শেষ গন্তব্যের জন্য সঞ্চিত এক যাত্রা
তান ১০ অক্টোবর জিয়াংসু প্রদেশের উশি থেকে রওনা হয়ে ১২ অক্টোবর লাসায় পৌঁছান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনযাত্রায় সময় লেগেছিল ৪৩ ঘণ্টা। ৯৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী স্মার্টফোন ব্যবহার করে নিজেই টিকিট, হোটেল ও দর্শনীয় স্থান ঘোরার ব্যবস্থা করেছিলেন। বয়সের কারণে একটি ট্রাভেল এজেন্সি তাঁকে নিতে রাজি না হওয়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।
সূচিপত্র
- শেষ গন্তব্যের জন্য সঞ্চিত এক যাত্রা
- সিনচিয়াংয়ের পর কেন তিব্বত
- ব্যবস্থাপনার ভার সামলেছে স্মার্টফোন
- একা ভ্রমণেও সহায়তা পেয়েছেন
- বিখ্যাত স্থাপনার বাইরেও লাসা
- ১৬ অক্টোবর পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা এগিয়ে আসেন
- স্ত্রী ও মেয়ে কেন বাড়িতে ছিলেন
- ভ্রমণমুখী জীবনের আগে রেলের চাকরি
- স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন অভ্যাস ও পরের গন্তব্য
- মূল বিষয়গুলো
তিব্বতে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তিনি চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের একটি জাতীয় সফরসূচি সম্পন্ন করেন। সফরটি শুরু হয়েছিল বেইজিং থেকে এবং তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত অনুযায়ী, চীনের ৩৪টি প্রাদেশিক প্রশাসনিক অঞ্চলই এর আওতায় পড়েছে। তিব্বতকে তিনি শেষের জন্য রেখেছিলেন, কারণ তাঁর বিবেচনায় এটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন গন্তব্য।
অনলাইনে তাঁকে ব্যাপকভাবে ‘দাদু তান’ নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, বয়স বলা হয় ৯৬। তবে পূর্ণ বছর হিসেবে তাঁর বয়স ৯৪। উশিতে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী বয়স গণনার কারণে বেশি সংখ্যাটি ব্যবহৃত হয়। তাঁর নিজের হিসাবে ট্রেনযাত্রায় সময় লেগেছিল ৪৩ ঘণ্টা, যদিও ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর ক্যাপশনে ৪৮ ঘণ্টার কথা বলা হয়েছিল।
তান জানান, লাসায় পৌঁছে তিনি ভালো বোধ করছিলেন এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি। তিনি পোটালা প্রাসাদ ও জোখাং মন্দিরের আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরেছেন, নগরবাসে চড়েছেন। পরে লাসার পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা তাঁকে তিব্বত জাদুঘর ও নরবুলিংকায় নিয়ে যান।
নিজের উদ্যোগে ভ্রমণ করায় তান প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের কেন সঙ্গে ছিলেন না—এ নিয়ে তাঁদের বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মুখেও পড়তে হয়েছে। তান ব্যাখ্যা করেন, তাঁর স্ত্রীর বয়স ৮০-এর বেশি এবং মেয়ের ৬০ পেরিয়েছে। তাঁদের স্বাস্থ্যের ওপর ভ্রমণের চাপ পড়তে পারে—এই উদ্বেগের কারণেই তিনি আংশিকভাবে একা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বহুল প্রচারিত এই যাত্রার পেছনের বিবরণে কয়েক ধরনের সহায়তার কথা উঠে আসে: প্রযুক্তি তাঁকে নিজে ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেছে, অপরিচিতরা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় পাশে দাঁড়িয়েছেন, আর স্থানীয় কর্মীরা তাঁর পরিকল্পনাকে সম্মান জানিয়ে সহায়তা দিয়েছেন।
সিনচিয়াংয়ের পর কেন তিব্বত
লাসায় তানের এই সফরের আগে আরেকটি কঠিন যাত্রা ছিল। সেপ্টেম্বরে তিনি সিনচিয়াং ঘুরে বাড়ি ফেরেন এবং আবার রওনা হওয়ার আগে প্রায় ২০ দিন বিশ্রাম নেন। দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা তাঁর কাছে নতুন ছিল না: এর আগে ইউনান সফরে তিনি ট্রেনে প্রায় ৪০ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন।
জাতীয় সফরসূচির আগের ৩৩টি গন্তব্যে তাঁর আত্মীয়রা তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। তিব্বতের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। দীর্ঘ ভ্রমণের সঙ্গে উচ্চতাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি যুক্ত হওয়ায় পরিবার ও বন্ধুরা এ যাত্রার বিরোধিতা করেন। পথে দেখা এক ট্রেনের কর্মীও তাঁকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন।
তান প্রথমে একটি সংগঠিত ভ্রমণদলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বয়সের কারণে একটি এজেন্সি তাঁকে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর তিনি নিজেই সব ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেন। আগের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাসের কারণ হতে পারে, যদিও আশপাশের মানুষ তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
তাঁর সাম্প্রতিক ভ্রমণের প্রধান ধাপগুলো ছিল:
- সেপ্টেম্বর: তান সিনচিয়াং সফর শেষ করেন, এরপর বাড়িতে প্রায় ২০ দিন বিশ্রাম নেন।
- ১০ অক্টোবর: উশি থেকে লাসার উদ্দেশে রওনা হন।
- ১২ অক্টোবর: তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৩ ঘণ্টার যাত্রা শেষে লাসায় পৌঁছান।
- ১৬ অক্টোবর: লাসার পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে তিব্বত জাদুঘর ও নরবুলিংকায় নিয়ে যান। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠনের একজন প্রতিনিধিও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ব্যবস্থাপনার ভার সামলেছে স্মার্টফোন
তান চীনের রেল টিকিট বুকিং সেবা 12306-এর মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট কেনেন এবং একটি মোবাইল অ্যাপে হোটেল বুক করেন। গাড়ি ডাকার জন্যও তিনি অ্যাপ ব্যবহার করেন। এসব কাজ তিনি নিজেই করেছেন; আগেভাগে তাঁর পরিবারের কেউ ব্যবস্থা করে দেননি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয় আগের বছর, মেয়েকে ফোনে প্রশ্ন করতে দেখে। কৌতূহলবশত তিনি একটি এআই সহকারী ডাউনলোড করেন এবং ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য খুঁজতে সেটি ব্যবহার করতে শেখেন।
লাসার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি উচ্চতা, দর্শনীয় স্থান ও যাতায়াতের পথ সম্পর্কে জানতে ওই সহকারীর সাহায্য নেন। নিজের বয়সের কেউ এ যাত্রা করতে পারবেন কি না, সেটিও জিজ্ঞাসা করেন। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর পাননি। এআই সহকারী তথ্য গুছিয়ে দিতে ও ভ্রমণসূচি প্রস্তাব করতে পারে; ভ্রমণের জন্য কারও শারীরিক সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হলে তাঁর স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন দরকার।
তানের ভ্রমণ-পরিকল্পনার অভ্যাসে তাঁর যাতায়াতের ধরনে এক বাস্তব পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি মনে করেন, একসময় রেলের টিকিট কিনতে কাউন্টারে লাইনে দাঁড়াতে হতো, থাকার জায়গা প্রায়ই পৌঁছানোর পর খুঁজতে হতো এবং স্থানীয় তথ্য জানার প্রধান উৎস ছিলেন হোটেলের কর্মীরা। এখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই ফোনে এসব কাজের অনেকটাই সেরে নিতে পারেন।
তাঁর কাছে ডিজিটাল দক্ষতা স্বাধীনভাবে ভ্রমণকে বাস্তব অর্থেই সহজ করেছে: অন্য কাউকে প্রতিটি ধাপ সামলাতে না বলেই তিনি থাকার ঘর নিশ্চিত করতে, পথ বেছে নিতে এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে পারেন।
