়া কী ছাড় দিয়েছে?
  4. লেনদেননির্ভর কূটনীতি: নতুন স্বাভাবিকতা?
  5. অর্থনৈতিক অভিঘাত: লাভ, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা
  6. নিরাপত্তার দোটানা: উত্তর কোরিয়া, চীন ও জোটের ওপর চাপ
  7. অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা
  8. আঞ্চলিক প্রভাব: বদলে যাওয়া জোট ও কৌশলগত হিসাব
  9. সামনে কী: টিকবে কি জোট?
  10. সংক্ষেপে

এখানে এল কীভাবে? শুল্ক-উত্তেজনার পটভূমি

কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট শীতল যুদ্ধের সময়কার সামরিক চুক্তি থেকে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় দুই দেশের সহযোগিতা গভীর হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার ছাতা দিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে। তবে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে ঘিরে জোটটি বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েও গেছে।

সর্বশেষ সংকটের শুরু ২০২৫ সালের গোড়ায়। সে সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েক ডজন দেশ থেকে আমদানির ওপর ব্যাপক নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। প্রাথমিক হুমকি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সব রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসবে; ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে হার হবে আরও বেশি। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাত পুনরুজ্জীবিত করা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সাম্প্রতিক করছাড়ের অর্থ জোগাড় করা হবে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বিষয়টি ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। দেশটির অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর, আর মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

আলোচনা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও দীর্ঘায়িত। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মন্থর অর্থনীতির ধাক্কা সামলাতে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত, ১ আগস্টের সময়সীমার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সিউল ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতায় পৌঁছায়: যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যা হুমকি দেওয়া ২৫ শতাংশের চেয়ে কম। এর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ করবে এবং পরবর্তী সাড়ে তিন বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনবে। চাল ও গরুর মাংসের মতো সংবেদনশীল খাত নতুন ছাড়ের আওতার বাইরে রাখা হয়, যা সিউলের আলোচকদের জন্য ছিল একটি বড় সাফল্য।

বিজ্ঞাপন

চুক্তির খুঁটিনাটি: দক্ষিণ কোরিয়া কী ছাড় দিয়েছে?

একাধিক সূত্রের খবরে উঠে আসা চূড়ান্ত চুক্তির পরিধি ব্যাপক:

  • ১৫ শতাংশ শুল্কহার: গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টরসহ দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে হার আদায় করেছে, এটি তার সমান। তবে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক হবে ৫০ শতাংশ।
  • ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ: যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এর মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও বায়োফার্মাসিউটিক্যালসের মতো কৌশলগত শিল্পে এবং ১৫০ বিলিয়ন ডলার জাহাজ নির্মাণ উদ্যোগে ব্যয় হবে। উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে "মেক আমেরিকা শিপবিল্ডিং গ্রেট এগেইন"। এর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সক্ষমতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ খাত, উভয়কেই শক্তিশালী করা।
  • ১০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ক্রয়: পরবর্তী চার বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে সিউল।
  • সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা: গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে দক্ষিণ কোরিয়াকে সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ভবিষ্যৎ শুল্ক বিবেচনায় কিছুটা পূর্বানুমেয়তা তৈরি হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং এই সমঝোতাকে "বড় অগ্রগতি" বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এতে কোরীয় রপ্তানিকারকদের জন্য পূর্বানুমেয়তা ফিরেছে এবং দুই দেশের শিল্প-উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তির ফলে ২০১২ সালের কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অধীনে চালু হওয়া প্রায় শূন্য শুল্কের ব্যবস্থাও স্থগিত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন।

লেনদেননির্ভর কূটনীতি: নতুন স্বাভাবিকতা?

এই ঘটনা আলাদা হয়ে উঠেছে শুধু শুল্কের ব্যাপ্তি বা বিনিয়োগ প্যাকেজের আকারের কারণে নয়; কূটনীতির অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গিও এর বড় কারণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে একের পর এক লেনদেনের রূপ দিয়েছে। এতে অর্থনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো একসূত্রে গাঁথা, আর প্রতিটি ছাড়ের হিসাব রাখা হয় দায়বদ্ধতার খাতায়। মিত্রদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয়, বাণিজ্যিক ছাড় কিংবা কৌশলগত সমন্বয়—যে ক্ষেত্রেই হোক, "ন্যায্য অংশ" দেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়।

