দেশব্যাপী নির্দেশনায় অনিশ্চয়তা
শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোনের কারণে মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়া বন্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার আগেই বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছে। চলতি মার্চে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে দেশব্যাপী ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। তবে নতুন নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তা নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তির মতো অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন ও আচরণবিধি-সংক্রান্ত জাতীয় নির্দেশিকা সংশোধনের প্রস্তাব জানিয়ে প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু আইনপ্রণেতারা যে স্পষ্টতা চেয়েছিলেন, তা দেওয়ার বদলে বিজ্ঞপ্তিটি বিভিন্ন মানদণ্ডের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের দিশেহারা করে তুলেছে।
সূচিপত্র
২০২৫ সালের আগস্টে জাতীয় পরিষদে পাস হওয়া সংশোধিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা আইনের লক্ষ্য ছিল স্কুলে স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের জন্য একটি অভিন্ন আইনি ভিত্তি তৈরি করা। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই কোনো না কোনো ধরনের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ ছিল। আইনটির উদ্দেশ্য ছিল এসব নিয়মে একরূপতা আনা এবং ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকদের স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া। তবে মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে স্কুলের প্রধানদের ৩১ আগস্টের মধ্যে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা তৈরি করতে বলা হয়েছে। ফলে বিধিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত একটি সাময়িক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অন্তর্বর্তী নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পড়েছে স্কুল প্রশাসকদের ওপর।
এই পরিবর্তনকাল শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, নিয়ম প্রয়োগে অসামঞ্জস্য থাকলে আইনের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আগে তুলনামূলক শিথিল নীতি অনুসরণ করা স্কুলগুলোকে এখন দ্রুত কঠোর কাঠামো তৈরি করতে হবে। আর আগে থেকেই কঠোর নীতি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, তাদের পদ্ধতি নতুন আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অভাবে অনেক প্রশাসকই প্রশ্ন তুলছেন, ডিভাইস জমা নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ তাঁদের আছে কি না, নাকি শুধু পাঠদানের সময় ব্যবহার সীমিত করার দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।
কোরিয়ান ফেডারেশন অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র জাং সিউং-হিউক সতর্ক করে বলেছেন, কাছাকাছি এলাকার স্কুলগুলোতে নিয়ম প্রয়োগের মান ভিন্ন হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ অনিবার্যভাবে বাড়বে। শিক্ষকসমাজের ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই জটিল নিয়ন্ত্রক পরিস্থিতি মোকাবিলার দায় একক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর না চাপিয়ে বিভ্রান্তি ও অভিযোগ থেকে স্কুলগুলোকে সক্রিয়ভাবে সুরক্ষার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মানসম্মত নির্দেশিকা দেওয়া উচিত। তাঁর সংগঠন গত বছর থেকেই মন্ত্রণালয়কে অভিন্ন বিধিমালা চালুর আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, খণ্ডিত নীতির কারণে শিক্ষার পরিবেশে বৈষম্য তৈরি হয়।
আইনি কাঠামো
আসন্ন বিধিনিষেধ দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। মার্চে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সঙ্গে কার্যকর হওয়া সংশোধিত আইনে স্কুলের প্রধান ও শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সতর্ক করার এবং ক্লাস চলাকালে স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করার স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা পাবেন। আইন অনুযায়ী, কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিস্থিতিতে ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে: প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সহায়তায়, শিক্ষকের অনুমোদিত নির্দিষ্ট শিক্ষামূলক কাজে, অথবা প্রকৃত জরুরি পরিস্থিতিতে।
আইনের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, স্কুলগুলো পুরো শিক্ষাদিবসজুড়ে শিক্ষার্থীদের স্মার্ট ডিভাইস সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে পারবে। অর্থাৎ, পাঠদানের সময় শুধু ফোন ব্যবহার নয়, সঙ্গে রাখাও নিষিদ্ধ করতে পারবে প্রশাসন। এই সংগ্রহের ক্ষমতা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর স্কুলের কর্তৃত্বে বড় ধরনের বিস্তার ঘটিয়েছে। আগে যা ছিল শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার অনানুষ্ঠানিক কৌশল, তা এখন আইনি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে রূপ নিচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের আগমনের সময় ডিভাইস জমা নেওয়ার সামষ্টিক ব্যবস্থা চালু করতে পারে। অথবা শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ডিভাইস নিজেদের কাছে রাখতে দিতে পারে, তবে সেগুলো বন্ধ করে সরিয়ে রাখতে হবে।
