কৌশলগত উন্নয়ন: ৩ ন্যানোমিটার যুগে জাপান
তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (TSMC) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে, জাপানে তাদের সবচেয়ে উন্নত ৩ ন্যানোমিটার সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের পরিকল্পনা। কুমামোতো কারখানায় অপেক্ষাকৃত কম উন্নত চিপ তৈরির আগের প্রতিশ্রুতির তুলনায় এটি বড় ধরনের অগ্রগতি। টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সি সি ওয়েই। তিনি জানান, দক্ষিণ জাপানে কোম্পানিটির দ্বিতীয় উৎপাদন কারখানায় এখন আগের পরিকল্পিত ৬ থেকে ১২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির বদলে ৩ ন্যানোমিটার চিপের ব্যাপক উৎপাদন লক্ষ্য করা হবে।
সূচিপত্র
- কৌশলগত উন্নয়ন: ৩ ন্যানোমিটার যুগে জাপান
- ১৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের খুঁটিনাটি
- এআইয়ের জন্য ৩ ন্যানোমিটার চিপ কেন গুরুত্বপূর্ণ
- জাপান সরকারের সমর্থন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
- র্যাপিডাসের সঙ্গে পার্থক্য: প্রতিযোগিতা নয়, পরিপূরক
- বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: অ্যারিজোনা, তাইওয়ান ও উৎপাদনে বৈচিত্র্য
- প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা
- নির্মাণের সময়সূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব
- এক নজরে
এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত লজিক চিপ উৎপাদনের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে জাপান। TSMC-এর শীর্ষস্থানীয় উৎপাদনকেন্দ্রের তালিকায় দেশটি তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশে স্থান পাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসেসরের অভূতপূর্ব চাহিদা মেটাতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে TSMC। এনভিডিয়াসহ শিল্পের নেতৃস্থানীয় কোম্পানিগুলোর প্রধান উৎপাদক এই প্রতিষ্ঠান।
১৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের খুঁটিনাটি
জাপানের সংবাদপত্র ইয়োমিউরির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নীত প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ হবে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। কিউশুর দ্বিতীয় কারখানার জন্য আগে বরাদ্দ রাখা ১২.২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ৩ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে উৎপাদন উন্নীত করার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক নিশ্চিত করেনি TSMC। তবে এই বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কোম্পানিটির বৈশ্বিক কৌশলে প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরে।
কুমামোতোতে দ্বিতীয় ফ্যাবের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। TSMC জানিয়েছে, “প্রযুক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধির সময়সূচি নির্ধারিত হবে আমাদের গ্রাহকদের চাহিদা এবং বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে।” জাপান অ্যাডভান্সড সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং (JASM) নামে পরিচিত যৌথ উদ্যোগের অংশ এই কারখানা, যেখানে সনি ও জাপানের অন্য অংশীজনেরা যুক্ত রয়েছে। টোকিও সফরে ওয়েই উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পে অব্যাহত সমর্থনের জন্য জাপানের কেন্দ্রীয় সরকার, কুমামোতো প্রিফেকচারাল সরকার এবং স্থানীয় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এই বিনিয়োগ ওই অঞ্চলে TSMC-এর বিদ্যমান উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে। কোম্পানিটির কুমামোতোতে প্রথম কারখানাটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিক ওই কারখানায় প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া-প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিপ উৎপাদন হয়। নতুন কারখানায় তৈরি হবে সবচেয়ে উন্নত ৩ ন্যানোমিটার চিপ, যা পরবর্তী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের জন্য ৩ ন্যানোমিটার চিপ কেন গুরুত্বপূর্ণ
সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের বর্তমান সীমান্তে রয়েছে ৩ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়া-প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চিপ ডিজাইনাররা কম জায়গায় আরও কোটি কোটি ট্রানজিস্টর বসাতে পারেন, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা ও গণনাশক্তি বাড়ে। উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্ভার চালানোর মূল শক্তি এই উন্নত চিপ। স্বচালিত যান থেকে ক্লাউড ডেটা সেন্টার পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পে চলমান প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে এগিয়ে নিচ্ছে এগুলো।
