শুল্কঝড়ের মধ্যেই চীনে হাব গড়তে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে শেইন

পড়তে 10 মিনিট
শুল্কঝড়ের মধ্যেই চীনে হাব গড়তে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে শেইন

চীনা উৎপাদনে শেইনের ৫০ কোটি ডলারের বাজি

গুয়াংঝু, চীনের দ্রুত-ফ্যাশন জায়ান্ট শেইন গুয়াংডং প্রদেশে একটি বিশাল লজিস্টিকস হাব নির্মাণে ৩.৫ বিলিয়ন ইউয়ান (৫০৪ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করছে। কৌশলগত এই পদক্ষেপে পশ্চিমা বাজারগুলো কঠোর বাণিজ্য বাধা তৈরি করলেও দেশের উৎপাদনভিত্তির প্রতি কোম্পানিটির অঙ্গীকারের ইঙ্গিত মিলছে। শেইনের সরবরাহব্যবস্থার অবকাঠামো শক্তিশালী করবে এই কেন্দ্র। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এটি নির্মিত হচ্ছে, যখন গত এক দশকে বৈশ্বিক খুচরা বাজার বদলে দেওয়া অতি সস্তা চীনা পণ্যের প্রবাহ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. চীনা উৎপাদনে শেইনের ৫০ কোটি ডলারের বাজি
  2. ছোট পার্সেলে বাণিজ্যের এক যুগের অবসান
  3. বেইজিংয়ের চাপ বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ জটিল করছে
  4. ব্রাজিলে ব্যর্থ পরীক্ষা
  5. যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বন্ধ, বিশ্ববাজারে নতুন গন্তব্য
  6. প্রতিকূল বাণিজ্য পরিবেশে পরিচালনাগত হিসাব
  7. এরপর কী
  8. মূল বিষয়গুলো

এই বিনিয়োগ একটি হিসাবি ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অনেক চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক এখন ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি, আগে ৮০০ ডলারের কম মূল্যের পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া ‘ডি মিনিমিস’ ছাড়ও বাতিল হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া এসব নীতিগত পরিবর্তনের ফলে শেইন ও প্রতিদ্বন্দ্বী টেমু কিছু পণ্যের দাম ইতিমধ্যে ৯১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে। গুয়াংডংয়ের উৎপাদন এলাকাগুলোর শ্রমিকেরা কাজের সময় কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার কথা জানিয়েছেন।

তবে শেইনকে চীনের ভেতরেই উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সক্রিয়ভাবে চাপ দিচ্ছে বেইজিং। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকায় উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করছে তারা। দেশের ভেতরের রাজনৈতিক চাপ এবং বিদেশের বাণিজ্যিক চাপের এই সম্মিলিত পরিস্থিতিতে শেইনের সামনে বিকল্প সীমিত: বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন ফ্যাশন খুচরা বিক্রেতা হয়ে ওঠার পেছনে যে উৎপাদনব্যবস্থা, সেটিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা, নাকি নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে দেখা। তাই গুয়াংডংয়ের হাবটি দুই উদ্দেশ্য পূরণ করবে: পরিচালনাগত উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে কোম্পানির আনুগত্যের বার্তা দেবে। কর্তৃপক্ষ উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিকে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জাতীয় কৌশলগত স্বার্থের বিষয়—দুই হিসেবেই দেখে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বস্ত্র ও পোশাক উৎপাদনকারী অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্র গুদামজাতকরণ ও বিতরণ সক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করবে। বিদেশে ব্যয়বহুল নতুন অবকাঠামো গড়ার বদলে এটি বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগাবে। হাবটির নির্দিষ্ট পরিচালনাগত লক্ষ্যমাত্রা জানায়নি কোম্পানির নির্বাহীরা। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, স্বয়ংক্রিয়করণ ও কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান লজিস্টিকস ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ছোট পার্সেলে বাণিজ্যের এক যুগের অবসান

