১৬ মিনিটের এক উড্ডয়ন, যা বদলে দিতে পারে বিমান চলাচল
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল হুনান প্রদেশের ঝুঝৌয়ের একটি বিমানবন্দর থেকে ৭.৫ মেট্রিক টন ওজনের একটি চালকবিহীন কার্গো বিমান উড্ডয়ন করে। বিমানটিতে কোনো যাত্রী বা পাইলট ছিল না, প্রচলিত জ্বালানিও ছিল না। এর বদলে বিমানটি উড়েছে অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়নার তৈরি মেগাওয়াট-শ্রেণির হাইড্রোজেনচালিত টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন AEP100 দিয়ে। ১৬ মিনিটে বিমানটি প্রায় ৩০০ মিটার উচ্চতায় ওঠে, ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার গতিতে ৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এবং নির্ধারিত কৌশলগুলো সম্পন্ন করে নিরাপদে ফিরে আসে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ঘটনাটিকে মেগাওয়াট-শ্রেণির হাইড্রোজেনচালিত বিমান টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনের বিশ্বের প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন বলে বর্ণনা করেছে। উড্ডয়নটি স্বল্পস্থায়ী হলেও প্রকৌশলী ও বিশ্লেষকদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এই খাতে গবেষণাগার থেকে বাস্তব প্রকৌশল প্রয়োগের দিকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূচিপত্র
বিশ্বের তেলবাজারে তীব্র চাপের এক সময়ে এই পরীক্ষা হলো। ২০২৬ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে অস্থির হয়ে পড়া বাজার স্থিতিশীল করতে সংস্থাটির ৩২ সদস্যদেশ জরুরি তেলের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপে বোঝা যায়, তেল সরবরাহে ধাক্কা এলে বৈশ্বিক বিমান চলাচল কতটা ঝুঁকিতে পড়ে। চীনের জন্য সফল এই পরীক্ষা আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য পথ খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে আইইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ২.৫ শতাংশের জন্য দায়ী এই খাতের জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলার সুযোগও তৈরি করেছে।
AEP100-এর প্রপালশন ব্যবস্থা
AEP100 ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন নয়। মোটর চালানোর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে এটি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের ওপরও নির্ভর করে না। এটি এমন একটি টার্বোপ্রপ, যেখানে প্রচলিত ইঞ্জিনে কেরোসিন পোড়ানোর মতোই টারবাইন চক্রের ভেতরে সরাসরি তরল হাইড্রোজেন পোড়ানো হয়; তবে জ্বালানির রাসায়নিক গঠন ও নির্গত পদার্থের ধরন আলাদা। টার্বোপ্রপে ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রপেলার ঘোরে এবং তা ধাক্কা তৈরি করে। কার্গো ফ্লাইট, আঞ্চলিক রুট ও দ্বীপে দ্বীপে যাতায়াতের জন্য এই বিন্যাস উপযোগী, যেখানে জেট বিমানের মতো সর্বোচ্চ গতি প্রধান বিবেচ্য নয়।
এই জ্বালানি ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্ক প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা দরকার। তরল হাইড্রোজেনকে মাইনাস ৪২৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। এতে বিমানে ক্রায়োজেনিক সংরক্ষণ, তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থিতিশীল দহন নিয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ইঞ্জিনে হাইড্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করলে প্রধানত জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। অর্থাৎ জ্বালানি পোড়ানোর ফলে ইঞ্জিন থেকে সরাসরি কোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না, যা একে প্রচলিত জেট ইঞ্জিন থেকে আলাদা করে। তবে সামগ্রিক জলবায়ু-সুবিধা পুরোপুরি নির্ভর করে হাইড্রোজেন কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে তার ওপর। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে পানির অণু ভেঙে তৈরি গ্রিন হাইড্রোজেন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হাইড্রোজেনে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার দূষণ কমে না; বরং কার্বনের বোঝা উৎপাদন পর্যায়ে সরে যায়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও দহন প্রক্রিয়ায় নাইট্রোজেন অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প তৈরি হয়, যা উচ্চতায় কনট্রেইল গঠন করতে পারে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা জানিয়েছে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের বাইরের এসব প্রভাবও বিমান চলাচলের জলবায়ুতে প্রভাব ফেলে। তাই বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়াতে পারে এমন দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইল কমাতে হাইড্রোজেনচালিত বিমানের রুট ও উচ্চতা সতর্কভাবে নির্ধারণ করতে হতে পারে।
মাটি থেকে আকাশে
এপ্রিলে উড্ডয়নের আগে নিয়ন্ত্রিত স্থির অবস্থায় ইঞ্জিনটির কার্যকারিতা যাচাই করে একাধিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। আকাশে ওড়ানোর আগে এ ধরনের স্থির পরীক্ষা প্রয়োজনীয় ধাপ। তাই ৪ এপ্রিলের প্রথম উড্ডয়ন প্রমাণ করে, সমন্বিত ব্যবস্থাটি কম্পন, পরিবর্তনশীল ভার এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে উড্ডয়নের চাপ সামলাতে পারে।
বিমানটির ওজন ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড। পুরো ১৬ মিনিটের উড্ডয়নজুড়ে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা স্থিতিশীল ছিল। নির্মাতা জানিয়েছে, চালকবিহীন কার্গো বিমানটি রানওয়েতে ফেরার আগে নির্ধারিত সব উড্ডয়ন কৌশল সম্পন্ন করে এবং পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা বা ত্রুটি দেখা যায়নি।
অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়নার কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে গবেষণা ও বাস্তব প্রকৌশল প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের ভাষ্য, এই প্রদর্শনীতে বাস্তব উড্ডয়নযানে হাইড্রোজেন প্রপালশন যুক্ত করার প্রকৌশলগত নির্ভরযোগ্যতা যাচাই হয়েছে।
এই সফল প্রথম উড্ডয়ন দেশীয়ভাবে তৈরি মেগাওয়াট-শ্রেণির হাইড্রোজেনচালিত বিমান ইঞ্জিনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থেকে প্রকৌশল প্রয়োগে উত্তরণের একটি বড় অগ্রগতি।
শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ঐতিহাসিক হলেও একবারের সফল উড্ডয়ন বাণিজ্যিক সনদ পাওয়ার শর্ত পূরণ করে না। একটি নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনী থেকে নিয়মিত যাত্রী বা কার্গো পরিবহনে যেতে হলে স্থায়িত্ব পরীক্ষা, বারবার চাপের চক্রে কার্যকারিতা যাচাই এবং বিভিন্ন আবহাওয়া ও ভারে নিরাপদে চলার প্রমাণ দিতে হবে।
হাইড্রোজেনচালিত উড্ডয়নের দুটি পথ
চীনের নেওয়া পথটিই একমাত্র চলমান উদ্যোগ নয়। এয়ারবাস তাদের ZEROe কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিমানের ধারণায় হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি বেছে নিয়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা মাটিতে ১.২ মেগাওয়াটের একটি ফুয়েল সেল ব্যবস্থা চালু করেছে। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে ‘হাইড্রোজেন হাবস অ্যাট এয়ারপোর্টস’ প্রকল্পে ২২০টির বেশি বিমানবন্দরকেও যুক্ত করেছে। নবায়নযোগ্য উৎসের হাইড্রোজেন ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে প্রপেলার চালানোর বিদ্যুৎ তৈরি হয় এবং নির্গত হয় পানি।
দুটি পদ্ধতির পার্থক্য শুধু প্রকৌশলগত পছন্দের বিষয় নয়। AEP100-এ দেখানো সরাসরি হাইড্রোজেন দহন বিদ্যমান টারবাইন কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায় বলে উচ্চতর ক্ষমতা ও বড় বিমান পর্যন্ত বিস্তৃত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। ফুয়েল সেল ব্যবস্থা সম্ভাব্যভাবে বেশি দক্ষ ও নীরব হলেও তাপ ব্যবস্থাপনা, সিস্টেমের ওজন এবং ক্ষমতার ঘনত্ব নিয়ে আলাদা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো পদ্ধতিই এখনো দৈনন্দিন বাণিজ্যিক সেবায় নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেনি। যাত্রী পরিবহনের আগে উভয়েরই সম্পূর্ণ নতুন বিমানবন্দর জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো দরকার হবে।
হাইড্রোজেনচালিত বিমান চলাচলের ধাপভিত্তিক রূপরেখা
এই পরীক্ষা অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়নার হুনান অ্যাভিয়েশন পাওয়ারপ্ল্যান্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জুন কাও, ওয়েই লি ও তাঁদের সহকর্মীদের সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণাপত্রে তুলে ধরা বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। এতে অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়নার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমিটিও অংশ নিয়েছে। প্রকাশিত রূপরেখায় ধাপভিত্তিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে: ২০২৮ সালের মধ্যে মূল প্রযুক্তি যাচাই, ২০৩৫ সালের মধ্যে আঞ্চলিক বিমানে সংযোজন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে মূলধারার বাণিজ্যিক বিমানে ব্যাপক ব্যবহার।
গবেষণাপত্রে কয়েকটি বড় বাধার কথা বলা হয়েছে, যেগুলো অতিক্রম করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান ও ইঞ্জিনের সমন্বিত নকশা, বিমানে তরল হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ব্যবস্থা, হাইড্রোজেন প্রবাহের সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ, উন্নত তাপ ব্যবস্থাপনা এবং কম নিঃসরণের দহনপ্রযুক্তি। এসব কারিগরি চাহিদাকে বাস্তব পরিচালনায় রূপ দিতে নতুন বিমানবন্দর রিফুয়েলিং স্টেশন, ক্রায়োজেনিক জ্বালানিবাহী ট্রাক, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণকর্মী এবং হাইড্রোজেনচালিত বিমান চলাচলের জন্য বর্তমানে অনুপস্থিত সনদমানও প্রয়োজন হবে।
চীনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এই প্রযুক্তি এক ট্রিলিয়ন ইউয়ানের শিল্পশৃঙ্খলে প্রবৃদ্ধি আনবে। এর আওতায় থাকবে উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রিন হাইড্রোজেন তৈরি, মধ্যবর্তী পর্যায়ে হাইড্রোজেন তরলীকরণ ও পরিবহন এবং শেষ পর্যায়ে উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম তৈরি ও নতুন উপকরণের উন্নয়ন। গ্রিন হাইড্রোজেনের দাম কমতে থাকলে সময়ের সঙ্গে এর অর্থনৈতিক সুবিধা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগে কার্গো, পরে যাত্রী
AEP100-এর যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞরাও একমত যে নিকট ভবিষ্যতে কার্গো পরিবহনই এর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রবেশপথ। চালকবিহীন বিমান কার্গো, দ্বীপাঞ্চলের সরবরাহব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক আকাশপথ হলো চীনের নীতিতে ‘নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতি’র মূল ক্ষেত্র। এসব ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে অবকাঠামো গড়া, ফ্লাইটের গতিপথ নিবিড়ভাবে নজরদারি এবং যাত্রীবাহী বিমানের জটিলতা ছাড়াই পরিচালনাগত ঝুঁকি সামলানো সম্ভব।
প্রাথমিকভাবে ব্যবহারের জন্য দ্বীপপথ বিশেষভাবে উপযোগী। অনেক দ্বীপের জনগোষ্ঠী এরই মধ্যে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও সীমিত সরবরাহের সমস্যায় রয়েছে, তাই বিকল্প প্রপালশন পরীক্ষার জন্য এগুলো স্বাভাবিক প্রার্থী। স্বল্প দূরত্বের পথে বড় ক্রায়োজেনিক জ্বালানি ট্যাংকের কারণে তৈরি অসুবিধা কম হয়। আর যান চলাচলের পরিমাণ কম থাকায় ব্যস্ত বিমানবন্দরে সম্প্রসারণের আগে নিয়ন্ত্রকেরা কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
ধাপে ধাপে চালুর এই কৌশল অন্যান্য বিমান চলাচল প্রযুক্তির বিকাশের ধারার সঙ্গে মেলে। প্রথমে চালকবিহীন কার্গো সেবায় নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে নির্মাতারা উড্ডয়নের সময় বাড়াতে, রক্ষণাবেক্ষণের রুটিন উন্নত করতে এবং জনআস্থা তৈরি করতে পারবেন। এরপর বড় বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী জেট চালাতে প্রয়োজনীয় কঠোর সনদের জন্য আবেদন করা যাবে।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
সফল প্রথম উড্ডয়ন সত্ত্বেও হাইড্রোজেনচালিত বিমান চলাচল নিয়মিত হতে এখনো বড় বাধা রয়ে গেছে। ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় তরল হাইড্রোজেন সংরক্ষণে নিরাপত্তা ও প্রকৌশলগত এমন উদ্বেগ রয়েছে, যা কেরোসিন ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ থেকে মৌলিকভাবেই আলাদা। হাজার হাজার উড্ডয়নচক্রে তাপ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি প্রবাহের ধারাবাহিকতা ও দহনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে; একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে তা প্রমাণিত হয় না। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, এক ফ্লাইটের পর পরবর্তী ফ্লাইটের প্রস্তুতির সময় এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় এখনো অজানা।