এই পরিবর্তন সিউলের অনেককে উদ্বিগ্ন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন, উপদ্বীপে মার্কিন সেনা মোতায়েনের মতো নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে আরও অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ের চাপ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার আরও বেশি অর্থ দেওয়া উচিত। সিউল রাজি না হলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথাও তিনি তুলেছেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আস্থা ক্ষয় করে এবং দীর্ঘদিনের জোটকে সুবিধাভিত্তিক সম্পর্কে পরিণত করে।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক পলিসির গবেষক কিয়ুম হ্যে-ইউন বলেন, "ট্রাম্পের শুল্কনীতি একতরফা প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার উভয় দেশের ব্যবসায়ের ওপর বোঝা হয়ে উঠতে পারে।"

দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমতও নেতিবাচক হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দক্ষিণ কোরীয়দের ইতিবাচক মনোভাব ২০২৪ সালের ৭৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৬১ শতাংশে নেমেছে। কথিত এক মিত্রের কাছ থেকে অন্যায্য আচরণ বলে অনেকে যা মনে করেন, তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভই এই পতনে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক অভিঘাত: লাভ, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা

নতুন শুল্ক ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই অনুভূত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদকদের—বিশেষ করে গাড়ি, ইস্পাত, সেমিকন্ডাক্টর ও ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর—কাজে বিঘ্ন ঘটেছে বলে জানা গেছে। আগের বছরের তুলনায় জুলাইয়ের প্রথম ২০ দিনে রপ্তানি ২.২ শতাংশ কমেছে। কিছু উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়ে বিরোধও দেখা দিয়েছে। উৎপাদন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা বাজার বৈচিত্র্য আনার মতো সামর্থ্য যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের নেই, তারা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা, শুল্কের খরচ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর চাপানো হতে পারে, ফলে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়বে। ঘোষণার পর S&P 500 সূচক পড়ে যায় এবং ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে যায়, যা বাজারের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। সমালোচকদের আরও যুক্তি, করছাড়ের খরচ মেটাতে শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যবহার করলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বাড়তে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য চুক্তিটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর মূল্য অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ জাপানের ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম, তবে তারপরও এটি দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন বেরিয়ে যাওয়ার সমান। বিনিয়োগের এই পরিমাণ দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান রিজার্ভের তুলনায় বেশি কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনায় মোট অঙ্কটি কম গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে।

নিরাপত্তার দোটানা: উত্তর কোরিয়া, চীন ও জোটের ওপর চাপ

সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে বাণিজ্য ও অর্থনীতি প্রাধান্য পেলেও যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের নিরাপত্তার দিকটি এখনো আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার সেনার অংশগ্রহণে বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দেশ। উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন ঠেকানোই এই মহড়ার লক্ষ্য। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া মহড়াকে আক্রমণের মহড়া বলে নিন্দা করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও পারমাণবিক হুমকিসহ নিজেদের সামরিক প্রদর্শন বাড়িয়েছে।

একই সময়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের বোঝা ভাগাভাগি ও কৌশলগত নমনীয়তার ওপর জোর দেওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতের মতো বৃহত্তর আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনীকে অন্যত্র পুনরায় মোতায়েন করা হতে পারে। এতে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার আরও বেশি দায়িত্ব সিউলের কাঁধে পড়বে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর জনসংযোগ পরিচালক কর্নেল রায়ান ডোনাল্ড বলেন, "জোটের মনোযোগ এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকে, যা টেকসই এবং উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঠেকাতে পারে, পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে পারে।"

দক্ষিণ কোরিয়াকে তার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। জাপানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে এবং বেইজিংকে মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করতে সিউলের ওপর চাপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করার প্রতিটি পদক্ষেপ বেইজিংয়ের নজরে পড়ছে। ফলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা এবং অর্থনৈতিক অবলম্বনের মাঝখানে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

বিজ্ঞাপন

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা

শুল্ক-সংকটের সময়টি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারত না। পূর্বসূরির অভিশংসনের পর বৈধতা-সংকটের মধ্যে ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব নেন প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, তরুণদের বেকারত্ব মোকাবিলা এবং করপোরেট সুশাসন সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার চাপ রয়েছে তাঁর সরকারের ওপর। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে লির সক্ষমতা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরের নানা শক্তির কারণে সীমিত—বিশ্ববাণিজ্য যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং ওয়াশিংটনের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত।