বছরের পর বছর শেইনের ব্যবসায়িক মডেল নির্ভর করেছে মার্কিন বাণিজ্য আইনের একটি ফাঁকফোকরের ওপর। এর ফলে শুল্ক না দিয়েই কোম্পানিটি লাখ লাখ আলাদা পার্সেল সরাসরি মার্কিন ক্রেতাদের কাছে পাঠাতে পারত। ৮০০ ডলারের কম মূল্যের চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই ‘ডি মিনিমিস’ বিধির সুবাদে শেইন ৪ ডলারের টি-শার্ট ও ১০ ডলারের পোশাক এমন সময়ে পৌঁছে দিতে পারত, যা দেশীয় খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে পাল্লা দিত। এই মডেল থেকে বছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়েছিল এবং ছাড়ে ফ্যাশন পণ্যের বাজারে শেইন হয়ে উঠেছিল প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান।

২০২৫ সালের ২ মে সেই সুবিধার অবসান ঘটে। সেদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এসব ছোট পার্সেলে ১২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ শুরু করে। প্রতিটি পণ্যে ১০০ ডলারের ফিও ধার্য করা হয়, যা ১ জুনের মধ্যে বেড়ে ২০০ ডলার হবে। এই পরিবর্তনে বিক্রিতে ইতিমধ্যে পরিমাপযোগ্য পতন দেখা দিয়েছে। ব্লুমবার্গের সেকেন্ড মেজারের তথ্য অনুযায়ী, নীতিগত পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার সময় ফেব্রুয়ারির পাঁচ দিনে শেইনের যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি ১৬ থেকে ৪১ শতাংশ কমে যায়। পিডিডি হোল্ডিংসের মালিকানাধীন টেমুর নিট মুনাফা ৫০ শতাংশ কমেছে বলে জানানো হলে কোম্পানিটির শেয়ার প্রায় ১৪ শতাংশ পড়ে যায়। নির্বাহীরা সতর্ক করে বলেন, উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত মুনাফা কমই থাকবে।

শুল্কের কাঠামো শেইনের প্রচলিত সরবরাহকারীদের জন্য অসম্ভব হিসাব তৈরি করেছে। মুনাফার হার প্রায়ই ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকায় নতুন শুল্কের সামান্য অংশও বহন করলে বিক্রি অলাভজনক হয়ে পড়বে। চীনের বৃহত্তম অন্তর্বাস উৎপাদনকেন্দ্র শানতোউয়ের একটি পোশাক কোম্পানির প্রধান জারসন ওং বলেন, “এবার সীমান্ত পেরিয়ে আসা ছোট পার্সেলগুলোর ওপরও শুল্ক বসছে। সরবরাহব্যবস্থার পক্ষে এই ব্যয়বৃদ্ধি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।” যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ বিক্রির ওপর নির্ভরশীল ওংয়ের কোম্পানি দেশটির বাজারে বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বেইজিংয়ের চাপ বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ জটিল করছে

কম শুল্কের দেশগুলোতে উৎপাদন সরিয়ে নিতে চাইতে পারে শেইন, তবে চীনা সরকার সক্রিয়ভাবে এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ানোর মধ্যে চাকরি ও শিল্প উৎপাদনক্ষমতার দেশত্যাগ ঠেকাতে বেইজিং শেইনকে চীনের বাইরে উৎপাদন সরানোর পরিকল্পনা বন্ধ করতে বলেছে। এই চাপ শেইনের লজিস্টিকস বিনিয়োগে রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। ফলে গুয়াংডংয়ের হাবটি নিছক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত না থেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে কোম্পানির অবস্থান মেলানোর ইঙ্গিতে পরিণত হয়েছে।

কারখানার চিত্রেই চীনা সরকারের উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়। প্যানইউ জেলায়, স্থানীয়ভাবে ‘শেইন ভিলেজ’ নামে পরিচিত এলাকাটিতে সরু রাস্তাজুড়ে হাজার হাজার ছোট পোশাক কারখানা। চারতলা কারখানার ভবনগুলোর মধ্যে মোটরসাইকেলে করে কাপড়ের রোল আনা-নেওয়া করা হয়। এখানকার শ্রমিকেরা সাধারণত মাসে ৪,০০০ থেকে ১০,০০০ ইউয়ান (৫৪৮ থেকে ১,৩৭০ ডলার) আয় করেন; মজুরি সরাসরি উৎপাদনের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। অর্ডার থাকলে কাজ চলে মধ্যরাত পর্যন্ত; অর্ডার কমে গেলে রাতের খাবারের সময়েই শিফট শেষ হয়।

