নতুন অস্ত্রভান্ডার: ক্লাস্টার বোমা ও তড়িৎচুম্বকীয় অস্ত্র
চলতি মাসে উত্তর কোরিয়া ব্যাপক পরিসরে একের পর এক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাস্টার বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র, যা সাবমিউনিশন ছড়িয়ে প্রায় দশটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা ঢেকে দিতে পারে; পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গ্রিড অচল করে দেওয়ার জন্য তৈরি তড়িৎচুম্বকীয় অস্ত্রও রয়েছে। নতুন একটি ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বল্পমূল্যের উপকরণে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিনের পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। এসব পরীক্ষা সামরিক বাহিনীর নিয়মিত আধুনিকায়নের চেয়ে বেশি কিছু। এগুলো ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থেকে পাওয়া রণক্ষেত্রের শিক্ষা পিয়ংইয়ং একটি সমন্বিত কৌশলে কাজে লাগানোর সচেতন চেষ্টা করছে। লক্ষ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা, দীর্ঘস্থায়ী বিমান হামলা টিকে থাকা এবং এশিয়ায় আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
সূচিপত্র
হওয়াসং-১১এ (কেএন-২৩) স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড ছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, এটি প্রায় সাত হেক্টর এলাকাজুড়ে থাকা "যেকোনো লক্ষ্যকে ছাই করে দিতে" পারে। এভাবে সাবমিউনিশন ছড়িয়ে দেওয়ায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ছড়িয়ে থাকা পদাতিক সেনাদল, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি বা রসদকেন্দ্রে শত শত সাবমিউনিশন আঘাত হানতে পারে। এতে প্রতিটি উৎক্ষেপণের সাশ্রয়ী কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, কারণ একক লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এসব হামলা ঠেকানো কঠিন হয়। পরীক্ষার সময় উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে ২৪১ থেকে ৬৯৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ে। এর পর দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠক ডাকেন।
পরীক্ষা করা হয়েছে কার্বন-ফাইবারের "ব্ল্যাকআউট বোমা"ও। এগুলো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর বিদ্যুৎ পরিবাহী তন্তু ছড়িয়ে দিয়ে গ্রিডে শর্ট সার্কিট ঘটায়। পাশাপাশি পরীক্ষা করা হয়েছে এমন একটি তড়িৎচুম্বকীয় অস্ত্রব্যবস্থা, যা দক্ষিণ কোরিয়ার এফ-৩৫এ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বা এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ারের মতো উন্নত সামরিক সরঞ্জামের বৈদ্যুতিক সার্কিট অচল করে দিতে পারে।
পরীক্ষাগুলোর তত্ত্বাবধানকারী জেনারেল কিম জং-সিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এসব সক্ষমতার বর্ণনা দেন।
তড়িৎচুম্বকীয় অস্ত্র ও কার্বন-ফাইবার বোমা কৌশলগত প্রকৃতির বিশেষ সম্পদ, যা বিভিন্ন সামরিক উপকরণের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা যায়।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, স্বল্পমূল্যের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিনের পরীক্ষা থেকে বোঝা যায়, ব্যাপক উৎপাদনকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিপুল উৎপাদন ও শিল্প সক্ষমতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এসব সক্ষমতা নেতা কিম জং-উনের পাঁচ বছর মেয়াদি সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সময়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি বৈরিতা অব্যাহত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতি থমকে আছে। সব মিলিয়ে এসব অগ্রগতি ইঙ্গিত দেয়, উত্তর কোরিয়া শুধু অস্ত্রভান্ডার আধুনিক করছে না, ভবিষ্যৎ সংঘাতে কীভাবে লড়বে এবং টিকে থাকবে, সেই কৌশলও শাণিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে শিক্ষা
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ নিবদ্ধ থাকায় এসব পরীক্ষার সময় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তেহরানের বাহিনী কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তা উত্তর কোরিয়ার সামরিক পরিকল্পনাকারীরা পর্যবেক্ষণ করছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরানের ব্যবস্থা কীভাবে কয়েক সপ্তাহের নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলার পরও টিকে থেকেছে, তা তাঁরা দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমায় আঘাতপ্রাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বাংকার ও সাইলো খুঁড়ে বের করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেগুলো আবার চালু করা হয়েছে। ইরানের সড়কপথে চলাচলকারী শত শত উৎক্ষেপণযান ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হলেও দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযানের প্রায় অর্ধেক এবং হাজার হাজার একমুখী হামলাকারী ড্রোন অক্ষত রয়েছে। ছড়িয়ে থাকা ও সুরক্ষিত ব্যবস্থার এই টিকে থাকা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বাস্তব শিক্ষা। উত্তর কোরিয়ার ২০টি অঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ স্থাপনার সঙ্গে ইরানের অবকাঠামোর ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করাও উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলা দেখিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বারপ্রান্তে থাকা রাষ্ট্রও উন্নত নজরদারি ও নির্ভুল হামলার সক্ষমতার কারণে অস্তিত্বগত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিম জং-উনের কাছে এটি নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখতে বিকল্প কমান্ড নেটওয়ার্ক, ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র, সুরক্ষিত অবকাঠামো এবং প্রতিপক্ষের আগাম হামলা ঠেকাতে আগাম আঘাতের মতবাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেয়।
কোরিয়া রিজিওনাল রিভিউয়ে লেখা এক নিবন্ধে ব্রুস বেকটল জুনিয়র ইরানের হামলায় উত্তর কোরিয়া থেকে উদ্ভূত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ব্যাপক কার্যকর ব্যবহার তুলে ধরেছেন।
স্কাড ব্যবস্থার আদলে তৈরি স্বল্পপাল্লার কিয়াম ক্ষেপণাস্ত্র ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। অন্যদিকে, নোডং-ভিত্তিক ইমাদ ও গদর ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১,৭৫০ থেকে ১,৯৫০ কিলোমিটার, যা বিস্তৃত আঞ্চলিক এলাকায় আঘাত হানতে সক্ষম করে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে রবার্ট পিটার্স বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও উত্তর কোরিয়া একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করতে পারে। প্রচলিত অস্ত্রে সজ্জিত ক্ষেপণাস্ত্রের বড় বহর দিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলার পর ধারাবাহিক হামলা চালাতে পারে তারা। বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মিশিয়ে একসঙ্গে ছোড়ার সক্ষমতা উত্তর কোরিয়া দেখিয়েছে, যা সেগুলোকে প্রতিহত করা কঠিন করে এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
ইউক্রেনের রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা
ইরানের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের টিকে থাকা ও আকাশ প্রতিরক্ষাকে চাপে ফেলার শিক্ষা পাওয়া গেলেও ড্রোনযুদ্ধ এবং সাশ্রয়ী ব্যাপক উৎপাদনের পাঠ দিচ্ছে ইউক্রেন। রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করা উত্তর কোরীয় সেনারা শাহেদ-ধাঁচের একমুখী হামলাকারী ড্রোনের সরাসরি অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। এসব ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার, যেখানে ইস্কান্দার-এমের মতো একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে লাগে ২০ লাখ বা ৩০ লাখ ডলার।
খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ, নেভিগেশন ও ড্রোনের কাঠামোসংক্রান্ত প্রযুক্তি ভাগাভাগি করেছে, যা দেশটির নিজস্বভাবে কার্যকর ব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতা জোরদার করেছে। রাশিয়ায় ড্রোন নির্মাণের অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারেন উত্তর কোরীয় কর্মীরা। রণক্ষেত্রে উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে ড্রোন থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য সরাসরি গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাবর্ষণ ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং বড় ব্যাটালিয়নের বদলে ছোট ও দ্রুতগতির পদাতিক ইউনিট গড়ে তোলা।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি সেন্টারের পরিচালক জন হেমিংস এই যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার প্রভাব মূল্যায়ন করেছেন।
মাত্র দুই বছর আগের তুলনায় কোরিয়ান পিপলস আর্মি এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক।
ড্রোন প্রযুক্তির কম খরচ প্রযুক্তিগত দুর্বলতা পুষিয়ে নিতে ব্যাপক উৎপাদনের সুযোগ করে দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া অসমমিত যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে অস্ত্র তৈরি করছে বলে মনে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ গ্রিড ও শিল্প অবকাঠামো অচল করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের ওপর জোর দেওয়া এবং স্বল্পমূল্যের উপকরণ ব্যবহার করে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বজায় রাখা।
পারমাণবিক নিবৃত্তি থেকে প্রচলিত যুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতা
এই শিক্ষাগুলোর সমন্বয় পিয়ংইয়ংয়ের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার কৌশলে আরও বিস্তৃত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। হামলা ঠেকাতে শুধু পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে উত্তর কোরিয়া এমন প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতা গড়ে তুলছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারে। বিশ্লেষকেরা এই কৌশলকে শীতল যুদ্ধের সময় ইউরোপের কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেন, যখন দীর্ঘস্থায়ী প্রচলিত যুদ্ধের আশঙ্কা আগ্রাসন ঠেকাতে নিবৃত্তি হিসেবে কাজ করত।
স্তরভিত্তিক এই নিবৃত্তি কৌশলে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র, সুরক্ষিত নেতৃত্ব, বিকল্প কমান্ড নেটওয়ার্ক, ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র, সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং অসমমিতভাবে সংঘাত বাড়ানোর উপকরণ। উদ্দেশ্য সংঘাত শুরু করা নয়; বরং প্রতিপক্ষকে বোঝানো যে যেকোনো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী, ব্যয়বহুল ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে, ফলে দ্রুত বা চূড়ান্ত বিজয়ের সম্ভাবনা নাকচ হবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা ইরান সংঘাত থেকে উত্তর কোরিয়া সম্ভবত যে আটটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রাখতে মজুত বাড়ানো, ড্রোন ও ড্রোনবিরোধী সক্ষমতা জোরদার করা এবং বিমান হামলা থেকে সড়কপথে চলাচলকারী উৎক্ষেপণযান রক্ষা করা। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বহু ছোট বাংকারে ছড়িয়ে রাখা এবং ছদ্ম লক্ষ্যবস্তুর আড়ালে সুরক্ষিত থাকলে ব্যাপক বিমান অভিযানও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে পুরোপুরি দমন করতে পারে না।
ক্রিঙ্ক অক্ষ ও দুই রণাঙ্গনে চাপ সৃষ্টি
উত্তর কোরিয়ার সামরিক বিবর্তন কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর আরও বিস্তৃত এক জোটের মধ্যে ঘটছে, যাকে কখনো কখনো ক্রিঙ্ক অক্ষ বলা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। এই ঘনিষ্ঠতা এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যাকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা দুই রণাঙ্গনে চাপ সৃষ্টি বলে অভিহিত করেন। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার উত্তেজনা একই সংঘাত-পরিস্থিতির পরস্পরসংযুক্ত রণাঙ্গনে পরিণত হয়।
ইরানের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপ থেকে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ায় পিয়ংইয়ং ও বেইজিং নীরবে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাম্প্রতিক পিয়ংইয়ং সফর ছিল ছয় বছরের মধ্যে তাঁর প্রথম সফর। অস্ত্র পরীক্ষার সময়ের সঙ্গে মিলে যাওয়া এই সফরের পরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে একই সময়ে সংকট দেখা দিলে এই সমন্বয়ের সুযোগ নিয়ে চীন ও রাশিয়া কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। উত্তর কোরিয়ার উন্নততর প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা এই সমন্বিত ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর যুক্তিকে আরও জোরদার করে। এই কাঠামোয় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর আলাদা সম্ভাব্য সংকট নয়, বরং পরস্পরসংযুক্ত রণাঙ্গন।
ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠকে কিম জং-উন সমাজতান্ত্রিক সংহতির ওপর জোর দেন। তিনি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ককে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার এবং তাইওয়ান বিষয়ে চীনের এক চীন নীতিকে সমর্থনের অঙ্গীকার করেন। এই আদর্শিক বক্তব্যের আড়ালে রয়েছে বাস্তব সামরিক সমন্বয়। উত্তর কোরিয়ার শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে চীনের কৌশলগত স্বার্থে কাজ করছে।
মিত্রদের প্রতিরক্ষার চ্যালেঞ্জ
