দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতিতে লোডশেডিং বেড়েছে

পড়তে 10 মিনিট
Power cuts deepen across southwestern Bangladesh as supply falls short in 21 districts

সন্ধ্যায় বিদ্যুতের ঘাটতি ১১৬ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় ১৪ অক্টোবর বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সন্ধ্যায় ১১৬ মেগাওয়াট ঘাটতির হিসাব দেয়। চাহিদা ছিল ৬৯৪ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ ছিল ৫৭৮ মেগাওয়াট। ফলে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগই পাওয়া যায়নি।

সূচিপত্র
  1. সন্ধ্যায় বিদ্যুতের ঘাটতি ১১৬ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে
  2. কত দ্রুত বেড়েছে বিদ্যুতের ঘাটতি?
  3. খুলনা ও বরিশালে সংকটের ধরন আলাদা
  4. বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত
  5. গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের দীর্ঘ বিভ্রাটের অভিজ্ঞতা
  6. চিংড়ি খামারের মজুত বাঁচাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন
  7. কারখানায় খরচ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে
  8. জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে আছে
  9. বন্ধ কেন্দ্রের উৎপাদন অন্য উৎসে পূরণ করা কঠিন কেন
  10. মূল বিষয়

খুলনা ও আশপাশের জেলাগুলোতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়াশোনা, রান্না, খাবার সংরক্ষণ এবং কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। খুলনার গোবরচাকা এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, একেকবার দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকত না। তাঁর হিসাবে, তাঁদের এলাকায় ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণকক্ষ ওই দিন দুপুর ১টার কিছু পরেই ১০১ মেগাওয়াট ঘাটতির হিসাব করে। তখনও সন্ধ্যার বেশি চাহিদার সময় হয়নি। আগের দিন বিকেলে ঘাটতি ছিল ৩৬ মেগাওয়াট।

দুই দিনের ওই বিকেলের হিসাবের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা আসলে কমেছিল। কিন্তু সরবরাহ কমেছিল আরও দ্রুত, ফলে ছোট ঘাটতি প্রায় তিন গুণ বড় হয়েছে। হিসাবগুলো থেকে বোঝা যায়, তাৎক্ষণিক সমস্যা আঞ্চলিক বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়া; হঠাৎ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যাওয়া নয়।

খুলনার গ্রামাঞ্চল ও চিংড়ি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় দেখা যায়, বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুধু ঘরের অসুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিক্ষার্থীদের পড়ার সময় নষ্ট হচ্ছে, খামারে পানিতে অক্সিজেন মেশানো কঠিন হচ্ছে, আর হিমায়িত পণ্য রক্ষায় রপ্তানিকারকদের জেনারেটরে বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

কত দ্রুত বেড়েছে বিদ্যুতের ঘাটতি?

১৩ ও ১৪ অক্টোবরের ওজোপাডিকোর হিসাব দেখায়, বিকেল ও সন্ধ্যা—দুই সময়েই ঘাটতি বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে কিছু গ্রাহকের বিদ্যুৎ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেওয়াকে লোডশেডিং বলা হয়।

  • ১৩ অক্টোবর, দুপুর ১টা: চাহিদা ছিল ৭৪১ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৭০৫ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৩৬ মেগাওয়াট।
  • ১৩ অক্টোবর, সন্ধ্যা ৭টা: চাহিদা ছিল ৭২১ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৬৪২ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৭৯ মেগাওয়াট।
  • ১৪ অক্টোবর, দুপুর ১টার কিছু পর: চাহিদা ছিল ৬৬১ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৫৬০ মেগাওয়াট; ঘাটতি ১০১ মেগাওয়াট।
  • ১৪ অক্টোবর, সন্ধ্যা: চাহিদা ছিল ৬৯৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৫৭৮ মেগাওয়াট; ঘাটতি ১১৬ মেগাওয়াট।
বিজ্ঞাপন

দুই দিনের মধ্যে বিকেলের চাহিদা ৮০ মেগাওয়াট কমলেও সরবরাহ কমেছে ১৪৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার যে অংশ মেটেনি, তা প্রায় ৪.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৩ শতাংশ হয়েছে।

সন্ধ্যায় সরবরাহ কমেছে ৬৪ মেগাওয়াট, আর চাহিদা কমেছে ২৭ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি আগের সন্ধ্যার তুলনায় ৩৭ মেগাওয়াট বা প্রায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