প্যানইউয়ের একটি জিনস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক উ বর্তমান পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করেন। এ বছর তার কাজের সময় অনেক কমেছে; আগে যেখানে মধ্যরাতে কাজ শেষ হতো, এখন সন্ধ্যায়ই বাড়ি ফিরতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শ্রমিক জানান, তার নিয়োগকর্তা উৎপাদন সরানোর সম্ভাবনা যাচাই করতে কয়েকবার ভিয়েতনাম গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ভিয়েতনামি পণ্যে ৪৬ শতাংশ শুল্কের সম্ভাবনা এবং গুয়াংডংয়ের পরিণত শিল্পব্যবস্থার তুলনায় অনুন্নত লজিস্টিকস অবকাঠামোর মুখে পড়েন।

“শেষ পর্যন্ত শুল্কযুদ্ধ সবারই ক্ষতি করবে; আমার মতো মানুষেরও, যারা শুধু জীবিকা নির্বাহ করতে চায়,” বলেন ১ লাখ ৪০ হাজার বর্গফুটের বস্ত্র কারখানা গুয়াংঝু দাওয়াং গার্মেন্টের মালিক লিলি লিয়াও। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তার মাসিক অর্ডার ১ লাখ ডলার থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলে ব্যর্থ পরীক্ষা

চীনের উৎপাদন মডেল ব্রাজিলে পুনর্গঠনের শেইনের প্রচেষ্টা দেখায়, কেন কোম্পানিটি এখন আবার গুয়াংডংয়ের দিকে ঝুঁকছে। ২০২৩ সালে ২,০০০ ব্রাজিলীয় কারখানার সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শেইন। ২০২৬ সালের মধ্যে ১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। ৫০ ডলারের কম মূল্যের অনলাইন কেনাকাটায় ব্রাজিলের ২০ শতাংশ শুল্ক, যা ‘লিটল ব্লাউজ ট্যাক্স’ নামে পরিচিত, এড়ানো এবং দেশটিকে লাতিন আমেরিকার উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি থমকে যায়। ব্রাজিলের কারখানাগুলো স্থানীয় শ্রম আইন ও করকাঠামো মেনে শেইনের ৩০ শতাংশ মূল্যছাড় এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের দাবি পূরণ করতে পারেনি। ব্রাজিলের বস্ত্র ও পোশাক শিল্প সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফার্নান্দো পিমেন্তেল বলেন, “ব্রাজিলে কাজের ধরন চীনের চেয়ে আলাদা। ব্রাজিলে নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও মানদণ্ড অনেক ভিন্ন।” ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ ঘোষিত প্রাথমিক ৩৩৬টি কারখানা অংশীদারত্বের বেশির ভাগই ভেঙে গেছে। এসপিরিতু সান্তো রাজ্যের জিবি ম্যানুফ্যাকচারিংসহ হাতে গোনা কয়েকটি সরবরাহকারী টিকে আছে।

লিখিত বিবৃতিতে শেইন স্বীকার করেছে, “ব্রাজিলে উৎপাদন পরিপক্ব হতে সময় লেগেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসায়িক ও শিল্প অবকাঠামোর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।” কোম্পানিটি মেনে নিয়েছে যে “অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে ধীর এবং বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়েছে।” তবে চীনের বাইরে এই মডেল নকল করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। চীনের সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত সমন্বিত ও দক্ষ হওয়ায় খরচ কম থাকে। এই ব্যর্থতা শেইনের সাফল্যের একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে: গুয়াংডংয়ের অনন্য শিল্পব্যবস্থার ওপরই এর সাফল্য নির্ভরশীল—যেখানে সরবরাহকারীরা সমন্বিত, শ্রমিকেরা বিশেষায়িত এবং পলিয়েস্টার কাপড় উৎপাদিত হয়। অন্য কোথাও সহজে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বন্ধ, বিশ্ববাজারে নতুন গন্তব্য

মার্কিন বাজারে প্রবেশের ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠায় চীনা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের অতি সস্তা পণ্য বিকল্প গন্তব্যে পাঠাচ্ছে। এর প্রধান সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া। এপ্রিলে মহাদেশটিতে চীনের রপ্তানি ৯ শতাংশ বেড়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রে চালান কমেছে ১৮ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংক শুল্কের কারণে অন্য বাজারে পাঠানো রপ্তানিকে সুদের হার কমানোর সুযোগ করে দেওয়া একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, সস্তা চীনা পণ্য আগামী দুই বছরে ২০ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে।

দ্বিতীয় সারির এসব বাজারে উপস্থিতি জোরদার করে শেইন এই পরিস্থিতির জবাব দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে সিডনিতে একটি অস্থায়ী দোকান চালু করে কোম্পানিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজারকেন্দ্রিক প্রথম ব্র্যান্ড আরালিনা বাজারে আনে। আলিবাবার তাওবাও এবং জেডি ডটকমও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে জোরেশোরে প্রবেশ করেছে। সাশ্রয়ী দামের পণ্য খোঁজা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে তারা বিনা মূল্যে শিপিংয়ের ন্যূনতম অর্ডারসীমা এবং ইংরেজি ভাষার ইন্টারফেস দিচ্ছে।

তবে এই ভৌগোলিক পরিবর্তন বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে প্রবেশাধিকার হারানোর ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে দিতে পারবে না। বিশ্বে পোশাক ও জুতা ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে। অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজার সাময়িক স্বস্তি দিলেও চীনের পুরো উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো বড় নয়। সাংহাই অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্সের অধ্যাপক হু জিয়ে বলেন, “মার্কিন বাজার ছেড়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবে আরও শুল্কের বোঝা সামলানো অত্যন্ত কঠিন হবে।”

বিজ্ঞাপন

প্রতিকূল বাণিজ্য পরিবেশে পরিচালনাগত হিসাব

গুয়াংডংয়ের ৫০ কোটি ডলারের লজিস্টিকস হাবটি শেইনের সেই এক বাজারে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জনের প্রচেষ্টা, যা হারানোর সামর্থ্য কোম্পানিটির নেই: চীন নিজেই। গুয়াংডংয়ে গুদামজাতকরণ, পণ্য বাছাই ও বিতরণের অবকাঠামো একত্রিত করে শেইন প্রতি পণ্যের ব্যয় যথেষ্ট কমাতে চায়, যাতে কিছুটা শুল্কের প্রভাব পুষিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্র্যান্ডটির পরিচিত দ্রুত পণ্য সরবরাহের গতি বজায় থাকে।

এই বিনিয়োগের কূটনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। বিদেশে উৎপাদন সরানোর জোরালো চেষ্টা না করে দেশের ভেতরের অবকাঠামোয় পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা বাড়ার সময়ে শেইন বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেকে মেলাচ্ছে। নিজ দেশের বাজারে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুকূল অবস্থান ধরে রাখতে এই পদক্ষেপ জরুরি হতে পারে। চীনের উৎপাদন ছেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় এমন কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষের আগ্রহ দেখা গেছে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্কব্যবস্থায় শেইনের ‘ছোট ব্যাচে উৎপাদন, দ্রুত পুনরায় অর্ডার’ মডেল অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। কোম্পানিটি সাধারণত প্রতিদিন শত শত ডিজাইনের অল্পসংখ্যক পণ্য বাজারে আনে, পরে তাৎক্ষণিক চাহিদার তথ্যের ভিত্তিতে জনপ্রিয় পণ্যের উৎপাদন দ্রুত বাড়ায়। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি পার্সেল আকাশপথে পাঠানো হয়। বড় চালানে সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে গুদামজাত করার দিকে গেলে নগদ অর্থের আবর্তন ৩০ দিন থেকে বেড়ে ১০০ দিন হবে। এতে ফ্যাশন-সংক্রান্ত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া মজুতের নমনীয়তাও হারাবে কোম্পানিটি।

বিজ্ঞাপন

এরপর কী

শেইনের সামনে এখন এমন বিপরীতমুখী চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উৎপাদনকেন্দ্রের চাকরি রক্ষায় বেইজিংয়ের চাওয়া পূরণের পাশাপাশি ৪ ডলারের টি-শার্ট আর কিনতে না পারা পশ্চিমা ক্রেতাদের সেবা দেওয়ার পথও খুঁজতে হবে কোম্পানিটিকে। প্রতিযোগীরাও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে। ওয়ালমার্ট মে মাসের শেষ নাগাদ দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটি বলেছে, শুল্ক এত বেশি যে তা বহন করা “খুবই কঠিন”। বেস্ট বাই, ফোর্ড এবং ম্যাটেলও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে।

শেইন ভিলেজের শ্রমিকদের কাছে নিকট ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কারখানার মালিকেরা চালান বন্ধ হয়ে যাওয়া, কনটেইনার ফেরত আসা এবং নীতিগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে করতে গ্রাহকদের অনির্দিষ্টকালের জন্য অর্ডার পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবু কেউ কেউ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আশাবাদ ধরে রেখেছেন। নিজের বক্তব্য বোঝাতে কাগজে ঢেউয়ের রেখা আঁকেন লিলি লিয়াও: “শেষ বলে কিছু নেই, আছে শুধু উত্থান-পতন,” তিনি বলেন। “এখন ট্রাম্পের নীতি বিশ্বকে প্রভাবিত করছে, আর আমরা নিম্নমুখী পর্যায়ে আছি। কিন্তু তার বয়স ৭০ বছরের বেশি, আর প্রতি চার বছর পরপর নির্বাচন হয়। এই পরিস্থিতি চিরকাল থাকবে না।”

তত দিন পর্যন্ত গুয়াংডংয়ের অবকাঠামোয় শেইনের বহু বিলিয়ন ইউয়ানের বিনিয়োগ একই সঙ্গে কৌশলগত প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক বার্তা হয়ে থাকবে। জাতীয়তাবাদী বাণিজ্যনীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা যখন খণ্ডিত হচ্ছে, তখন দ্রুত-ফ্যাশন জায়ান্টটি তার সাম্রাজ্য গড়ে তোলা উৎপাদনকেন্দ্রের সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীরভাবে নিজেকে যুক্ত করছে। বিদেশে জমতে থাকা প্রতিকূলতার চেয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির সুফল বেশি হবে—এই বাজিই ধরছে তারা।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • পরিচালনাগত দক্ষতা বাড়াতে গুয়াংডং প্রদেশে লজিস্টিকস হাব নির্মাণে ৫০৪ মিলিয়ন ডলার (৩.৫ বিলিয়ন ইউয়ান) বিনিয়োগ করছে শেইন
  • যুক্তরাষ্ট্র ‘ডি মিনিমিস’ ছাড় বাতিল করে অনেক চীনা আমদানির ওপর ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করেছে; এতে শেইন কিছু পণ্যের দাম ৯১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে
  • সরবরাহব্যবস্থা চীনের বাইরে সরানো বন্ধ করতে শেইনকে বলেছে চীনা সরকারি কর্মকর্তারা; দেশীয় উৎপাদন ধরে রাখতে কোম্পানিটির ওপর চাপ রয়েছে
  • যুক্তরাষ্ট্রে অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় গুয়াংডংয়ের ‘শেইন ভিলেজ’-এর শ্রমিকেরা কাজের সময় কমে যাওয়া ও চাকরির অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন
  • ব্রাজিলে উৎপাদন ছড়িয়ে দেওয়ার শেইনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে; স্থানীয় কারখানাগুলো কোম্পানির মূল্য ও গতি-সংক্রান্ত চাহিদা পূরণ করতে পারেনি
  • সস্তা চীনা পণ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করছে—এমন অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে রপ্তানি সরিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিটি
  • ছোট পার্সেল শুল্কমুক্তভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা শেষ হওয়ায় শেইনের ব্যবসায়িক মডেল কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে; বড় চালানে পণ্য পাঠানো ও বিদেশে গুদামজাত করার পথে যেতে হতে পারে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে