ঐতিহাসিক পরিবর্তন
১৯৪৯ সালে আধুনিক নথি সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীনে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকের সংখ্যা ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত দেশব্যাপী নমুনা জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০ লাখের বেশি মানুষকে নিয়ে নভেম্বরে করা ক্ষুদ্র জনশুমারির তথ্য বলছে, জাতীয় জনসংখ্যার ১৫.৮৭ শতাংশের বয়স অন্তত ৬৫ বছর। অন্যদিকে ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা মোট জনসংখ্যার ১৫.২৫ শতাংশ। এ মাইলফলক নিশ্চিত করছে, প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশটি সেই প্রতীকী সীমা পেরিয়েছে, যে বিষয়ে জনমিতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। তরুণ জনসংখ্যার সমাজ থেকে দেশটি ক্রমে প্রবীণ-প্রধান জনমিতির দিকে এগোচ্ছে। মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের নমুনার ভিত্তিতে করা এ জরিপ পূর্ণাঙ্গ জনশুমারির মধ্যবর্তী সময়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জনমিতিক চিত্র তুলে ধরে। এর ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, অনেক নীতিনির্ধারকের ধারণার চেয়েও দ্রুত এ পরিবর্তন ঘটছে।
সূচিপত্র
এই উলটপালটের সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক কাঠামোয় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে। স্বতন্ত্র জনমিতিবিদ হে ইয়াফু উল্লেখ করেছেন, পেনশন ও বয়স্কদের পরিচর্যা-সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীর মূল অংশ, ৬৫ বছর ও তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা এখন শিশুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এতে সরকারি পেনশন পরিশোধের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। পরিবার পর্যায়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবারের আকার ছোট হয়ে আসার সম্মিলিত প্রভাবে ঐতিহ্যগতভাবে সন্তানদের মা-বাবার দেখাশোনার যে রীতি, তা চাপে পড়ছে। চীনা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এই রীতিই প্রবীণদের সহায়তার অনানুষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রবীণ বাসিন্দার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়া, দৈনন্দিন সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবার চাহিদা পরিবারের অনানুষ্ঠানিক পরিচর্যাকারীদের জোগানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে এমন এক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা পূরণে সরকারি সেবা এখনো যথেষ্ট নয়।
জরিপে কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক হ্রাসের চিত্রও উঠে এসেছে। ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নাগরিকেরা এখন মোট জনসংখ্যার ৬১.৮৯ শতাংশ, যা মাত্র এক দশক আগে ছিল ৬৭.৩৩ শতাংশ। এর অর্থ, ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের জন্য উপার্জনক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দ্রুত বার্ধক্য সংকটের শিকড়
বর্তমান জনমিতিক কাঠামো আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের নীতি চালানোর উত্তরাধিকার এটি, যা পরিবারের আকার ও প্রজননের ধরন আমূল বদলে দিয়েছে। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া এক সন্তান নীতির আওতায় শহরের অধিকাংশ দম্পতির জন্য সন্তান নেওয়ার সীমা কঠোরভাবে একজন নির্ধারণ করা হয়। পরে নিয়মে পরিবর্তন এনে গ্রামীণ পরিবারগুলোকে প্রথম সন্তান মেয়ে হলে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এ কর্মসূচির কারণে ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটি জন্ম ঠেকানো গেছে। এর ফলে ১৯৯১ সালেই মোট প্রজনন হার প্রতি নারীতে ২.১ সন্তানের প্রতিস্থাপন-স্তরের নিচে নেমে আসে।
এক সন্তান নীতির যুগের আগে, ১৯৭০-এর দশকে ‘পরে বিয়ে, বেশি বিরতি, কম সন্তান’ উদ্যোগের মাধ্যমে দম্পতিদের দেরিতে বিয়ে ও সন্তান জন্মের মধ্যে বেশি ব্যবধান রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। এতে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রজনন হার ৬.১ থেকে কমে ২.৭-এ নামে। তবে এক সন্তানের কঠোর সীমা আরোপের ফলে বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার কাঠামোয় গভীর ফাটল তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে নীতিটি বাতিল করে প্রথমে দুই সন্তান এবং পরে ২০২১ সালে তিন সন্তান নীতি চালু করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র জন্মহার বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপে জন্মহারের স্থায়ী প্রত্যাবর্তন ঘটেনি। অর্থনৈতিক চাপ, বদলে যাওয়া লিঙ্গভূমিকা এবং ছোট পরিবারের নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক জড়তা সন্তান জন্মদানকে নিরুৎসাহিত করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ২০২২ সালে মোট প্রজনন হার কমে ১.০৯-এ দাঁড়ায় এবং ২০২৩ সালে তা আরও কমে প্রায় ০.৯৯ হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে বিশ্বে সবচেয়ে কম প্রজনন হারের দেশগুলোর মধ্যে জায়গা হয়েছে চীনের; দেশটির হার যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের চেয়েও অনেক কম। জন্মনিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধের মধ্যে পুত্রসন্তানের প্রতি পছন্দের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় লিঙ্গ অনুপাতও ভারসাম্যহীন হয়েছে। ফলে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ বেশি, যা পরিবার গঠন ও ভবিষ্যৎ প্রজননকে জটিল করে তুলছে।
কর্মীসংকোচন ও পরিচর্যাব্যবস্থায় চাপ
চীনে শুধু মানুষের বয়সই বাড়ছে না, একই সময়ে শ্রমশক্তিও সংকুচিত হচ্ছে। কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যা ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। আর জাতীয় জনসংখ্যা সর্বোচ্চ হয়েছিল ২০২১ সালে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে আট বছর আগে। জাতিসংঘের মডেল অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীদের অনুপাত দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে। একই সময়ে বার্ধক্যনির্ভরতার হার ২০২২ সালের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫১ শতাংশ হবে। বাস্তবে এর অর্থ, দেশের আধুনিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রতি ১০০ কর্মীকে অনেক বেশি অবসরপ্রাপ্ত মানুষের ভরণপোষণ করতে হবে।
সরকারি অর্থব্যবস্থায় এর চাপ পড়ছে। বর্তমান অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন দিতে বর্তমান কর্মীদের চাঁদার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল রাষ্ট্রীয় পেনশনব্যবস্থায় অবদানকারী ও সুবিধাভোগীর অনুপাত খারাপ হওয়ায় ঘাটতি বাড়ছে। সহায়তার উৎস বৈচিত্র্যময় করতে কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে অবসরকালীন অর্থায়নের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে বেসরকারি পেনশন কর্মসূচি চালু করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শহর বা গ্রামীণ পেনশন বিমায় অন্তর্ভুক্ত সব কর্মীকে আওতায় আনতে কর্মসূচিটি দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা হয়। তারপরও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বৃহত্তর সংস্কার ছাড়া ১৯৬০-এর দশকে জন্ম নেওয়া বেবি বুম প্রজন্মের সবাই অবসরে গেলে পেনশন সুবিধার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে, বয়স্ক মা-বাবার দেখাশোনা সন্তানদেরই করতে হবে—এই ঐতিহ্যগত প্রত্যাশার সঙ্গে ছোট পরিবার ও মানুষের স্থানান্তরের বাস্তবতার সংঘাত হচ্ছে। ‘সি শি থং থাং’ বা এক ছাদের নিচে একাধিক প্রজন্মের বসবাসের রীতি ম্লান হয়ে আসছে। তরুণেরা উপকূলীয় মেগাসিটিগুলোতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছেন, আর তাঁদের মা-বাবা থেকে যাচ্ছেন দেশের অভ্যন্তরীণ শহরগুলোতে। দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মতো ভাইবোন কম থাকায় প্রবীণদের পরিচর্যার ভার ক্রমেই একমাত্র সন্তানের ওপর পড়ছে। একই সঙ্গে তাঁদের সামলাতে হচ্ছে নিজের কর্মজীবন ও পরিবার।
প্রবীণপ্রধান দেশের মানুষের গল্প
সমষ্টিগত পরিসংখ্যানের প্রতিফলন দেখা যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হেইলংজিয়াং প্রদেশের সাবেক রেলকেন্দ্র ইয়িমিয়ানপোর মতো শহরে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শহরটির জনসংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। এ সময়ে শিশুর সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে, আর প্রবীণদের সংখ্যা বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। স্থানীয় স্থাপনাগুলোও মানুষের চলে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে: একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আরেকটি পার্কিংয়ের জায়গা। সিনেমা হলটি পরিত্যক্ত। বাসিন্দারা বলছেন, এখন রাস্তায় তরুণদের প্রায় দেখাই যায় না।
৪৮ বছর বয়সী লিন জিন দুই দশক বেইজিংয়ে কাটিয়ে ইয়িমিয়ানপোতে ফিরে এসেছেন। লাখো পরিবারের সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর অভিজ্ঞতায়। অসুস্থ মা-বাবার দেখাশোনা করতে তিনি ফিরে এসেছেন। সাহায্য করার মতো আর কোনো আত্মীয় না থাকায় রাজধানীর অর্থনৈতিক সুযোগ ছেড়ে আসতে হয়েছে তাঁকে। বেইজিংয়ে কলেজে পড়া তাঁর মেয়ের ফেরার কোনো পরিকল্পনা নেই। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আর্থিক লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ায় মা হওয়ার বিষয়ে তিনি এখনো নিশ্চিত নন।
ভাবনাটা হলো, একসঙ্গে থাকা এবং দল বেঁধে অবসর কাটানো।
বন্ধু ও ভাইবোনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া লিনের বাস্তববাদী পরিকল্পনা দেখায়, কীভাবে বহু প্রজন্মের একসঙ্গে বসবাসের জায়গা নিচ্ছে অনানুষ্ঠানিক সহায়তার নেটওয়ার্ক। তাঁর মেয়ে ২০ বছর বয়সী লু লিন বলেন, সন্তান নেওয়ার কথা ভাবার আগে তাঁর অন্তত ৫০ লাখ ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৭ লাখ ডলার, সঞ্চয় থাকা দরকার। অধিকাংশ কর্মীর নাগালের বাইরে এ পরিমাণ অর্থ। হেইলংজিয়াংয়ে ২০২৩ সালে প্রতি ১ হাজার বাসিন্দায় তিনটিরও কম জন্ম নিবন্ধিত হওয়ার কারণ বুঝতে এসব মনোভাব সহায়তা করে। দেশটির সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি এটি। কয়েক হাজার ইউয়ানের সরকারি ভর্তুকিও কেন পরিস্থিতিতে সামান্য পরিবর্তন আনতে পেরেছে, তা-ও এতে বোঝা যায়।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক অভিযোজন
জনমিতিবিদেরা প্রায়ই বলেন, ধনী হওয়ার আগেই বুড়িয়ে যাওয়ার সংকটে পড়েছে চীন। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার আগে সম্পদ সঞ্চয় করতে পেরেছিল পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু চীন এখনো মধ্যম আয়ের দেশ থাকা অবস্থায় গভীর জনমিতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে। এ সময়গত ব্যবধানের কারণে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। শ্রমিকের ঘাটতি, কল্যাণমূলক ব্যয় বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস একসঙ্গে ঘটলে উচ্চ আয়ের দেশে পৌঁছানোর আগেই অর্থনীতি স্থবির হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, বার্ধক্যের কারণে ২০৫০ সাল পর্যন্ত মোট উপকরণ উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি বছরে ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। অন্যদিকে দেশীয় গবেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০৪০-এর দশকে মোট দেশজ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে এক অঙ্কের নিচের দিকের সংখ্যায় নেমে আসবে।
শ্রমবাজারে ইতিমধ্যেই পরিবর্তন শুরু হয়েছে। তরুণ শারীরিক শ্রমিকের জোগান কমে যাওয়ায় শ্রমজীবী পদে মজুরি বাড়ছে। এতে দেশের উৎপাদনভিত্তি গড়ে তোলা রপ্তানি প্রতিযোগিতা হুমকিতে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বেইজিং ‘নিউ কোয়ালিটি প্রোডাক্টিভ ফোর্সেস’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে এনেছে। এ উদ্যোগে রোবট ব্যবহারে উৎসাহ এবং শিল্পের আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ‘সিলভার ইকোনমি’ বা প্রবীণদের ঘিরে অর্থনীতিতে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রবীণ পরিচর্যার বাজার ৩ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর আওতায় থাকবে স্বাস্থ্যসেবা, অবসরযাপনের আবাসন, সহায়ক যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত ভোগ্যপণ্য।
একাডেমিক গবেষণাতেও ভোগের ধরনে ইতিবাচক দিকের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পিয়ার-রিভিউড সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনমিতিক লভ্যাংশের পরিবর্তনে মাথাপিছু পারিবারিক ভোগ বেড়েছে। এর কারণ নিষ্পত্তিযোগ্য আয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ভোগের পরিবেশের উন্নতি। বিপুল শ্রমশক্তি থেকে পাওয়া পরিমাণগত লভ্যাংশ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত গুণগত লভ্যাংশ কিছু ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে, যদি মানবসম্পদে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে।
নীতিগত উদ্যোগ ও আঞ্চলিক দৃষ্টান্ত
জনমিতিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দিতে বেইজিং কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ২০২৫ সাল থেকে ১৫ বছর ধরে ধাপে ধাপে আইনগত অবসরের বয়স বাড়ানো হবে। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬৩ বছর এবং শ্বেত-কলার পেশায় কর্মরত নারীদের ক্ষেত্রে ৫৮ বছরে পৌঁছাবে। ব্লু-কলার পেশায় কর্মরত নারীরা ৫০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়সে অবসরে যাবেন। অভিজ্ঞ কর্মীদের চাকরিতে আরও বেশি দিন রাখা এবং পেনশন থেকে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রবাহ কমানোই এ পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। তবে নতুন কর্মীর ঘাটতির মূল কারণ এটি দূর করতে পারবে না।
বড় পরিবারে উৎসাহ দিতে সরকার নগদ ভাতা, করছাড়, বর্ধিত শিশুযত্ন ছুটি এবং শিশুর কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার শেষ বছরের বেতন মওকুফ করেছে। কিছু পৌরসভা আবাসন ভর্তুকিও দিচ্ছে। তবু পূর্ব এশিয়াজুড়ে জন্মহার একরকমভাবে কমই রয়ে গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের কম জন্মহারকে যথাক্রমে ‘নীরব জরুরি অবস্থা’ ও ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। দ্রুত বার্ধক্যের মুখে থাকা সমাজগুলোর একটি সিঙ্গাপুর এ সংকট সামলাতে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়াচ্ছে এবং কর্মজীবনের মেয়াদ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সতর্ক করেছে, আগামী তিন দশকে এশিয়ার জনসংখ্যা ততটাই বুড়িয়ে যাবে, যতটা পশ্চিমা দেশগুলোর হয়েছে আগের ছয় দশকে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬১ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশ হবে।
পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে চীন প্রবীণদের জন্য অবকাঠামো ও পেশাদার পরিচর্যা-সেবা সম্প্রসারণ করছে। ২০২২ সালে বেসরকারি পেনশন কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণ পরিচর্যার ছুটি চালু করা আরও প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে এগোনোর পদক্ষেপ। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে চীনের প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ, ৬০ বছরের বেশি বয়সী হবে। কোনো সমাজই এর আগে এত বিপুলসংখ্যক প্রবীণ নাগরিকের মুখোমুখি হয়নি। এ চাহিদা মেটাতে হলে প্রতিটি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অঙ্গীকার ও সামাজিক অভিযোজন প্রয়োজন।
মূল বিষয়গুলো
- ১৯৪৯ সালে আধুনিক নথি সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীনে ৬৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
- জনসংখ্যায় কর্মক্ষম বয়সীদের অংশ ৬২ শতাংশের নিচে নেমেছে, যা এক দশক আগে ৬৭ শতাংশের বেশি ছিল।
- এক সন্তান নীতিতে চূড়ান্ত রূপ পাওয়া কয়েক দশকের কঠোর জন্মনিয়ন্ত্রণে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রজনন হার প্রতি নারীতে প্রায় ০.৯৯ জন্মে নেমে এসেছে।
- শ্রমশক্তি সংকোচন ও বার্ধক্যনির্ভরতার হার বৃদ্ধি পেনশনব্যবস্থা, পারিবারিক পরিচর্যার ঐতিহ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হুমকিতে ফেলছে।
- পরিবর্তনের চাপ সামলাতে সরকার অবসরের বয়স বাড়াচ্ছে, বেসরকারি পেনশন সম্প্রসারণ করছে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রসার ঘটাচ্ছে এবং দম্পতিদের ভর্তুকি দিচ্ছে।






