গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে তাইওয়ান নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা শির
তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্ব্যর্থহীন সতর্কবার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফোনালাপে তিনি স্বশাসিত দ্বীপটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন। এই কথোপকথন থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, বাণিজ্য আলোচনা ও নিরাপত্তা উত্তেজনার জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে দুই দেশই। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘চমৎকার’ এবং ‘দীর্ঘ ও বিস্তারিত’ এই আলোচনা হয়েছে তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক তৎপরতা বাড়ার মধ্যে এবং এপ্রিলে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগে সংবেদনশীল কূটনৈতিক দর-কষাকষির সময়ে।
সূচিপত্র
- গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে তাইওয়ান নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা শির
- অস্ত্র বিক্রি নিয়ে বিরোধ: ১১ বিলিয়ন ডলারের উত্তপ্ত বিষয়
- ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: বাণিজ্য চুক্তি বনাম ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা
- তাইওয়ানের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
- আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: জাপান, রাশিয়া ও বদলে যাওয়া জোট
- এপ্রিলের শীর্ষ বৈঠকে কী হতে পারে
- মূল কথা
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাইপেকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন শি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘তাইওয়ানকে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেবে না’ বেইজিং। গত নভেম্বরে দুই নেতার মধ্যে যোগাযোগের পর এটিই তাঁদের প্রথম সরাসরি কথা। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফোনালাপটি হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র প্যাকেজ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে, পাশাপাশি বাণিজ্য, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে চীনের সহযোগিতাও চাইছে।
শি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল সম্মেলন করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই কূটনৈতিক আলোচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ক্রমের উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি বেইজিংয়ের কৌশলগত অংশীদারত্বের শক্তি তুলে ধরা। অন্যদিকে, ট্রাম্প সম্পর্কের বাণিজ্যিক দিকটিতে জোর দিয়ে জানান, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ মিলিয়ন টন সয়াবিন কেনার কথা বিবেচনা করবে, যা আগের ১২ মিলিয়ন টনের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া তেল, গ্যাস ও উড়োজাহাজের ইঞ্জিন সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ফোনালাপ নিয়ে দুই দেশের বিবরণে অগ্রাধিকারের যে পার্থক্য দেখা গেছে, তা বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির ভিন্ন কৌশলগত হিসাব তুলে ধরে। তাইওয়ানের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট সীমারেখা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বেইজিং; অন্যদিকে, ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম চীন সফরের প্রস্তুতি নিতে নিতে ট্রাম্পের নজর রয়েছে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ে। ইউক্রেনের যুদ্ধ, ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও কথা হয়েছে। তবে এসব সংবেদনশীল বিষয়ে দুই রাজধানীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্যের মাত্রা ছিল ভিন্ন।
অস্ত্র বিক্রি নিয়ে বিরোধ: ১১ বিলিয়ন ডলারের উত্তপ্ত বিষয়
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বিশাল অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ। এর মূল্য প্রায় ১১.১ বিলিয়ন ডলার; এতে রয়েছে উন্নত রকেট লঞ্চার, স্বচালিত হাউইটজার, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ। প্রস্তাবিত এই হস্তান্তর সাম্প্রতিক ইতিহাসে তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে বড় একক সামরিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোর একটি। এতে বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং দ্বীপটির চারপাশে দুই দিন ধরে বিমান, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট নিয়ে সামরিক মহড়া চালায়।
এই নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন শি জিনপিং। এতে বোঝা যায়, তাইওয়ানের উন্নত প্রতিরক্ষাসামর্থ্য অর্জন ঠেকানোকে বেইজিং কতটা অস্তিত্বগত গুরুত্ব দেয়। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে বলেছেন শি।
তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে, যাতে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীন ও আমেরিকাকে সংঘাত, এমনকি সংঘর্ষের বিপজ্জনক পথে টেনে নিতে না পারে।
এই বক্তব্যে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে: চীনের ‘এক চীন নীতি’ অনুযায়ী তাইওয়ান চীনা ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওয়াশিংটনের ‘এক চীন নীতি’ থেকে এর পার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের অবস্থানকে স্বীকার করলেও তা স্পষ্টভাবে সমর্থন করে না।
বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যেখানে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। এর মধ্যে ছিল প্রাণঘাতী গোলাবারুদ ও স্বয়ংক্রিয় ড্রোন। চীনের সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে এটি সাময়িক পদক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে। পরে স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া বা সংশোধন করা হলেও, এ ঘটনা তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ায় যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে তাইওয়ান দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো ছাড়কে সাময়িক কৌশলগত সমন্বয় হিসেবে দেখলেও বেইজিং এই ফাঁকগুলো কাজে লাগিয়ে দ্বীপটির প্রতিরক্ষাসামর্থ্য নিয়ে ‘নতুন বাস্তবতা’ তৈরি করতে পারে।
ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: বাণিজ্য চুক্তি বনাম ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা
ট্রাম্প-শি ফোনালাপের আনুষ্ঠানিক বিবরণে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে দুই দেশের মৌলিকভাবে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে অর্থনৈতিক অর্জনই ছিল মুখ্য। তিনি সম্ভাব্য সয়াবিন কেনাকে মার্কিন কৃষকদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেন এবং জ্বালানি রপ্তানি, ফেন্টানিল নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম টিকটক নিয়ে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।
ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে কথোপকথনটিকে ভিন্নভাবে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। আমরা দুজনেই বুঝি, এই সম্পর্ক এমন রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, বেইজিংয়ের বিবরণে সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; সেখানে মূল স্থান পেয়েছে তাইওয়ান। শি বলেন, দুই দেশেরই বৈধ উদ্বেগ থাকলেও সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব কেবল ‘সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক লাভের’ ভিত্তিতে। চীনা প্রেসিডেন্ট তাইওয়ান প্রশ্নটিকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেও তুলে ধরেন। তিনি দ্বীপটির মূল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়াকে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে বর্ণনা করেন এবং সমকালীন স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ফ্যাসিবাদবিরোধী সহযোগিতার কথা বলেন।
অর্থনৈতিক লেনদেন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার এই ব্যবধান ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। এ সময় তিনি তাইওয়ানের জন্য মার্কিন সুরক্ষার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার বড় অস্ত্র বিক্রির অনুমোদনও দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহায়তার জন্য তাইওয়ানের অর্থ দেওয়া উচিত। তিনি মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে বিমা পলিসির সঙ্গে তুলনা করেন। দ্বীপটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত চিপ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, ট্রাম্প তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেন। এসব বক্তব্যে মার্কিন সহায়তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তাইপেতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যদিও বাস্তবে সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
তাইওয়ানের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্প-শি ফোনালাপ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে দেশের ভেতরের মানুষ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আশ্বস্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন যে উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার পরও ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বীপটির সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়, এবং সব সহযোগিতা প্রকল্প বাধাহীনভাবে চলবে।
তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি আরও সূক্ষ্ম মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হিসেবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের যোগাযোগকে স্বাগত জানায় তাইপে। চেন বলেন, ‘এই পুরো ফোনালাপ নিয়ে আমরা খুব বেশি উদ্বিগ্ন নই।’ তাঁর মতে, সরাসরি সংলাপ ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি কমায়। তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা মনে করি, এটি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে যখন চীন তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে।’
তবে লাই প্রশাসনের প্রস্তাবিত ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট বিরোধী নিয়ন্ত্রিত আইনসভায় আটকে যাওয়াসহ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ বড় বাধার কথা স্বীকার করেন চেন। সংসদীয় এই অচলাবস্থায় বেইজিংয়ের ক্ষোভের কারণ হওয়া অস্ত্র কেনাকাটার অর্থায়ন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার মধ্যে ১১ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজও রয়েছে। কুওমিনতাং (কেএমটি) বিরোধী দল সামরিক ব্যয়ে বড় ধরনের বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশে ব্যয় উন্নীত করার প্রশাসনিক লক্ষ্যের তুলনায় তারা আরও সংযত বাজেটের প্রস্তাব দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন দুর্বলতা তৈরি করছে, যা আমেরিকার অভিপ্রায় যা-ই হোক, বাইরের শক্তিগুলো কাজে লাগাতে পারে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: জাপান, রাশিয়া ও বদলে যাওয়া জোট
ট্রাম্প-শি ফোনালাপের সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক বক্তব্যের কারণে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে জাপানের সামরিক বাহিনী জড়িয়ে পড়তে পারে। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং দেশটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তাইওয়ান-সংক্রান্ত পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে টোকিও। ফলে তাকাইচির মন্তব্য আঞ্চলিক কথাবার্তায় উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বেইজিং সঙ্গে সঙ্গেই মন্তব্যগুলোকে ‘লাল রেখা’ অতিক্রম বলে নিন্দা জানায়, যার ফলে চীন-জাপান সম্পর্ক আরও তলানিতে নামে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের প্রসঙ্গ তোলেন শি। জাপানের কৌশলগত অবস্থান মোকাবিলায় এই বক্তব্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছিল বলে মনে হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অতীতে ফ্যাসিবাদ ও সামরিকতাবাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যৌথভাবে রক্ষা করা উচিত। ইতিহাসের এই বয়ান বেইজিংয়ের বর্তমান স্বার্থে কাজ করে: একদিকে তা জাপানের বিস্তৃত সামরিক ভূমিকার পরোক্ষ সমালোচনা করে, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন আবেগকে কাজে লাগায়।
ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার দিনই শি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও ভিডিও কনফারেন্স করেন। ‘অস্থির’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে দুই নেতা সম্পর্ক আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেন। রুশ গণমাধ্যম জানায়, বছরের প্রথমার্ধে চীন সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন পুতিন। ইউক্রেনে মস্কোর আগ্রাসনের পর থেকে গভীর হওয়া কৌশলগত অংশীদারত্ব এতে আরও জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতাদের সঙ্গে পরপর কথোপকথনের মাধ্যমে বেইজিং নিজেকে বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে, একই সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী জোটগুলোও বজায় রেখেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই কূটনৈতিক ভারসাম্যকে সংঘাত ও একতরফাবাদের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের স্থিতিশীলতাকারী ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এপ্রিলের শীর্ষ বৈঠকে কী হতে পারে
এপ্রিলে ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর তাঁর বর্তমান মেয়াদে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে শির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের পর এই সফর হচ্ছে। ওই বৈঠকে দুই নেতা এক বছরের জন্য বাণিজ্যবিরতি স্থাপন করেছিলেন। শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সফরকে সামনে রেখে বোয়িং সর্বোচ্চ ৫০০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈঠকে বা তার কিছু পর ট্রাম্প চীনা রপ্তানির ওপর ফেন্টানিল-সংশ্লিষ্ট অবশিষ্ট শুল্ক তুলে নিতে চাইবেন। এর বিনিময়ে সয়াবিন ও জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখতে চীনের সহযোগিতা চাইতে পারেন তিনি।
এপ্রিলে আলোচনায় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচ্যসূচিতে তাইওয়ান প্রশ্নই সম্ভবত প্রাধান্য পাবে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ফোনালাপে শির স্পষ্ট সতর্কবার্তার পর। চীন আক্রমণ করলে তাইওয়ানকে রক্ষায় মার্কিন বাহিনী নামবে কি না, সে বিষয়ে কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখেছেন ট্রাম্প। তবে তাইপেকে সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে সহায়তার লক্ষ্যে তাঁর প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। আলোচকদের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে তাইওয়ানে সামরিক সহায়তা বন্ধের বেইজিংয়ের দাবি এবং তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী ওয়াশিংটনের আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে সমন্বয় করা। ওই আইনে তাইওয়ানকে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষাসামর্থ্য দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করা হয়েছে।
ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লেভ নাখমানের পর্যবেক্ষণ, ২০২৬ সালজুড়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের কাছ থেকেই বাড়তি কথার চাপের জন্য তাইওয়ানকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
আমার মনে হয়, তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ট্রাম্প ভালোভাবেই জানেন। তাই এই প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, এমন কিছু তিনি করবেন বলে আমি মনে করি না।
তবু ট্রাম্পের কূটনীতির ধরন এমন পরিস্থিতির সুযোগ রাখে, যেখানে অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া-নেওয়া হতে পারে। এপ্রিলে শীর্ষ বৈঠক যত ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাবনাটি তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের সতর্ক রাখছে।
মূল কথা
- চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে তাইওয়ানকে উল্লেখ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন শি জিনপিং। স্বশাসিত দ্বীপটিতে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তিনি ‘সতর্কতা’ দাবি করেছেন।
- ফোনালাপকে ‘চমৎকার’ বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর জোর দিয়ে জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ মিলিয়ন টন সয়াবিন কেনার সম্ভাবনা এবং জ্বালানি রপ্তানিতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
- তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ‘অত্যন্ত দৃঢ়’ রয়েছে। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখার সহায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছেন।
- শি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পর এই আলোচনা হয়। এতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখার বেইজিংয়ের কৌশল ফুটে উঠেছে।
- চলতি মেয়াদে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে এপ্রিলে চীন যাবেন ট্রাম্প। উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাব্য চুক্তি ও শুল্ক সমন্বয়সহ বড় বাণিজ্য ঘোষণার প্রত্যাশা রয়েছে।
- তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১১.১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, লাই প্রশাসনের চাওয়া ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা তহবিল আটকে দিয়েছে তাইওয়ানের বিরোধী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট।
- জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সম্প্রতি তাইওয়ান-সংক্রান্ত পরিস্থিতিতে জাপানি সামরিক বাহিনী জড়িয়ে পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর জবাবে বেইজিং টোকিওর বিরুদ্ধে ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের অভিযোগ তুলেছে।