আইনটি একটি মৌলিক নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করলেও বিভিন্ন শিক্ষাপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা নমনীয়তা রেখেছে। বিধিনিষেধ শুধু আনুষ্ঠানিক পাঠদানের সময় প্রযোজ্য হবে, নাকি দুপুরের খাবারের বিরতি, অবকাশ ও ক্লাসের মধ্যবর্তী সময়েও চলবে, তা ঠিক করার স্বাধীনতা স্কুলের হাতে রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষাসংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে দেওয়া এই বিবেচনামূলক ক্ষমতাই এখন বাস্তবায়ন নিয়ে বিভ্রান্তির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আইনটিকে ঘণ্টা বাজা থেকে ছুটি পর্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। অন্যরা মনে করছে, বিরতির সময়ের নীতি না বদলে কেবল শ্রেণিকক্ষভিত্তিক বিদ্যমান বিধিনিষেধকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আগস্ট পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশে সাময়িক নিয়ম চালুর অনুমতি দেওয়ার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রাথমিক বাস্তবায়নপর্বে কোন মানদণ্ড কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে আরও অস্পষ্টতা তৈরি করেছে।
নীতির খণ্ডিত চিত্র
কোরিয়ান ফেডারেশন অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা করে, যা বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। দেশজুড়ে ১৫৩টি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ওপর জরিপে দেখা যায়, সব প্রতিষ্ঠানেই ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে ফোন সঙ্গে রাখা এবং বিরতির সময় ব্যবহারের নীতিতে ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া স্কুলগুলোর মাত্র ৩.৯ শতাংশে বর্তমানে ফোন সঙ্গে রাখাই পুরোপুরি নিষিদ্ধ। অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষার্থীরা ডিভাইস সঙ্গে রাখতে পারে, তবে পাঠের সময় তা নিষ্ক্রিয় রাখতে হয়।
শ্রেণিকক্ষের বাইরের সময়ের নীতি খতিয়ে দেখলে এই ভিন্নতা আরও স্পষ্ট হয়। জরিপে দেখা গেছে, ৮৫টি স্কুল, অর্থাৎ উত্তরদাতাদের ৫৫.৬ শতাংশ, বিরতি ও দুপুরের খাবারের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি দেয়। অন্যদিকে ৬৮টি স্কুল, বা ৪৪.৪ শতাংশ, পুরো শিক্ষাদিবসেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। ডিভাইস ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে: ৯০টি স্কুল সামষ্টিকভাবে ডিভাইস সংগ্রহ করে, আর ৫৭টি স্কুলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ডিভাইস নিজেদের কাছে রাখতে পারে। জাতীয় আইন যে খণ্ডিত পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে চেয়েছিল, এই পরিসংখ্যান ঠিক সেই চিত্রই তুলে ধরে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন-সময়সূচির কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষেও এই বৈষম্য বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষকদের প্রস্তুতির ভিন্নতাও বাস্তবায়নকে জটিল করছে। সমিতিটি নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের শুরুর মধ্যে প্রায় ৪,০০০ শিক্ষকের ওপর দেশব্যাপী জরিপ চালায়। এতে ৫৯.৭ শতাংশ জানান, স্মার্ট ডিভাইস নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে তাঁদের স্কুলগুলো ভালোভাবে প্রস্তুত। তবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩২.৬ শতাংশ, জানান প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত। প্রস্তুতির এই ঘাটতি ইঙ্গিত দেয়, নীতি থাকলেও মার্চে আইন কার্যকর হওয়ার সময় তা প্রয়োগের ব্যবস্থা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত হতে পারে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে মানসম্মত বাস্তবায়ন-পদ্ধতির জরুরি প্রয়োজনের কথা জরিপের ফলাফলে উঠে এসেছে।
মানবাধিকার অবস্থানের পরিবর্তন
দক্ষিণ কোরিয়ায় ডিভাইস সংগ্রহের কঠোর নীতির আইনি ভিত্তি এসেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কমিশন বলে এসেছে, শিক্ষার্থীদের ফোন জব্দ করা সংবিধানপ্রদত্ত সুরক্ষার লঙ্ঘন; বিশেষ করে সুখের অধিকার-সংশ্লিষ্ট কর্ম ও যোগাযোগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে কমিশন ফোন সংগ্রহ-সংক্রান্ত প্রায় ৩০০টি অভিযোগ পর্যালোচনা করেছে। এ সময়ে তারা ধারাবাহিকভাবে রায় দিয়েছে যে, আবাসিক হলের বিধিমালা ও স্কুলের এমন নীতি, যেখানে ডিভাইস জমা দিতে হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ জিওল্লা প্রদেশের এক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী বাধ্যতামূলকভাবে ফোন জমা নেওয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তা খারিজ করে দেয় কমিশন। ওই শিক্ষার্থীর যুক্তি ছিল, এ নিয়ম ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। অভিযোগ খারিজের পক্ষে ৮-২ ভোটে কমিশন সিদ্ধান্ত দেয়, ফোন নিয়ে বিরোধ ও শৃঙ্খলাজনিত সমস্যায় শিক্ষকদের কর্তৃত্ব এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অধিকারের যে ক্ষতি হয়, তা ডিভাইস সংগ্রহের ফলে অধিকার লঙ্ঘনের চেয়ে বেশি। কমিশন উল্লেখ করে, স্মার্টফোনে অতিরিক্ত নিমগ্ন শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সহপাঠীদের সঙ্গে যথাযথভাবে মেলামেশা করতে পারে না। বিরতির সময় ফোন ব্যবহারের অনুমতি দিলে বিরোধ তৈরি হতে পারে, যা শিক্ষার অধিকারকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করবে।
এই বিচারিক পরিবর্তন আইনি নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি জুগিয়েছে এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত মামলার ভয় ছাড়াই স্কুলগুলোকে ডিভাইস সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালুর পথ খুলে দিয়েছে। কমিশন ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বিভ্রান্তি, শেখার ক্ষতি ও সাইবার বুলিং ঠেকাতে স্মার্টফোনের ব্যবহার সীমিত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিশন আরও বলেছে, শিক্ষার ফলাফলে মোবাইল ফোনের বিঘ্ন সৃষ্টির বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই স্বীকৃতি পাচ্ছে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপট: আন্তর্জাতিক প্রবণতা
স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপকারী ক্রমবর্ধমান দেশ ও অঞ্চলের দলে যোগ দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে জাতীয় আইনে এমন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে এটি অন্যতম। অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অগ্রণী বিধিনিষেধ আরও বিস্তৃত করেছে। নেদারল্যান্ডস এমন নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়ায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। ফ্রান্স বর্তমানে ২০০টি মাধ্যমিক স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চালাচ্ছে; পরে তা দেশজুড়ে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। আর নিউজিল্যান্ড সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মনোযোগ-বিঘ্নহীন স্কুলের উদ্যোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের অংশ হিসেবে নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল কে-১২ স্কুলে ঘণ্টা বাজা থেকে ছুটি পর্যন্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে রাজ্যব্যাপী বিধিনিষেধ নিশ্চিত করেছেন। এ ধরনের ব্যাপক সীমাবদ্ধতা চালু করা সবচেয়ে বড় রাজ্য এখন নিউইয়র্ক। ২০২৫ সালের শরতে কার্যকর হতে যাওয়া নীতিতে দুপুরের খাবারের বিরতি ও অধ্যয়নকক্ষের সময়সহ পুরো শিক্ষাদিবসে অনুমোদনহীন ইন্টারনেট-সংযুক্ত ব্যক্তিগত ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্কুলে ডিভাইস সংরক্ষণের সমাধানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।
নিউইয়র্কের বাস্তবায়ন মডেল
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নিউইয়র্কের পদ্ধতির বেশ কিছু মিল রয়েছে, যা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। রাজ্যের নীতিতে স্কুলগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্কুল চলাকালে অভিভাবকেরা যেন নির্ভরযোগ্য উপায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্কুল জেলাগুলোকে। চিকিৎসাজনিত সমস্যা সামলানো শিক্ষার্থী, যাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিভাইস ব্যবহারের প্রয়োজন, এবং অনুবাদসেবা বা পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্বের মতো শিক্ষামূলক কারণে ডিভাইস দরকার হলে তারা ছাড় পাবে।
তবে নিউইয়র্ক শহরের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়নের এমন জটিলতা চিহ্নিত করেছেন, যা সিউলে দেখা দেওয়া উদ্বেগের সঙ্গে মেলে। স্কুল চ্যান্সেলর মেলিসা অ্যাভিলেস-রামোস স্বীকার করেছেন, শহরজুড়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে উল্লেখযোগ্য লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি বলেন, ভালো ধারণা থেকে বাস্তবায়নে পৌঁছানোর পথ কখনো কখনো দীর্ঘ হয়। সংরক্ষণের পাউচ এবং ডিভাইস সংগ্রহের ব্যবস্থা সামলাতে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের খরচ হিসাব করে শহরের বাজেট কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন ব্যয় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার হবে বলে ধারণা করছেন, যা রাজ্যের বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ।
বিরোধিতা: ডিজিটাল অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন থাকলেও নাগরিক স্বাধীনতাকর্মী ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। বামপন্থী জিনবো পার্টি বিশেষভাবে সরব হয়েছে। তাদের যুক্তি, আইনটি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল অধিকার এবং শিক্ষার অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দলটির প্রতিনিধিরা বলেছেন, এই ব্যবস্থা কিশোরদের স্বাধীনভাবে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে শেখার সুযোগ বন্ধ করে এবং ডিজিটাল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করে।
কিছু শিক্ষার্থীও একই উদ্বেগ জানিয়েছে। ১৮ বছর বয়সী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী সিও মিন-জুন মনে করেন, ক্লাসের সময় ফোন নিষিদ্ধ করলেও আসক্তির অন্তর্নিহিত সমস্যা সমাধান হয় না। তাঁর কথায়, শিক্ষার্থীরা যাতায়াতের সময় বা রাতে বিছানায় শুয়েও ফোন ব্যবহার করবে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে বিকল্প কাজ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত। শুধু ডিভাইস কেড়ে নিলে ফোন ছাড়া শিক্ষার্থীরা কী করতে পারে, তা শেখানো হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিষেধাজ্ঞার চেয়ে স্বায়ত্তশাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল সাক্ষরতা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে নির্দেশিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
