পুরোনো বয়ানটির অবসান
কয়েক দশক ধরে এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্পটি ছিল খুব সরল: অঞ্চলটি বিশ্বের কারখানা হিসেবে কাজ করে, পশ্চিমা ভোক্তাদের—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের—জন্য তৈরি পণ্য উৎপাদন করত। গত বছর ওয়াশিংটন শুল্ক আরোপ করলে বিশ্লেষকেরা সেই পরিচিত সতর্কবার্তাই আবার সামনে আনেন—আমেরিকান ভোক্তাদের ব্যয় কমে গেলে এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। এই বয়ান শুধু পুরোনোই নয়; অচল। বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামো এমনভাবে বদলেছে, যা প্রচলিত বিশ্লেষণে স্বীকার করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। দশটি আসিয়ান দেশ এবং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে গঠিত ASEAN+3 পশ্চিমা বিশ্বের উৎপাদন-সহায়ক ভূমিকা পেরিয়ে এসেছে। এটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম বাজার, স্বনির্ভর এক অর্থনৈতিক শক্তি, যার অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি।
সূচিপত্র
পরিসংখ্যানে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা
এই রূপান্তরের প্রমাণ পরিমাণগত ও চমকপ্রদ। ২০২৩ সালে আসিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পেছনে ফেলে চীনের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারে পরিণত হয়—যা বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালে আসিয়ানে চীনের রপ্তানি আরও ১২% বেড়ে প্রায় ৫৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, আর চীনে আসিয়ানের রপ্তানি বাড়ে মাত্র ২%। এতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি ১৯০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পৃথক আসিয়ান দেশগুলোর জন্য এই ভারসাম্যহীনতা উদ্বেগজনক হলেও, এটি আঞ্চলিক বাজারের বিপুল আকর্ষণক্ষমতা তুলে ধরে। ২০০৯ সাল থেকে চীন বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ির বাজার; বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিক্রির ৪০%-এর বেশি নতুন জ্বালানিচালিত গাড়ি। আসিয়ানের দশটি দেশের সম্মিলিত নামমাত্র জিডিপি প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার শিল্পশক্তির সঙ্গে যুক্ত হলে এই জোটের ভোক্তাভিত্তি দাঁড়ায় প্রায় দুইশ কোটি মানুষে, যাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে।
কারখানা থেকে ভোক্তাশক্তিতে
আসিয়ান+৩-কে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদানির্ভর রপ্তানিমুখী অঞ্চল হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণা গত এক দশকে গড়ে ওঠা আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের জটিল নেটওয়ার্ককে উপেক্ষা করে। ২০১৭ সাল থেকে বড় বাণিজ্যিক অর্থনীতিগুলো ভূরাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মধ্যে ক্রমেই বেশি পণ্য বিনিময় করেছে। তবে এশিয়ায় এই প্রবণতা পশ্চিমকেন্দ্রিক মডেল থেকে বিচ্ছিন্নতাকে ত্বরান্বিত করেছে। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিতে চীনের অংশ ২০১৭ সালের ২১% থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি মাত্র ৯%-এ নেমে আসে, যা দুই দশকের বাণিজ্য সংহতিকে কার্যত উল্টে দেয়। তবে সব দেশ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানি বছরে গড়ে ৫.৭% হারে বাড়তে থাকে। স্থানচ্যুত বাণিজ্য শুধু হারিয়ে যায়নি; এশিয়ার ভেতরে নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। ভিয়েতনাম ও মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব অর্জন করেছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে আসিয়ানের বাণিজ্য এতটাই গভীর হয়েছে যে অঞ্চলটি এখন উৎপাদনকেন্দ্র এবং চীনের তৈরি পণ্যের প্রধান গন্তব্য—দুই ভূমিকাই পালন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে আঞ্চলিক বৈচিত্র্যায়ন ত্বরান্বিত
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি—যার আওতায় ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার জন্য শুল্কহার ৪০% ছাড়িয়েছে এবং সিঙ্গাপুরের মতো মিত্রদের জন্যও ভিত্তিমূলক হার ১০%—আসিয়ান অর্থনীতিগুলোকে আগে থেকেই চলমান বৈচিত্র্যায়নের কৌশল দ্রুত এগিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার বদলে আসিয়ান দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড ব্রিকসে পর্যবেক্ষক মর্যাদা পায়; অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তির উদ্যোগ নিচ্ছে। এই কৌশলগত বাঁকবদল থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বড় রপ্তানি গন্তব্য হলেও অঞ্চলটির একমাত্র অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র হিসেবে আর কাজ করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে কম খরচের উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়, একই সঙ্গে দেশের ভেতরে দাম বাড়ায় এবং ঐতিহ্যগত মিত্রদের এশিয়ার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মতো কাঠামোর দিকে ঠেলে দেয়।
ACFTA 3.0 এবং ডিজিটাল ও সবুজ অর্থনীতির সংহতি
আঞ্চলিক সম্পর্ক গভীর হওয়া শুধু বাইরের চাপের প্রতিক্রিয়া নয়; বাণিজ্যচুক্তিতে বিধিবদ্ধ একটি সচেতন কৌশলগত সিদ্ধান্তও। ২০২৫ সালের অক্টোবরে চীন ও আসিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে আসিয়ান-চীন মুক্ত বাণিজ্য এলাকা 3.0 উন্নয়ন প্রটোকলে স্বাক্ষর করে। ২০১০ সালে চুক্তিটি চালুর পর এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত সংশোধন। এই চুক্তিতে ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের সহায়তাসহ নয়টি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে চীন ও আসিয়ানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এই হালনাগাদ প্রটোকলে আন্তঃসীমান্তে তথ্যপ্রবাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহযোগিতা এবং কারিগরি মানদণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে চীনের মূল্যশৃঙ্খলে আসিয়ানের সংযুক্তি আরও গভীর হবে; পাশাপাশি শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলারও চেষ্টা থাকবে।
অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতার চ্যালেঞ্জ: সুযোগ ও ঝুঁকি
বাজারবহির্ভূত নীতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতিতে চালিত চীনের শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা আসিয়ানের উন্নয়নের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও হুমকি। চীনের তৈরি পণ্যের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০১৮ সালের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়; এই রপ্তানি বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ কিনেছে আসিয়ান। ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৪ সালে বস্ত্র খাতে ৮০,০০০ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন এবং আরও ২৮০,০০০ জনের চাকরি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো সস্তা চীনা আমদানিতে ছেয়ে গেছে। ভিয়েতনামে চীনের আন্তঃসীমান্ত প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন কমমূল্যের অর্ডার আসছে, যার মাসিক মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ডের জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুপাভুত সাইচুয়া সস্তা আমদানির ঢল নিয়ে থাই নীতিনির্ধারকদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।
চীনারা এখন ডানে-বাঁয়ে, সব দিকেই রপ্তানির চেষ্টা করছে। এসব সস্তা আমদানি সত্যিই সমস্যার সৃষ্টি করছে।
তবে পশ্চিমা শুল্ক এড়াতে চাওয়া চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য আসিয়ানও গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে আসিয়ানে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ রেকর্ড ১৭.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বিনিয়োগ অঞ্চলের জ্বালানি রূপান্তর ও শিল্পের আধুনিকায়নে সহায়তা করছে, যদিও স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন সীমিত করে এমন উল্লম্ব সংহতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ওয়াশিংটনের কৌশলগত জবাব
বাণিজ্য নেতৃত্বের জন্য অঞ্চলটি ক্রমেই চীনের দিকে তাকানোয় সেখানে অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সময় ক্রমে কমে আসছে। ২০২৩ সালে আসিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭৪.৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট অভ্যন্তরীণমুখী প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৩২.৪% এবং ৬২৫,০০০ আমেরিকানের কর্মসংস্থানে সহায়তা করে। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,০০০-এর বেশি কোম্পানি কাজ করছে; এসব কোম্পানির বিদেশি শাখার বৈশ্বিক মোট বিক্রির ১০% আসে অঞ্চলটি থেকে। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালের যুক্তরাষ্ট্র-সিঙ্গাপুর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর ওয়াশিংটন কোনো বড় আঞ্চলিক বাণিজ্য উদ্যোগ সম্পন্ন করেনি। ২০১৬ সালে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ থেকে সরে আসা এবং পরে ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক কাঠামো কার্যত পরিত্যাগ করায় আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আসিয়ানের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু চীনের শুল্কের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে না, বেইজিংয়ের বাণিজ্যকেন্দ্রিক আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই কূটনীতি চীনকে আমেরিকার সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে।
মূল বিষয়গুলো
- বিশ্বের বৃহত্তম বাজার হিসেবে ASEAN+3 যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে; ২০২৩ সালে আসিয়ান চীনের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হয়।
- ২০২৪ সালে আসিয়ানে চীনের রপ্তানি ১২% বেড়ে প্রায় ৫৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটির অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যপথগুলো বছরে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আমেরিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার না করে আসিয়ানের ব্রিকস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বাজারমুখী বৈচিত্র্যায়ন ত্বরান্বিত করেছে।
- ACFTA 3.0 চুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য, সবুজ জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগের নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা পশ্চিমা কাঠামোর বাইরে আঞ্চলিক সংহতি গভীর করছে।
- চীনের শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতার কারণে আসিয়ানে সস্তা আমদানির ঢল নেমেছে, বস্ত্র ও ইস্পাত খাতে চাকরি হারাচ্ছেন কর্মীরা; একই সঙ্গে তা অঞ্চলটিতে চীনের রেকর্ড প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে।
- ম্যাককিনজির গবেষণায় চীন থেকে আসিয়ানসহ উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগকারী বাণিজ্যপথগুলোকে নির্ভরযোগ্য সম্ভাবনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বাণিজ্য বিভাজনের পরিস্থিতিতেও বাড়বে।






