২০ লাখ রোগীকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
দেশের রোগীদের দেশে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করে বৈদেশিক মুদ্রায় ১৫০ ট্রিলিয়ন রুপি সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রোগীদের কাছ থেকে ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি আয় করতে চায় দেশটি। এ লক্ষ্যে বালির সানুর ও বাতামে স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
সূচিপত্র
- ২০ লাখ রোগীকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
- আর্থিক লক্ষ্যগুলোর হিসাব
- কম রোগী-প্রাক্কলন দিয়ে শুরু হয়েছিল সানুরের পরিকল্পনা
- সানুরে রোগীরা যেসব সেবা পাবেন
- কৌশলের কেন্দ্রে চিকিৎসক ও লাইসেন্স
- রোগীরা কেন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান
- পর্যটন অঞ্চলের বাইরেও বিনিয়োগ
- পরবর্তী পর্যায়ে বিদেশি রোগী ও কর্মসংস্থান
- মূল বিষয়গুলো
২১ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে মধ্য জাকার্তার গেদুং এ.এ. মারামিসে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলবিষয়ক জাতীয় বৈঠকে এ লক্ষ্যগুলোর কথা জানান অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হারতর্তো। তিনি বলেন, প্রায় ২০ লাখ ইন্দোনেশীয় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং এতে তাঁদের প্রায় ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি ব্যয় হয়। তাঁদের গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পেনাং।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রতিটি ইন্দোনেশীয় রোগীকে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে ৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি সাশ্রয় হবে। আর ইন্দোনেশিয়ায় আসা ১২ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক রোগীর প্রত্যেকে ১৬ কোটি রুপি ব্যয় করলে আয় হবে ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি। এই নতুন লক্ষ্যগুলো অর্জনের কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
এই কৌশল কীভাবে কাজ করবে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সানুর। প্রায় ৪১ হেক্টর এলাকায় গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে রয়েছে বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ ক্লিনিক, হোটেল ও অন্যান্য সুবিধা। সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বাতামের নামও রয়েছে, যদিও সেখানে চিকিৎসাসুবিধা নিয়ে এয়ারলাঙ্গার বক্তব্যে বিস্তারিত কম ছিল।
ইন্দোনেশিয়া চায়, তার নাগরিকেরা কোথায় চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশি রোগীরা কোথায় অর্থ ব্যয় করবেন—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসুক। তবে সাফল্যের জন্য শুধু ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়: রোগীদের এমন বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসার বিকল্প ও সেবা পেতে হবে, যেগুলোর জন্য তাঁরা বর্তমানে বিদেশে যান।
আর্থিক লক্ষ্যগুলোর হিসাব
এয়ারলাঙ্গার সাশ্রয়ের হিসাবের আওতায় রয়েছে বিপুলসংখ্যক রোগী। জনপ্রতি ৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি হিসাবে ১৫০ ট্রিলিয়ন রুপি সাশ্রয় করতে হলে ২০ লাখ রোগীকে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে—যা তাঁর উল্লেখ করা বিদেশে যাওয়া রোগীদের মোট সংখ্যার সমান। আর ১২ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক রোগী প্রত্যেকে ১৬ কোটি রুপি ব্যয় করলে আলাদা ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি আয়ের লক্ষ্য পূরণ হবে।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় বলতে বোঝায়, ইন্দোনেশীয়রা বিদেশে যে অর্থ ব্যয় করতেন, তা দেশের অর্থনীতিতেই থেকে যাওয়া। বিদেশি রোগীরা ইন্দোনেশিয়ায় সেবার জন্য অর্থ দিলে তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। রোগীর চিকিৎসাযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে হাসপাতাল, পরীক্ষাগার ও আবাসনসেবা প্রদানকারীরা এই ব্যয় থেকে আয় করতে পারে।
বর্তমানে বিদেশে চিকিৎসার জন্য অর্থের বহিঃপ্রবাহ নিয়ে সরকারি হিসাবগুলোতে পার্থক্য রয়েছে। এয়ারলাঙ্গা এর পরিমাণ প্রায় ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি বলেছেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানবিষয়ক মন্ত্রী এরিক তোহির ২৫ জুন, ২০২৫ তারিখে সানুর প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ১৫০ ট্রিলিয়ন রুপির কথা বলেন। একটি একাডেমিক গবেষণায় ১৮০ ট্রিলিয়ন রুপির বেশি লেনদেন এবং বছরে ১০ লাখের বেশি ইন্দোনেশীয়ের বিদেশযাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ইন্দোনেশীয় চিকিৎসাপ্রার্থীদের ৭৪ শতাংশ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যান। ২০ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার। ফলে দেশ দুটো ইন্দোনেশীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রতিযোগী, আবার যেসব রোগীর অর্থ দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে সরকার সবচেয়ে বেশি আগ্রহী, তাঁদের গন্তব্যও এগুলো।
ইনজার্নির প্রধান নির্বাহী মায়া ওয়াতোনো সানুর প্রকল্পের ধাপে ধাপে এগোনোর লক্ষ্য তুলে ধরেছেন: প্রথম বছরে ৫০ ট্রিলিয়ন রুপির বহিঃপ্রবাহ ঠেকানো, এরপর তিন বছরে ইন্দোনেশীয় রোগীদের দেশে রেখে এবং বিদেশি রোগীদের আকর্ষণ করে প্রায় ২০০ ট্রিলিয়ন রুপির লক্ষ্যে পৌঁছানো। এয়ারলাঙ্গার সাম্প্রতিক লক্ষ্যগুলোতে এই দুই ধরনের আর্থিক সুবিধা আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কম রোগী-প্রাক্কলন দিয়ে শুরু হয়েছিল সানুরের পরিকল্পনা
২২ জুলাই, ২০২২ তারিখে এয়ারলাঙ্গার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিষদ সানুরের প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরিষদের সানুর অনুমোদন-সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, আগে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ১ লাখ ২৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার ইন্দোনেশীয় ২০৩০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে চিকিৎসা নেবেন।
পরিষদের হিসাবে, এই সংখ্যা আগে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ইন্দোনেশীয়দের ৪ থেকে ৮ শতাংশ। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে ৮৬ ট্রিলিয়ন রুপি এবং অতিরিক্ত আয় হবে ১৯ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন রুপি বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এই অঙ্কগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমায় সানুর প্রকল্পের হিসাব; সাম্প্রতিক ঘোষণাটি আরও বিস্তৃত স্বাস্থ্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কৌশল নিয়ে।
প্রধান মাইলফলকগুলোতে দেখা যায়, অনুমোদন থেকে পরিচালনা এবং বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য পর্যন্ত প্রকল্পটি কীভাবে এগিয়েছে:
- ২২ জুলাই, ২০২২: জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিষদ সানুরের প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং সরকারি বিধিমালার মাধ্যমে অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে।
- ২৫ জুন, ২০২৫: সানুরের স্থাপনাগুলো ও বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তোহির।
- জুলাই ২০২৬: বিদেশে চিকিৎসা কমাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৃহত্তর প্রযুক্তি ও হাসপাতাল বিনিয়োগ কর্মসূচির রূপরেখা দেয়।
- ২১ অক্টোবর, ২০২৬: সানুর ও বাতামের নাম উল্লেখ করে সাশ্রয় ও আন্তর্জাতিক রোগী আকর্ষণের সর্বশেষ লক্ষ্য তুলে ধরেন এয়ারলাঙ্গা।
- ২০৩০ ও ২০৪৫: সানুরের মূল পরিকল্পনায় ওই দুই বছরের জন্য রোগী ফিরিয়ে আনা এবং সঞ্চিত আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সানুরে রোগীরা যেসব সেবা পাবেন
সানুর অঞ্চলের একমাত্র হাসপাতাল বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল। ৬৭ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের এ হাসপাতালে ছয়টি বিশেষায়িত সেবা রয়েছে: হৃদ্রোগ, ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, পরিপাকতন্ত্র, যকৃত এবং অস্থি ও সন্ধি।
অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে হাসপাতালটির সেবাগুলো জোরদার করা হয়েছে। ২০২২ সালের সরকারি পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছিল, পিটি পারতামিনা বিনা মেডিকা—যা আইএইচসি নামে পরিচিত—মেয়ো ক্লিনিকের সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সানুরের বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনায় চিকিৎসাসেবা, সুস্থতা ফিরে পাওয়ার আবাসন এবং পর্যটনকে এক জায়গায় আনার কথা রয়েছে। পরিকল্পিত সেবার মধ্যে রয়েছে প্রজনন চিকিৎসা, চোখের চিকিৎসা, বয়স্কদের সেবা, নান্দনিক অস্ত্রোপচার এবং স্টেম সেল-সংক্রান্ত সুবিধা। মূল পরিকল্পনায় ঔষধি গাছকেন্দ্রিক উদ্ভিদ উদ্যান, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং সভা, সম্মেলন ও প্রদর্শনীর জন্য স্থাপনার কথাও ছিল।
এই আতিথেয়তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রয়েছে দুটি হোটেল: ১৯৬৬ সালে চালু হওয়া বালি বিচ হোটেল এবং মেরু সানুর হোটেল। স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য যাওয়া কিংবা সুস্থ হওয়া পর্যন্ত থাকার ক্ষেত্রে আবাসন চিকিৎসার ব্যয় ও বাস্তব ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে ওঠে।
ইনজার্নি হসপিটালিটির প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিনে হুতাবারাত বলেন, অংশীদার বাছাইয়ের আগে তিন বছর ধরে ৩০০টির বেশি ক্লিনিক পর্যালোচনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করা এবং তাঁদের সক্ষমতা যাচাই করাও ছিল। এতে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী বাছাই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে, যার গুরুত্ব নির্মাণকাজের সমান।
কৌশলের কেন্দ্রে চিকিৎসক ও লাইসেন্স
ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৭০ হাজার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য অঞ্চলগুলো বিদেশি পেশাজীবী এবং বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইন্দোনেশীয়দের কাজে লাগাতে চায়। একই সঙ্গে দেশের চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের সুযোগ দিতে চায়।
প্রকল্পের জন্য বর্ণিত ব্যবস্থার আওতায় আন্তর্জাতিক চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা সানুরে কাজের লাইসেন্স পেতে পারেন। তবে তাঁদের কাজের অনুমতি এই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২১ অক্টোবরের ঘোষণায় স্বাস্থ্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইন্দোনেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য পেশাগত লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানান এয়ারলাঙ্গা।
বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের বাণিজ্য ও পরিচালন বিভাগের প্রধান নোয়েল ইয়েও ব্যাখ্যা করেন, হাসপাতালের লক্ষ্য রোগীদের জন্য আন্তর্জাতিক পেশাজীবীদের কাছে পাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ:
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ইন্দোনেশীয়দের অনেকেই ঠিক এই ধরনের পেশাজীবীর সেবা পাওয়ার জন্যই দেশ ছাড়েন,
হাসপাতালটির ইন্দোনেশীয় ভাসকুলার সার্জন রিও মারনোতো জার্মানিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের আগে ইন্দোনেশিয়ায় কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হতো। তাঁর মতে, দেশে ফেরা পেশাজীবীরা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক পদ্ধতি চালু করতে সহায়তা করতে পারেন।
রোগনির্ণয় কেন্দ্র ও স্টেম সেল গবেষণায় বিধিবিধানগত সহায়তারও আহ্বান জানান এয়ারলাঙ্গা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থাপনা ও প্রণোদনাবিষয়ক সংশোধন দ্রুত করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। রোগনির্ণয় কেন্দ্রে এমন পরীক্ষা করা হয়, যা চিকিৎসকদের রোগ শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসা বেছে নিতে সহায়তা করে। স্টেম সেল গবেষণায় এমন কোষ নিয়ে কাজ করা হয়, যেগুলো বিশেষায়িত কোষে রূপ নিতে পারে। তবে বিভিন্ন প্রয়োগের জন্য পৃথক বৈজ্ঞানিক ও বিধিবিধানগত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
রোগীরা কেন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান
বিনিয়োগ কর্মসূচির জন্য রোগীদের আস্থা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিভার্সিতাস ইন্দোনেশিয়ার গবেষণা প্রকাশনা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ইন্দোনেশীয়রা কেন বিদেশে যান শীর্ষক গুণগত গবেষণায় মাকাসার, সুরাবায়া ও বাতামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৮ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নেওয়া রোগীরাও ছিলেন।
গবেষকেরা চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্তে পাঁচটি প্রভাবক চিহ্নিত করেন: অন্যদের পরামর্শ, দেশের চিকিৎসাসেবায় অসন্তোষ, বিদেশে চিকিৎসার পূর্ব অভিজ্ঞতা, পরিবারের প্রভাব এবং চিকিৎসকের রেফারেল। সাক্ষাৎকারে ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অবিশ্বাসই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে উঠে আসে।
অংশগ্রহণকারীরা চিকিৎসার পরিকল্পনা, চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষের কথা জানান। দেশে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিদেশে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রোগীদের আবার বিদেশে যেতে এবং অন্যদেরও ওই সেবা নেওয়ার পরামর্শ দিতে উৎসাহিত করেছে।
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বোঝার জন্য গবেষণাটিতে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। তবে লেখকেরা বলেন, তথ্যের পূর্ণ স্যাচুরেশন নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সহজভাবে বললে, আরও সাক্ষাৎকার নিলে নতুন বিষয় উঠে আসা বন্ধ হবে—এ বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। তাঁদের সুপারিশ ছিল, রোগীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা।
ইন্দোনেশীয় রোগীদের ধরে রাখতে চাওয়া হাসপাতালের ক্ষেত্রে তাই সরঞ্জামের পাশাপাশি চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে রোগনির্ণয়, প্রস্তাবিত চিকিৎসা এবং এরপর কী হবে—তা বুঝতে হবে। দেশের চিকিৎসাসেবা বেছে নিতে রোগীর স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ওপর পরিবারের সদস্য ও আগে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদেরও প্রভাব রয়েছে।
পর্যটন অঞ্চলের বাইরেও বিনিয়োগ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বৃহত্তর কর্মসূচিতে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতাল ও প্রযুক্তিকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামবিষয়ক মহাপরিচালক রিজকা আন্দালুসিয়া জানিয়েছেন, সি-শ্রেণি বা মধ্যম পর্যায়ের হাসপাতাল নেই—এমন ৬৬টি জেলা ও শহরের হাসপাতাল উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অগ্রণী হাসপাতালগুলোতে আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হলো ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং মূত্ররোগ ও নেফ্রোলজি—যার আওতায় মূত্রতন্ত্র ও কিডনির চিকিৎসা পড়ে। মন্ত্রণালয়ের মতে, এসব কারণে ইন্দোনেশীয়রা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। পরিকল্পিত প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে রোবটের সহায়তায় অস্ত্রোপচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনোমিক্স ও প্রোটন থেরাপি।
রোবটের সহায়তায় অস্ত্রোপচারে সার্জনরা অপারেশনের সময় বিশেষ যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেন। জিনোমিক্সে জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, যা রোগনির্ণয় বা চিকিৎসা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। প্রোটন থেরাপিতে ক্যানসারের বিরুদ্ধে বিকিরণ দিতে প্রোটন রশ্মি ব্যবহার করা হয়। কর্মসূচির রূপরেখা দেওয়ার সময় মন্ত্রণালয় জানায়, এই সেবা তখনো ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যেত না।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোও রোবটের সহায়তায় অস্ত্রোপচার ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনে বিনিয়োগ করছে। নিউক্লিয়ার মেডিসিনে রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়। সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য বিনিয়োগের নিয়ম সহজ করা, যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর চায় মন্ত্রণালয়। কালবে ফার্মা ও জিই হেলথকেয়ারের অংশীদারত্বে ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় সিটি স্ক্যানার তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় ছিল ৬১৩ ট্রিলিয়ন রুপি, ২০২৪ সালে ৬৩০ ট্রিলিয়ন এবং ২০২৫ সালে আনুমানিক ৬৬০ ট্রিলিয়ন রুপি। ২০২৩ সালের অঙ্ক থেকে ২০২৫ সালের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৭ ট্রিলিয়ন রুপি বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তাই চিকিৎসা পর্যটনে বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় পরিসরের বৃদ্ধি এবং হাসপাতালসেবায় মৌলিক ঘাটতি পূরণের প্রচেষ্টাও চলছে।
পরবর্তী পর্যায়ে বিদেশি রোগী ও কর্মসংস্থান
সানুর অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, আসিয়ানের অন্যান্য দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রোগীদের লক্ষ্য করছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের নিবন্ধিত রোগীদের ৪০ শতাংশ ইন্দোনেশীয় এবং ৬০ শতাংশ বিদেশি; তাঁদের মধ্যে ৩০টির বেশি দেশের মানুষ রয়েছেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিকিৎসা পর্যটন বাজারে অবস্থান গড়ার চেষ্টায় এই আন্তর্জাতিক রোগীরাই হাসপাতালটির বিদ্যমান ভিত্তি। বাজারটির মূল্য ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে হিসাব করা হয়েছে এবং বছরে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে। চিকিৎসাসেবা ও আবাসনের সমন্বয় সানুরকে চিকিৎসাবাবদ ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসার কারণে দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী রোগীদের আকর্ষণেও প্রতিযোগিতায় রাখছে।
কর্মসংস্থানের প্রাক্কলনেও বিভিন্ন পরিসর রয়েছে। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিষদের ২০২২ সালের প্রস্তাবে ১০ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুপি বিনিয়োগ এবং ৪৩ হাজার ৬৪৭টি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে প্রকল্প কর্মকর্তারা চিকিৎসা ও আতিথেয়তাসেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে তিন বছরে ১২ হাজার কর্মসংস্থানের প্রত্যাশার কথা জানান।
২০২৫ সালের জুনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তোহির বলেন, সরকার অন্যান্য অঞ্চলেও সানুরের মডেল চালু করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে সহায়তার জন্য দানান্তারার প্রধান নির্বাহী রোসান পারকাসা রোসলানির সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বানও জানান তিনি। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থাটি পরিচালনা ও টেকসই বিনিয়োগে গুরুত্ব দেবে।
সানুরের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো, স্থাপনা, লাইসেন্সের পরিবর্তন ও অংশীদারত্বকে এমন সেবায় রূপ দেওয়া, যা রোগীরা বারবার বেছে নেবেন। বাতামকে অন্তর্ভুক্ত করায় সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে, অন্যান্য অঞ্চলে হাসপাতাল উন্নয়নের উদ্যোগ চিকিৎসা পর্যটনের বাইরের প্রয়োজনগুলোও পূরণ করবে। এসব প্রচেষ্টা মিলিয়ে ব্যয় দেশে ধরে রাখার লক্ষ্যটি যুক্ত হচ্ছে প্রতিটি রোগীর বাস্তব প্রশ্নের সঙ্গে: প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তাঁরা কোথায় পাবেন।
মূল বিষয়গুলো
- ইন্দোনেশীয় রোগীদের দেশে রেখে ১৫০ ট্রিলিয়ন রুপি সাশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক রোগীদের কাছ থেকে ২০০ ট্রিলিয়ন রুপি আয়ের লক্ষ্য নিয়েছেন এয়ারলাঙ্গা।
- সাশ্রয়ের হিসাব ধরে নেওয়া হয়েছে, ২০ লাখ রোগী প্রত্যেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি ব্যয় করবেন; আর আয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে ১২ লাখ ৫০ হাজার বিদেশি রোগীর প্রত্যেকে ১৬ কোটি রুপি ব্যয়ের ভিত্তিতে।
- সানুরে বালি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল, বিশেষায়িত সেবা ও আবাসন রয়েছে; স্বাস্থ্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কৌশলের অংশ বাতামও।
- প্রায় ৭০ হাজার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতির মধ্যে ইন্দোনেশীয় ও বিদেশি চিকিৎসা পেশাজীবীদের আকর্ষণে লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।
- রোগীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক গবেষণায় বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস, সেবায় অসন্তোষ ও ব্যক্তিগত সুপারিশকে বড় প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- সানুরের মূল পরিকল্পনায় ২০৩০ ও ২০৪৫ সালের মাইলফলক রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় আর্থিক লক্ষ্যগুলোর কোনো ঘোষিত সময়সীমা নেই।