মেগাওয়াট দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুতের ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। এখানে দেওয়া হিসাবগুলো উল্লিখিত সময়ের বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ জানায়। কোনো এলাকায় কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না, তা নির্ভর করে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান কীভাবে নেটওয়ার্কজুড়ে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখে তার ওপর।

খুলনা ও বরিশালে সংকটের ধরন আলাদা

১৪ অক্টোবর সন্ধ্যার ঘাটতির মধ্যে খুলনা জোনের অংশ ছিল ৮১ মেগাওয়াট। সেখানে চাহিদা ছিল ৫২৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৪৪৭ মেগাওয়াট। বরিশাল জোনে ১৬৬ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩১ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৩৫ মেগাওয়াট।

পরিমাণের হিসাবে খুলনায় ঘাটতি বেশি হলেও প্রয়োজনীয় সরবরাহের বড় অংশ হারিয়েছে বরিশাল। সন্ধ্যায় খুলনা জোনের চাহিদার প্রায় ১৫.৩ শতাংশ মেটেনি, বরিশাল জোনে এ হার ছিল ২১.১ শতাংশ।

বরিশালে বিকেলের পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। ১৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪২ মেগাওয়াট, যা চাহিদার প্রায় ২৩.৩ শতাংশ। খুলনা জোনে বিকেলের চাহিদা ৪৮১ মেগাওয়াটের বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৫৯ মেগাওয়াট।

আগের দিন বিকেলে বরিশাল জোনে প্রয়োজনীয় ১৭৪ মেগাওয়াটের পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছিল। পূর্ণ সরবরাহ থেকে উল্লেখযোগ্য ঘাটতিতে নেমে আসার কারণে বাসিন্দারা এক দিনের ব্যবধানেই পরিস্থিতির বড় অবনতি অনুভব করতে পারেন।

১৪ অক্টোবর সন্ধ্যার জেলা-ভিত্তিক হিসাবে খুলনায় ২৯, বরিশালে ২২, রাজবাড়ীতে ১৩ এবং ফরিদপুরে ১২ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখানো হয়। তবে সব জেলার হিসাব যোগ করলে হয় ১২৯ মেগাওয়াট, যেখানে নিয়ন্ত্রণকক্ষের আঞ্চলিক মোট ছিল ১১৬ মেগাওয়াট। অঞ্চল ও জোনের মোট হিসাব পরস্পরের সঙ্গে মেলে; জেলা-ভিত্তিক হিসাবে অমীমাংসিত সংখ্যাগত অসংগতি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত

খুলনার বাসিন্দারা বলেন, সুবিধাজনক বা অনুমানযোগ্য সময়ে নয়, বরং জরুরি কাজের মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বয়রার আম্বিয়া খাতুন বলেন, আগে থেকেই গ্যাসের সংকট থাকায় পরিবারগুলোকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাই বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়। টুটপাড়ার লতিকা রানী বলেন, হঠাৎ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জরুরি কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদের বর্ণনায় ২৪ ঘণ্টায় সাত-আটবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। খুলনার নিরালা এলাকার বাসিন্দা হাজেরা খাতুন বলেন, দিন ও রাত—দুই সময়েই বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কলেজছাত্র ইমন শেখ বলেন, গরমের মধ্যে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে, আবার মোমবাতি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বটিয়াঘাটার দেবীতলা গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেঘলা মল্লিক তাঁর পড়াশোনায় এর প্রভাবের কথা বলেন:

গত সপ্তাহ থেকে দিন-রাত প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে আমার পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

তাঁর মা প্রীতিলতা মল্লিক বলেন, তাঁদের পরিবারের বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। অন্য বাসিন্দারা বলেন, ফ্রিজে খাবার নষ্ট হচ্ছে, আর রিচার্জেবল ফ্যান ও ব্যাকআপ বিদ্যুতের ইউনিটগুলো বিভ্রাটের মাঝের সময়ে পর্যাপ্ত চার্জ হতে পারছে না।

বারবার বিদ্যুৎ গেলে একটি পরিবারের হাতে আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সময় থাকে না। বিদ্যুৎ ফিরলেও ব্যাটারি চার্জ হওয়া বা ফ্রিজের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার আগেই আবার বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে।

গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের দীর্ঘ বিভ্রাটের অভিজ্ঞতা

খুলনার গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা দিনে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছেন। বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রা এলাকায় তীব্র ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিও রয়েছে; এটি ওজোপাডিকোর বর্ণিত বৃহত্তর আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে আরেকটি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান।

ওজোপাডিকো প্রায় ১৪ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, যার মধ্যে খুলনায় প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার। খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে সেবা দেয় এবং সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট।

মণ্ডল বিকেল ৩টার হিসাবে চাহিদা ৭৪ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ৭১ মেগাওয়াট জানান; ঘাটতি ছিল ৩ মেগাওয়াট। কোনো একটি বিতরণকারীর এক ঘণ্টার হিসাব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একাংশের চিত্র দেয়। অন্যদিকে, বাসিন্দাদের বর্ণনায় সারা দিনে জমে ওঠা বিভ্রাটের কথা উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ওজোপাডিকোর অন্য হিসাবেও আঞ্চলিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী চাপের চিত্র দেখা যায়। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ৬৫৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৬০ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৯৯ মেগাওয়াট। রাতের দিকে চাহিদা ছিল প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ১০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।

রবিবার রাত ৮টার হিসাবে চাহিদা ছিল ৭৭৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৬৭৩ মেগাওয়াট। ওই ১০০ মেগাওয়াট ঘাটতির মধ্যে খুলনা জোনের অংশ ছিল ৭১ মেগাওয়াট, বরিশাল জোনের ২৯ মেগাওয়াট।

অক্টোবরের তারিখগুলোর সঙ্গে কোনো বছর উল্লেখ করা হয়নি। বৃহস্পতিবার ও রবিবারের হিসাবেরও পূর্ণ তারিখ নেই। তাই সময়ক্রমে এগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায় না।

চিংড়ি খামারের মজুত বাঁচাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন

খালাশী বুনিয়া গ্রামের চিংড়ি চাষি কৃষ্ণা বিশ্বাস বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে তাঁর খামারের চিংড়ি সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে তাঁর খামারে অক্সিজেন মেশানোর যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে চাষিরা কেন উদ্বিগ্ন হন, তা ব্যাখ্যা করে বিশ্বাস বলেন:

লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেন মেশানোর যন্ত্র বন্ধ হলে চিংড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পুরো মজুতই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অক্সিজেন মেশানোর যন্ত্র পানি নাড়াচাড়া করে ও মিশিয়ে দেয়, যাতে চাষ করা প্রাণীদের কাছে অক্সিজেন পৌঁছায়। তাই বিদ্যুৎ চলে গেলে চিংড়ি বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ঘরের কোনো কাজ দেরি হওয়ার চেয়ে এটি ভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) বলছে, খুলনায় নিবন্ধিত ১০৯টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানার মধ্যে মাত্র ৩০টি এবং চট্টগ্রামে ১৮টি চালু রয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, এসব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা প্রায় ৪ লাখ টন। তবে কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় চিংড়ির মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ পাচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।

এই হিসাবগুলো এমন এক শিল্পের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে কাঁচামালের তীব্র সংকট আগে থেকেই রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় খামার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ—সব পর্যায়েই নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

কারখানায় খরচ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে

বিএফএফইএর পরিচালক ও এমইউ সি ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে কারখানার কার্যক্রম ইতিমধ্যেই ব্যাহত হয়েছে:

বিদ্যুতের এই ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দাস বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিংড়ি শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। তাঁর সতর্কবার্তা শুধু কারখানার কর্মীদের নয়, চিংড়ি উৎপাদন ঘিরে থাকা বৃহত্তর কর্মসংস্থানকে নিয়ে।

বিএফএফইএর আরেক পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হিমায়িত চিংড়ির রপ্তানিকারকদের সংরক্ষণাগার ঠান্ডা রাখতে জেনারেটরের খরচ বাড়ছে। জেনারেটর বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তবে এর জন্য জ্বালানি লাগে এবং পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

বিদ্যুতের ঘাটতি ব্যবসায়ীদের কয়েকভাবে প্রভাবিত করছে। খামারে পানির উপযুক্ত অবস্থা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন, প্রক্রিয়াজাতকারীদের যন্ত্র চালাতে বিদ্যুৎ দরকার, আর রপ্তানিকারকদের নির্ভরযোগ্য হিমায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত চিংড়ি না পাওয়া কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যয়ের বোঝাও কম পণ্যের ওপর ভাগ হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে আছে