ডেমোক্রেটিক পার্টি অব কোরিয়ার প্রতিনিধি কো মিন-জং প্রক্রিয়াগত আপত্তি তুলে বলেছেন, আইনটি শিক্ষার্থীদের স্বশাসনে সক্ষম স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর যুক্তি, ওপর থেকে বিধিনিষেধ চাপিয়ে না দিয়ে স্বশাসনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিজেদের নিয়ম তৈরি করতে উৎসাহিত করা উচিত স্কুলগুলোর।
শ্রেণিকক্ষের প্রমাণ
নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের নেতিবাচক ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে ক্রমবর্ধমান গবেষণার প্রমাণ তুলে ধরছেন। হানিয়াং ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের প্রায় ৫০,০০০ কিশোরের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন চার ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, অনিদ্রা ও আত্মহত্যার চিন্তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি। হেলথ ইনস্যুরেন্স রিভিউ অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের মানসিক রোগ-সংক্রান্ত চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা গত চার বছরে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই প্রায় ২,৫০,০০০ শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও একই প্রবণতার সমর্থন মিলেছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ১,৭০০ অভিভাবক ও ৩৬৪ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৭৬ শতাংশ কিশোর মোবাইল ফোন ব্যবহারে কোনো না কোনো ধরনের বিধিনিষেধ সমর্থন করলেও, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকা স্কুলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী দিনের বেলায় ডিভাইস ব্যবহার করার কথা স্বীকার করেছে। নীতির কঠোরতা যা-ই হোক, শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রতিদিন গড়ে ১.৫ ঘণ্টা ফোনে কাটায়। তবে গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কঠোর নীতির সঙ্গে শিক্ষকদের জানানো ইতিবাচক ফলাফলের সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক অ্যাঞ্জেলা ডাকওয়ার্থ বলেন, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন আশপাশে রাখা, এমনকি ব্যাগে বা পেছনের পকেটে রাখারও অনুমতি নেই, সেখানে পড়াশোনায় মনোযোগ বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষকেরাও একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষক বলেছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারে শ্রেণিকক্ষে বিঘ্ন ঘটে। কিছু শিক্ষার্থী ফোন ব্যবহার সীমিত করা হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; কখনো কখনো এতে মৌখিক গালিগালাজ বা শারীরিক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কোরিয়ান ফেডারেশন অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন এই বিলকে সমর্থন করছে, কারণ এটি মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করার জন্য আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দেবে। আগে ডিভাইস জব্দ করলে অভিভাবকের অভিযোগের মুখে শিক্ষকেরা নিজেদের অসহায় মনে করতেন।
মূল বিষয়গুলো
- সংশোধিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা আইন ২০২৫ সালের আগস্টে পাস হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা ২০২৬ সালের মার্চে কার্যকর হবে।
- স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে স্কুলগুলোকে নির্ধারণ করতে হবে। তবে সেই সময়সীমা পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে সাময়িক নিয়ম চালু করা যাবে।
- প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের অনুমোদিত শিক্ষামূলক কাজ এবং জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া আইন অনুযায়ী ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না।
- স্কুলগুলো পুরো শিক্ষাদিবসজুড়ে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারবে। আগে ফোন জব্দের বিরোধিতা করলেও অবস্থান পরিবর্তনের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এখন এ চর্চাকে অনুমোদনযোগ্য বলে মনে করে।
- বর্তমানে স্কুলগুলোর নীতিতে ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে: জরিপে অংশ নেওয়া স্কুলের ৫৫.৬ শতাংশে বিরতির সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, ৪৪.৪ শতাংশে তা নিষিদ্ধ এবং মাত্র ৩.৯ শতাংশে ফোন সঙ্গে রাখাই পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
- প্রায় ৩২.৬ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করতে তাঁদের স্কুলগুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়।
- নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের মতো দেশ ও অঞ্চলের আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞার মিল রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত স্কুল বা জেলার ওপর নীতি নির্ধারণের দায় না রেখে দেশব্যাপী আইন করে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া স্বতন্ত্র।






