উৎপাদন কারখানা যখন পর্যটনকেন্দ্র
বেইজিংয়ে গিয়ে প্রাচীন স্থাপনা না দেখে কারখানা ঘুরে দেখার টিকিটের লটারিতে অংশ নেওয়ার কথা ভাবুন। এখন হাজারো দর্শনার্থীর কাছে শিল্পোৎপাদন সক্ষমতাই হয়ে উঠেছে সেরা আকর্ষণ। শাওমির উৎপাদনকেন্দ্রটি অপ্রত্যাশিতভাবেই পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। বিনা মূল্যের ৬০ মিনিটের নির্দেশিত ভ্রমণ এতটাই মর্যাদার বিষয় যে কালোবাজারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে ৩০০ ডলার পর্যন্ত। আগ্রহী দর্শনার্থীদের এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়; ১ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ২০০টি আসনের জন্য লটারিতে জেতার সম্ভাবনা এমন উন্মাদনা তৈরি করেছে, যা ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক স্থানগুলোর আকর্ষণের সঙ্গে পাল্লা দেয়।
সূচিপত্র
এই প্রবণতা চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরার পদ্ধতিতে বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন। স্থানীয়ভাবে ‘টাইগার মম’ নামে পরিচিত উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিভাবকেরা ছয় বছর বয়সী শিশুকেও নিয়ে আসেন, যাতে তারা রোবটকে স্মার্টফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন করতে দেখতে পারে। তাঁদের আশা, এতে শিশুরা অল্প বয়সেই প্রকৌশলের প্রতি আগ্রহী হবে। এই কেন্দ্রে ৪০ মিনিটের যাত্রায় উচ্চপ্রযুক্তির প্রদর্শনী হল ঘুরে দেখানো হয়, এরপর ২০ মিনিট ধরে প্রায় ৭০০টি রোবটের তদারকিতে থাকা আনুমানিক ১০০ কর্মীকে কাজ করতে দেখা যায়। দর্শনার্থীরা দেখেন, প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি উচ্চমানের বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন হচ্ছে; পাশের স্মার্টফোন কারখানায় উৎপাদনের গতি আরও বেশি। শাওমি ক্যাম্পাসের কাছে গেলে বিস্তীর্ণ ভবনগুলো দেখা যায়, যেগুলো বাগানঘেরা উঠান দিয়ে যুক্ত। সেখানে খরগোশের মাসকটের ভাস্কর্য, বাস্তব হওয়া স্বপ্নের প্রতীক উড়ন্ত শূকরের ভাস্কর্য এবং জলাধারে প্রতিফলিত বিশাল কোম্পানি লোগো রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে পণ্য উন্মোচনের পর এই পর্যটন জোয়ারে গতি আসে। সে সময় দুই ঘণ্টায় SU7 Ultra গাড়ির ১০ হাজার ইউনিট বিক্রি হয়। ‘কারখানা পর্যটন’-এর এই উন্মাদনা শিল্পস্থলগুলোতে ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে ২ কোটি দর্শনার্থী যাওয়ার সরকারি পূর্বাভাসের সঙ্গে মেলে। এসব স্থান জাতীয় গর্বের প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভোক্তাদের মধ্যে ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। শাওমির জন্য উৎপাদন লাইন দর্শনার্থীদের সামনে খুলে দেওয়া ব্র্যান্ডের সঙ্গে ক্রেতাদের সম্পর্ক জোরদার করে এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে ভবিষ্যৎ ক্রেতাদের কাছে পণ্য পরিচিত করার সুযোগ দেয়।
ছয় সেকেন্ডে উৎপাদনের বিস্ময়
কাচের পর্যবেক্ষণ জানালার ওপারে রয়েছে এমন এক উৎপাদন সাফল্য, যা প্রচলিত শিল্পের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বেইজিংয়ের চাংপিং জেলায় শাওমির স্মার্ট ফ্যাক্টরিতে প্রায় প্রতি ছয় সেকেন্ডে একটি নতুন ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন তৈরি হয়; বছরে উৎপাদন ১ কোটিরও বেশি ইউনিট। পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখলে সারা বছরের গড়ে প্রতি ৩.১৫ সেকেন্ডে একটি যন্ত্র তৈরি হয়। তবে উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন করা প্রতিটি ইউনিটের প্রকৃত সংযোজনচক্র ছয় সেকেন্ডের মানদণ্ডেই চলে।
কারখানাটির আয়তন ৮১ হাজার বর্গমিটার, যা প্রায় ১১টি ফুটবল মাঠের সমান। এতে বিনিয়োগ করা হয়েছে ২.৪ বিলিয়ন ইউয়ান (৩৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার); কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রচলিত কারখানায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ উৎপাদন লাইনে ঘণ্টায় ৩০০টি যন্ত্র তৈরি করতে প্রায় ৪৫০ কর্মী লাগে। এর বিপরীতে, শাওমির স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইন ৩১০ মিটার দীর্ঘ এবং ২২০ কর্মী ঘণ্টায় ৬০০টি ইউনিট তৈরি করেন। ৮১ শতাংশ সামগ্রিক স্বয়ংক্রিয়তার কারণে এই দক্ষতা সম্ভব হয়েছে। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ যন্ত্রের নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা বুদ্ধিমান রোবট ব্যবহার করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শতভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে।
উৎপাদনের সমন্বিত প্রক্রিয়া শুরু হয় সারফেস-মাউন্ট প্রযুক্তির লাইনে, যেখানে মুদ্রিত সার্কিট বোর্ডে অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক উপাদান মাইক্রোমিটার-স্তরের নির্ভুলতায় বসানো হয়। রোবোটিক বাহু একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৪০টি মাদারবোর্ড ড্রয়ারভিত্তিক পরীক্ষাব্যবস্থায় পাঠায়। সীমিত ধারণক্ষমতার রোবোটিক বাহু ব্যবহার করা পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় এতে দক্ষতা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এসব ব্যবস্থায় একসঙ্গে কয়েক ডজন কার্যকারিতা পরীক্ষা চালিয়ে ত্রুটি শনাক্ত করা হয়। এরপর কাঠামোগত শক্তিবৃদ্ধির ধাপে ফোম, স্টিলের পাত ও কুশনিং প্যাড যোগ করে ভঙ্গুর উপাদানগুলো সুরক্ষিত করা হয়। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা লেই জুন এই কারখানাকে শাওমির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি একে চীনের সবচেয়ে উন্নত মোবাইল ফোন কারখানাগুলোর একটি বলে ঘোষণা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, অধিকাংশ সরঞ্জাম প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই তৈরি।
ডার্ক ফ্যাক্টরির ভেতরে
শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞরা শাওমির মতো স্থাপনাকে ‘ডার্ক ফ্যাক্টরি’ বলেন। এতে এমন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন পরিবেশ বোঝায়, যেখানে মানুষের আরামের জন্য আলো, হিটিং বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। এসব কারখানা দিনে ২৪ ঘণ্টা চলে; ফলে পালাবদল, বিরতি এবং মানবশ্রমের স্বাভাবিক অসংগতি থাকে না। চাংপিংয়ের কারখানাটি বড় পরিসরে এই ধারণার বাস্তব রূপ। এতে নিজস্বভাবে তৈরি ৯৬৮টি যন্ত্র এবং মালিকানাধীন উৎপাদন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। আলো ছাড়াই চলা এই কারখানায় স্বয়ংক্রিয় ট্রলি রেলপথ ধরে বড় রোবোটিক বাহুর কাছে যন্ত্রাংশ পৌঁছে দেয়।
এর প্রযুক্তিগত কেন্দ্র হলো শাওমি হাইপার ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যাটফর্ম। সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে তৈরি এই ডিজিটাল স্নায়ুতন্ত্রই কারখানার মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করে। বড় পর্দায় দৈনিক উৎপাদন, উৎপাদিত পণ্যের গ্রহণযোগ্যতার হার এবং দক্ষতার সরাসরি তথ্য দেখা যায়; ত্রিমাত্রিক সর্বাঙ্গীণ দৃশ্যে সার্কিট বোর্ড উৎপাদন থেকে চূড়ান্ত সংযোজন পর্যন্ত কার্যক্রম অনুসরণ করা যায়। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কসংকেত দেয় এবং কারিগরেরা সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করেন। বুদ্ধিমান আগাম শনাক্তকরণ যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি ঘটার আগেই চিহ্নিত করে। পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এতে সময় বাঁচে এবং অপচয় কমে।