জাতীয় পর্যায়ের হিসাব থেকে আঞ্চলিক সংকটের পেছনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃহত্তর সমস্যার চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, কয়েকটি কারণে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া, প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সারা দেশে লোডশেডিং ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

৭ অক্টোবরের বিপিডিবির হিসাবে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা ছিল ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে সরবরাহ ছিল ৮৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট। কেন্দ্রগুলো চাহিদার প্রায় ৩৫.৫ শতাংশ গ্যাস পেয়েছে; ঘাটতি ছিল দৈনিক ১ হাজার ৬২৯ মিলিয়ন ঘনফুট।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে দেশীয় উৎপাদন থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে আরও ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। পরিবহনের সুবিধায় গ্যাসকে ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তর করা হয়; ব্যবহারের আগে আবার গ্যাসে রূপান্তর করা হয়।

এই সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গ্যাস দিলে কারখানাগুলোতে সংকট বাড়তে পারে এবং রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।

রক্ষণাবেক্ষণ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং যান্ত্রিক সমস্যার কারণেও বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল, ভেড়ামারা, বাঘাবাড়ী ও সিরাজগঞ্জসহ আরও কয়েকটি স্থাপনায় কেন্দ্র বন্ধ ছিল। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ইউনিটও বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

বন্ধ কেন্দ্রের উৎপাদন অন্য উৎসে পূরণ করা কঠিন কেন

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা হিসাব দিয়েছেন, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলে প্রায় ২৫ টাকা, কয়লায় ১৩ থেকে ১৪ টাকা এবং গ্যাসে ৭ টাকা খরচ হয়। এক ইউনিট বিদ্যুৎ বলতে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বোঝায়; এক কিলোওয়াট ক্ষমতার কোনো যন্ত্র এক ঘণ্টা চললে যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয়, সেটিই এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা।

উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসের তুলনায় প্রায় ৩.৬ গুণ। তাই গ্যাসভিত্তিক উৎপাদনের ঘাটতি তেল দিয়ে পূরণ করতে অনেক বেশি অর্থের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্বালানি ও সচল বিদ্যুৎকেন্দ্রও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি ৭ অক্টোবর রাত ১টায় সারা দেশে ২ হাজার ৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের হিসাব করে। সকাল ৮টায় তা কমে ৮৫৯ মেগাওয়াটে নেমে আসে, এরপর বিকেল ৪টায় বেড়ে হয় ১ হাজার ১৬১ মেগাওয়াট। এই হিসাবগুলো দেখায়, এক দিনেই ঘাটতির পরিমাণ অনেকটা বদলে যায়।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে সমস্যাটিকে যুক্ত করেছেন:

"এর ফলে আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেগুলো চালাতে পারছি না," তিনি বলেন।

রহমত উল্লাহ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের পক্ষে মত দেন। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রাতে সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথাও বলেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত; আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে পাওয়া বিদ্যুৎ নিয়ে বারবার বিভ্রাট সামলাচ্ছেন।

মূল বিষয়

  • ১৪ অক্টোবর ২১ জেলায় সন্ধ্যায় ১১৬ মেগাওয়াট ঘাটতির হিসাব দেয় ওজোপাডিকো; চাহিদা ছিল ৬৯৪ মেগাওয়াট।
  • বিদ্যুতের চাহিদা কমলেও এক দিনের মধ্যে বিকেলের ঘাটতি ৩৬ থেকে বেড়ে ১০১ মেগাওয়াট হয়েছে।
  • সন্ধ্যায় খুলনা জোনে ঘাটতির পরিমাণ বেশি ছিল, তবে প্রয়োজনীয় সরবরাহের বড় অংশ হারিয়েছে বরিশাল।
  • বাসিন্দারা পড়াশোনা, ঘরের কাজ ও খাবার সংরক্ষণ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন; গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ছিল না।
  • চিংড়ি চাষি ও রপ্তানিকারকেরা মজুতের ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং জেনারেটরের বাড়তি খরচের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
  • জ্বালানির অপর্যাপ্ত সরবরাহের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও যন্ত্রপাতির সমস্যায় জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত হচ্ছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে