নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে প্রত্যাহারের ১০টির মধ্যে ৭টিরও বেশি
২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে চীন ২ কোটি ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০টি বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহন প্রত্যাহার করেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের কারণে এর মধ্যে ১ কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৮০০টি গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়। এ পরিসংখ্যানে গাড়িশিল্পের নজরদারিতে নিরাপত্তা পরীক্ষা, জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং যানবাহন উন্নয়নের গতি গুরুত্বের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সূচিপত্র
- নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে প্রত্যাহারের ১০টির মধ্যে ৭টিরও বেশি
- জরুরি অবস্থায় দরজা খোলার ব্যবস্থা কেন নজরদারিতে
- আগস্টের প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান
- নির্মাতারা কী পরিবর্তন আনবে
- যান্ত্রিক হাতল বাধ্যতামূলক করছে জাতীয় মান
- দ্রুত বাজারে আনার তাগিদের বিপরীতে পরীক্ষার চাপ
- গাড়ি সড়কে নামার আগেই ঝুঁকি পরীক্ষা
- বিস্তৃত হচ্ছে প্রত্যাহার ব্যবস্থা, বদলাচ্ছে ঝুঁকি
- চীনের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মনোযোগ
- মূল বিষয়গুলো
বাজার নিয়ন্ত্রণবিষয়ক রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গুণগত উন্নয়ন ব্যুরোর উপপরিদর্শক লি চাংছিং বিশ্ব বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহন সম্মেলনে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহন নিয়ে ৬১৭টি প্রত্যাহার কার্যক্রম তদারক করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্ত, প্রশাসনিক পরামর্শ, সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া প্রত্যাহারের আওতায় পড়েছে মোট গাড়ির ৭১.২৩ শতাংশ।
টেসলা ও চীনের কয়েকটি নির্মাতার জরুরি দরজা খোলার ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রত্যাহার কার্যক্রমের পর এ ঘোষণা এল। পাশাপাশি, দরজার হাতলের নিরাপত্তা নিয়ে বাধ্যতামূলক জাতীয় মান ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হওয়ার আগে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো। নতুন মান অনুযায়ী, দরজা ভেতর ও বাইরে—দুই দিক থেকেই খোলার জন্য যান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহনে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, সফটওয়্যার ও সংযোগ প্রযুক্তি থাকে; অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে চালক-সহায়তা ব্যবস্থাও যুক্ত থাকে। কর্মকর্তাদের বর্ণিত নিরাপত্তা-উদ্বেগ সফটওয়্যার ও ব্যাটারি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যেকোনো গাড়ির মৌলিক প্রয়োজন পর্যন্ত বিস্তৃত: গুরুতর সংঘর্ষের পর যাত্রীরা যেন বের হতে পারেন এবং উদ্ধারকারীরা যেন ভেতরে ঢুকতে পারেন।
লি নির্মাতাদের গবেষণা, পরীক্ষা ও পরবর্তী প্রতিটি পণ্য-পরিবর্তনের ধাপে নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। নতুন সুবিধাগুলো চালকের সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজ করে, তা যাচাই না করেই গাড়ি বাজারে আনার তাড়াহুড়া নিয়ে তিনি সতর্ক করেন।
নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের পরিসর উল্লেখযোগ্য। ৯ মাসে প্রত্যাহারের আওতায় আসা ২ কোটি ৩৯ লাখ গাড়ির মধ্যে প্রায় ৫৮ লাখ ৭০ হাজার গাড়ি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের আওতাভুক্ত ছিল না। কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি শনাক্তে নিজেদের ব্যবহৃত পদ্ধতি বাড়ানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে নিজেরাই ত্রুটি শনাক্ত করতে চাপ দিচ্ছে।
জরুরি অবস্থায় দরজা খোলার ব্যবস্থা কেন নজরদারিতে
চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা শনাক্ত করেছে: ভেতরের জরুরি যান্ত্রিক হাতলগুলো আশপাশের সাজসজ্জার সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে যাত্রীরা সেগুলো খুঁজে পেতে ও ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়েন। আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে যে হাতল আছে, কিন্তু সহজে চোখে পড়ে না, তা বেরিয়ে আসতে দেরি করাতে পারে।
গুরুতর সংঘর্ষে গাড়ির নিম্ন-ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। অনেক নিয়ন্ত্রণ ও ইলেকট্রনিক দরজা-ব্যবস্থা এই বিদ্যুতেই চলে। বৈদ্যুতিকভাবে দরজা খোলা না গেলে যান্ত্রিক ব্যবস্থা ল্যাচ খোলার একটি সরাসরি উপায় দেয়। তাই এর কাজ করার পাশাপাশি অবস্থান, চেহারা ও ব্যবহারের সহজতাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, ত্রুটির কারণে দ্রুত দরজা খুলতে চাওয়া যাত্রী এবং বাইরে থেকে উদ্ধার করতে আসা মানুষ—দুই পক্ষই বাধার মুখে পড়তে পারেন। লুকানো বাইরের হাতল ও ইলেকট্রনিক ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নজর কেড়েছে, কারণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কী করতে হবে, তা স্বাভাবিক চেহারা ও কার্যপ্রণালি থেকে ব্যবহারকারীরা সহজে বুঝতে নাও পারেন।
গোপন হাতলকে ব্যাপক উৎপাদনে আনতে টেসলা ভূমিকা রেখেছিল, পরে চীনের অনেক বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাও একই ধরনের নকশা গ্রহণ করে। এখন নিয়ন্ত্রকেরা নির্মাতাদের বলছেন, এসব ব্যবস্থা জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজ করে তা নিশ্চিত করতে হবে; শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারের সুবিধা ও চেহারার দিকে নজর দিলেই চলবে না।
আগস্টের প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান
বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ত্রুটিপূর্ণ পণ্য প্রত্যাহার কারিগরি কেন্দ্রের শিল্পপণ্য বিভাগের প্রধান শিয়াও লিংইউন বলেন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ত্রুটির কারণে ২১ আগস্ট প্রায় ৮০ লাখ গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর টেডা ফোরামে তিনি সফটওয়্যার, ব্যাটারি ব্যবস্থা ও বুদ্ধিমান ড্রাইভিং সুবিধাসংক্রান্ত সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
এ বৃহত্তর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টেসলা, শাওমি ও লিপমোটরসহ ৯টি নির্মাতা জরুরি অবস্থায় দরজা খোলার ব্যবস্থা নিয়ে প্রায় ৪৩ লাখ গাড়ির ত্রুটি সারানোর পরিকল্পনা করে। ওই গাড়িগুলোর প্রায় ৬৯ শতাংশই টেসলার, যার সংখ্যা আনুমানিক ২৯ লাখ ৮০ হাজার।
২১ আগস্টের বৃহত্তর কার্যক্রমে ১১টি নির্মাতা প্রত্যাহার বা সফটওয়্যার হালনাগাদের ঘোষণা দেয়, আর ৯টি নির্মাতা জরুরি হাতলে সতর্কতামূলক লেবেল লাগানোর পরিকল্পনা করে। প্রায় ৮০ লাখের পরিসংখ্যানে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট আরও নানা ধরনের ত্রুটি অন্তর্ভুক্ত; দরজা খোলার ব্যবস্থা ঠিক করার জন্য নির্দিষ্ট করা ৪৩ লাখ গাড়ির চেয়ে এর পরিধি বিস্তৃত।
টেসলা, শাওমি, লিপমোটর, এক্সপেং, জিকার ও লিংক অ্যান্ড কোসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড এ কার্যক্রমে তাদের এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাতাদের মধ্যে একই ধরনের নকশা ব্যবহৃত হলে কীভাবে একই রকম নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি হতে পারে, এসব পদক্ষেপ তা দেখায়।
নির্মাতারা কী পরিবর্তন আনবে
টেসলার প্রত্যাহারের আওতায় আমদানি করা এবং চীনে তৈরি মডেল ৩, মডেল ওয়াই, মডেল এস ও মডেল এক্স গাড়ি রয়েছে। প্রত্যাহার কার্যকর হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর। সমাধানের অংশ হিসেবে জরুরি দরজা খোলার হাতল চিহ্নিত করে আরও স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেল লাগানো এবং সংঘর্ষের পর গাড়ির জানালা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামানোর জন্য সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হবে।
নয়টি নির্মাতা বিনা খরচে লেবেল লাগানোর পরিকল্পনা করেছে। বৃহত্তর কার্যক্রমে অংশ নেওয়া অধিকাংশ নির্মাতাও দূর থেকে সফটওয়্যার হালনাগাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ ধরনের হালনাগাদকে প্রায়ই ‘ওভার দ্য এয়ার’ বা ওটিএ (OTA) আপডেট বলা হয়: কর্মশালায় গিয়ে সফটওয়্যার বদলানোর বদলে নির্মাতা তারবিহীন সংযোগে গাড়িতে নতুন সফটওয়্যার পাঠায়।
চীনের বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের সংশোধনমূলক সফটওয়্যার-ব্যবস্থাকেও প্রত্যাহার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই প্রত্যাহারের আওতায় নির্দেশনা বা সফটওয়্যারের পরিবর্তনের পাশাপাশি গাড়ির যান্ত্রিক মেরামতও থাকতে পারে। এ কার্যক্রমে লেবেল ও সফটওয়্যারের সমন্বয় জরুরি হাতল খুঁজে পাওয়া এবং দুর্ঘটনার পর দরজা খোলার আরেকটি সম্ভাব্য উপায়—দুই দিকই বিবেচনায় নিয়েছে।
জরুরি দরজা খোলার অবস্থান ও পদ্ধতি মডেলভেদে আলাদা হওয়ায় মালিকদের নিজেদের গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা জানা প্রয়োজন। এ কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রণগুলো সহজে চেনার ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি গাড়ির জন্য নির্ধারিত সংশোধন নিশ্চিত করা। অংশ নেওয়া সব নির্মাতার জন্য একটি অভিন্ন কাজ শেষের তারিখ জানানো হয়নি।
যান্ত্রিক হাতল বাধ্যতামূলক করছে জাতীয় মান
চীনের ‘মোটরগাড়ির দরজার হাতলের নিরাপত্তার কারিগরি শর্তাবলি’ শীর্ষক বাধ্যতামূলক জাতীয় মান ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হবে। পেছনের হ্যাচ বা টেলগেট বাদে প্রতিটি দরজায় বাইরে ও ভেতরে এমন হাতল থাকতে হবে, যা দিয়ে যান্ত্রিকভাবে দরজা খোলা যায়।
বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা অচল হলে যাত্রী বা উদ্ধারকারীরা দরজা খুলতে না পারার ঝুঁকি কমানোই এ শর্তের লক্ষ্য। প্রচলিত ম্যানুয়াল ব্যবস্থা ছাড়া বাইরের ইলেকট্রনিক হাতলের ওপর বিধিনিষেধের ঘোষণা চীন ফেব্রুয়ারিতে দেয়; ২০২৭ সাল থেকে নতুন মডেলের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে।
চলমান প্রত্যাহার কার্যক্রম এবং নতুন মান গাড়ির নিরাপত্তার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় নিয়ে কাজ করে। ইতিমধ্যে বিক্রি হওয়া গাড়ির ত্রুটি সংশোধন করে প্রত্যাহার। আর নকশাসংক্রান্ত শর্ত নির্ধারণ করে, বাজারে আনার সময় সংশ্লিষ্ট মডেলগুলোকে নির্মাতাদের কী শর্ত পূরণ করতে হবে।
চীনে টেসলার বড় উৎপাদন ও বিক্রির উপস্থিতির কারণে এ বিধির প্রভাব চীনা বাজারের বাইরেও পড়তে পারে। সাংহাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবিলিটির প্রধান নির্বাহী বিল রুশো বলেন, কোম্পানিটির ব্যবসায়িক স্বার্থ অন্য জায়গাতেও নকশা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “চীন টেসলার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় ও উৎপাদন বাজার হওয়ায়, আমার ধারণা টেসলা শুধু চীনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা সমাধান রাখার বদলে চীনের শর্ত মেনেই নকশা করবে।”
দ্রুত বাজারে আনার তাগিদের বিপরীতে পরীক্ষার চাপ
লির সতর্কবার্তা শুধু দরজার যন্ত্রাংশ নিয়ে ছিল না। দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে গিয়ে নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করা এবং বাস্তব ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে যথেষ্ট পরীক্ষা ছাড়া নতুন উদ্ভাবন গাড়িতে যুক্ত না করার আহ্বান জানান তিনি।
নির্মাতাদের দুর্ঘটনা ও ত্রুটির তথ্য সঠিকভাবে জানাতে এবং প্রত্যাহারসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে, বলেন তিনি। ঘটনা গোপন করা বা প্রতিবেদনে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে নাকচ করেন। কোনো সমস্যা ব্যাপক হওয়ার আগেই বিভিন্ন গাড়িতে একই ধরনের লক্ষণ শনাক্ত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এসব প্রতিবেদন সহায়তা করে।
চীনে গাড়ির দামে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে নতুন মডেল ও সুবিধা দ্রুত আনার বাণিজ্যিক চাপ বাড়ছে। সফটওয়্যার, ব্যাটারি ও চালক-সহায়তা ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে; ফলে নতুন সংস্করণ গাড়ির অন্য অংশের সঙ্গে কীভাবে কাজ করে, তা নির্মাতাদের যাচাই করতে হয়।
নিয়ন্ত্রণের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে রুশো বলেন, শিল্পের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসছে:
তিনি বলেন, “দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির উদ্ভাবন ও সুবিধার বিস্তার থেকে শিল্পটি এখন আরও জোরালো নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।”
নির্মাতাদের জন্য এর বাস্তব অর্থ হলো, পণ্য উন্নয়নের সঙ্গে দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা। কোনো সুবিধাকে কঠিন সড়ক পরিস্থিতিতেও কাজ করতে হবে, শুধু প্রদর্শনী বা সাধারণ পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় নয়।
গাড়ি সড়কে নামার আগেই ঝুঁকি পরীক্ষা
শিয়াও তিনটি কাজের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নিয়ন্ত্রক পদ্ধতির কথা বলেন: শুরুতেই ঝুঁকি শনাক্তে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, ব্যবহারের সময় সমস্যা নজরে রাখতে নিয়মিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন এবং ত্রুটি সংশোধনে প্রত্যাহার।
‘স্যান্ডবক্স তদারকি’ নামে পরিচিত নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার কর্মসূচিতে স্বাভাবিক যান চলাচলের বাইরে কঠিন পরিস্থিতিতে গাড়ি পরীক্ষা করা হয়। শিয়াও বলেন, এতে প্রায় ২০০টি গাড়ির সমস্যা শনাক্ত হয়েছে, ফলে কোম্পানিগুলো উন্নতি আনতে পেরেছে। বড় নির্মাতারা ধীরে ধীরে তাদের সর্বশেষ বুদ্ধিমান মডেলগুলো এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করছে।
২০২৫ সালে চালু হওয়া দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ব্যবস্থায় বুদ্ধিমান ড্রাইভিং সুবিধাসংশ্লিষ্ট ঘটনা দ্রুত জানাতে হয় নির্মাতাদের। নিয়ন্ত্রকেরা এসব তথ্য একত্র করে বিপজ্জনক পরিস্থিতির একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করেন, যা পরবর্তী পরীক্ষায় কাজে লাগতে পারে।
শিয়াও বলেন, দুর্ঘটনার তথ্য থেকে অনিয়মিত আকৃতির বস্তু শনাক্ত ও সেগুলোর প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে চলমান সমস্যাগুলো সামনে এসেছে। নির্ধারিত পরিস্থিতিতে সাধারণ পরীক্ষা হয়, কিন্তু সড়কে বিপদের অস্বাভাবিক আকৃতি, অবস্থান ও সমন্বয় দেখা যায়। বাস্তব ঘটনার তথ্য পরীক্ষায় যুক্ত হলে নির্মাতারা আরও কঠিন সমস্যা সমাধানের সুযোগ পান।
ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার তথ্য থেকে পরীক্ষার পরিস্থিতি তৈরিতে নিয়ন্ত্রকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জামও ব্যবহার করছেন। স্যান্ডবক্স কর্মসূচিতে ইতিমধ্যে প্রায় সাত-আটটি নির্মাতা এসব পরিস্থিতি পরীক্ষা করছে। দুটি জাতীয় মান নিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া চলছে: একটি চালক-সহায়তা ব্যবস্থায় ত্রুটি শনাক্তকরণ নিয়ে, অন্যটি দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের বিন্যাস ও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে।
বিস্তৃত হচ্ছে প্রত্যাহার ব্যবস্থা, বদলাচ্ছে ঝুঁকি
চীনের প্রত্যাহার ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কার্যক্রমে ১২ কোটিরও বেশি গাড়ি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, বলেন লি। এর অর্ধেকের বেশি হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের পর। সেপ্টেম্বরের ফোরামে শিয়াও আরও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান দেন: ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রত্যাহারের আওতায় এসেছে ১২ কোটি ১০ লাখ গাড়ি, যার ৫৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ত্রুটি তদন্তের সঙ্গে যুক্ত।
বহু বছরের বিভিন্ন প্রত্যাহার কার্যক্রমে একই গাড়ি একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তাই ঐতিহাসিক মোট হিসাবে বছর ধরে প্রত্যাহারের আওতায় আসা গাড়িগুলো গণনা করা হয়। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ চীনের সড়কে প্রায় ৩৭ কোটি গাড়ি চলছিল; এটি তখন ব্যবহারে থাকা গাড়ির বহরের আলাদা পরিমাপ।
শিয়াও আরও বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি ১০ হাজার নতুন জ্বালানির গাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের হার ৬৮ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ ২০২৫ সালে হারটি ২০১৯ সালের স্তরের প্রায় ৩২ শতাংশে নেমেছিল। গাড়ির সংখ্যার তুলনায় অগ্নিকাণ্ডের হিসাব করলে বহর বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকির পরিবর্তনও বোঝা যায়।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমও বিস্তৃত হচ্ছে। প্রত্যাহারের সংশোধিত বিধিতে মোটরসাইকেল অন্তর্ভুক্ত করা এবং বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহনের তদারকি নিয়ে বিধান যুক্ত করার কথা রয়েছে। ব্যাটারি বদল এবং বহুল ব্যবহৃত ড্রাইভিং সফটওয়্যার সরবরাহকারীদের কারণে ত্রুটি দেখা দিলে কোন কোম্পানি তথ্য দেবে ও দায় নেবে, তা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএলের কাজের মাধ্যমে পাওয়ার ব্যাটারির গুণগত মান ব্যবস্থাপনা নিয়ে চারটি জাতীয় মানও প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশি ওয়ারেন্টি ও প্রত্যাহারের শর্ত গাড়ির নকশার সময় বিবেচনায় নিতে চীনা নির্মাতাদের সহায়তার জন্য কর্তৃপক্ষ রপ্তানি-সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে।
চীনের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মনোযোগ
চীনে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির প্রায় ৫৫ শতাংশই বৈদ্যুতিক; ফলে সেখানে নিরাপত্তা বিধি শিল্পের পণ্য উন্নয়নের বড় অংশের জন্য প্রাসঙ্গিক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাচেকো উন্নত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা বলেন।
তিনি বলেন, “প্রবণতাটি স্পষ্ট: উন্নত যানবাহন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চীন ধীরে ধীরে নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে।”
দরজা খোলার ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকদের কাছেও পৌঁছেছে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসড়ক যানবাহন নিরাপত্তা প্রশাসন জানায়, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টেসলা মডেল ৩ গাড়ির জরুরি যান্ত্রিক দরজা খোলার ব্যবস্থা নিয়ে করা আবেদন চলমান বিধি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করাই ভালো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আগুনে আটকে পড়া মানুষের আহত হওয়া বা মৃত্যুর ঘটনায় টেসলার দরজার হাতলের নকশার ভূমিকা ছিল। চীনে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সংঘর্ষ ও আগুনে শাওমি এসইউ৭-এর এক চালক মারা যান; উদ্ধার করতে আসা লোকজন দরজা খুলতে পারেননি। এসব ঘটনা জরুরি অবস্থায় গাড়িতে প্রবেশাধিকার নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
চালক-সহায়তা ব্যবস্থার বিজ্ঞাপনে ‘স্মার্ট ড্রাইভিং’ ও ‘স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং’-এর মতো শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। এতে গাড়ির নিরাপত্তার আরেকটি দিক সামনে এসেছে: কোনো সুবিধা বিক্রির ভাষা থেকে চালকেরা সেটি ব্যবহারে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা পান কি না।
বর্তমান ধারার গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো হলো:
- ফেব্রুয়ারি ২০২৬: হাতে খোলার ব্যবস্থা ছাড়া বাইরের ইলেকট্রনিক হাতলের ওপর বিধিনিষেধের ঘোষণা দেয় চীন।
- ২১ আগস্ট, ২০২৬: দরজা খোলার ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ত্রুটি নিয়ে নির্মাতারা বড় প্রত্যাহার কার্যক্রমের ঘোষণা দেয়।
- ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: টেডা ফোরামে শিয়াও প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান ও নতুন তদারকি সরঞ্জামের কথা তুলে ধরেন।
- ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: প্রায় ২৯ লাখ ৮০ হাজার গাড়ি নিয়ে টেসলার প্রত্যাহার কার্যকর হয়।
- ১ জানুয়ারি, ২০২৭: দরজার হাতলের নিরাপত্তা নিয়ে বাধ্যতামূলক মোটরগাড়ি মান কার্যকর হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনে বুদ্ধিমান সংযুক্ত যানবাহন নিয়ে ৬১৭টি প্রত্যাহার কার্যক্রমে ২ কোটি ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
- তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের কারণে ১ কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৮০০টি গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা মোটের ৭১.২৩ শতাংশ।
- আগস্টের বৃহত্তর প্রত্যাহার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জরুরি দরজা খোলার ব্যবস্থা ঠিক করতে প্রায় ৪৩ লাখ গাড়ি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
- সংঘর্ষের পর জানালা নামানোর সফটওয়্যার এবং জরুরি দরজা খোলার হাতলের লেবেল টেসলার সংশোধনমূলক ব্যবস্থার অংশ।
- দরজার ভেতরে ও বাইরে যান্ত্রিকভাবে খোলার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করে নতুন মান ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হবে।
- আগেভাগে ত্রুটি শনাক্তে নিয়ন্ত্রকেরা দুর্ঘটনার প্রতিবেদন ও নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা বাড়াচ্ছেন।