পরীক্ষিত অস্ত্রগুলো দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য নির্দিষ্ট কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ক্লাস্টার বোমা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাকে জটিল করে তোলে, কারণ প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র মূল বুস্টারকে আঘাত করার আগেই সাবমিউনিশন ছড়িয়ে পড়ে। তড়িৎচুম্বকীয় অস্ত্র আধুনিক যুদ্ধবিমান ও নৌযানের উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে হুমকির মুখে ফেলে। স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিপুল সংখ্যায় ব্যবহারের আশঙ্কায় ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরাস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একটি প্যাট্রিয়ট প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৩০ লাখ ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার চেওংগুং-২ ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১৫ লাখ ডলার।
প্রতিহতকারী ড্রোন তৈরির জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ১৮ বিলিয়ন ওন বা ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারের একটি কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। দেশটি বুঝতে পেরেছে, সস্তা ড্রোনের ঝাঁকের বিরুদ্ধে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের পাল্লা প্রতিকূল। কিছু বিশ্লেষকের পরামর্শ, ইউক্রেন সংঘাতে উদ্ভাবনের দ্রুতগতির কথা বিবেচনা করে শুরু থেকে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি না করে রণক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তির লাইসেন্স নিতে সিউলের ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতাদের সঙ্গে অংশীদার হওয়া উচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র জাং দো-ইয়ং বলেন:
দক্ষিণ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় উত্তর কোরিয়ার যেকোনো উসকানির জবাবে চরম শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি আমাদের সামরিক বাহিনীর রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সীমা পরীক্ষা করে চলেছে। এ অবস্থায় ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের শিক্ষা সামরিক মতবাদে যুক্ত করা উত্তর-পূর্ব এশিয়ার জন্য বিদ্যমান হুমকিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
মূল কথা
উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক অস্ত্র পরীক্ষা বিচ্ছিন্ন পারমাণবিক নিবৃত্তি থেকে এমন সমন্বিত প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতার দিকে কৌশলগত বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যার লক্ষ্য টিকে থাকা, প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করা এবং পাল্টা আঘাত হানা। সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে পিয়ংইয়ং যেকোনো ভবিষ্যৎ সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল করে তুলতে চায়। এতে ওয়াশিংটন ও সিউলের কৌশলগত হিসাব জটিল হবে এবং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর উদীয়মান সহযোগিতার অক্ষে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান শক্ত হবে।
- উত্তর কোরিয়া এমন ক্লাস্টার বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে, যা দশটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা ঢেকে দিতে পারে; পাশাপাশি বৈদ্যুতিক অবকাঠামো অচল করার জন্য তৈরি তড়িৎচুম্বকীয় ব্ল্যাকআউট অস্ত্রও পরীক্ষা করেছে
- বিমান হামলার মধ্যেও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে ইরান যুদ্ধ থেকে এবং ড্রোনযুদ্ধ ও ব্যাপক উৎপাদনের বিষয়ে ইউক্রেন থেকে পাওয়া শিক্ষা পিয়ংইয়ং কাজে লাগাচ্ছে
- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যা করার ঘটনা সুরক্ষিত স্থাপনা, বিকল্প কমান্ড ব্যবস্থা এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার বিকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখার উত্তর কোরিয়ার প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করেছে
- পারমাণবিক নিবৃত্তির ওপর একক নির্ভরতা ছাড়িয়ে টিকে থাকতে সক্ষম প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতার মাধ্যমে যেকোনো সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল করে তোলাই এই কৌশলের লক্ষ্য
- চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে গভীরতর সম্পর্ক দুই রণাঙ্গনে চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে; একই সময়ে সংকট দেখা দিলে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদ ছড়িয়ে পড়তে পারে
- প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিপুল হামলায় জর্জরিত করা, সাবমিউনিশন ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্বল্পমূল্যে ব্যাপক উৎপাদনের কৌশলের কারণে এসব অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে






