সূচিপত্র
যুগান্তকারী আবিষ্কার: বাসযোগ্য অঞ্চলে একটি সুপার-আর্থ
চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইউনান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল Kepler-725c নামের উল্লেখযোগ্য একটি বহিঃগ্রহ আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ১০ গুণ ভরের এই গ্রহটি সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে এবং তথাকথিত “বাসযোগ্য অঞ্চলে” অবস্থিত—নক্ষত্রের চারপাশের এমন অঞ্চল, যেখানে তরল পানি থাকার উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে। ২০২৪ সালের ৩ জুন Nature Astronomy-তে প্রকাশিত এই আবিষ্কার, প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে এমন জগতের সন্ধানে চলমান প্রচেষ্টায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। Kepler-725c পৃথিবী থেকে প্রায় ২,৪৭২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং তার নক্ষত্রকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২০৭.৫ দিন সময় নেয়। এর নক্ষত্র Kepler-725 একটি জি-টাইপের প্রধান-ক্রমের নক্ষত্র, যা আমাদের সূর্যের মতো হলেও বয়সে কম এবং চৌম্বকীয়ভাবে বেশি সক্রিয়। গ্রহটি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১.৪ গুণ সৌর বিকিরণ পায়। এর কক্ষপথের কারণে বছরের কিছু সময় এটি বাসযোগ্য অঞ্চলে প্রবেশ করে, যা এর জলবায়ু ও বাসযোগ্যতার সম্ভাবনা নিয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন তৈরি করেছে।কীভাবে আবিষ্কৃত হলো Kepler-725c?
বেশির ভাগ বহিঃগ্রহ খুঁজে পাওয়া হয় দুটি প্রধান পদ্ধতিতে: ট্রানজিট পদ্ধতি, যাতে কোনো গ্রহ নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া শনাক্ত করা হয়, এবং রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতি, যাতে প্রদক্ষিণরত গ্রহের মহাকর্ষীয় টানে নক্ষত্রের সামান্য দুলুনি মাপা হয়। তবে এই পদ্ধতিগুলোতে স্বল্প কক্ষপথের বড় গ্রহ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে সূর্যের মতো নক্ষত্রকে দীর্ঘ কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করা পৃথিবীর মতো গ্রহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। Kepler-725c আবিষ্কারে ট্রানজিট টাইমিং ভেরিয়েশন (TTV) নামে আরও উন্নত একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রহটিকে সরাসরি খোঁজার বদলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একই ব্যবস্থার অন্য একটি গ্রহ—গ্যাস দানব Kepler-725b—এর ট্রানজিটের সময়ে সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। Kepler-725c-এর মহাকর্ষীয় প্রভাবে Kepler-725b-এর ট্রানজিট প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে কিছুটা আগে বা পরে ঘটে। এই সময়ের পরিবর্তনগুলো সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে দলটি অদৃশ্য সুপার-আর্থটির উপস্থিতি, ভর ও কক্ষপথ নির্ণয় করতে সক্ষম হয়।গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক সান লেইলেই ব্যাখ্যা করেন, “কেউ নিঃশব্দে ঘড়ির কাঁটা সরিয়ে দিয়েছে কি না, তা বুঝতে ঘড়িটি কত দ্রুত চলছে তা পর্যবেক্ষণ করার মতো।”সূর্যের মতো নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে একটি সুপার-আর্থ আবিষ্কারে TTV পদ্ধতি এই প্রথম ব্যবহৃত হলো। এতে প্রমাণিত হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে যেসব গ্রহ শনাক্ত করা কঠিন, সেগুলো খুঁজে বের করারও ক্ষমতা এই কৌশলের রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
Kepler-725c কেন বিশেষ?
সুপার-আর্থ—পৃথিবীর চেয়ে বড় কিন্তু নেপচুনের চেয়ে ছোট গ্রহ—আমাদের ছায়াপথে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন গ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা পরিচিত বেশির ভাগ সুপার-আর্থই লাল বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, যেগুলো আমাদের সূর্যের চেয়ে ছোট ও শীতল। এসব নক্ষত্র থেকে শক্তিশালী ট্রানজিট ও রেডিয়াল ভেলোসিটি সংকেত পাওয়া যায় বলে গ্রহ শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ। সূর্যের মতো নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে সুপার-আর্থ খুঁজে পাওয়া অনেক বিরল এবং প্রাণের সন্ধানের জন্য তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এমন নক্ষত্র আমাদের সৌরজগতের নক্ষত্রের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। Kepler-725c-এর কক্ষপথ উল্লেখযোগ্যভাবে উপবৃত্তাকার। অর্থাৎ, বছরের কেবল একাংশ এটি বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকে। গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও পৃষ্ঠের অবস্থার ওপর নির্ভর করে এতে জলবায়ুর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ভর দেখে একে পাথুরে জগৎ বলে মনে হতে পারে, তবে সরাসরি বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত গ্রহটির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য—এটি পাথুরে, পানিসমৃদ্ধ, নাকি গ্যাসপ্রধান—অজানা থাকবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। অবস্থান আশাব্যঞ্জক হলেও Kepler-725c অত্যন্ত দূরে—পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের তুলনায় প্রায় ১৬ কোটি গুণ দূরে। ফলে সরাসরি এটি নিয়ে গবেষণা করা কঠিন। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহটি তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায় না বলে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো বর্তমান টেলিস্কোপও এর বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করতে পারে না।বিজ্ঞাপন
TTV পদ্ধতি কেন বৈপ্লবিক?
TTV পদ্ধতি বহিঃগ্রহ আবিষ্কারের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, বিশেষ করে যেসব গ্রহ তাদের নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায় না, কিংবা অন্য পদ্ধতিতে শনাক্ত করার জন্য খুব ছোট বা দূরবর্তী। অদৃশ্য গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাব কাছের গ্রহগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন ব্যবস্থায় লুকিয়ে থাকা জগৎ খুঁজে পেতে পারেন, যা অন্যথায় শনাক্তই হতো না। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার PLATO মিশন এবং চীনের Earth 2.0 প্রকল্পের মতো আসন্ন মহাকাশ অভিযানে এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য সূর্যের মতো নক্ষত্রের চারপাশে আরও পৃথিবীসদৃশ গ্রহ খুঁজে বের করা। TTV গবেষণার জন্য সম্ভাব্য বাসযোগ্য জগতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।সান লেইলেই বলেন, “এই আবিষ্কার সূর্যের মতো নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে কম ভরের গ্রহ শনাক্তে TTV পদ্ধতির সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।”আন্তর্জাতিক গবেষক দলে চীন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা ছিলেন। এতে মানবজাতির প্রাচীনতম প্রশ্নগুলোর একটির উত্তর খোঁজার বৈশ্বিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটেছে: মহাবিশ্বে কি আমরা একা?
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
Kepler-725c-এর আবিষ্কার বড় অগ্রগতি হলেও অনেক কিছুই এখনো অজানা। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতের টেলিস্কোপ ও মহাকাশ অভিযান এ ধরনের গ্রহের বায়ুমণ্ডল সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেবে। সেখানে পানি, অক্সিজেন বা প্রাণের অন্য কোনো চিহ্ন খোঁজা হবে। আপাতত, আরেকটি পৃথিবীর সন্ধানে মহাজাগতিক অভিযাত্রায় Kepler-725c এক আকর্ষণীয় সূত্র হয়ে আছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং TTV-র মতো নতুন শনাক্তকরণ পদ্ধতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সত্যিকারের পৃথিবীসদৃশ গ্রহ—এমনকি প্রাণেরও—সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে
- Kepler-725c পৃথিবীর প্রায় ১০ গুণ ভরের একটি সুপার-আর্থ, যা বাসযোগ্য অঞ্চলে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।
- ট্রানজিট টাইমিং ভেরিয়েশন (TTV) পদ্ধতিতে গ্রহটি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিবেশী গ্রহগুলোর ওপর মহাকর্ষীয় প্রভাব দেখে অদৃশ্য গ্রহ শনাক্ত করা হয়।
- সূর্যের মতো নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে TTV পদ্ধতিতে সুপার-আর্থ শনাক্তের ঘটনা এটিই প্রথম, যা বহিঃগ্রহ আবিষ্কারে যুগান্তকারী অগ্রগতি।
- Kepler-725c-এর কক্ষপথের কারণে বছরের একাংশ এটি বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকে, যা এর জলবায়ু ও প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
- সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীসদৃশ জগতের সন্ধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন শনাক্তকরণ পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এই আবিষ্কারে উঠে এসেছে।