স্যামসাং, হুন্দাই ও এলজির মতো দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাবশালী ছেবোল (পরিবার পরিচালিত বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী) একদিকে সম্পদ, অন্যদিকে বাধা। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পে বিনিয়োগ এবং সরকারি আলোচনায় সহায়তা করার সক্ষমতা তাদের আছে। তবে তাদের আধিপত্য উদ্ভাবনকে দমিয়ে রাখে এবং বৃহত্তর অর্থনীতির নমনীয়তা সীমিত করে। লি বাধ্যতামূলক সুশাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু ছেবোলগুলোর নিয়ন্ত্রণ কমানোর অতীত প্রচেষ্টা তীব্র বাধার মুখে পড়েছে।

এদিকে সিউলের রাজনৈতিক সংকট আলোচনায় সরকারের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ব্যস্ত বা কোণঠাসা থাকায় আমলা ও ব্যবসায়ী নেতাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়েছে, যার ফল মিশ্র। শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠের অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কিংবা একই ধরনের চাপের মুখে থাকা অন্য মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য আরও কঠিন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক প্রভাব: বদলে যাওয়া জোট ও কৌশলগত হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া শুল্ক চুক্তিটি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে না। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর নয়, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরও কয়েক ডজন দেশের ওপরও পড়েছে; হার ১০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। এর জেরে পাল্টা পদক্ষেপ, বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় বেড়েছে।

অর্থনৈতিক চাপের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন নিয়ে চীনের এবং রপ্তানি বিধিনিষেধ নিয়ে জাপানের চাপের মুখে পড়েছে সিউল। প্রতিবারই দক্ষিণ কোরিয়া রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য এনেছে, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোকে সহায়তা দিয়েছে। বর্তমান সংকট রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে পারে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারে এবং আরও স্বায়ত্তশাসিত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তানীতি গ্রহণে উৎসাহ জোগাতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার বিকল্প সীমিত। জাপানের তুলনায় দেশটির অর্থনীতি বেশি বাণিজ্যনির্ভর, আর নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জোটের সঙ্গে সম্পর্কিত। সিউলের কেউ কেউ চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের পক্ষে কথা বললেও ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করা কিংবা বেইজিংকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট লি এবং তাঁর উত্তরসূরিদের চ্যালেঞ্জ হবে, দেশের মৌলিক স্বার্থ বিসর্জন না দিয়ে এই পরস্পরবিরোধী চাপ সামলানো।

সামনে কী: টিকবে কি জোট?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এক শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট লি। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হবে শুল্ক চুক্তি বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি সামলানো এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগাভাগি ও উত্তর কোরিয়া নীতির মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান। তবে আরও বড় প্রশ্ন হলো, লেনদেননির্ভর কূটনীতি, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন যুগের সঙ্গে জোটটি খাপ খাওয়াতে পারবে কি না।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, শুধু ঐতিহাসিক বয়ান বা আদর্শিক সাদৃশ্যের ওপর নির্ভরশীল জোট এখন আর যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার এই সময়ে ওয়াশিংটন ও সিউলকে বাস্তববাদী, স্বার্থনির্ভর নীতি নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মিত্রদের ক্ষতিতে স্বল্পমেয়াদি লাভকে অগ্রাধিকার দিলে শেষ পর্যন্ত নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এগোনোর পথের জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা, অভিযোজনক্ষমতা এবং জটিল ও অনিশ্চিত বিশ্বে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • নতুন শুল্ক এবং লেনদেননির্ভর কূটনীতির কারণে আস্থা ও সহযোগিতা চাপে পড়েছে; কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট।
  • ১৫ শতাংশ শুল্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের পাশাপাশি ১০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কেনার সম্মতিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক থেকে অল্পের জন্য রেহাই পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
  • চুক্তিটি অতীতের প্রায় শূন্য শুল্কের ব্যবস্থা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয় এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও শর্তসাপেক্ষ জোটের বিস্তৃত প্রবণতাকে তুলে ধরে।
  • দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি বাইরের ধাক্কার ঝুঁকিতে রয়েছে; নতুন শুল্ক ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
  • নিরাপত্তা উদ্বেগ এখনো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে; চলমান সামরিক মহড়ার পাশাপাশি উপদ্বীপে মার্কিন সেনা উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
  • অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কার্যকর জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সিউলের সক্ষমতা সীমিত করছে।
  • উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও চীনের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা—আঞ্চলিক এসব গতিপ্রকৃতি দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশলগত হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।
  • জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বাস্তববাদী যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে