দক্ষিণ কোরিয়ার শান্তি উদ্যোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান উত্তর কোরিয়ার
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। এতে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থাগুলোর একটিতে উত্তেজনা কমার আশা ভেস্তে গেছে। ২৮ জুলাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া এখনো “শত্রু” এবং সিউল যত প্রস্তাবই দিক না কেন, পিয়ংইয়ংয়ের “আলোচনায় কোনো আগ্রহ নেই”। জুনে সিউলে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ক্ষমতা গ্রহণ করা দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রশাসনের প্রতি উত্তর কোরিয়ার এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ কোরিয়ার শান্তি উদ্যোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান উত্তর কোরিয়ার
- কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতি: সংলাপের কোনো সুযোগ নেই
- পটভূমি: উত্তেজনা ও হাতছাড়া হওয়া সুযোগের ইতিহাস
- প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
- সিউলের একতরফা পদক্ষেপের সমালোচনা
- উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত হিসাব: রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পারমাণবিক ইস্যু
- যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ও কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা
- দক্ষিণ কোরিয়ার জোট ও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
- জনমত ও সামনের পথ
- বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: কূটনীতির সীমাবদ্ধতা
- সারসংক্ষেপ
অভিশংসিত পূর্বসূরি ইউন সুক ইয়লের কঠোর নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিতে প্রেসিডেন্ট লির সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তারা অসামরিকীকৃত অঞ্চল (ডিএমজেড) বরাবর উত্তর কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকারে সম্প্রচার বন্ধ করে, প্রচারপত্র বিলি থামায় এবং উত্তর কোরিয়ায় ব্যক্তিগত পর্যটন সফর ফের চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করে। তবে কিম ইয়ো জং এসব পদক্ষেপকে “প্রশংসার যোগ্য কাজ নয়” বলে উড়িয়ে দেন। উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য, দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মৌলিক চরিত্রে এমন পরিবর্তন এসেছে, যা আর ফেরানো সম্ভব নয়।
কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতি: সংলাপের কোনো সুযোগ নেই
কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিতে (কেসিএনএ) প্রকাশিত কিম ইয়ো জংয়ের বক্তব্য ছিল দ্ব্যর্থহীন:
সিউল যে নীতিই গ্রহণ করুক বা যে প্রস্তাবই দিক না কেন, এতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আরওসি [কোরিয়া প্রজাতন্ত্র]-এর সঙ্গে বৈঠকে বসার কোনো কারণ নেই, আলোচনারও কিছু নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের বিষয়ে লি প্রশাসনের “অন্ধ আস্থা” রয়েছে। তার দাবি, এই জোট “কোরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণাংশকে কলুষিত করেছে” এবং সম্পর্কের উন্নতির কোনো সুযোগ রাখেনি। উত্তর কোরিয়াবিরোধী সম্প্রচার বন্ধসহ অন্যান্য সমঝোতামূলক পদক্ষেপকে কিম “শুরুতেই যা করা উচিত হয়নি, তা ফিরিয়ে নেওয়ার প্রত্যাবর্তনযোগ্য পদক্ষেপ” বলেও উড়িয়ে দেন।
এমন সময়ে এসব মন্তব্য এল, যখন উত্তর কোরিয়া দক্ষিণের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের কয়েক দশকের নীতি পরিত্যাগ করে এখন দক্ষিণ কোরিয়াকে স্থায়ী প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটি। ২০২৪ সালে পিয়ংইয়ং দুই দেশকে যুক্ত করতে পারত এমন সড়ক ও সেতু উড়িয়ে দেয়, যা আন্তঃকোরীয় যোগাযোগ ভেঙে পড়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।
পটভূমি: উত্তেজনা ও হাতছাড়া হওয়া সুযোগের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সোভিয়েত ও মার্কিন দখলদারির অঞ্চল গঠনের পর কোরীয় উপদ্বীপ বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০–১৯৫৩) শান্তিচুক্তির বদলে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়। ফলে দুই কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো যুদ্ধে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে তাদের সম্পর্ক কখনো সতর্ক সম্পৃক্ততার পর্যায়ে গেছে, কখনো বিপজ্জনক সংঘাতে জড়িয়েছে।
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার “সানশাইন নীতি” সংলাপ, পরিবারগুলোর পুনর্মিলন এবং কেসং শিল্পাঞ্চলের মতো যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্পে উৎসাহ জোগায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সামরিক উসকানি এবং সিউলে আরও রক্ষণশীল সরকারের উত্থানের মধ্যে এসব উদ্যোগ ভেঙে পড়ে। ২০১৯ সালে কিম জং উন ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের পারমাণবিক কূটনীতি ভেঙে পড়া ছিল আরেকটি সন্ধিক্ষণ। এরপর পিয়ংইয়ং অস্ত্র উন্নয়নে আরও জোর দেয় এবং দক্ষিণের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক উত্তেজনা তীব্রভাবে বেড়েছে। উভয় পক্ষই প্রচার অভিযান আবার শুরু করেছে এবং উত্তর কোরিয়া উপদ্বীপে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই রাষ্ট্রের ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে। ২০২০ সালে কেসংয়ে আন্তঃকোরীয় যোগাযোগ কার্যালয় ধ্বংস এবং ২০২৪ সালে পুনরেকত্রীকরণকে নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে পরিত্যাগ করায় বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
২০২৫ সালের জুনে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের নির্বাচিত হওয়াকে অনেকেই আন্তঃকোরীয় সম্পর্ক নতুন করে গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। সম্পৃক্ততার অঙ্গীকার নিয়ে প্রচার চালান লি। তিনি যোগাযোগের চ্যানেল পুনরুদ্ধার, উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের ও বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোর বিষয়ে নীতি সংশোধন এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার প্রশাসন দ্রুত সীমান্তে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে এবং উত্তর কোরিয়ায় ব্যক্তিগত পর্যটন সফরের অনুমতি দেওয়ার ধারণা সামনে আনে। এর লক্ষ্য ছিল আস্থা তৈরি ও সংলাপ ফের শুরু করা।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, সরকার “উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে সংবেদনশীল না হয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্তঃকোরীয় পুনর্মিলন ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং কোরীয় উপদ্বীপে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাস্তবায়নে চেষ্টা চালিয়ে যাবে।” মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কু বিয়ং-সাম বলেন, কিম ইয়ো জংয়ের মন্তব্য আগের কিছু বক্তব্যের মতো শত্রুতাপূর্ণ না হলেও, দুই কোরিয়ার মধ্যে “অবিশ্বাসের দেয়াল যে কতটা উঁচু”, তা তুলে ধরে।
সিউলের একতরফা পদক্ষেপের সমালোচনা
এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার প্রশ্ন তুলেছেন, সিউলের দৃষ্টিভঙ্গি অতিরিক্ত একতরফা কি না। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর কোরিয়াকে লক্ষ্য করে কয়েক দশক ধরে চলা রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করাকে বাইরের তথ্যের বিরুদ্ধে পিয়ংইয়ংয়ের লড়াইয়ে বড় জয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, উত্তরের পাল্টা পদক্ষেপ ছাড়াই এমন একতরফা ছাড় দেওয়া কৌশলগত সরলতার ঝুঁকি তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় দক্ষিণ কোরিয়ার দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।
“কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি গড়ে উঠতে হবে পারস্পরিক আস্থা ও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ভিত্তিতে, একতরফা উদ্যোগের ওপর নয়। সদিচ্ছা কৌশলগত সরলতায় পরিণত হওয়ার আগেই এই দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে,” ইউপিআইয়ের এক কলাম লেখক লিখেছেন।
অন্যরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষ সম্পৃক্ততার পক্ষে থাকলেও, বিনিময়ে যথেষ্ট কিছু না পেয়ে সরকার অতিরিক্ত ছাড় দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত হিসাব: রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পারমাণবিক ইস্যু
সিউলের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি বুঝতে হলে আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে পড়ার পর পিয়ংইয়ং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধ সমর্থনে সেনা ও অস্ত্র পাঠিয়েছে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে বলে খবর রয়েছে। উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া এই ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্বে সিউল বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রণোদনা পিয়ংইয়ংয়ের কমেছে।
একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক জোটকে উত্তর কোরিয়া সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে চলেছে। বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়াকে পিয়ংইয়ং আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করে এবং এগুলো এখনো বিরোধের বড় কারণ। কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিতে আসন্ন মহড়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট লির অধীনে মৌলিকভাবে কিছুই বদলায়নি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া বা মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের মতো আরও অনুকূল পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকাই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান কৌশল। এর আগে আলোচনার টেবিলে ফিরতে চায় না দেশটি। এদিকে পিয়ংইয়ং অস্ত্র কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে, জাতীয় গৌরব বাড়াতে এবং সিউল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ও কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করা প্রথম ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন, যা অগ্রগতির আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের গতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা নিয়ে মতবিরোধে তাদের কূটনীতি ভেঙে পড়ে। এরপর ট্রাম্প আবার সংলাপ শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করলেও উত্তর কোরিয়া নতুন করে আলোচনা শুরুর আহ্বান উপেক্ষা করেছে।
কিছু বিশ্লেষকের বিশ্বাস, পিয়ংইয়ং শেষ পর্যন্ত আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ চাইতে পারে, তবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে। আপাতত উত্তর কোরিয়ার মনোযোগ পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা সুসংহত করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার দিকে বলেই মনে হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জোট ও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্রতর প্রতিযোগিতা এবং উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিকে ক্রমেই বেশি প্রভাবিত করছে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার প্রচলিত কৌশল ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে ওয়াশিংটন চাপ দিচ্ছে, আর চীনের অর্থনৈতিক চাপের জবাবে সিউল তার বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা আবার সক্রিয় হয়েছে। এটি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। একই সময়ে, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে ন্যাটোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গভীর করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের প্রয়োজন থেকে চালিত সিউলের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার বৃহত্তর প্রবণতাই এসব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে এসব জোট উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টাকে জটিলও করে তুলছে। পিয়ংইয়ং এসব অংশীদারত্বকে শত্রুতার প্রমাণ এবং নিজস্ব সামরিক শক্তি বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে দেখে। প্রেসিডেন্ট লির প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ হলো, পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রেখেও শক্তিশালী জোটগুলো বজায় রাখা।
জনমত ও সামনের পথ
দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমত এখনো বিভক্ত। সম্পৃক্ততা ও পুনর্মিলনের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও, উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া ছাড় দেওয়ার বিষয়ে অনেক নাগরিক সতর্ক। আরওকেএস চেওনান ডুবিয়ে দেওয়া, ইয়োনপিয়ংয়ে গোলাবর্ষণ এবং কেসংয়ের যোগাযোগ কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো অতীতের উসকানির স্মৃতি দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়েছে।
দেশের ভেতরের প্রত্যাশা, জোট ব্যবস্থাপনা এবং উত্তর কোরিয়ার অনিশ্চিত আচরণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন কাজটি প্রেসিডেন্ট লির প্রশাসনের সামনে। নতুন করে সংলাপের সুযোগ তৈরির আশায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার মাত্রা বা ধরন বদলাতে সরকার প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপ পিয়ংইয়ংকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: কূটনীতির সীমাবদ্ধতা
ইহা উইমেন্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন:
অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়াকে শ্রেষ্ঠ অবস্থানে দেখিয়ে জাতীয় গৌরব বাড়ানোর চেষ্টা কিম ইয়ো জংয়ের মন্তব্যে রয়েছে। আসন্ন সামরিক মহড়ার সমালোচনা করে পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো এবং সিউল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিভেদ তৈরিও তার লক্ষ্য।
অন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা এবং রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিকল্প সহায়তা পাওয়া—এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সামান্য সুবিধাও না দেখলে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান অবস্থান বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপ
- দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক শান্তি উদ্যোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। সিউলকে “শত্রু” আখ্যা দিয়ে সংলাপের সব প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছে তারা।
- প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের প্রশাসন প্রচার সম্প্রচার বন্ধ করা এবং উত্তরে ব্যক্তিগত পর্যটন সফরের বিষয়টি বিবেচনার মতো পদক্ষেপ নিয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছে। তবে পিয়ংইয়ং এসব উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
- কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিউলের জোটের প্রতি উত্তর কোরিয়ার অব্যাহত অবিশ্বাস এবং দক্ষিণকে স্থায়ী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
- রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার বাড়তে থাকা সম্পর্ক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের তীব্রতর প্রতিযোগিতাসহ আঞ্চলিক পরিস্থিতি নতুন করে কূটনীতি শুরুর সম্ভাবনাকে জটিল করেছে।
- উত্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দরজা খোলা রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে শক্তিশালী জোট বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে দক্ষিণ কোরিয়া।
- দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমত বিভক্ত। একতরফা ছাড় এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সংশয় রয়েছে।
- আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বড় পরিবর্তন না এলে বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা বজায় থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।






