ভবিষ্যতের জ্বালানিতে প্রকৃতির অনুকরণ
চীনা গবেষকেরা শুধু সূর্যের আলো ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিকে মূল্যবান রাসায়নিকের প্রাথমিক উপাদানে রূপান্তরকারী একটি ব্যবস্থা তৈরি করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী Nature Communications-এ বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত এই উদ্ভাবনটি সালোকসংশ্লেষণ থেকে অনুপ্রাণিত। সালোকসংশ্লেষণ হলো সূর্যের আলো, পানি ও বায়ুমণ্ডলের কার্বন ব্যবহার করে উদ্ভিদের শক্তি উৎপাদনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
সূচিপত্র
চীনা বিজ্ঞান একাডেমি ও হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত গবেষক দলটি অল্প পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম একটি বিশেষ উপাদান তৈরি করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ব্যবহারযোগ্য যৌগে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে এই শক্তি সঞ্চয়ের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
কার্বন ডাই-অক্সাইড রূপান্তরে সহায়ক অনুঘটকের সঙ্গে যুক্ত হলে ব্যবস্থাটি সৌরশক্তিচালিত কার্বন মনোক্সাইড উৎপাদন করতে পারে। এই মধ্যবর্তী রাসায়নিককে পরে আরও প্রক্রিয়াজাত করে তরল হাইড্রোকার্বন জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনের মতো যেসব খাতে বিদ্যুতায়ন কঠিন, সেগুলোকে শক্তি জোগানোর সম্ভাব্য পথ খুলে দিতে পারে এই প্রযুক্তি।
কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ যেভাবে কাজ করে
সূর্যের আলো ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা ফটোক্যাটালাইসিস বা কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি গবেষণার লক্ষ্য। প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষণে উদ্ভিদ রাসায়নিক বন্ধনে সৌরশক্তি সঞ্চয় করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে শর্করা তৈরি করে। পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের বিকল্প হিসেবে টেকসই জ্বালানি তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে এই দক্ষতার অনুকরণ করার চেষ্টা করে আসছেন।
কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে চীনা দলটি: একাধিক জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া একই সময়ে সংযুক্ত করার প্রয়োজন। প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় আলোক-উৎপন্ন ইলেকট্রন সাময়িকভাবে সঞ্চয় করতে উন্নত জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়, যা বিভিন্ন বিক্রিয়া-ধাপের মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে শক্তি স্থানান্তরে সহায়তা করে। চার্জ সঞ্চয়কারী হিসেবে কাজ করে এমন রুপা-পরিবর্তিত টাংস্টেন ট্রাইঅক্সাইড উপাদান তৈরি করে গবেষকেরা এই কৌশলের অনুকরণ করেছেন।
প্রকাশিত গবেষণাপত্রে গবেষক দলটি তাদের উদ্ভাবনী কৌশলের বর্ণনা দিয়েছে।
এই গবেষণায় দক্ষ কার্বন ডাই-অক্সাইড ফটোরিডাকশনের জন্য জীবপ্রকৃতি-অনুপ্রাণিত চার্জ সঞ্চয় কৌশল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা সৌর জ্বালানি উৎপাদনে একটি সর্বজনীন পদ্ধতি সরবরাহ করে।
আলোতে উন্মুক্ত হলে এই উপাদান ইলেকট্রন সঞ্চয় করে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য প্রয়োজনমতো তা ছেড়ে দেয়। সাধারণত টেকসই নয় এমন জৈব ভোগ্য উপাদান ব্যবহারকারী পদ্ধতির সঙ্গে তুলনীয়ভাবে কাজ করে এই ব্যবস্থা; পাশাপাশি বিভিন্ন অনুঘটকের সঙ্গে মিলিয়ে এটি সর্বজনীনভাবে ব্যবহার করা যায়। প্রাকৃতিক সূর্যালোকে উপাদানটি সফলভাবে রূপান্তর-বিক্রিয়া ঘটিয়েছে। এতে কৃত্রিম আলো বা বাহ্যিক শক্তির উৎস ছাড়াই ব্যবহারিক সৌর জ্বালানি প্রয়োগের সম্ভাব্যতা দেখানো হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে
ব্যবহারযোগ্য সৌর জ্বালানি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সময়েই চীনের এই অগ্রগতি এসেছে। বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ব্যবহারযোগ্য শক্তিবাহকে রূপান্তরের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের গবেষকেরা সমান্তরালভাবে কাজ করছেন। তাঁদের প্রযুক্তিগত কৌশল ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োগ একেক রকম। একযোগে এই অগ্রগতিগুলো ইঙ্গিত দেয়, কয়েক দশকের পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পর প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডে অধ্যাপক আলদো স্টেইনফেল্ডের নেতৃত্বে ETH Zurich-এর বিজ্ঞানীরা এমন একটি শিল্পকারখানা তৈরি করেছেন, যা পরিবেশের বাতাস থেকে সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি সংগ্রহ করে। ঘনীভূত সৌরশক্তি ব্যবহার করে কারখানাটি এই যৌগগুলোকে ভেঙে সিঙ্গ্যাস তৈরি করে। হাইড্রোজেন ও কার্বন মনোক্সাইডের মিশ্রণ এই সিঙ্গ্যাস থেকে পরে কেরোসিন ও মিথানল তৈরি করা হয়। কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে উৎপাদিত এই সৌর কেরোসিন দহনের সময় ঠিক ততটাই কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে, যতটা উৎপাদনের সময় শোষণ করা হয়েছিল; ফলে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জিত হয়। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তিটি যথেষ্ট এগিয়েছে। জার্মানিতে শিল্প-পর্যায়ের উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটির অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা দেখাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে জাপানি গবেষকেরাও আগের দক্ষতার রেকর্ড ভেঙেছেন। Institute of Science Tokyo ও Hiroshima University-এর বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের সিসা-ভিত্তিক অক্সিহ্যালাইড ফটোক্যাটালিস্ট তৈরি করেছেন, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় হাইড্রোজেন উৎপাদনের কার্যকারিতা ৬০ গুণ পর্যন্ত বাড়ায়। তাঁদের উপাদান হাইড্রোজেন উৎপাদনে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং তরল জ্বালানি ফর্মিক অ্যাসিডে কার্বন ডাই-অক্সাইড রূপান্তরে ১০ শতাংশের রেকর্ড কোয়ান্টাম ফলন অর্জন করেছে। গবেষণার সহ-নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক কাজুহিকো মায়েদা গঠনগত উন্নয়নের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।
ফটোক্যাটালিস্ট হিসেবে অক্সিহ্যালাইডের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এর গঠন নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব এই গবেষণা তুলে ধরে।
এদিকে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহের জন্য সৌরশক্তিচালিত একটি ফ্লো রিঅ্যাক্টর তৈরি করেছেন। যন্ত্রটি রাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং সূর্যের আলোয় সিঙ্গ্যাসে রূপান্তর করে। বাহ্যিক শক্তির উৎস, তার বা ব্যাটারি ছাড়াই এটি কাজ করে। রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে একটি আয়না সূর্যালোককে ঘনীভূত করে। বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ নেই এমন প্রত্যন্ত স্থানেও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ করে দিতে পারে এই বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতি।
এই বৈশ্বিক উদ্যোগে অবদান রেখেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরাও। চেন্নাইয়ের হিন্দুস্তান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ শোণ দস্তা ও সালফার-ভিত্তিক একটি উপাদান তৈরি করেছেন, যা সূর্যের আলো শোষণ করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে জ্বালানির উপাদান অ্যাসিট্যালডিহাইডে রূপান্তর করে। বিশেষ আলোকসজ্জার যন্ত্রের বদলে সাধারণ সূর্যালোক ব্যবহার করেই ব্যবস্থাটি আগের পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে। অধ্যাপক শোণ গবেষণাটির ব্যবহারিক লক্ষ্য তুলে ধরেছেন।
এই গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, পৃথিবীকে সহায়তা করার বাস্তব উপায় খুঁজে বের করা।
এই অগ্রগতিগুলোর আন্তর্জাতিক পরিসর ইঙ্গিত দেয়, একাধিক স্বতন্ত্র পথে সৌর জ্বালানি প্রযুক্তি পরিপক্ব হয়ে উঠছে। এতে অন্তত একটি পদ্ধতির বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনে লক্ষ্য
এই প্রযুক্তিগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার প্রচলিত পরিবহনের বাইরেও বিস্তৃত, বিশেষ করে যেসব খাতে বিদ্যুতায়ন কঠিন। উচ্চ শক্তিঘনত্ব ও বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণে বিমান চলাচল, নৌপরিবহন ও ভারী শিল্প তরল হাইড্রোকার্বন জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য সম্মিলিতভাবে দায়ী এই খাতগুলোকে ব্যাটারিচালিত বিদ্যুৎ বা হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তিতে রূপান্তর করাও সহজ নয়।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বিমান চলাচলে বিশেষভাবে বড় বাধা রয়েছে। যুক্তিসংগত ওজন ও দূরত্ব বজায় রাখতে উড়োজাহাজের অত্যন্ত উচ্চ শক্তিঘনত্বের জ্বালানি দরকার। বর্তমান ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটের জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করা যায় না; আর তা করতে গেলে অতিরিক্ত ওজন যুক্ত হবে, যা বাণিজ্যিক পরিচালনাকে অলাভজনক করে তুলবে। মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে বিশ্বে সৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ৩ শতাংশের জন্য বর্তমানে বিমান চলাচল দায়ী। ২০৩৫ সাল নাগাদ যাত্রীর সংখ্যা বছরে ৭৫০ কোটির দিকে বাড়ার সঙ্গে এই হারও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত জ্বালানি আকর্ষণীয় সমাধান, কারণ এগুলো প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির সরাসরি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সূর্যালোক থেকে উৎপাদিত কেরোসিন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বিদ্যমান উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, মিথানল সামুদ্রিক জ্বালানি বা ওষুধ উৎপাদনের রাসায়নিক কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগতে পারে। উৎপাদনের সময় যে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করা হয়, জ্বালানি পোড়ালে শুধু সেটুকুই নির্গত হয়। ফলে বিদ্যমান জ্বালানি বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে না বাড়িয়ে একটি বদ্ধ কার্বন চক্র তৈরি করা যায়।
২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ শূন্যে নামানোর জন্য টেকসই বিমান জ্বালানিকে অপরিহার্য বলে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে এ ধরনের জ্বালানি বিমান চলাচলের চাহিদার ১০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। তবে বর্তমানে মোট ব্যবহারের ০.১ শতাংশেরও কম হলো টেকসই জ্বালানি। পরীক্ষাগার ও পাইলট প্রকল্পে প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।
বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাধা
উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সৌর জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে বেশ কিছু বড় প্রতিবন্ধকতা। বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হওয়ার পথে প্রধান বাধা এখনো ব্যয়। সুইস গবেষকদের হিসাব, বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত সৌর কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১ ডলার ৩৫ সেন্ট থেকে ২ ডলার ২০ সেন্টের মধ্যে হতে পারে। প্রচলিত জেট জ্বালানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হওয়ার দিকে এটি অগ্রগতি হলেও শিল্প-পর্যায়ের কারখানা নির্মাণে প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ চাহিদা উৎপাদন শুরু করাকে জটিল করে তুলছে এবং প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাও উৎপাদনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। সৌর জ্বালানি উৎপাদনে প্রচুর সূর্যালোকের প্রয়োজন, তাই মরুভূমি অঞ্চলে কারখানা স্থাপন সবচেয়ে উপযোগী। তবে প্রত্যন্ত মরুভূমি থেকে উৎপাদিত জ্বালানি বড় পরিবহনকেন্দ্রে নিতে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও সমন্বিত লজিস্টিকস দরকার। জৈব জ্বালানি উৎপাদনে প্রায়ই কৃষিজমি নিয়ে খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা হয়। সৌর জ্বালানি অনাবাদি মরুভূমি এলাকায় উৎপাদন করা যায়, ফলে উচ্চ সৌর বিকিরণ কাজে লাগানোর পাশাপাশি মূল্যবান কৃষিজমি ফসল ও গবাদিপশুর জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
রূপান্তর দক্ষতা ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক উদ্ভাবনগুলো আগের প্রযুক্তির তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও, বর্তমান ব্যবস্থাগুলো প্রাপ্ত সৌরশক্তির সামান্য অংশকেই রাসায়নিক বন্ধনে রূপান্তর করে। তুলনার জন্য বলা যায়, প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষণের দক্ষতা প্রায় ১ শতাংশ। Science-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক পরীক্ষাগারভিত্তিক অর্জনে নির্দিষ্ট বিক্রিয়া-ধাপে দক্ষতা ১৩ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আরও দক্ষ অনুঘটক তৈরি, চার্জ পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ার উন্নতি এবং স্থিতিশীল তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাযুক্ত নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারেই শুধু নয়, বাস্তব পরিবেশেও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে এমন ব্যবস্থা তৈরিতে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।
পরীক্ষাগারের সাফল্য থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে নীতিগত সহায়তা জরুরি বলে মনে হচ্ছে। গবেষকদের পরামর্শ, বিমান সংস্থাগুলোকে নির্দিষ্ট অনুপাতে টেকসই উৎসের জ্বালানি সংগ্রহে বাধ্য করতে কোটা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে নিশ্চিত চাহিদা তৈরি হবে, যা অবকাঠামোয় বিনিয়োগকে ন্যায্যতা দেবে। গত দুই দশকে সৌর ফটোভোলটাইক প্যানেল ও বায়ু টারবাইনের ব্যয় সফলভাবে কমানোর মডেল অনুসরণ করে এ ধরনের নিয়ন্ত্রক কাঠামো উৎপাদন বাড়ানো এবং ব্যয় কমানো ত্বরান্বিত করতে পারে।
মূল কথা
- চীনা বিজ্ঞানীরা রুপা-পরিবর্তিত টাংস্টেন ট্রাইঅক্সাইড ব্যবহার করে সূর্যালোকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিকে জ্বালানির পূর্বধাপে রূপান্তরের উদ্ভিদ-অনুপ্রাণিত ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। গবেষণাটি Nature Communications-এ প্রকাশিত হয়েছে।
- এই প্রযুক্তিতে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চয় করে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য চার্জ সঞ্চয় কৌশল ব্যবহার করা হয়। ফলে টেকসই নয় এমন ভোগ্য উপাদানের প্রয়োজন হয় না।
- সুইজারল্যান্ড, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ভারতের গবেষকেরা ভিন্ন পদ্ধতি ও দক্ষতার মাত্রা নিয়ে একই ধরনের সৌর জ্বালানি প্রযুক্তিতে কাজ করছেন।
- বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনের কার্বন নিঃসরণ কমাতে সৌর জ্বালানির বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ উচ্চ শক্তিঘনত্বের প্রয়োজনের কারণে এসব খাতে বিদ্যুতায়ন কঠিন।
- সৌর কেরোসিনের বর্তমান ব্যয়ের হিসাব প্রতি লিটারে ১.৩৫ থেকে ২.২০ ডলার। বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের জন্য অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।
- উৎপাদন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই বিমান জ্বালানি চাহিদার ১০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা।