একা ভ্রমণেও সহায়তা পেয়েছেন
তান ট্রেনে ওপরের বার্থ বুক করেছিলেন। একই কামরার এক তরুণী নিজের নিচের বার্থটি তাঁর সঙ্গে বদলে নেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ভাড়ার পার্থক্যের টাকা নিতে অস্বীকার করেন। এতে তাঁর শোবার জায়গায় ওঠানামা সহজ হয়।
লাসা রেলস্টেশনে কর্মীরা তাঁকে হুইলচেয়ার দেন এবং অ্যাপে ডাকা গাড়ির জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। হোটেলের কর্মীরাও তাঁর ভ্রমণসূচি এবং কোনো সহায়তা দরকার কি না, তা জানতে চান।
চলাফেরায় তানের একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, ছোটবেলায় তাঁর বাঁ পায়ের পেশি ক্ষয় হয়েছিল। পায়ের ব্যায়াম করতে তিনি বহু বছর সাইকেল চালিয়েছেন। অবস্থার উন্নতি হলেও অনেক সিঁড়ি আছে—এমন জায়গায় কোনো সহায়ক উপকরণ বা অন্যের সাহায্য ছাড়া চলা কঠিন হতে পারে। তিনি হাঁটার লাঠিও ব্যবহার করেন।
এসব বিবরণে বোঝা যায়, পুরো যাত্রায় সহায়তা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোথায় যাবেন তা পরিকল্পনা, বুকিং ও নির্বাচনের কাজ তিনি নিজেই করেছেন; তবে বার্থে ওঠা, স্টেশনে যাতায়াত কিংবা সিঁড়ি ব্যবহারের সময় সাহায্য নিয়েছেন। কখনো কঠিন প্রবেশপথের কারণে কোনো দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব হয়নি।
তাঁর যাত্রায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে ব্যবহারিক সহায়তারও সমন্বয় ছিল। বুকিংয়ের কাজ করেছে ফোন, আর শারীরিক পরিবেশে যেখানে প্রয়োজন হয়েছে, মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বিখ্যাত স্থাপনার বাইরেও লাসা
তানের দর্শনীয় স্থানের তালিকায় ছিল পোটালা প্রাসাদ চত্বর, জংজিয়াও লুকাং পার্ক, জোখাং মন্দির, তিব্বত জাদুঘর ও নরবুলিংকা। রাতে লাসা নদীতে ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয় তাঁর। ছবির জন্য তিনি তিব্বতি পোশাক পরেছিলেন।
সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি শহরের রাস্তাঘাটও তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল। শুধু পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে যাতায়াত না করে দৈনন্দিন জীবন দেখতে তিনি বিভিন্ন পাড়ায় বাস ও ট্যাক্সিতে ঘুরেছেন।
ভ্রমণের পথে তানের একটি পরিচিত রুটিন গড়ে উঠেছে: শহরের ইতিহাস জানতে জাদুঘরে যাওয়া, রাতের বাজার ঘোরা, গণপরিবহনে চড়া এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা। শুধু গন্তব্যের সংখ্যা বাড়ানোর বাইরেও তাঁর দেশজুড়ে ভ্রমণসূচিতে এসব পছন্দ বিশেষ তাৎপর্য যোগ করেছে।
যাত্রা করা অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী তান জানান, তরুণ দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করে তাঁর কেমন লেগেছে:
এই ভ্রমণটি আমার খুব উপভোগ্য হয়েছে। পোটালা প্রাসাদে অনেক তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে গল্প করে খুব আনন্দ পেয়েছি। নিজেকেও তরুণ মনে হয়েছে।
লাসা নিয়ে তাঁর বর্ণনায় এসব আলাপচারিতার পাশাপাশি দর্শনীয় স্থানের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তার কথাও উঠে এসেছে। শহরের স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি কথাবার্তা ও দৈনন্দিন যাতায়াতও তাঁর সফরের অংশ ছিল।
১৬ অক্টোবর পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা এগিয়ে আসেন
অনলাইনে তানের গল্প নজর কাড়ার পর লাসার সংস্কৃতি ও পর্যটন ব্যুরো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁর সম্মতি নিয়ে কর্মীরা ১৬ অক্টোবর দুপুরে তাঁর হোটেলে যান, পরিকল্পনা জানতে চান এবং সহায়তার প্রস্তাব দেন।
তাঁরা তিব্বত জাদুঘর ও নরবুলিংকার প্রবেশের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং তাঁকে দুই জায়গাতেই সঙ্গ দেন। বেড়ানোর সময় তিনি প্রদর্শনী দেখেন ও ছবি তোলেন। নরবুলিংকায় তিব্বতি পোশাক পরা অবস্থায় তোলা ছবিও ছিল।
কর্মীরা জানান, তিনি সজাগ ছিলেন এবং সহজেই কথাবার্তা বলতে পারছিলেন। তাঁদের ক্লান্ত লাগছে কি না, তা তিনি বারবার জানতে চান বলেও তাঁরা জানান। তাঁকে তিব্বতি অপেরার পরিবেশনায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
তানের জন্য কঠিন এক সময়ে এই সাক্ষাৎ হয়। পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে অনলাইনে করা অপমানজনক মন্তব্যের কথা তিনি জানতে পেরেছিলেন। এতে এতটাই মন খারাপ হয়েছিল যে সেদিন সকালে তিনি বাইরে যাননি। পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা আশ্বস্ত করলে এবং দর্শনীয় স্থান ঘুরতে সাহায্য করলে তাঁর মন ভালো হয়।
স্ত্রী ও মেয়ে কেন বাড়িতে ছিলেন
তান বলেন, পরিবারের সদস্যদের বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই তাঁরা তাঁর সঙ্গে যাননি। তাঁর স্ত্রীর বয়স ৮০-এর বেশি, আর মেয়ের ৬০ পেরিয়েছে। সম্প্রতি একসঙ্গে ছংছিং সফরে গেলে যাত্রাপথে তাঁর মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
তিব্বতে একা যাওয়ার সিদ্ধান্তে ওই অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলেছিল। তান বলেন, নিজের কারণে স্ত্রী ও মেয়েকে আরেকটি ক্লান্তিকর সফরের ভোগান্তিতে ফেলতে চাননি। তাঁর যাত্রা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের পাশাপাশি, তাঁকে সঙ্গ দিতে তাঁদের কী করতে হবে, তা নিয়েও তাঁর নিজের উদ্বেগ ছিল।
তাই পরিবারকে লক্ষ্য করে করা অনলাইন সমালোচনায় তিনি কষ্ট পান। অনেক দর্শক তাঁর দৃঢ়তার প্রশংসা করলেও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, আত্মীয়রা তাঁকে একা ভ্রমণে যেতে দিলেন কেন; তাঁদের ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যও করা হয়।
তানের ব্যাখ্যায় পরিবারের তিনজনের বয়সই সামনে আসে। ৬০ পেরোনো মেয়েরও স্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার সীমা থাকতে পারে, আর ৮০ পেরোনো স্ত্রীর জন্যও দীর্ঘ যাত্রা কষ্টকর। এই পরিবারের জন্য একসঙ্গে ভ্রমণ করা আগেই কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
ভ্রমণমুখী জীবনের আগে রেলের চাকরি
তানের পরিবারের শিকড় গুয়াংদংয়ের তাইশানে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মালয়েশিয়ায়। ১৯ বছর বয়সে তিনি চীনে ফিরে আসেন এবং ১৯৫৪ সালে সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচিতে যানবাহন উৎপাদন বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
১৯৫৯ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি নানজিংয়ের পুঝেন রেলগাড়ি কারখানায় কাজ করেন, যা এখন সিআরআরসি নানজিং পুঝেন নামে পরিচিত। ১৯৮৮ সালে অবসর নেওয়ার পর তিনি স্ত্রীর আদি শহর উশিতে বসবাস শুরু করেন। কর্মজীবনে তিনি নিয়মিত নানজিং ও উশির মধ্যে যাতায়াত করতেন।
অবসরের পর তরুণ বয়সে উপভোগ করা একটি আগ্রহে ফেরার সময় পান তিনি। কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে এর আগে ভ্রমণের সুযোগ খুব কম ছিল।
১৬ অক্টোবর সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয়ের উশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠনের সেক্রেটারি ইউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে তিব্বতে কেমন আছেন জানতে চান এবং শুভেচ্ছা জানান। তান বলেন, লোকজন তাঁর দেখাশোনা করছেন। উশিতে ফেরার পর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার যাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন অভ্যাস ও পরের গন্তব্য
নিয়মিত চলাফেরা ও ভ্রমণকে নিজের সুস্থতার অন্যতম কারণ মনে করেন তান। তিনি বলেন, সাধারণত রাতের খাবারের পর তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটেন। পড়া বা টেলিভিশন দেখার সময় অন্তত প্রতি ঘণ্টায় একবার উঠে দাঁড়ান। প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়েন, নিয়ম মেনে চলেন এবং সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেন।
লাসায় ভালো বোধ করার কথা জানালেও সফরের আগে উদ্বেগ ছিল। অধিক উচ্চতায় বায়ুচাপ কম থাকায় প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে শরীরে কম অক্সিজেন পৌঁছায় এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শরীরের সময় লাগে। বয়স্ক ভ্রমণকারী, বিশেষত হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, রওনা হওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
বিশ্রাম, সামাল দেওয়া যায় এমন ভ্রমণসূচি এবং পরিবারের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ—মালভূমি অঞ্চলে যাওয়ার বাস্তব প্রস্তুতির অংশ। ভ্রমণকারীদের আবহাওয়ার খোঁজ নেওয়া, উপযোগী পোশাক সঙ্গে রাখা এবং অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসা নেওয়াও উচিত। তানের চলাফেরার অসুবিধার কারণে সহজে ওঠানামা করা যায় এমন যানবাহন এবং সিঁড়িতে সহায়তা বিশেষ কাজে লেগেছিল।
তিব্বত সফরের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘোরার এই পর্যায়টি শেষ হয়েছে, তবে তান ইতিমধ্যে আরও কিছু গন্তব্যের কথা ভাবছিলেন। পিংলু খাল দেখতে গুয়াংসিতে যাওয়া এবং শহরটি কতটা বদলেছে দেখতে হেফেইয়ে আবার যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল। কোনো সফরের তারিখ জানানো হয়নি।
তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনাও লাসায় সময় কাটানোর পেছনের সেই আগ্রহের ধারাবাহিকতা: নিজের চোখে জায়গা দেখা, সেখানকার উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করা এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।
মূল বিষয়গুলো
- পূর্ণ বছর হিসেবে তানের বয়স ৯৪; স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বয়স গণনায় তাঁকে ব্যাপকভাবে ৯৬ বছর বয়সী বলা হয়।
- ১০ অক্টোবর উশি থেকে একা রওনা হয়ে ১২ অক্টোবর লাসায় পৌঁছান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনযাত্রায় সময় লেগেছিল ৪৩ ঘণ্টা।
- স্মার্টফোনে নিজেই যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা করেন এবং ভ্রমণসূচি সম্পর্কে জানতে এআই সহকারী ব্যবহার করেন।
- এক সহযাত্রী, রেলকর্মী, হোটেলের কর্মী এবং লাসার পর্যটন দপ্তরের কর্মীরা যাত্রাপথে তাঁকে সহায়তা করেন।
- উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি বলে জানান তিনি, যদিও পায়ের সমস্যার কারণে কিছু সিঁড়ি ব্যবহার করা কঠিন ছিল।
- দীর্ঘ যাত্রার চাপ এবং নিজেদের বয়সের কথা বিবেচনা করে স্ত্রী ও মেয়ে বাড়িতে ছিলেন বলে জানান তান।
- তিব্বত সফরে দেশজুড়ে ভ্রমণসূচি শেষ করার পর গুয়াংসি ও হেফেই যাওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।