হাইড্রোজেনের উৎসই নির্ধারণ করবে এই প্রযুক্তি প্রকৃত জলবায়ু সুবিধা দেবে কি না। বর্তমানে কম নিঃসরণকারী হাইড্রোজেন বৈশ্বিক উৎপাদনের সামান্য অংশ। অধিকাংশ হাইড্রোজেন এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে স্টিম মিথেন রিফর্মিং প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, যাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎচালিত তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদিত গ্রিন হাইড্রোজেনের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বাড়ানো না গেলে হাইড্রোজেনচালিত বিমান চলাচলে নিঃসরণ কমবে না, বরং বিমানের নির্গমন থেকে জ্বালানি কারখানায় সরে যাবে।
হাইড্রোজেন ট্যাংক, গ্যাস নির্গমন ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতির করণীয়ের জন্য নিয়ন্ত্রকদের সম্পূর্ণ নতুন সনদমান তৈরি করতে হবে। বিমানবন্দরের অগ্নিনির্বাপণ বিভাগ, ভূমিতে কাজ করা কর্মী এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে। এ অবকাঠামো গড়তে বিপুল ব্যয় হবে। একাধিক এলাকার জ্বালানি কোম্পানি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান নির্মাতা ও সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও দরকার হবে।
ভূরাজনৈতিক ও শিল্পগত বার্তা
পরিবেশগত লক্ষ্যের পাশাপাশি AEP100 পরীক্ষা চীনের শিল্পকৌশল সম্পর্কেও একটি বার্তা দেয়। দেশীয়ভাবে তৈরি মেগাওয়াট-শ্রেণির হাইড্রোজেন ইঞ্জিন তৈরি করে তা উড্ডয়নযানে সংযোজনের মাধ্যমে চীন দেখিয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা ও রুশ নির্মাতাদের প্রাধান্য থাকা এই খাতে তারা নিজস্ব প্রযুক্তিগত শৃঙ্খল গড়তে পারে। অস্থির তেলের বাজার ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে বিশ্বজুড়ে দেশগুলো যখন জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে মূল্যায়ন করছে, তখনই এ অর্জন সামনে এসেছে।
বিমান চলাচলের কার্বন নিঃসরণ কমানোর সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটির সমাধানে এই উড্ডয়ন চীনকে অগ্রভাগেও স্থান দিয়েছে। অধিকাংশ দীর্ঘপথের জন্য ব্যাটারি এখনো অতিরিক্ত ভারী। টেকসই বিমান জ্বালানি সম্ভাবনাময় হলেও পোড়ালে তা কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে। ব্যবহারের পর্যায়ে হাইড্রোজেন তাত্ত্বিকভাবে শূন্য-কার্বন পথ দিতে পারে, তবে তার জন্য পুরো জ্বালানি চক্রের নিঃসরণ কমাতে হবে। আপাতত সরাসরি দহন পদ্ধতি বেছে নিয়ে চীন এয়ারবাসের পছন্দের ফুয়েল সেল পদ্ধতির বিপরীতে একটি বিকল্প মডেল তুলে ধরেছে। একই প্রশ্নের ভিন্ন উত্তর পরীক্ষা করছে দুই বড় মহাকাশ ও বিমান নির্মাতা; ফলে এটি এক বাস্তব বৈশ্বিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
মূল কথা
- ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল হুনান প্রদেশের ঝুঝৌয়ের কাছে ৭.৫ মেট্রিক টন ওজনের চালকবিহীন কার্গো বিমানে বিশ্বের প্রথম মেগাওয়াট-শ্রেণির হাইড্রোজেনচালিত টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন উড়িয়েছে চীন।
- অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়নার তৈরি AEP100 ইঞ্জিন ফুয়েল সেল ব্যবহার না করে টারবাইন চক্রের ভেতরে সরাসরি তরল হাইড্রোজেন পোড়ায়।
- ১৬ মিনিটের উড্ডয়নে বিমানটি ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার গতিতে ৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এবং ৩০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছায়। পুরো সময় ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা স্থিতিশীল ছিল।
- চীনা পরিকল্পনায় প্রথমে চালকবিহীন কার্গো ও দ্বীপাঞ্চলের সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবহার, এরপর ২০৩৫ সালের দিকে আঞ্চলিক বিমান এবং ২০৫০ সালের মধ্যে মূলধারার জেট বিমানে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।
- গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন, ক্রায়োজেনিক সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং নতুন নিরাপত্তা বিধি বাণিজ্যিক পর্যায়ে ব্যবহারের বড় বাধা।
- এয়ারবাস হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ফলে চীনের সরাসরি দহন পদ্ধতি হাইড্রোজেনচালিত বিমান চলাচলের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দৃষ্টিভঙ্গির একটি।
- জলবায়ু সুবিধা নির্ভর করবে জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদনের ওপর। কনট্রেইলের মতো কার্বন ডাই-অক্সাইডের বাইরের প্রভাবও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।






