পরিধানযোগ্য সেন্সরে ব্যাটারি নিয়ে দুশ্চিন্তার অবসান
ব্যায়াম শুরু করার ঠিক সময়ে ফিটনেস ট্র্যাকারটি বন্ধ হয়ে গেলে যে হঠাৎ দুশ্চিন্তা হয়, তা নিশ্চয়ই আপনার পরিচিত। মুহূর্তেই হৃদ্স্পন্দন, পোড়ানো ক্যালরি ও ব্যায়ামের তীব্রতা পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি যন্ত্রটি কবজিতে বাঁধা এক টুকরো অকেজো প্লাস্টিক হয়ে যায়। চার্জিং কেবল খুঁজে বেড়ানোর বিরক্তি, দেয়ালের সকেট থেকে বারবার চার্জ দিতে হয় এমন যন্ত্রের অসুবিধা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাটারির কারণে পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে অপরাধবোধ—দীর্ঘদিন ধরেই পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি খাতকে ভুগিয়ে আসছে। জাপানের গবেষকেরা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা এসব ভোগান্তির অবসান ঘটাতে পারে। টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের একটি দল ত্বকে লাগানো যায় এমন পাতলা প্যাচ তৈরি করেছে, যা মানুষের ঘাম থেকেই সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে; ফলে রিচার্জেবল ব্যাটারি বা চার্জিং কেবলের আর প্রয়োজন হবে না।
সূচিপত্র
এই অগ্রগতির কেন্দ্রে রয়েছে পানিভিত্তিক এনজাইম কালি, যা কাগজের ভিত্তির ওপর এক ধাপেই স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বায়োফুয়েল সেল তৈরি করতে দেয়। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ACS Applied Engineering Materials-এ অনলাইনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ০.৬৩ ভোল্টে এর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘনত্ব প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে প্রায় ১৬৫ মাইক্রোওয়াট (প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১,০৬৫ মাইক্রোওয়াট)। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ কম শক্তি-চাহিদার বায়োসেন্সর ও তারহীন তথ্য প্রেরণে যথেষ্ট। এর ফলে ব্যায়াম, চিকিৎসাসেবা ও দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি বদলে যেতে পারে। এই উদ্ভাবন সঞ্চিত শক্তির বদলে সংগৃহীত শক্তির দিকে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে জ্বালানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয় শরীরের নিজস্ব রসায়ন।
গবেষক দলের নেতৃত্বদানকারী ডিপার্টমেন্ট অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রির সহযোগী অধ্যাপক ইসাও শিতান্দা জানান, বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের প্রযুক্তিকে গবেষণাগারে আটকে রাখা উৎপাদনগত বাধা দূর করাই ছিল লক্ষ্য। একবারে সমানভাবে ছাপা যায় এমন কালি তৈরি করে দলটি ব্যাটারিবিহীন পরিধানযোগ্য বায়োসেন্সরের ব্যাপক উৎপাদনের বাস্তবসম্মত পথ খুলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী পরিধানযোগ্য চিকিৎসাযন্ত্রের বাজার যখন ১৯৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে, তখন ব্যাটারি বাদ দেওয়া এ খাতের সবচেয়ে জরুরি প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
শরীরের রসায়ন থেকে বিদ্যুৎ
এই যন্ত্রগুলোকে এনজাইমেটিক বায়োফুয়েল সেল বা EBFC বলা হয়। শরীরের তরলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে জৈবিক এনজাইম ব্যবহার করে এগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এ গবেষণায় প্রধান জ্বালানি হলো ল্যাকটেট, যা ঘামে থাকা বিপাকীয় প্রক্রিয়ার উপজাত। ব্যায়ামের সময় শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহারের ফলে পেশিতে ল্যাকটেট তৈরি হয়, যার কিছু অংশ ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। জাপানি গবেষকেরা তাঁদের ব্যবস্থাটি এমনভাবে নকশা করেছেন, যাতে প্রতি লিটারে প্রায় ১ থেকে ২৫ মিলিমোল ল্যাকটেটের ঘনত্ব মাপা যায়। হালকা কাজ থেকে শুরু করে তীব্র শারীরিক পরিশ্রম—ব্যায়ামের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এই পরিসর সরাসরি মিলে যায়।
তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি সরল ও কার্যকর। একটি ইলেকট্রোডে এনজাইম ল্যাকটেট অণু থেকে ইলেকট্রন বের করে আনতে সাহায্য করে। এরপর এই ইলেকট্রন বাহ্যিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করে। বিপরীত ইলেকট্রোডে চারপাশের বাতাসের অক্সিজেন ওই ইলেকট্রন গ্রহণ করে বিক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। ইলেকট্রনের এই অবিরাম প্রবাহ কোনো সঞ্চিত চার্জ বা বাহ্যিক বিদ্যুৎ উৎস ছাড়াই সেন্সিং ও তথ্য প্রেরণের জন্য ব্যবহারযোগ্য শক্তি সরবরাহ করে। যন্ত্রটি শরীরের স্বাভাবিকভাবে উৎপাদিত রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করায় হাঁটা, ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজ করার সময় নিষ্ক্রিয়ভাবেই বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
একই গবেষক দলের আগের গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিদ্যুৎ Bluetooth Low Energy ব্যবস্থা চালাতে পারে। ফলে ব্যাটারির সাহায্য ছাড়াই যন্ত্রটি ঘামের ল্যাকটেটের মাত্রা তারহীনভাবে পাঠাতে পারে। এতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা তৈরি হয়: আপনি যত বেশি পরিশ্রম করবেন, তত বেশি ঘাম হবে, আর সেই সঙ্গে শারীরিক অবস্থা-সংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর জন্য আরও বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, শরীরের যখন সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণ দরকার, ঠিক তখনই সেন্সরটি আরও কার্যকর হয়।
উৎপাদনের বাধা দূর করা
বহু বছর ধরে এনজাইমেটিক বায়োফুয়েল সেল পরীক্ষাগারে আশাব্যঞ্জক ফল দেখালেও উৎপাদনগত চ্যালেঞ্জের কারণে এর ব্যাপক ব্যবহার সম্ভব হয়নি। প্রচলিত উৎপাদনপদ্ধতিতে শ্রমসাধ্য একাধিক ধাপ রয়েছে। উৎপাদনকারীদের প্রথমে কার্বন ইলেকট্রোডের একটি স্তর ছাপতে হয়, এরপর আলাদাভাবে এনজাইম ও মিডিয়েটরের দ্রবণ ফোঁটায় ফোঁটায় পৃষ্ঠে দিতে হয় এবং শেষে অসম ফিল্ম শুকানোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বহু ধাপের এই প্রক্রিয়ায় যন্ত্রভেদে উল্লেখযোগ্য তারতম্য দেখা দেয়, ফলে মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন এবং ব্যাপক উৎপাদন অবাস্তব হয়ে পড়ে। কতটা তরল পড়ল বা শুকাতে কতক্ষণ লাগল—এই সামান্য পার্থক্যও একেকটি প্যাচের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেন্সিং ক্ষমতা বদলে দিতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগী অধ্যাপক ইসাও শিতান্দা এবং তাঁর দল—যার সদস্য টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের মাহিরো ওমোরি ও RESONAC Co. Ltd-এর মিৎসুরু হানাসাকি—এমন একটি মিশ্রণ তৈরি করেছেন, যা এই ভঙ্গুর ধাপগুলোকে একটিমাত্র ছাপার উপযোগী স্তরে একীভূত করে। উদ্ভাবনটির মূল দিক হলো সক্রিয় রাসায়নিক উপাদানগুলোকে ছাপার উপযোগী কালিতে আগেই মিশিয়ে নেওয়া। এর ফলে পাতলা কাগজের ভিত্তির ওপর জাল পর্দা ব্যবহার করে একবারেই দুই ইলেকট্রোড তৈরি করা যায়।
শ্রমসাধ্য, অদক্ষ ও ব্যয়বহুল EBFC তৈরির পদ্ধতি এড়াতে হলে এমন এনজাইম কালি বাজারে আনতে হবে, যা সমানভাবে ছাপা যায় এবং ব্যাপক উৎপাদনের উপযোগী।
শিল্প উৎপাদনে স্ক্রিন প্রিন্টিং পদ্ধতি ইতিমধ্যেই বহুল ব্যবহৃত। ফলে বিদ্যমান উৎপাদন লাইনের সঙ্গে এই প্রযুক্তি সহজেই যুক্ত করা যেতে পারে। পানিভিত্তিক মিশ্রণে জৈব দ্রাবক নেই, তাই সূক্ষ্ম এনজাইমের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যায় এবং ছাপার পরও জৈব উপাদানগুলোর কার্যকারিতা বজায় থাকে। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে যন্ত্রভেদে তারতম্য কমে। এখন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষাগারের ছাপাকে টেকসই, পরিধানযোগ্য সেন্সরে রূপ দেওয়া, যা কারখানায় বাস্তবিকভাবে তৈরি করা যাবে।
উপযুক্ত কালি তৈরি
স্থিতিশীল ও ছাপার উপযোগী এনজাইম কালি তৈরির জন্য একাধিক উপাদানের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। গবেষক দলটি ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড টেমপ্লেট ব্যবহার করে তৈরি মেসোপোরাস কার্বন—অত্যন্ত বেশি পৃষ্ঠতলবিশিষ্ট এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত উপাদান—এর সঙ্গে ইলেকট্রন স্থানান্তরে সহায়তাকারী রাসায়নিক মিডিয়েটর মিশিয়েছে। তারা POLYSOL নামের নতুন পানিভিত্তিক বাইন্ডারও যোগ করেছে। এটি পলিমার ইমালশন, যা কার্বন পৃষ্ঠের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয় এবং ছিদ্রযুক্ত কাঠামোর ভেতরে এনজাইমের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখে। স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের জন্য উপযুক্ত ঘনত্ব পেতে ঘনকারক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ।
কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজের ব্যবহার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। Nature-এ প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংযোজক মেসোপোরাস কার্বন কালির বিচ্ছুরণক্ষমতা বাড়ায় এবং উপাদানটির ভেতরের ছিদ্রগুলোকে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। আগের গবেষণায় একই ধরনের কার্বন মিশ্রণে CMC যোগ করলে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘনত্ব দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং কোনো সংযোজক ছাড়া তৈরি ইলেকট্রোডের তুলনায় শক্তি ঘনত্ব ২.৫ গুণেরও বেশি হয়েছে।
বায়োফুয়েল সেল তৈরির সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি বরাবরই ক্যাথোড—অক্সিজেন ব্যবহারকারী সেই ইলেকট্রোড, যেখানে ইলেকট্রন সার্কিটের পথ সম্পন্ন করে। অক্সিজেন-প্রক্রিয়াকারী এনজাইমগুলো বিশেষভাবে সংবেদনশীল এবং প্রচলিত উৎপাদনপদ্ধতিতে স্থিতিশীল রাখা কঠিন। কোষের বাকি অংশের জন্য ব্যবহৃত একই ছাপার উপযোগী কালির মিশ্রণে সরাসরি বিলিরুবিন অক্সিডেজ যুক্ত করে জাপানি দলটি একবারেই স্থিতিশীল ও উচ্চ কার্যক্ষমতার ক্যাথোড তৈরি করেছে। এনজাইম কালি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কার্যকর ক্যাথোড অংশের সফল স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের এটি প্রথম উদাহরণ। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য বায়োফুয়েল সেল তৈরির শেষ বড় বাধাটিও দূর হলো।
বাস্তব জীবনের উপযোগী কার্যক্ষমতা
তড়িৎ-রাসায়নিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছাপানো ইলেকট্রোড প্রচলিত ড্রপ-কাস্ট পদ্ধতিতে তৈরি বিকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো কাজ করেছে। সম্পূর্ণ ল্যাকটেট-অক্সিজেন বায়োফুয়েল সেলটি ০.৬৩ ভোল্ট কার্যকর ভোল্টেজে প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে সর্বোচ্চ ১৬৫ মাইক্রোওয়াট বিদ্যুৎ ঘনত্ব অর্জন করেছে। একই ধরনের ব্যবস্থায় আগে জানানো প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ৯৬ মাইক্রোওয়াটের চেয়ে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা পরিধানযোগ্য যন্ত্রে শক্তি আহরণের দক্ষতায় বড় অগ্রগতি।
নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষায়ও সমানভাবে চমকপ্রদ ফল মিলেছে। অসমভাবে এনজাইম ছড়িয়ে পড়া এবং ভিত্তির সঙ্গে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকার কারণে ড্রপ-কাস্ট ইলেকট্রোড সাধারণত কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রাথমিক কার্যক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে নেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা চালানোর সময় এনজাইম-কালির ইলেকট্রোডে কার্যক্ষমতা খুব সামান্য কমেছে। বাস্তবে পরিধানযোগ্য যন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীল কার্যক্ষমতা এগুলো বজায় রেখেছে।
ব্যায়ামের সময় সুস্থ মানুষের শরীরে ল্যাকটেটের যে মাত্রা দেখা যায়, প্রায় প্রতি লিটারে ১ থেকে ২৫ মিলিমোল, সেই শারীরবৃত্তীয় পরিসরে ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে কাজ করে। ঘামের স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনের সঙ্গে এই সামঞ্জস্য বাস্তব জীবনে যন্ত্রটির ব্যবহারযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোল-টু-রোল প্রিন্টিংয়ের প্রদর্শনীর মাধ্যমে দলটি উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতাও দেখিয়েছে। এতে একটানা প্রায় ১,৩১২ ফুট (৪০০ মিটার) ভিত্তি ছাপা হয়েছে, যা প্রমাণ করে শিল্প পর্যায়ে এই উৎপাদনপদ্ধতি কাজ করে। ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভ্যাকুয়াম পরিবেশে সংরক্ষণের পরীক্ষায় এনজাইমের কার্যক্ষমতা সবচেয়ে ভালোভাবে বজায় ছিল। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের সম্ভাব্য পদ্ধতি নির্ধারণে এটি সহায়ক হতে পারে।
খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার
স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ঘাম সেন্সরের সম্ভাব্য ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ক্রীড়াবিজ্ঞানে রিয়েল-টাইমে ল্যাকটেট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রক্তের নমুনা দিতে থামার প্রয়োজন ছাড়াই ব্যায়ামের তীব্রতা ও পেশির ক্লান্তি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কোচরা ক্লান্তির সীমা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, খেলোয়াড়েরা গতি ও পরিশ্রমের মাত্রা ঠিক করতে পারবেন, আর অনুমানের বদলে তাৎক্ষণিক জৈব-রাসায়নিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের চাপ সমন্বয় করা যাবে। ঘামের ল্যাকটেট ও রক্তের ল্যাকটেটের সম্পর্ক জটিল হলেও, খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণের জন্য এই পারস্পরিক সম্পর্ক এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী।
স্বাস্থ্যসেবায় বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। নার্সিং হোম ও প্রবীণ পরিচর্যা কেন্দ্রে রোগীরা সব সময় উপসর্গ স্পষ্টভাবে জানাতে পারেন না। পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত তাপের চাপ ও সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়—প্রতিটি অবস্থাই ঘামের রাসায়নিক গঠনে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়। ত্বকে লাগানো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী একটি প্যাচ সেই পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করতে পারে, প্রচলিত নির্দিষ্ট বিরতিতে করা পরীক্ষায় যা ধরা পড়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আগাম সতর্কতার এই সক্ষমতার অর্থ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, জরুরি পরিস্থিতির ঝুঁকি কমানো এবং রোগীর উন্নততর ফলাফল। আর রোগীদের জন্য ত্বকে লাগানো কাগজের মতো পাতলা একটি প্যাচ ব্যবহারের বাধাগুলো একেবারেই দূর করে।
গরম আবহাওয়ায় সাধারণ কাজও যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন বিপাকীয় প্রক্রিয়ার আগাম সতর্কসংকেত শনাক্ত করে একই ধরনের সেন্সর হিটস্ট্রোক প্রতিরোধব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনাতেও একই সহজ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে। ব্যাটারিনির্ভর যন্ত্র দিয়ে যে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ কঠিন ছিল, এই পদ্ধতিতে তা বজায় রাখা সম্ভব।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
একটি একটি করে দেখলে পরিধানযোগ্য যন্ত্র ছোট মনে হয়, কিন্তু সম্মিলিতভাবে এগুলোর পরিবেশগত প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়েছিল, যার মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে বলে নথিভুক্ত। একবার ব্যবহারযোগ্য করে নকশা করা হলে ব্যাটারিবিহীন প্যাচ একাই ই-বর্জ্যের সংকট সমাধান করবে না। তবে এগুলো ক্ষুদ্র ব্যাটারির চাহিদা কমাতে এবং যন্ত্রের নকশা উল্লেখযোগ্যভাবে সরল করতে পারে।
কয়েক দশক ধরে পরিধানযোগ্য সেন্সরের নকশায় ব্যবহৃত কয়েন-সেল ব্যাটারি বাদ দিলে একই সঙ্গে যন্ত্রের আকার, খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব কমে। বর্তমানে যেসব একবার ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা প্যাচে ব্যাটারি বদলাতে হয় অথবা বিষাক্ত উপাদানসহ ফেলে দিতে হয়, এই প্রযুক্তি সেগুলোর পরিচ্ছন্ন বিকল্প হতে পারে। এটি চলে শরীরের স্বাভাবিকভাবে উৎপাদিত রাসায়নিক দিয়েই।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রযুক্তি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সম্ভাবনা রাখে। পুরো যন্ত্রটি যদি সম্পূর্ণ স্ক্রিন প্রিন্টিং পদ্ধতিতে তৈরি করা যায়, তবে উৎপাদন খরচ প্রতি যন্ত্রে প্রায় ১০ ইয়েনে নেমে আসতে পারে। এতে একবার ব্যবহারযোগ্য বা বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত পরিধানযোগ্য যন্ত্র অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। ফলে বৈশ্বিক পরিধানযোগ্য চিকিৎসাযন্ত্রের বাজারে এই প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার ১৯৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
বাজারে আসার পথে চ্যালেঞ্জ
আশাব্যঞ্জক ফল মিললেও বাণিজ্যিক যন্ত্রে ঘাম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বায়োফুয়েল সেলের ব্যাপক ব্যবহার শুরুর আগে আরও কাজ বাকি। ঘাম, বাঁকানো এবং দৈনন্দিন নড়াচড়ার মধ্যেও কার্যক্ষমতা না হারিয়ে কাগজের ভিত্তিটি টিকে থাকতে পারবে—তা প্রমাণ করতে হবে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, অক্সিজেনের সংস্পর্শ ও ব্যবহারের সময়কার পরিবেশগত অবস্থার কারণে এনজাইমের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। দলটির মতে, আরও উন্নয়ন, দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা ও পরিধানযোগ্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করার পর ২০৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে বাস্তব প্রয়োগ শুরু হতে পারে।
বাস্তবে উপযোগিতা নির্ভর করবে এমন প্যাচের ওপর, যা আরামদায়ক, স্থিতিশীল মাত্রা দেয় এবং বিভিন্ন শারীরিক গঠন ও কার্যকলাপের ক্ষেত্রেও চিকিৎসক ও ব্যবহারকারীদের কাছে স্পষ্ট সংকেত পৌঁছে দেয়। রোল-টু-রোল প্রদর্শনীতে উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা প্রমাণিত হলেও, গবেষণাগারের অবস্থা থেকে ভোক্তাপণ্যে পৌঁছাতে স্থায়িত্বের কঠোর পরীক্ষা ও ক্লিনিক্যাল যাচাই দরকার। গবেষকদের ধারণা, এই শেষ বাধাগুলো দূর হলে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা যন্ত্র নির্মাতারা প্রযুক্তিটি গ্রহণে আগ্রহী হতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা গেলে সম্ভাব্য ব্যবহারগুলো সহজেই কল্পনা করা যায়। রিয়েল-টাইমে ল্যাকটেট পর্যবেক্ষণ খেলোয়াড়দের পরিশ্রমের মাত্রা নিখুঁতভাবে সমন্বয় করতে সহায়তা করবে। আর অবিরাম বিপাকীয় পর্যবেক্ষণ এমন পরিচর্যার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে, যেখানে সহজ ও কম ঝামেলার পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে জরুরি। শুধু শরীরে পরে থেকেই শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণকারী সেন্সরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এই প্রযুক্তি আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর সমাজ গড়তে ভূমিকা রাখতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের জাপানি গবেষকেরা পানিভিত্তিক এনজাইম কালি তৈরি করেছেন, যা ঘাম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বায়োফুয়েল সেল এক ধাপেই স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করতে দেয়। ০.৬৩ ভোল্টে এর বিদ্যুৎ ঘনত্ব প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ১৬৫ মাইক্রোওয়াট।
- এনজাইমেটিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ঘামের ল্যাকটেটকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে এ প্রযুক্তি পরিধানযোগ্য সেন্সরে ব্যাটারির প্রয়োজন দূর করে। Bluetooth Low Energy-তে তথ্য পাঠানোর জন্যও এতে যথেষ্ট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
- যন্ত্রভেদে তারতম্য ঘটায় এমন প্রচলিত বহু-ধাপের উৎপাদনপদ্ধতির বদলে নতুন এনজাইম কালি দিয়ে কাগজের ভিত্তির ওপর দুই ইলেকট্রোড একসঙ্গে ছাপানো যায়। এতে প্রতি যন্ত্রের খরচ প্রায় ১০ ইয়েনে নামতে পারে।
- ব্যবস্থাটি প্রতি লিটারে ১ থেকে ২৫ মিলিমোল ল্যাকটেটের ঘনত্ব মাপে, যা ব্যায়ামের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে। খেলোয়াড়, প্রবীণ পরিচর্যায় থাকা রোগী এবং হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে এটি অবিরাম স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
- সংরক্ষণে স্থিতিশীলতা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি যাচাই এবং পরিধানযোগ্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করার কাজ বাকি থাকায় বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০৩০ সালের কাছাকাছি।






