চীনা গ্রাফাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ৯৩.৫% শুল্ক: বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে এক সন্ধিক্ষণ
চীনের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য বিরোধে নাটকীয় পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনা গ্রাফাইটের ওপর ৯৩.৫% শুল্ক আরোপ করেছে। বৈদ্যুতিক যান (ইভি) তৈরির ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এই গ্রাফাইট। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ ঘোষিত এ পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ইভির সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে, গাড়ির দামকে প্রভাবিত করতে পারে এবং দেশে ব্যাটারির উপকরণশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বৈদ্যুতিক যান কতটা সাশ্রয়ী থাকবে এবং সেগুলোর ব্যবহার কতটা বাড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূচিপত্র
- চীনা গ্রাফাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ৯৩.৫% শুল্ক: বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে এক সন্ধিক্ষণ
- যুক্তরাষ্ট্র এত উচ্চ শুল্ক আরোপ করল কেন?
- শুল্ক কীভাবে কার্যকর হবে
- যুক্তরাষ্ট্রের ইভি শিল্পে এর প্রভাব কী?
- বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থায় অভিঘাত
- শুল্ক কি ইভির ব্যবহার বাড়ার গতি কমাবে?
- শিল্প ও পরিবেশগত প্রভাব
- চীনের প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক দাবার ছক
- গাড়ি নির্মাতা, ব্যাটারি উৎপাদক ও ভোক্তাদের পরবর্তী করণীয় কী?
- সংক্ষেপে
ইভি বিপ্লবের নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গ্রাফাইট। প্রতিটি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অ্যানোডে গ্রাফাইট লাগে। অ্যানোড হলো ব্যাটারির সেই অংশ, যা শক্তি সঞ্চয় ও সরবরাহ করে। বর্তমানে বিশ্বে গ্রাফাইটের বাজারে চীনের আধিপত্য রয়েছে। পরিশোধিত গ্রাফাইটের বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ৭৫% এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে দেশটি থেকে। নতুন শুল্কের সঙ্গে আগের শুল্ক যোগ হলে কিছু চীনা গ্রাফাইট পণ্যের ওপর মোট শুল্কের হার ১৬০% পর্যন্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এত উচ্চ শুল্ক আরোপ করল কেন?
বাণিজ্য বিভাগের এই সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগ তদন্ত করা হয় যে চীনা কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্রাফাইট “ডাম্পিং” করছে—অর্থাৎ সরকারি ভর্তুকির সহায়তায় প্রায়ই ন্যায্য বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের যুক্তি, এ চর্চায় মার্কিন উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ হুমকির মুখে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গ্রাফাইট সরবরাহকারীদের জোট আমেরিকান অ্যাকটিভ অ্যানোড ম্যাটেরিয়াল প্রডিউসারস শুল্ক আরোপের আবেদন করে। তাদের দাবি, চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ও আগ্রাসী রপ্তানির কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলোর পক্ষে প্রতিযোগিতা করা বা উৎপাদন বাড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য বিভাগ তাদের সঙ্গে একমত হয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে জানায়, চীনা গ্রাফাইট আমদানি সত্যিই ডাম্পিংয়ের শিকার এবং অন্যায্য ভর্তুকি পেয়েছে।
সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাণিজ্য সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “প্রতিযোগীদের দুর্বল করা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে চীন যে ক্ষতিকর বাণিজ্যচর্চা ব্যবহার করে, ডাম্পিং তারই একটি।”
শুল্ক কীভাবে কার্যকর হবে
কার্বনের বিশুদ্ধতা অন্তত ৯০%—এমন অ্যানোড-গ্রেড গ্রাফাইটের ওপর ৯৩.৫% অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রযোজ্য হবে। গ্রাফাইট কৃত্রিম, প্রাকৃতিক বা মিশ্র—যে ধরনেরই হোক, এ শুল্ক কার্যকর। চীন সরকারের ভর্তুকি নিয়ে সমান্তরাল তদন্তে অধিকাংশ উৎপাদকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৬.৫৫% পাল্টা শুল্কের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে হার আরও বেশি। এর সম্মিলিত ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় কিছু চীনা গ্রাফাইটের ওপর প্রায় ১৬০% শুল্ক পড়তে পারে।
আদেশটি প্রাথমিক হলেও আমদানিকারকদের এখনই শুল্ক দিতে হবে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাশিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যদি আগের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়, তাহলে কোম্পানিগুলো অর্থ ফেরত পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইভি শিল্পে এর প্রভাব কী?
যুক্তরাষ্ট্রের ইভি খাতে বড় নীতিগত পরিবর্তনের সময় এ শুল্ক আরোপ করা হলো। ট্রাম্প প্রশাসন ইভি কারখানা ও ব্যাটারি প্ল্যান্টের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ বাতিল বা ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইভি ক্রেতাদের জন্য ৭,৫০০ ডলারের কর রেয়াত বন্ধ করে একটি বিলে স্বাক্ষর করেছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন গ্রাফাইট শুল্ক যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বৈদ্যুতিক যান তৈরি ও কেনার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
প্যানাসনিকের হিসাবে, ব্যাটারির মোট খরচের ৮%-এরও কম গ্রাফাইটের পেছনে যায়, তাই ব্যাটারির সবচেয়ে ব্যয়বহুল উপাদান এটি নয়। তবে ইভিতে ব্যাটারিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল একক যন্ত্রাংশ, আর গ্রাফাইটের দাম বাড়লে তার প্রভাব অন্য খরচেও পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, গ্রাফাইটের দাম দ্বিগুণ হলে একটি ব্যাটারি প্যাকের দাম ১,০০০ ডলার বা তারও বেশি বাড়তে পারে, ফলে ভোক্তাদের জন্য ইভির বিক্রয়মূল্যও বাড়তে পারে।
গাড়ি নির্মাতা ও ব্যাটারি উৎপাদকেরা ইতিমধ্যেই চাপ অনুভব করছেন। টেসলা, ফোর্ড, প্যানাসনিক ও এলজি এনার্জি সলিউশন—সবাই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাটারি কারখানার জন্য চীনা গ্রাফাইটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শুল্ক তদন্ত চলাকালে টেসলা ও অন্যান্য কোম্পানি যুক্তি দিয়েছিল, উন্নত ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ-বিশুদ্ধতার গ্রাফাইট বাণিজ্যিক পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা মার্কিন সরবরাহকারীদের এখনো নেই।
টেসলার আইনজীবী ম্যাট নাইসেল কর্মকর্তাদের বলেন, “লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদকেরা ৯৯.৯ শতাংশ কার্বন বিশুদ্ধতাসম্পন্ন গ্রাফাইট চান, অর্থাৎ ধাতব অমিশ্রণ অত্যন্ত কম থাকতে হবে। এমন কঠোর মান মেনে গ্রাফাইট উৎপাদনে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের একজন উৎপাদকও নেই। দেশীয় উৎপাদকেরা যখন বাজারের চাহিদামতো পণ্য তৈরি করতে এখনো সক্ষম নন, তখন আমদানিকে দায়ী করতে পারেন না।”
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাফাইট উৎপাদকেরাও স্বীকার করছেন, এ ঘাটতি পূরণে সময় লাগবে। চ্যাটানুগাভিত্তিক গ্রাফাইট উৎপাদক নোভোনিক্সের প্রধান নির্বাহী মাইক ও’ক্রনলি বলেন, “ব্যাটারিতে ব্যবহারের উপযোগী করে এই উপাদান তৈরি ও অনুমোদন পেতে অনেক সময় লাগে। তাই সরবরাহকারী বদলানো বা সরবরাহের উৎস পরিবর্তন করা খুব সহজ নয়। শুল্কের ফলে সরবরাহে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে না। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে একটি শিল্প গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এখন শুরু হবে, অথবা আরও ত্বরান্বিত হবে।”
বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থায় অভিঘাত
নতুন শুল্কের প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতাদের ব্যাটারি সরবরাহকারী এবং চীনা গ্রাফাইটের ওপর নির্ভরশীল কোরীয় ব্যাটারি উৎপাদকেরা খরচ বাড়ার আশঙ্কা করছেন। এলজি ও স্যামসাং এসডিআইয়ের মতো কোম্পানিগুলো বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে এবং বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করবে, নাকি ক্রেতাদের ওপর চাপাবে, তা বিবেচনা করছে। এ পরিস্থিতি বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ব্যাটারির উপকরণে চীনের আধিপত্য থেকে সরে আসার চ্যালেঞ্জগুলো সামনে এনেছে।
এদিকে শুল্ক ঘোষণায় আর্থিক বাজারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বিকল্প উৎসের চাহিদা বাড়বে বলে ধারণা করায় অচীনা গ্রাফাইট উৎপাদক—যেমন অস্ট্রেলিয়ার সিরাহ রিসোর্সেস ও কানাডার নুভো মন্ড গ্রাফাইট—এর শেয়ারের দাম বেড়েছে। আলাবামায় গ্রাফাইট কারখানা নির্মাণরত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েস্টওয়াটার রিসোর্সেসের শেয়ারের দাম ১৫% বেড়েছে। কোম্পানিটি ২০২৮ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৫০ হাজার টনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।
তবে বিশ্ব গ্রাফাইটের বাজার এখনো অল্প কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন গ্রাফাইট পণ্য আমদানি করা হয়, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে চীন থেকে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করেছে, সরবরাহঝুঁকির দিক থেকে গ্রাফাইট ব্যাটারির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ। জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য তাই সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা জরুরি অগ্রাধিকার।
শুল্ক কি ইভির ব্যবহার বাড়ার গতি কমাবে?
বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তরের গতি কমাবে কি না। ইভির ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালে ১২ লাখ মার্কিন নাগরিক বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনেন, যা গাড়ির বাজারের প্রায় ৭.৬%। তবে সাশ্রয়ী দাম এখনো বড় বাধা: ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিক্রি হওয়া একটি ইভির গড় দাম ছিল ৫২,৩৪৫ ডলার, যেখানে সব ধরনের গাড়ির গড় দাম ছিল ৪৮,২৪৭ ডলার। কেন্দ্রীয় কর রেয়াত বন্ধ হওয়া এবং ব্যাটারির খরচ বাড়লে পেট্রলচালিত গাড়ির সঙ্গে দামের সমতা অর্জন ইভির জন্য আরও কঠিন হতে পারে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, স্বল্প মেয়াদে ইভির দামে সামগ্রিক প্রভাব সীমিত থাকবে। কারণ ব্যাটারির খরচে গ্রাফাইটের অংশ তুলনামূলক কম এবং গাড়ি নির্মাতারা বাড়তি খরচের কিছুটা নিজেরা বহন করতে পারে। অন্যরা সতর্ক করছেন, বাড়তি যেকোনো ব্যয় ইভির ব্যবহার বৃদ্ধির গতি কমাতে পারে, বিশেষ করে সাধারণ ক্রেতাদের পছন্দের কম দামের মডেলগুলোর ক্ষেত্রে।
এখানে কৌশলগত হিসাবও রয়েছে। শুল্ক বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশীয় গাড়ি নির্মাতা ও ব্যাটারি সরবরাহকারীদের চীনা প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় দিতে চায়। প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা একীভূত করার ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলো এগিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন যাতে সস্তা ব্যাটারি ও গাড়ি বিপুল পরিমাণে ঢেলে দিয়ে মার্কিন উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে না পারে, শুল্কের উদ্দেশ্য সেটি ঠেকানো।
শিল্প ও পরিবেশগত প্রভাব
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত করার বৃহত্তর উদ্যোগের একটি অংশ হলো গ্রাফাইট শুল্ক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প ও বাইডেন—দুই প্রশাসনই ব্যাটারির উপকরণ, যেমন লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ও বিরল মৃত্তিকা মৌলের দেশীয় খনন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনে উৎসাহ দিতে পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে শক্তিশালী দেশীয় গ্রাফাইট শিল্প রাতারাতি গড়ে উঠবে না। উন্নত ব্যাটারিতে প্রয়োজনীয় অতি উচ্চ-বিশুদ্ধতার গ্রাফাইট উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ, কারিগরি দক্ষতা এবং সময় দরকার। ওয়েস্টওয়াটার রিসোর্সেস ও নোভোনিক্সের মতো কোম্পানি উৎপাদন বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভি শিল্পের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা মার্কিন সরবরাহকারীদের অর্জন করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
এর মধ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরে শুল্কের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়তে পারে। ব্যাটারির খরচ বাড়লে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সঞ্চয় প্রকল্পের বিস্তার ধীর হতে পারে, কারণ সেসব প্রকল্পেও ইভির মতো একই লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সরবরাহঝুঁকি ও দামের অস্থিরতা নতুন উৎপাদন কারখানা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক দাবার ছক
চীন এখনো পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি, তবে এ পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। বেইজিং ইতিমধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ব্যাটারি প্রযুক্তির রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ঘিরে বৃহত্তর বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সরবরাহের উৎস বহুমুখী করতে এবং চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে এ প্রক্রিয়া জটিল এবং এতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
গাড়ি নির্মাতা, ব্যাটারি উৎপাদক ও ভোক্তাদের পরবর্তী করণীয় কী?
আপাতত বিকল্প সরবরাহকারী দ্রুত খুঁজে না পেলে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতা ও ব্যাটারি উৎপাদকদের প্রয়োজনীয় গ্রাফাইটের জন্য বেশি দাম দিতে হবে। কেউ কেউ বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপাতে পারে, অন্যরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তা নিজেরা বহন করতে পারে। এই শুল্ক দেশীয় গ্রাফাইট উৎপাদনে বিনিয়োগের জোরালো প্রণোদনা দিচ্ছে, তবে পরিবর্তনে সময় লাগবে।
বৈদ্যুতিক যান কেনার কথা ভাবছেন এমন ভোক্তাদের স্বল্প মেয়াদে বেশি দাম দিতে হতে পারে এবং প্রণোদনাও কম পেতে পারেন। তবে দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য হলো আরও টেকসই, নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক মার্কিন ব্যাটারি শিল্প গড়ে তোলা, যা আগামী কয়েক দশক পরিচ্ছন্ন পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে সহায়তা করবে।
সংক্ষেপে
- অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা ও ডাম্পিংয়ের অভিযোগে ইভি ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ চীনা গ্রাফাইটের ওপর ৯৩.৫% শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
- আগের শুল্কের সঙ্গে যোগ হলে কিছু চীনা গ্রাফাইট পণ্যের ওপর মোট শুল্কের হার ১৬০% হতে পারে।
- বিশ্বের গ্রাফাইটের প্রায় ৭৫% এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে চীন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইভি শিল্প চীনা উপকরণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
- গাড়ি ও ব্যাটারি নির্মাতাদের সতর্কতা, চাহিদা মেটানোর মতো উচ্চ-বিশুদ্ধতার গ্রাফাইট উৎপাদনে মার্কিন সরবরাহকারীরা এখনো সক্ষম নন। তাই স্বল্প মেয়াদে খরচ বাড়বে।
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা ও মার্কিন উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান সুরক্ষার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ এ পদক্ষেপ।
- ব্যাটারির খরচ বাড়া এবং কেন্দ্রীয় কর রেয়াত বন্ধ হওয়ায় ইভির ব্যবহার বৃদ্ধির গতি কমতে পারে এবং মার্কিন ভোক্তাদের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি কম সাশ্রয়ী হতে পারে।
- শুল্ক বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা ও আর্থিক বাজারে আলোড়ন তুলেছে এবং এতে অচীনা গ্রাফাইট উৎপাদকেরা লাভবান হয়েছেন।
- শক্তিশালী মার্কিন গ্রাফাইট শিল্প গড়ে তুলতে কয়েক বছর লাগবে, তবে শুল্ক বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনে জোরালো প্রণোদনা দিচ্ছে।
- এ সিদ্ধান্তে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।