আগে পরিকল্পিত ৬ থেকে ১২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনের তুলনায় ৩ ন্যানোমিটারের পার্থক্য যথেষ্ট বড়। ৬ ন্যানোমিটার চিপ অনেক ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ও গাড়িশিল্পের কাজে পর্যাপ্ত হলেও ৩ ন্যানোমিটার ট্রানজিস্টর অনেক বেশি বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী এবং দ্রুতগতির। বড় এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও চালানোর জন্য তাই এগুলো অপরিহার্য। এসব মডেলের গণনাচাহিদা কয়েক মাস পরপর প্রায় দ্বিগুণ হয়, আর বিদ্যুৎ খরচ পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ।
বর্তমানে TSMC শুধু তাইওয়ানেই ৩ ন্যানোমিটার চিপ তৈরি করে। ২০২৭ সালে অ্যারিজোনায় তাদের দ্বিতীয় কারখানায় উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানে উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বৈচিত্র্য আসবে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তাইওয়ানে উন্নত চিপ উৎপাদন কেন্দ্রীভূত থাকার কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে ওয়েই এ ঘোষণার অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। প্রধান নির্বাহী বলেন:
আমাদের বিশ্বাস, এই কারখানা স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও অবদান রাখবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, জাপানের এআই ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তুলবে।
ওয়েই আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানি গ্রাহক ও অংশীদারদের সঙ্গে আরও সহযোগিতা নিয়ে TSMC সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে।
জাপান সরকারের সমর্থন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
প্রধান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব নিশ্চিত করতে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকে “জাতীয় প্রকল্প” হিসেবে বিবেচনা করছে জাপান সরকার। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত পুনরুজ্জীবিত করতে জাপান তার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৭১ শতাংশ—আনুমানিক ২৫.৭ বিলিয়ন ডলার—বিনিয়োগ করছে। এই অনুপাত জার্মানির ০.৪১ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ০.২১ শতাংশ কিংবা ফ্রান্সের ০.২ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কিউশুতে TSMC-এর প্রথম কারখানার সহায়তায় টোকিও ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়েছে। উন্নীত ৩ ন্যানোমিটার বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আরও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে খবর রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ৩ ন্যানোমিটার চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিকস, গাড়ি উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার জাপানের বৃহত্তর কৌশলের প্রতিফলন এটি।
সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্নের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া প্রতিরক্ষামূলক শিল্পনীতির সঙ্গে সরকারের এই সমর্থন সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহামারিতে বিশ্বজুড়ে চিপের ঘাটতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই, ২০১৯ সালে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় TSMC-কে বিনিয়োগে আমন্ত্রণ জানাতে আলোচনা শুরু করে। কেন্দ্রীভূত উৎপাদন সক্ষমতার ঝুঁকি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দূরদর্শিতার প্রমাণ এটি।
র্যাপিডাসের সঙ্গে পার্থক্য: প্রতিযোগিতা নয়, পরিপূরক
জাপান একই সময়ে র্যাপিডাসের মাধ্যমে আরেকটি উচ্চাভিলাষী সেমিকন্ডাক্টর উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে। দেশীয় এই ফাউন্ড্রি প্রকল্পের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে হোক্কাইডোতে আরও উন্নত ২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদন করা। সরকার নির্ধারণ করেছে, দুটি প্রকল্প ভিন্ন বাজার ও ব্যবহারের ক্ষেত্রকে সেবা দেবে, ফলে সরাসরি প্রতিযোগিতা হবে না।
TSMC-এর ৩ ন্যানোমিটার কারখানায় তাৎক্ষণিকভাবে বেশি পরিমাণে উৎপাদনের জন্য পরীক্ষিত ফিন ফিল্ড-ইফেক্ট ট্রানজিস্টর (FinFET) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে, র্যাপিডাস ২ ন্যানোমিটার উৎপাদনের জন্য সরাসরি গেট অল অ্যারাউন্ড (GAA) স্থাপত্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। প্রযুক্তিগত এই পার্থক্যের অর্থ, বিকিরণ-সহনশীলতা ও শক্তি-দক্ষতার মতো অত্যাধুনিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন এমন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ও সামরিক ব্যবহারের লক্ষ্য রাখছে র্যাপিডাস। আর TSMC-এর কুমামোতো কারখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসেসরের তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক চাহিদা মেটাবে।
ব্রুকিংসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাপানের দ্বিমুখী কৌশলটি ঝুঁকি সামাল দেওয়ার একটি পন্থা। এতে TSMC-এর সঙ্গে কম ঝুঁকির, নিশ্চিততাপূর্ণ অংশীদারত্বের পাশাপাশি র্যাপিডাসের উচ্চ ঝুঁকি ও উচ্চ মুনাফার উদ্যোগ যুক্ত হয়েছে। এই বৈচিত্র্যের ফলে TSMC-নির্ভর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাপান তার সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম পুনর্গঠন করতে পারবে, পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতার মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাও ধরে রাখতে পারবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: অ্যারিজোনা, তাইওয়ান ও উৎপাদনে বৈচিত্র্য
বিশ্বজুড়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটেই জাপানে TSMC-এর সম্প্রসারণ ঘটছে। ২০২৫ সালের মার্চে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ১৬৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর মধ্যে অ্যারিজোনায় তিনটি নতুন উৎপাদন কারখানা এবং দুটি উন্নত প্যাকেজিং কারখানা রয়েছে। অ্যারিজোনার দ্বিতীয় ফ্যাবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ৩ ন্যানোমিটার উৎপাদনের সরঞ্জাম স্থাপনের কথা রয়েছে। ২০২৭ সালে সেখানে ব্যাপক উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য, যা এখন উন্নীত জাপানি কারখানার জন্যও নির্ধারিত সময়সীমা।
অ্যারিজোনা ও কুমামোতো—দুই জায়গাতেই সমান্তরালভাবে ৩ ন্যানোমিটার উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে অ্যাপল, এনভিডিয়া, এএমডি ও কোয়ালকমের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের জন্য ভৌগোলিক বিকল্প তৈরি করার TSMC-এর কৌশল। তিনটি পৃথক রাজনৈতিক অঞ্চলে উন্নত উৎপাদন ছড়িয়ে দিয়ে কোম্পানিটি আঞ্চলিক সংঘাত, বাণিজ্য বিরোধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে চায়, যেগুলো তাইওয়ানে কেন্দ্রীভূত উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জাপানে সম্প্রসারণের কৌশলটি বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক আস্থা পেয়েছে। ঘোষণার পর বাজার খোলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত TSMC-এর আমেরিকান ডিপোজিটারি রিসিপ্টের দাম ০.৭৭ শতাংশ বেড়েছে। এই বিনিয়োগ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থায় জাপানের অবস্থানও শক্তিশালী করবে। দেশটির কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও উপকরণ খাতে আধিপত্য ধরে রেখেছে; কোটার ডেভেলপারদের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাজারের ৮৮ শতাংশ এবং সিলিকন ওয়েফারের ক্ষেত্রে ৫৩ শতাংশ তাদের দখলে।
প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা
জাপানে TSMC-এর উদ্যোগের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে দেশটির বিদ্যমান সেমিকন্ডাক্টর অবকাঠামোর ওপর। টোকিও ইলেকট্রন, শিন-এতসু কেমিক্যাল ও ইবিডেনের মতো জাপানি সরবরাহকারীরা উন্নত চিপ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, উপকরণ ও প্যাকেজিং সাবস্ট্রেট সরবরাহ করে। কুমামোতোতে তাদের কার্যক্রমে স্থানীয়ভাবে ৬০ শতাংশ পণ্য কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে খবর রয়েছে TSMC-এর। এতে জাপানের শিল্পভিত্তি জুড়ে বিনিয়োগের ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়বে।
চিপ অন ওয়েফার অন সাবস্ট্রেট (CoWoS)-এর মতো উন্নত প্যাকেজিং প্রযুক্তির জন্য এই সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে TSMC। ঐতিহ্যগতভাবে খাদ্যপণ্যের জন্য পরিচিত আজিনোমোতোর মতো কোম্পানি এখন চিপ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত আজিনোমোতো বিল্ড আপ ফিল্ম (ABF) রেজিনের বড় উৎপাদক। উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ের চাহিদায় এসব কোম্পানির বাজারমূল্য তিন গুণ হয়েছে।
শুধু সরকারি ভর্তুকি নয়, জাপানে এসব বিশেষায়িত সরবরাহকারীর উপস্থিতিও TSMC-এর প্রাথমিক বিনিয়োগের পক্ষে জোরালো প্রযুক্তিগত যুক্তি তৈরি করেছিল। ব্রুকিংসের গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, সনির সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের CMOS ইমেজ সেন্সর যৌথভাবে তৈরি করার ব্যবসায়িক সুযোগ ভৌগোলিক সম্প্রসারণকে যুক্তিসংগত করেছে। পাশাপাশি, সনির মতো বড় স্থানীয় অংশীদার জটিল নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সামলাতেও সহায়তা করেছে।
নির্মাণের সময়সূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব
কুমামোতোতে দ্বিতীয় কারখানার নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে আগের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য বিলম্বের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, তার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হলো। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে TSMC অ্যারিজোনায় বিশাল সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় প্রকল্পস্থলে নির্মাণকাজের গতি কমেছিল বলে খবর পাওয়া যায়। প্রধান নির্বাহী ওয়েই প্রথমে এর একটি কারণ হিসেবে ওই অঞ্চলের যানজটের কথা বলেছিলেন। তবে জাপান সরকার এ দাবি নাকচ করে জানায়, অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে TSMC আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়া এবং প্রযুক্তি নোড ৩ ন্যানোমিটারে উন্নীত হওয়ার ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান থেকে উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে জাপান। মূল পরিকল্পনায় গাড়ি ও সাধারণ কম্পিউটিংয়ের উপযোগী ৬ থেকে ১২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনের কথা ছিল। এখন এআই অ্যাকসেলারেটরের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ৩ ন্যানোমিটার চিপে যাওয়ার এই পরিবর্তন গত এক বছরে বাজারচাহিদার দ্রুত বিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।
বিদ্যমান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পগুচ্ছের কাছাকাছি অবস্থান, জাপানের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তুলনামূলক কম ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং প্রিফেকচার ও জাতীয়—উভয় পর্যায়ের সরকারের জোরালো সমর্থন কুমামোতোকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। এসব কারণে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে TSMC তাইওয়ানের কার্যক্রমের সাফল্যের কিছু দিক পুনরায় কাজে লাগাতে পারবে এবং উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনার গ্রাহকচাহিদাও পূরণ করতে পারবে।
এক নজরে
- জাপানের কুমামোতোতে দ্বিতীয় উৎপাদন কারখানায় ৩ ন্যানোমিটার চিপ তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে TSMC; আগের পরিকল্পনায় ৬ থেকে ১২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনের কথা ছিল
- বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে খবর রয়েছে; অর্থনৈতিক নিরাপত্তার লক্ষ্যে জাপান সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে
- টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্তটি জানান প্রধান নির্বাহী সি সি ওয়েই; তিনি জাপানের এআই ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তুলতে কারখানাটির ভূমিকার ওপর জোর দেন
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের আকাশছোঁয়া বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে কাজ করবে কারখানাটি; এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী TSMC
- দ্বিতীয় ফ্যাবের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে; এর সঙ্গে যুক্ত হবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুমামোতোতে চালু হওয়া TSMC-এর বিদ্যমান কারখানা
- হোক্কাইডোতে ২ ন্যানোমিটার চিপ তৈরির জন্য নিজস্ব ফাউন্ড্রি র্যাপিডাসকেও একই সঙ্গে সহায়তা দিচ্ছে জাপান; সরকারের সিদ্ধান্ত, দুটি প্রকল্প ভিন্ন বাজারে কাজ করবে এবং সরাসরি প্রতিযোগিতা করবে না
- ২০২৭ সাল থেকে অ্যারিজোনার দ্বিতীয় ফ্যাবেও ৩ ন্যানোমিটার চিপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে TSMC-এর; এর ফলে তাইওয়ানের বাইরে উন্নত চিপ উৎপাদনে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য আসবে






