চেন্নাইয়ের গানা ছন্দ থেকে ৪০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র
রজনীকান্তের বিখ্যাত ‘সুপারস্টার’ টাইটেল কার্ডে সুর দেওয়া এবং চেন্নাইয়ের গানা ছন্দকে মূলধারার সিনেমায় পৌঁছে দেওয়া সংগীত পরিচালক দেবা ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে চেন্নাইয়ে মারা যান। তামিলনাড়ু রাজ্যের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ১৮ অক্টোবর রানিপেট জেলার আরকটের কাছে মাঙ্গাডুতে তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়েছিল।
সূচিপত্র
- চেন্নাইয়ের গানা ছন্দ থেকে ৪০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র
- টেলিভিশনের কর্মী, যাঁর পিয়ানো বাজানো শোনা গিয়েছিল
- যে চলচ্চিত্রগুলো তাঁর উত্থান চিহ্নিত করেছিল
- রজনীকান্তের টাইটেল সংগীত কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
- গানা, নাচের গান ও শান্ত সুর
- জনজীবনের অংশ হয়ে ওঠা গান
- তাঁর সুরকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে মালয়েশিয়া
- ‘পাডায়াপ্পা’ নিয়ে কঠিন কথোপকথন
- যে পরিচালককে তিনি নিজের বলে ডাকতেন
- তরুণ দর্শকদের কনসার্টে এল নতুন প্রাণ
- মূল তথ্য
ভক্ত ও সহকর্মীদের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দিতে ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টা পর্যন্ত চেন্নাইয়ের টি. নগরে তাঁর বাসভবনে মরদেহ রাখার কথা ছিল। এরপর তা তাঁর জন্মগ্রামে নিয়ে যাওয়ার কথা। উত্তর চেন্নাইয়ের গানা সংগীতশিল্পীরাও তাঁর বাড়িতে জড়ো হওয়া মানুষের মধ্যে ছিলেন।
উপরাষ্ট্রপতি সি.পি. রাধাকৃষ্ণন বলেন, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় ভাষার ৪০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে সুর করেছেন দেবা। তাঁর কাজের পরিধিতে ছিল ‘আন্নামালাই’ ও ‘বাশা’ থেকে ‘আসাই’ ও ‘কাধল কোট্টাই’-এর রোমান্টিক সাউন্ডট্র্যাক, পাশাপাশি কমল হাসানের কমেডি ‘আভাই শানমুখী’ ও ‘পঞ্চতন্ত্রম’।
হাসপাতালের বিবরণে বলা হয়, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সূর্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিচালক সুরেশ কৃষ্ণ জানান, দেবার ছেলে তাঁকে বলেছিলেন, ঘুম থেকে উঠে, দাড়ি কামিয়ে কফি পান করার পর হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে বিস্তারিত চিকিৎসা বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
দেবার পরিচিত সাদা পোশাক, কর্কশ-খসখসে কণ্ঠে গান গাওয়া এবং সহজ রসবোধ তাঁকে রেকর্ডিং স্টুডিওর বাইরেও পরিচিত করে তুলেছিল। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ছিল তাঁর ব্যস্ততম সময়। প্রতিষ্ঠিত ইলাইয়ারাজার পাশাপাশি এবং তখন উঠে আসা এ.আর. রহমানের সমসাময়িক হিসেবে তিনি বিপুল শ্রোতাগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। তাঁর গান সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবের জমায়েত, বিদেশের কনসার্ট হল, এমনকি সিঙ্গাপুরের এক সাবেক প্রেসিডেন্টের বিদায় অনুষ্ঠানেও পৌঁছেছিল।
টেলিভিশনের কর্মী, যাঁর পিয়ানো বাজানো শোনা গিয়েছিল
১৯৫০ সালের ২০ নভেম্বর দেবনেসন চক্কালিঙ্গম নামে জন্ম নেওয়া দেবা সংগীত পরিচালনায় আসার পথে আলোচনার আড়ালে থেকেও কাজ করেছেন। দূরদর্শনের সাবেক পরিচালক এম.এস. পেরুমল স্মরণ করেন, তিনি ফ্লোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং টেলিভিশন প্রযোজনার বাস্তব কাজগুলোতে সহায়তা করতেন।
পেরুমল বলেন, একবার স্টুডিও সেট পরিদর্শন শেষে ফেরার সময় তিনি পিয়ানোর শব্দ শুনতে পান। শব্দ অনুসরণ করে গিয়ে দেখেন, তরুণ দেবনেসন বাজাচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পেরুমল জানতে পারেন, অভিনেত্রী মনোরমাকে নিয়ে মঞ্চনাটকের জন্য তিনি ইতিমধ্যে চন্দ্রবোসের সঙ্গে সংগীত তৈরি করছেন।
এরপর পেরুমল তাঁকে ‘ভায়ালুম ভাঝভুম’-এ সুর করার ব্যবস্থা করে দেন; গীতিকার ছিলেন থোন্দরামপাট্টু বাসু। পরে টেলিভিশন নাটকেও কাজের সুযোগ আসে। পেরুমলের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন ফ্লোর অ্যাসিস্ট্যান্টকে সংগীতের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে কিছু সহকর্মী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু তিনি দেবাকে সমর্থন করে গেছেন।
চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ আসার পর দেবা পেরুমলের পরামর্শ চান। পেরুমল তাঁকে চাকরি ছেড়ে সিনেমায় মন দিতে উৎসাহিত করেন। তাঁর কর্মজীবনে তামিলনাড়ু গণপূর্ত বিভাগে কাজ করার সময়ও ছিল, যদিও সেই চাকরিগুলোর সময়কাল উল্লেখ করা হয়নি।
অভিনেতা শরৎকুমারও আলাদাভাবে স্মরণ করেছেন, চলচ্চিত্রজগতে দেবাকে পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁর নিজের ভূমিকার কথা। এসব স্মৃতিচারণে বেতনের চাকরি ও মঞ্চের সংগীত থেকে বাণিজ্যিক সিনেমায় দেবার যাত্রাপথে একাধিক মানুষের উপস্থিতি উঠে আসে।
যে চলচ্চিত্রগুলো তাঁর উত্থান চিহ্নিত করেছিল
১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাট্টুক্কারা মান্নারু’ চলচ্চিত্রে দেবার সংগীত পরিচালক হিসেবে অভিষেক হয়। ১৯৯০ সালে ‘ভাইকাসি পোরান্থাচু’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং সেরা সংগীত পরিচালকের জন্য তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারও এনে দেয়। ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আন্নামালাই’ হয়ে ওঠে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় মোড়।
পরে ‘আসাই’-এর জন্য স্বীকৃতি এবং তামিলনাড়ু সরকারের কালাইমামানি পুরস্কার পান দেবা। তিনি ‘থেনিসাই থেন্দ্রাল’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন; তামিল এই উপাধির অর্থ মিষ্টি সুরের বাতাস।
তাঁর শ্রোতাগোষ্ঠী কীভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, ক্যারিয়ারের প্রধান পর্যায়গুলোতে তা দেখা যায়:
- ১৯৮৬: ‘মাট্টুক্কারা মান্নারু’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর অভিষেক।
- ১৯৯০: ‘ভাইকাসি পোরান্থাচু’ এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি এবং প্রথম রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার।
- ১৯৯২: ‘আন্নামালাই’-এর মাধ্যমে সুরেশ কৃষ্ণের সঙ্গে সহযোগিতা শুরু হয় এবং রজনীকান্তের চিরচেনা ‘সুপারস্টার’ টাইটেল উপস্থাপনার সূচনা হয়।
- ১৯৯৫: ‘বাশা’ রজনীকান্তের পর্দার ভাবমূর্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।
- ১৯৯৭: ‘পোরক্কালাম’-এ ছিল ‘থাঞ্জাভুরু মান্নু এদুথু’, যা পরে সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট এস.আর. নাথানের সঙ্গে যুক্ত হয়।
- ২০২৩: কুয়ালালামপুরের কনসার্টের আগে দেবা বলেন, তাঁর সুর বিশ্বজুড়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে মালয়েশিয়ার শ্রোতারা সহায়তা করেছেন।
- ১৮ অক্টোবর, ২০২৬: পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।
১৯৯০-এর দশকে তাঁর কাজের পরিমাণ ছিল বিশেষভাবে বেশি। ১৯৯৬ সালে ৩৬টি চলচ্চিত্রে সংগীত দেওয়ার কৃতিত্ব তাঁর; অর্থাৎ ওই বছর প্রতি মাসে গড়ে তিনটি চলচ্চিত্র। ক্যারিয়ারের শীর্ষে তাঁর কাজের চাহিদা কতটা ছিল, এই সংখ্যাটি তা তুলে ধরে।
রজনীকান্তের টাইটেল সংগীত কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
‘আন্নামালাই’ দর্শকদের এমন এক সংগীতময় সূচনা উপহার দেয়, যা রজনীকান্তের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ‘সুপারস্টার’ টাইটেল কার্ডের সংগীত রচনা করেন দেবা। এতে অভিনেতার নাম পর্দায় ভেসে ওঠাটাই গল্প শুরুর আগে দর্শকের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরির মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
‘আন্নামালাই’-এর পরিচালক সুরেশ কৃষ্ণ স্মরণ করেন, দর্শকেরা রজনীকান্তকে যে উপাধিতে ডাকতেন, সেটিকে দৃশ্যমান লোগোতে রূপ দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। নির্মাতাদের কারিগরি উপকরণ ছিল সীমিত, আর এই উপস্থাপনা কতক্ষণ চলবে সে সম্পর্কেও তাঁদের ধারণা ছিল না। কৃষ্ণ বলেন, এটি ‘জেলার ২’ পর্যন্তও চলেছে।
রজনীকান্ত ‘আন্নামালাই’, ‘বাশা’ ও ‘অরুণাচালাম’-কে তিনটি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন, যেগুলোতে দেবা সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। এসব চলচ্চিত্রে সুরকার গান ও নাটকীয় আবহসংগীত—দুটিই তৈরি করেন, যা দর্শকদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কোনো চরিত্রের উপস্থিতি চিনে নিতে সাহায্য করত।
তাঁর আবহসংগীত কমেডিতেও ভূমিকা রেখেছে। ‘সূরিয়ান’-এ গাউন্ডামানির দৃশ্যগুলোর সঙ্গে থাকা সুর চলচ্চিত্রটির পরিচিত আকর্ষণের অংশ হয়ে আছে। আবহসংগীত হলো দৃশ্যের নিচে বাজানো যন্ত্রসংগীত, যা উত্তেজনা তৈরি করে, কৌতুককে জোরালো করে অথবা দর্শকের আবেগকে পরিচালিত করে।
গানা, নাচের গান ও শান্ত সুর
চেন্নাইয়ের গানা সংগীতধারা দেবার জনপরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল। শহরের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর শিকড়; দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে এতে থাকে সরল ভাষা, স্থানীয় অভিব্যক্তি ও জোরালো ছন্দ। এই সুরকে আরও বড় সিনেমার দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেন দেবা।
আগের এক সাক্ষাৎকারে চেন্নাইয়ের সুরকার হিসেবে এই ধারার প্রতি নিজের টান ব্যাখ্যা করে দেবা বলেছিলেন:
আমি চেন্নাইয়ের মানুষ, আর গানা চেন্নাইবাসীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ... শুনতে হয়তো কাঁচা মনে হতে পারে, কিন্তু এই ধারার সংগীতবোধ অনেক গভীর।
তাঁর সংগীতসম্ভারে ছিল নাচের সঙ্গে যুক্ত প্রাণবন্ত কুথু, ভক্তিমূলক সুর এবং কোমল রোমান্টিক গানও। এই বৈচিত্র্যের ফলে তাঁকে একটিমাত্র সুরের ওপর নির্ভর না করে নানা ধরনের চলচ্চিত্রে কাজ করতে হয়েছে।
‘আসাই’, ‘কাধল কোট্টাই’, ‘নেরুক্কু নের’, ‘কালামেল্লাম কাধল ভাঝ্গা’ ও ‘আহা’ তাঁর সুরেলা দিকটি তুলে ধরে। ‘আভাই শানমুখী’, ‘পাম্মাল কে. সম্বন্ধম’ ও ‘পঞ্চতন্ত্রম’-এ কমল হাসান অভিনীত কমেডির সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর সংগীত। ‘ভালি’ ও ‘খুশি’ তাঁর চলচ্চিত্রতালিকাকে আরও বিস্তৃত করে; এতে রজনীকান্ত ও হাসানের পাশাপাশি অজিত ও বিজয়ের চলচ্চিত্রও ছিল।
দেবা নিজেও গান গাইতেন, আর তাঁর কণ্ঠের খসখসে বৈশিষ্ট্য কিছু গানে শ্রোতাদের কাছে তাঁকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। ডিএমকে সভাপতি এম.কে. স্ট্যালিন স্মরণ করেন, অনিরুদ্ধসহ তরুণ সুরকারদের জন্যও তিনি গান গেয়েছেন, ফলে তাঁর পরিচিত কণ্ঠ আরেক প্রজন্মের সংগীতে পৌঁছেছে।
জনজীবনের অংশ হয়ে ওঠা গান
স্ট্যালিনের স্মরণবার্তায় বলা হয়, দেবার গান কীভাবে মূল চলচ্চিত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ‘নান অটোকারান’-এর কথা বলেন, যা তামিলনাড়ুর অটোস্ট্যান্ডগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত; আর ‘ভারারু আজগার ভারারু’-এর কথা বলেন, যা মাদুরাইয়ের চিথিরাই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, চলচ্চিত্রের গান কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। পেশা নিয়ে লেখা গান শ্রমজীবীদের মধ্যে গর্বের এক যৌথ প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে। আরেকটি গান স্থানীয় ধর্মীয় উৎসবের চেনা সুর হয়ে প্রতি বছর উৎসবের সঙ্গে ফিরে আসতে পারে।
১৯৯৭ সালের ‘পোরক্কালাম’ চলচ্চিত্রের জন্য সুর করা ‘থাঞ্জাভুরু মান্নু এদুথু’ বিদেশে ভিন্ন এক পরিচিতি পায়। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট এস.আর. নাথানের এটি ছিল প্রিয় গান, এবং তাঁর বিদায় অনুষ্ঠানে গানটি বাজানো হয়। দেবা এই যোগসূত্রকে সম্মানের বলে বর্ণনা করেন।
প্রাণবন্ত নাচের গানের জন্য পরিচিত এক সুরকারের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের এই যোগসূত্র তাঁর কোমল সুরের প্রসারও তুলে ধরে। একটি চলচ্চিত্রের গান এমন ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল, যা জনসমক্ষে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠানে বাজানোর মতো তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তাঁর সুরকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে মালয়েশিয়া
দেবার শ্রোতাদের প্রসঙ্গে মালয়েশিয়া বিশেষ জায়গা পেয়েছে। ২০২৩ সালে কুয়ালালামপুরের এক কনসার্টের আগে তিনি বলেন, সেখানে শ্রোতাদের সাড়া তাঁর কিছু রোমান্টিক গানকে আরও বড় সাফল্য পেতে সাহায্য করেছে।
ভারতের বাইরে তাঁর সংগীতের সাড়া ব্যাখ্যা করে দেবা বলেছিলেন:
গানা গানের জন্য আমার পরিচিতি থাকলেও, মালয়েশিয়ার শ্রোতাদের মাধ্যমেই আমার সুরেলা গানগুলো বিশ্বজুড়ে হিট হয়েছে।
পার্থক্যটি বোঝাতে তিনি ‘কাধল কোট্টাই’-এর কথা বলেন। ‘কাভালাই পাডাথেই’ ভারতে বড় হিট হয়েছিল, আর মালয়েশিয়ার শ্রোতারা বিশেষভাবে সাড়া দিয়েছিলেন কোমল সুরের ‘নালাম নালামারিয়া আভাল’ গানটিতে। একই সাউন্ডট্র্যাক বিদেশের শ্রোতাদের কাছে অন্য একটি প্রিয় গান উপহার দেয়।
মালয়েশিয়ার ভক্তরা পর্দার আড়ালে কাজ করা সুরকার ও অন্য শিল্পীদের চিনতে পারেন বলেও দেবা খুশি হতেন। কনসার্টে এমন শ্রোতাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতেন তিনি, যাঁরা তাঁর সংগীত চিনতেন, যদিও স্রষ্টাকে তাঁরা খুব কমই পর্দায় দেখেছেন।
ভারতের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রশিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর কাজ। তেলুগু চলচ্চিত্রে তাঁর সুর করা কাজের মধ্যে ছিল ‘মাস্টার’, ‘থোলি প্রেমা’, ‘অটো ড্রাইভার’ ও ‘নাগা’। সুরেশ কৃষ্ণ জানান, তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও মালয়ালমে এবং ‘আনান্থা’-র একটি হিন্দি গানেও দেবার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
‘পাডায়াপ্পা’ নিয়ে কঠিন কথোপকথন
রজনীকান্তের স্মৃতিচারণে ছিল ‘পাডায়াপ্পা’য় এ.আর. রহমানকে নেওয়ার বিষয়ে দেবার সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার একটি ঘটনা। একসঙ্গে তিনটি সফল চলচ্চিত্র করার পর পরিবর্তনের কথা কীভাবে বলবেন, তা নিয়ে অভিনেতা দ্বিধায় ছিলেন।
রজনীকান্ত স্মরণ করেন, দেবা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মেলান এবং আন্তরিকভাবে এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। সেই প্রতিক্রিয়ার কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা দেবার বক্তব্য উদ্ধৃত করেন:
তিনি (রহমান) নতুন এবং প্রতিভাবান সুরকার। অবশ্যই, তাঁর সঙ্গে কাজ করো।
রজনীকান্ত দেবাকে সোনার হৃদয়ের মানুষ বলে বর্ণনা করেন। তিনি সুরকারের শুরুর দিকের সংগ্রামের কথাও স্মরণ করেন; ভাই ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করতে তিনি রাস্তায় ও বিয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন।
সফল হওয়ার পরও ভাইবোনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছিলেন দেবা। তাঁর ভাই সাবেশ ও মুরালি চলচ্চিত্রের সংগীত নিয়ে কাজ করতেন, আর ছেলে শ্রীকান্ত দেবা সুরকার হন। পেরুমল স্মরণ করেন, দেবা গর্ব করে বলতেন, সিনেমায় তাঁরা তাঁর সিনিয়র—কারণ তিনি শিল্পে আসার আগে তাঁরা টি. রাজেন্দরের জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন।
পেরুমল আরও স্মরণ করেন, দেবা কালাইমামানি পুরস্কার পেয়েছিলেন। পরে তামিলনাড়ু ইয়াল ইসাই নাটক মন্দ্রমের চেয়ারম্যান হিসেবে অন্য শিল্পীদের হাতে সেই সম্মান তুলে দেওয়ার অবস্থানেও পৌঁছান তিনি। তাঁর ক্যারিয়ার সুযোগের জন্য চেষ্টা করা থেকে অন্যদের স্বীকৃতি দিতে সহায়তা করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
যে পরিচালককে তিনি নিজের বলে ডাকতেন
সুরেশ কৃষ্ণ এমন এক বন্ধুত্বের কথা বলেন, যার শুরু ‘আন্নামালাই’ ছবিতে পেশাগতভাবে এবং পরে যা পারিবারিক সম্পর্কের মতো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তিনি জানান, ‘চারুকেশি’ ছিল তাঁদের একসঙ্গে করা শেষ চলচ্চিত্র; সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে ছিল ‘আনান্থা’।
কৃষ্ণের স্মৃতিতে, জনসমক্ষে ও ব্যক্তিগত পরিসরে দেবা ছিলেন সমান উষ্ণ, কৃতিত্ব ভাগ করে নিতে আগ্রহী এবং কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সংগীত নিয়ে কথা বললেই সবচেয়ে খুশি। পরিচালক বলেন, সম্প্রতি দেবা তাঁদের সম্পর্কের কথা এমন ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে বলেছিলেন:
সম্প্রতি তিনি এমন একটা কথা বলেছেন, যা আমাকে সত্যিই ছুঁয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সুরেশ কৃষ্ণ আমার পরিচালক।’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, অন্য কারও সম্পর্কে তিনি কখনো এমন বলবেন না।
এই বন্ধুত্ব কয়েক দশক পেরিয়েছে, ছাড়িয়ে গেছে ভাষার সীমানাও। কৃষ্ণের ভাষ্য, দেবা বলতেন তিনিই তাঁর সংগীতকে বিভিন্ন চলচ্চিত্রশিল্প ও স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের স্মৃতিচারণে ‘আন্নামালাই’-এর বড় সাফল্যের পাশাপাশি রেকর্ডিং, আলাপচারিতা এবং বারবার একসঙ্গে কাজ করার নীরব মুহূর্তগুলোও উঠে আসে।
‘আভাই শানমুখী’, ‘পাম্মাল কে. সম্বন্ধম’ ও ‘পঞ্চতন্ত্রম’-এ দেবার সঙ্গে কাজের প্রাণবন্ত পরিবেশের কথা স্মরণ করেন কমল হাসান। তাঁকে স্মরণ করে বক্তব্য দেন সিলাম্বরাসন টিআর, নিবিন পাউলি, কার্তি, সিমরান, বিজয় সেতুপতি, শ্রীনিবাস ও আরজে বালাজিও; বালাজি ‘মুকুথি আম্মান’-এ দেবার সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
তরুণ দর্শকদের কনসার্টে এল নতুন প্রাণ
রজনীকান্ত স্মরণ করেন, মৃত্যুর প্রায় আড়াই বছর আগে সিঙ্গাপুরে কনসার্টের একটি ধারাবাহিক আয়োজন শুরু করতে দেবা তাঁকে সাহায্য করতে বলেছিলেন। এরপর অন্য দেশেও অনুষ্ঠান হয়। সাম্প্রতিক সফর থেকে ফিরে দেবা অভিনেতার সঙ্গে দেখা করেন এবং তরুণদের তাঁর গান উদ্যাপন করতে দেখে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন।
কৃষ্ণও একই আনন্দের কথা বলেন। অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও পাঠাতেন দেবা; বহু বছর আগে তৈরি সংগীতে দর্শকদের নাচতে দেখে তিনি আনন্দিত হতেন। তরুণ ভক্তদের আবিষ্কার করে সুরকারের বিস্ময়ভরা প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করেন পরিচালক:
তিনি অবাক হয়ে বলতেন, ‘হে ভগবান, জেন জি!’ মানুষ তাঁর সংগীত কীভাবে উপভোগ করছে এবং কত অনুষ্ঠান হচ্ছে, তা দেখে তিনি খুব খুশি হতেন।
কনসার্টগুলো তাঁর ক্যারিয়ারের নানা দিককে এক জায়গায় এনেছিল: চেন্নাইয়ের সঙ্গে যুক্ত গানা ছন্দ, বিদেশে জনপ্রিয় রোমান্টিক গান এবং তামিলের বড় চলচ্চিত্রগুলোর চেনা সুর। যাঁরা গানগুলো মুক্তির সময় শুনেছিলেন, তাঁরা নিজেদের স্মৃতি নিয়ে আবার সেগুলোতে ফিরে আসার পাশাপাশি নতুন শ্রোতারাও সেই সংগীত খুঁজে পেয়েছেন।
সহকর্মী ও ভক্তদের ব্যক্তিগত বিদায়ের পাশাপাশি তামিলনাড়ু রাজ্য মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাঁদের কাছে দেবা ছিলেন তারকার পর্দায় আবির্ভাবের সুরকার, প্রিয় প্রেমের গানের স্রষ্টা, উৎসবের গান কিংবা এক সন্ধ্যার নাচের সংগীতের মানুষ।
মূল তথ্য
- ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে চেন্নাইয়ে মারা যান দেবা।
- তামিলনাড়ু রাজ্যের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ১৮ অক্টোবর আরকটের কাছে মাঙ্গাডুতে তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়েছিল।
- তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় ভাষার ৪০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে সুর করেছেন তিনি।
- রজনীকান্তের ‘সুপারস্টার’ টাইটেল কার্ডের জন্য তাঁর সংগীতের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালের ‘আন্নামালাই’ দিয়ে।
- তাঁর সংগীতে ছিল চেন্নাইয়ের গানা, প্রাণবন্ত নাচের গান, রোমান্টিক সুর, ভক্তিমূলক সংগীত ও আবহসংগীত।
- ভারতের বাইরেও তাঁর শ্রোতাদের মধ্যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
- তাঁর সংগীত পরিবারে আছেন ছেলে শ্রীকান্ত দেবা এবং ভাই সাবেশ ও মুরালি।