এই স্বনির্ভরতা যন্ত্রপাতিতেও বিস্তৃত: হার্ডওয়্যারের ৯৬.৮ শতাংশ নিজস্বভাবে তৈরি, আর উৎপাদন সফটওয়্যার শতভাগ নিজস্ব। উন্নত পরিশোধন ও ধনাত্মক বায়ুচাপের বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাইক্রোমিটার-স্তরে ধুলা সরায়। এতে মানুষের সংস্পর্শে দূষণের ঝুঁকি ছাড়াই অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক উপাদান ব্যবহারের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়। মডিউলার প্ল্যাটফর্মের নকশার কারণে নতুন মডেলের জন্য উৎপাদন লাইন মাত্র ১০ ঘণ্টায় রূপান্তর করা যায়; প্রচলিত কারখানায় এমন পরিবর্তনে এক সপ্তাহ লাগে। আবহাওয়ার কারণে আঠার সান্দ্রতা বদলে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পাম্পের চাপ নতুন করে হিসাব করে, ফলে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জোড়ার মান বজায় থাকে।
সংযোজন কারখানার তকমা ঘোচানো
বছরের পর বছর শাওমিকে শুধু সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার ধারণার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। প্রধান নির্বাহী লেই জুনের ভাষায়, এই তকমা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণ। শুরুর দিকের যন্ত্রগুলোতে কোয়ালকমের চিপ, স্যামসাংয়ের ডিসপ্লে এবং সনির ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো, আর তৃতীয় পক্ষের নির্মাতারা সেগুলো সংযোজন করত। ফলে বাজার পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করতেন, কোম্পানিটির নিজস্ব মূল প্রযুক্তি নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রি ইলেকট্রিক অ্যাপ্লায়েন্সেসের চেয়ারপারসন দং মিংঝু প্রকাশ্যে শাওমির প্রযুক্তিগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এয়ার কন্ডিশনার বিক্রির র্যাঙ্কিং ও সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্কে নতুন করে সামনে আসে।
এর জবাবে লেই জুন শাওমিকে উল্লম্ব সমন্বয়ের পথে এগিয়ে নিয়েছেন। কোম্পানির প্রেসিডেন্ট লু ওয়েইবিং যাকে নকশা, গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন এবং যাচাই-বাছাই নিয়ে গড়া পূর্ণাঙ্গ শিল্পচক্র বলেন, শাওমি তা প্রতিষ্ঠা করছে। চাংপিংয়ের স্মার্টফোন কারখানার পাশাপাশি রয়েছে ইঝুয়াংয়ের গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র এবং সম্প্রতি চালু হওয়া উহান স্মার্ট হোম অ্যাপ্লায়েন্স কারখানা। ৫ লাখ বর্গমিটার আয়তনের এই কারখানায় প্রতি ৬.৫ সেকেন্ডে একটি উচ্চমানের এয়ার কন্ডিশনার তৈরি হয় এবং এআই-ভিত্তিক দৃশ্যমান মান পরীক্ষা শতভাগ স্বয়ংক্রিয়। ২.৫ বিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগে তৈরি এ স্থাপনায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাত্র ৩৩৬ দিন পর উৎপাদন শুরু হয়। স্মার্টফোন ও গাড়ি কারখানার পর এটি শাওমির তৃতীয় বড় উৎপাদনকেন্দ্র।
অনেকের মধ্যে পক্ষপাত আছে; তাঁরা একগুঁয়েভাবে মনে করেন, শাওমির কোনো প্রযুক্তি নেই, এটি কেবল সংযোজন কারখানা,” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন লেই জুন। “একসময় এসব কথায় আমি গভীর আত্মসংশয়ে ভুগেছিলাম। কিন্তু গত বছর শাওমির স্মার্টফোন স্মার্ট ফ্যাক্টরি ও গাড়ি স্মার্ট ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার পর এসব কথা প্রায় হারিয়ে গেছে।
এই রূপান্তরের উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রভাব রয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানির মূল্যায়ন চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকারীদের তুলনায় মৌলিকভাবে আলাদা; এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও শেয়ারের দামে। প্রায় সব উপাদান নিজেদের কারখানায় তৈরি করে শাওমি মান ও দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়িতে টেসলার এবং প্রিমিয়াম স্মার্টফোনে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের সঙ্গে জোরালো প্রতিযোগিতার অবস্থান তৈরি করে। উহানের কারখানাটি বিশেষভাবে আগের বিতর্কের জবাব দেয়। তখন ক্রেতারা লক্ষ্য করেছিলেন, শাওমির এয়ার কন্ডিশনার তৈরি করত সিচুয়ান চ্যাংহং। এ নিয়ে রসিকতা ছড়িয়েছিল, সরাসরি চ্যাংহংয়ের পণ্য কিনলেই বেশি সাশ্রয় হবে।
নির্ভুল পরীক্ষা ও মানব তদারকি
স্বয়ংক্রিয়তার প্রাধান্য থাকলেও শাওমির মান নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় কর্মীরা অপরিহার্য। স্মার্টফোন উৎপাদন লাইনের ২২০ কর্মী পণ্য পরীক্ষা করেন, অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে হস্তক্ষেপ করেন এবং বিশেষ পরিচ্ছন্ন কক্ষে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করার মতো বিকল্পহীন সূক্ষ্মতার কাজ করেন। মানুষ ও যন্ত্রের এই সহযোগিতায় উৎপাদিত পণ্যের ৯৯ শতাংশ মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, যা শিল্পের ৯৮ শতাংশ মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে জটিল চূড়ান্ত সংযোজনের ধাপ সামলানোর নমনীয়তাও বজায় থাকে।
পরীক্ষার প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিস্তৃত। সারফেস-মাউন্ট প্রযুক্তিতে উপাদান বসানোর পর মাদারবোর্ডগুলো একাধিক চ্যানেলে পরীক্ষা করে নির্ধারিত মান অনুযায়ী কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। প্রতিটি পেছনের প্যানেল লাগানোর পর যন্ত্রগুলো পানি-প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরীক্ষা পেরোয়। এরপর নিজস্বভাবে তৈরি ৪৯টি পরীক্ষাকেন্দ্রে চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়। সেখানে অ্যান্টেনার কার্যকারিতা, অডিওর মান, ক্যামেরা, ডিসপ্লের ক্যালিব্রেশন, ব্লুটুথ সংযোগ এবং সেন্সরের নির্ভুলতা যাচাই করা হয়।
এরপর যন্ত্রগুলো বার্ধক্য পরীক্ষা কক্ষে যায়, যেখানে একসঙ্গে ২,৪০০টি স্মার্টফোন রাখা যায়। বিভিন্ন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের অনুকরণ করে ব্যাটারির আয়ু ও কার্যকারিতার স্থিতিশীলতা যাচাই করা হয়। এতে কর্মীদের দীর্ঘ সময় কঠোর পরীক্ষার পরিবেশে থাকতে হয় না এবং পরীক্ষার সময়ও কমে। প্যাকেজিংয়ের আগে প্রস্তুত যন্ত্রগুলো বিদ্যুৎ খরচ, অ্যান্টেনার কার্যকারিতা, অডিও, ক্যামেরা, ডিসপ্লে ও সেন্সরসহ নানা দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা পেরোয়। এরপর চূড়ান্ত পুনঃপরীক্ষার ধাপ সম্পন্ন হয়। উৎপাদনের সাতটি ধাপে নিশ্চিত করা হয়, প্রায় ২,০০০ ইউরো দামের ফ্ল্যাগশিপ মডেলগুলোর জন্য নির্ধারিত উচ্চমান পূরণ করেই যন্ত্রগুলো কারখানা ছাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে সম্প্রসারণ ও বাজারে অবস্থান
শাওমির উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে জোরালো ব্যয়ও চলছে। প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত চীনের বাজারে কোম্পানিটির অংশীদারত্ব ১৫ শতাংশ, যা আগের বছরের চেয়ে চার শতাংশ পয়েন্ট বেশি। বিশ্ববাজারে অংশীদারত্ব সামান্য কমে ১৩ শতাংশ হলেও ইউরোপের বাজারে উল্টো এক শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। এতে প্রিমিয়াম বিভাগে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের পর তৃতীয় অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শাওমির অবস্থান বিশেষভাবে শক্তিশালী। মালয়েশিয়ায় বাজারের ২১ শতাংশ তাদের দখলে এবং ক্যানালিসের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে তারাই শীর্ষে। এসব বাজারে প্রতিষ্ঠিত বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিপরীতে শাওমিকে ক্রমেই প্রিমিয়াম বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। লাইকার সঙ্গে যৌথ প্রকৌশলে তৈরি ১৭ সিরিজের ফ্ল্যাগশিপ ফোন বার্সেলোনায় উন্মোচনের পর এই অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। এই ইমেজিং সহযোগিতায় কারখানার সৃজনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গাগুলো ব্যবহার করা হয়। সেখানে সাজানো বসার ঘর, চীনা ধাঁচের রেস্তোরাঁ এবং ঘরের ভেতরের বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে। এসব জায়গায় ক্যামেরা ব্যবস্থাকে দৈনন্দিন বিভিন্ন পরিবেশের জন্য মানিয়ে নেওয়া হয়, উজ্জ্বল দিনের তীব্র বৈপরীত্য থেকে শুরু করে মৃদু আলোয় থাকা ঘর পর্যন্ত।
এই বাণিজ্যিক সাফল্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে অর্থ জোগাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে শাওমি ২৩.৫ বিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগ করেছে, যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের ব্যয়ের প্রায় সমান। বিশ্বের ১১টি শহরে কোম্পানিটির ৭৩০টিরও বেশি গবেষণাগার রয়েছে; এগুলোর মোট আয়তন ৪০ হাজার বর্গমিটারের বেশি। বেইজিং ক্যাম্পাস ল্যাবরেটরি এর প্রধান স্থাপনা। শুধু ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেই ব্যয় রেকর্ড ৯.১ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২.১ শতাংশ বেশি। রাজস্ব ২২.৩ শতাংশ বেড়ে ১১৩.১ বিলিয়ন ইউয়ান এবং সমন্বিত নিট মুনাফা ১১.৩ বিলিয়ন ইউয়ানে দাঁড়ায়। এতে বোঝা যায়, সংযোজন থেকে উন্নত উৎপাদনে রূপান্তর আর্থিক ফল দিচ্ছে।
মূল তথ্য
- বেইজিংয়ের চাংপিংয়ে শাওমির কারখানায় প্রতি ছয় সেকেন্ডে একটি ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন তৈরি হয়; বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ইউনিট
- ২.৪ বিলিয়ন ইউয়ানের এই কারখানায় ৮১ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়তা রয়েছে; একই ধরনের উৎপাদনে প্রচলিত কারখানায় ৪৫০ কর্মী লাগলেও এখানে কাজ করেন ২২০ জন
- কারখানা ভ্রমণ পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে; টিকিট পেতে এক মাস অপেক্ষা, লটারি এবং কালোবাজারে ৩০০ ডলার পর্যন্ত দাম দিতে হচ্ছে
- হাইপার ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যাটফর্মে ৯৬.৮ শতাংশ নিজস্বভাবে তৈরি হার্ডওয়্যার ও শতভাগ মালিকানাধীন সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়, যা আলো ছাড়া উৎপাদন সম্ভব করে
- লেই জুনের উল্লম্ব সমন্বয় কৌশলের লক্ষ্য হলো নকশা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে শাওমিকে সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মূল প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিতে রূপান্তর করা
- উৎপাদন সম্প্রসারণ করে কোম্পানিটি উহানে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির কারখানা এবং প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি গাড়ি তৈরি করা মোটরগাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র চালু করেছে
- ইউরোপে স্মার্টফোন বাজারে শাওমির অংশীদারত্ব ২০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ২১ শতাংশ; ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ হয়েছে ২৩.৫ বিলিয়ন ইউয়ান






