উত্তর কোরিয়া উদ্বোধন করল ওনসান-কালমা সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট
উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছে ওনসান-কালমা উপকূলীয় পর্যটন এলাকা—দেশটির পূর্ব উপকূলে বিস্তৃত একটি সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট। এর মধ্য দিয়ে নেতা কিম জং উনের ভাষায়, “এ বছর অন্যতম বৃহত্তম সাফল্য” অর্জিত হলো। ২০ হাজার অতিথির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে রিসোর্টটিতে, যা এই বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের নেওয়া এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় পর্যটন প্রকল্প। অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যের কারণেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা এর উদ্বোধন ঘনিষ্ঠভাবে দেখছেন—বিশেষ করে পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে রুশ পর্যটক আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সূচিপত্র
- উত্তর কোরিয়া উদ্বোধন করল ওনসান-কালমা সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট
- ওনসান-কালমা রিসোর্ট কী?
- রুশ পর্যটকদের লক্ষ্য কেন?
- পর্যটন, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক কৌশল
- অবকাঠামো ও যাতায়াত: রিসোর্টটি কি সফল হতে পারবে?
- ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: কূটনীতির হাতিয়ার পর্যটন
- রিসোর্টের ভেতরে: দুর্দশার মাঝে বিলাসিতা
- ঐতিহাসিক নজির: উত্তর কোরিয়ায় পর্যটন
- বিশেষজ্ঞদের মত: রিসোর্টটি কি সফল হবে?
- বৃহত্তর তাৎপর্য: রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার পর্যটন
- সংক্ষেপে
২০২৫ সালের ২৫ জুন অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিম জং উন, তাঁর স্ত্রী রি সল-জু, তাঁদের মেয়ে কিম জু-আয়ে এবং কিমের বোন কিম ইয়ো-জং। বিশেষ অতিথি হিসেবে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মাতসেগোরা ও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির কূটনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। ১ জুলাই থেকে দেশীয় পর্যটকদের জন্য রিসোর্টটি খুলে দেওয়ার কথা; এরপর শিগগিরই রুশ পর্যটকদেরও আসার কথা রয়েছে।
ওনসান-কালমা রিসোর্ট কী?
ওনসান-কালমা রিসোর্টটি ওনসান শহরের কাছে উপকূলের ৪ কিলোমিটার (২.৫ মাইল) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। অঞ্চলটি কিম পরিবার ও উত্তর কোরিয়ার অভিজাতদের কাছে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই উন্নয়ন প্রকল্পে রয়েছে উঁচু হোটেল, ভিআইপি ভিলা, সাশ্রয়ী আবাসন, রেস্তোরাঁ, বিপণিকেন্দ্র, ক্রীড়া সুবিধা এবং একটি ওয়াটার পার্ক। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্রসৈকতে বিশ্রাম থেকে শুরু করে দুঃসাহসিক কার্যক্রম—দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নানা অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য রিসোর্টটি তৈরি করা হয়েছে।
শৈশবের বড় একটি সময় ওনসানে কাটানো কিম জং উন বহুদিন ধরেই এলাকাটিকে উত্তর কোরিয়ার পর্যটনের প্রদর্শনীস্থলে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। প্রকল্পটি প্রথম ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালে, আর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৯ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতি এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বারবার বিলম্ব হয়। ২০২৪ সালে নির্মাণকাজ পুরোদমে আবার শুরু হয়; খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া উপকরণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে।
রুশ পর্যটকদের লক্ষ্য কেন?
সীমিত আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতে উত্তর কোরিয়া ঐতিহাসিকভাবে চীনা পর্যটকদের ওপর নির্ভর করলেও ওনসান-কালমা রিসোর্টের প্রাথমিক লক্ষ্য স্পষ্টতই রুশ পর্যটকেরা। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন এই পরিবর্তন: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পিয়ংইয়ং ও মস্কো তাদের অংশীদারত্ব জোরদার করছে।
রুশ পর্যটকদের ৭ জুলাইয়ের প্রথম দিকেই আসা শুরু হতে পারে। ভ্লাদিভস্তকভিত্তিক ভ্রমণ সংস্থাগুলো আট দিনের প্যাকেজ ট্যুর দিচ্ছে, যাতে রয়েছে ফ্লাইট, রিসোর্টে থাকা এবং মাসিকরিয়ং স্কি রিসোর্টের মতো উত্তর কোরিয়ার অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানে ভ্রমণ। ট্যুরগুলোর দাম প্রায় ১ হাজার ৮৪০ ডলার, যা মধ্যম থেকে উচ্চ আয়ের বাজারকে লক্ষ্য করে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে রেল ও আকাশপথ পুনরায় চালু হওয়ায় পর্যটনের এই নতুন পথ আরও সহজ হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয় বলেছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রুশ রাষ্ট্রদূতকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশ্য সম্ভবত রুশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত দেওয়া। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, দীর্ঘদিন বিলম্বিত প্রকল্পটি শেষ করতে রাশিয়ার উপকরণ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
পর্যটন, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক কৌশল
পর্যটন উন্নয়নে উত্তর কোরিয়ার তৎপরতা বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও দুর্বল অর্থনীতিকে চাঙা করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয় এমন অল্প কয়েকটি খাতের একটি পর্যটন—যদি এতে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ স্থানান্তর বা উত্তর কোরীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ না থাকে। পর্যটকেরা নিজ খরচে ভ্রমণ করলে এবং ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধ করলে সাধারণত তা আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তবে আইনি পরিস্থিতি জটিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৭০ নম্বর প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়ায় বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আর ২৩৭৫ নম্বর প্রস্তাবে উত্তর কোরীয় সংস্থার সঙ্গে নতুন যৌথ উদ্যোগ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ পর্যটন নিজে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন না করলেও, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ এড়াতে পর্যটন কার্যক্রমের কাঠামো সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
উত্তর কোরিয়ার জন্য ওনসান-কালমা রিসোর্ট একটি বড় বিনিয়োগ—ব্যয় তুলে আনা ও আয় করতে হলে নিয়মিত বিদেশি পর্যটকের আগমন প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত রুশ পর্যটকদের ওপর জোর দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চীনা পর্যটক দলের জন্যও উত্তর কোরিয়াকে আবার দরজা খুলতে হবে। মহামারির আগে বিদেশি পর্যটকের ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন চীনা নাগরিক। তবে আপাতত চীনা পর্যটক দলের ভ্রমণ স্থগিত রয়েছে, এবং তা শিগগির আবার শুরু হবে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষণ নেই।
অবকাঠামো ও যাতায়াত: রিসোর্টটি কি সফল হতে পারবে?
জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ওনসান-কালমা রিসোর্টের বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। উত্তর কোরিয়ার পরিবহন অবকাঠামো সীমিত; বাইরের বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগ স্থাপনকারী ফ্লাইট ও ট্রেনের সংখ্যাও হাতে গোনা। দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তাদের মতে, ভ্লাদিভস্তক থেকে ফ্লাইটে পিয়ংইয়ং হয়ে রিসোর্টে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় ১৭০ জন পর্যটক যেতে পারবেন—রিসোর্টের ঘোষিত ২০ হাজার অতিথির ধারণক্ষমতার তুলনায় যা অনেক কম।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে উত্তর কোরিয়া রিসোর্টের পাশে নতুন একটি রেলস্টেশন ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করেছে। অবকাঠামোর এই উন্নয়নগুলো যাতায়াত বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়, তবে আপাতত বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং সংখ্যা সীমিত থাকবে।
এ ছাড়া, সাধারণ উত্তর কোরীয়দের জন্য রিসোর্টে প্রবেশাধিকার সীমিতই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশীয় পর্যটকদের মধ্যে পিয়ংইয়ং ও অন্যান্য বড় শহরের সুবিধাভোগী অভিজাতদেরই থাকার সম্ভাবনা বেশি। অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও পর্যটনকে কাজে লাগানোর দেশটির বৃহত্তর নীতির সঙ্গে এটি মেলে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: কূটনীতির হাতিয়ার পর্যটন
আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যখন বেড়েছে, তখনই ওনসান-কালমা রিসোর্টের উদ্বোধন হলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে; বিশেষ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে পিয়ংইয়ং মস্কোকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পর। এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা রিসোর্টের কাজ শেষ করতে সাহায্য করে থাকতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রুশ রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি এবং সীমান্তপারের রেল ও আকাশপথে যাতায়াত পুনরায় চালু হওয়া রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে। পিয়ংইয়ংয়ের কাছে রুশ পর্যটক আকর্ষণ শুধু অর্থনৈতিক লাভের বিষয় নয়; এটি নরম কূটনীতিরও একটি রূপ—মস্কোর প্রতি সংহতি জানানো এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বেছে বেছে যোগাযোগে আগ্রহের ইঙ্গিত।
একই সময়ে, উত্তর কোরিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্র ও বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের পশ্চিমাবিরোধী অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করতে বেইজিং অনিচ্ছুক; চীনা পর্যটক দলের ভ্রমণও স্থগিত রয়েছে। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের ধারণা, পর্যটন খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর্থিকভাবে টেকসই করতে শেষ পর্যন্ত চীনা পর্যটকদের জন্যও উত্তর কোরিয়াকে আবার দরজা খুলতে হবে।
রিসোর্টের ভেতরে: দুর্দশার মাঝে বিলাসিতা
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ওনসান-কালমা রিসোর্টকে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনসমৃদ্ধ “জাতীয় সম্পদের মর্যাদাসম্পন্ন পর্যটন নগরী” হিসেবে তুলে ধরেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ছবিতে কিম জং উন ও তাঁর পরিবারকে পুলের পাশে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে; অতিথিরা উপভোগ করছেন ওয়াটার স্লাইড ও অন্যান্য আকর্ষণ। রিসোর্টের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আছে উঁচু হোটেল, ভিআইপি কটেজ, শপিং মল, ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং ওয়াটার পার্ক—দেশীয় অভিজাত ও বিদেশি পর্যটক, উভয়ের কথা মাথায় রেখে এগুলো তৈরি করা হয়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার বাস্তব জীবন রিসোর্টে প্রদর্শিত বিলাসিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। দেশটি এখনো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র; সেখানে খাদ্যসংকট দীর্ঘস্থায়ী এবং দারিদ্র্য ব্যাপক। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা উত্তর কোরিয়াকে বর্ণনা করেছেন এমন এক “দমবন্ধ করা, বদ্ধ পরিবেশ” হিসেবে, “যেখানে আশা ছাড়া প্রতিদিনই জীবনসংগ্রাম।”
উত্তর কোরিয়ায় পর্যটন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত; বিদেশি পর্যটকদের সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হয় এবং কী দেখা বা ছবি তোলা যাবে, সে বিষয়ে কঠোর নিয়ম রয়েছে। মাসিকরিয়ং রিসোর্টে স্কি ছুটির মতো আগের পর্যটন অভিজ্ঞতাগুলোও ছিল কঠোর নজরদারিতে; সেখানে ছিল সাজানো পরিবেশনা এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগের সুযোগ। ওনসান-কালমা রিসোর্টও একই ধরনের বিধিনিষেধের মধ্যে পরিচালিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে অভিজ্ঞতাটি কতটা বাস্তব ও আকর্ষণীয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঐতিহাসিক নজির: উত্তর কোরিয়ায় পর্যটন
আন্তর্জাতিক পর্যটন নিয়ে উত্তর কোরিয়ার উল্লেখযোগ্যতম উদ্যোগটি ছিল ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটকদের জন্য মনোরম কুমগাং পর্বত এলাকা খুলে দেওয়া হয়। এই প্রকল্পকে দুই কোরিয়ার সম্পৃক্ততার প্রতীক হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। এক দশকে প্রায় ২০ লাখ দক্ষিণ কোরীয় পর্যটক সেখানে গিয়েছিলেন, যা পিয়ংইয়ংকে বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহ এনে দেয়। তবে ২০০৮ সালে এক উত্তর কোরীয় সেনার গুলিতে দক্ষিণ কোরীয় এক পর্যটক নিহত হওয়ার পর উদ্যোগটি আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে পর্যটনকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এরপর পর্যটন খাত পুনরুজ্জীবিত করতে উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও সাফল্য সীমিত ছিল। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের গন্তব্য হিসেবে দেশটিকে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বশেষ এবং এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ ওনসান-কালমা রিসোর্ট। অবকাঠামো, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে এটি সফল হতে পারবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মত: রিসোর্টটি কি সফল হবে?
ওনসান-কালমা রিসোর্টের উদ্বোধন নিয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কিছু বিশ্লেষকের কাছে এটি কিম জং উনের অর্থনীতি বহুমুখী করা এবং আধুনিকায়নের ভাবমূর্তি তুলে ধরার সাহসী প্রচেষ্টা। অন্যরা এর সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান; তাঁদের যুক্তি, পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উত্তর কোরিয়ার আকর্ষণ সীমিত এবং বিদেশিদের যাতায়াতে এখনো বিধিনিষেধ রয়েছে।
কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, রিসোর্টটির প্রাথমিক লক্ষ্য সম্ভবত সুবিধাভোগী দেশীয় অভিজাত শ্রেণি; পর্যায়ক্রমে এর পর রুশ পর্যটকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি কিমের “সমাজতান্ত্রিক সভ্যতা”র ভাবনা এবং পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ খোঁজার কৌশলগত প্রচেষ্টার প্রতিফলন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড হাওয়েল আরও সতর্ক:
দীর্ঘ মেয়াদে এই রিসোর্ট কিম জং উনকে তাঁর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক লাভ এনে দিতে পারবে কি না, তা অবশ্য এখনো দেখার বিষয়: শুরু থেকেই ওনসান-কালমা তেমন কোনো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নয়।
আগে পশ্চিমা পর্যটকদের উত্তর কোরিয়া নিয়ে যাওয়া ট্যুর অপারেটররাও সন্দিহান। ইয়াং পাইওনিয়ার ট্যুরসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রোয়ান বিয়ার বিবিসিকে বলেন:
আমি আশা করেছিলাম, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য আরও ব্যাপকভাবে দরজা খোলার ইঙ্গিত মিলবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপাতত তেমনটা মনে হচ্ছে না।
তবু প্রচলিত ধারার বাইরে গন্তব্যে আগ্রহী দুঃসাহসী পর্যটকদের কাছে এর বিশেষ আকর্ষণ থাকতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। উরি ট্যুরসের পরিচালক এলিয়ট ডেভিস বলেন:
উত্তর কোরিয়ার অনন্য সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা সমুদ্রসৈকত রিসোর্টের মতো পরিচিত কোনো জায়গার অভিজ্ঞতা নেওয়া কৌতূহলোদ্দীপক।
বৃহত্তর তাৎপর্য: রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার পর্যটন
ওনসান-কালমা রিসোর্ট চালুর বিষয়টি শুধু পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সুপরিকল্পিত প্রদর্শন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরে এবং বাছাই করা বিদেশি অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পিয়ংইয়ং অগ্রগতি ও উন্মুক্ততার ভাবমূর্তি দেখাতে চায়—একই সঙ্গে কারা আসতে পারবে এবং তারা কী দেখতে পাবে, তার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।
নিষেধাজ্ঞা চলার মধ্যেও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে অর্থনৈতিক যোগাযোগের নতুন পথ খোঁজার ফলে রিসোর্টটি উত্তর কোরিয়ার পরিবর্তনশীল পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক হিসেবেও কাজ করছে। প্রকল্পটিতে কিম জং উন ও তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা জাতীয় অর্জন ও রাজবংশীয় ধারাবাহিকতার বয়ানে এর গুরুত্ব তুলে ধরে।
সংক্ষেপে
- উত্তর কোরিয়া ২০ হাজার অতিথির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দেশটির এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় পর্যটন প্রকল্প ওনসান-কালমা উপকূলীয় পর্যটন এলাকা খুলে দিয়েছে।
- রিসোর্টটির প্রাথমিক লক্ষ্য দেশীয় পর্যটক ও রুশ পর্যটকেরা; এতে পিয়ংইয়ং ও মস্কোর গভীরতর সম্পর্কের প্রতিফলন রয়েছে।
- নিষেধাজ্ঞা ও মহামারির কারণে নির্মাণকাজ কয়েক বছর বিলম্বিত হয়েছিল; তবে ২০২৪ সালে তা আবার শুরু হয়, খবরে বলা হয়েছে রাশিয়ার সহায়তায়।
- বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পর্যটনকে দেখা হচ্ছে, তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে আইনি ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
- একসময় উত্তর কোরিয়ার পর্যটন খাতের মূল ভরসা চীনা পর্যটক দলগুলোর ভ্রমণ এখনো স্থগিত; অদূর ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক যাতায়াতের সম্ভাবনাও কম।
- রিসোর্টটির উদ্বোধন অর্থনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বার্তাও বহন করে; এর মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বেছে বেছে যোগাযোগের ইচ্ছা প্রকাশ করছে উত্তর কোরিয়া।
- রিসোর্টটির সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত বিভক্ত; কেউ এর বিশেষ আকর্ষণ দেখছেন, আবার কেউ এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান।
- ওনসান-কালমা প্রকল্প উত্তর কোরিয়ায় পর্যটনের জটিলতা তুলে ধরে, যেখানে বিলাসবহুল উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাপক দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ।






