কবিতা থেকে বাস্তবে
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সোনালি বর্ম পরা সৈন্যদের উজ্জ্বল চিত্র কেবল ধ্রুপদি চীনা কবিতার পঙ্ক্তিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাং রাজবংশের খ্যাতিমান কবি ওয়াং চাংলিং লিখেছিলেন, যোদ্ধারা ‘শত্রুকে পরাজিত না করা পর্যন্ত মরুভূমি ছাড়বেন না, যদিও যুদ্ধে তাঁদের সোনালি বর্ম ১০০ বার জীর্ণ হয়ে যায়।’ এই পঙ্ক্তিগুলো সীমান্তের যুদ্ধের অদম্য চেতনা তুলে ধরেছিল, কিন্তু এমন বর্মের বাস্তব অস্তিত্ব অধরাই ছিল। ঐতিহাসিক বিবরণে বর্ণিত জাঁকালো সোনালি বর্মের একটিও নমুনা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কখনো খুঁজে পাননি। তাই অনেকেই ভাবতেন, ‘সোনালি বর্ম’ কি সামরিক মর্যাদার রূপক, নাকি নিছক কাব্যিক অলংকার।
সূচিপত্র
সেই অনিশ্চয়তা এখন দূর হয়েছে। চীনা সামাজিক বিজ্ঞান একাডেমির (সিএএসএস) প্রত্নতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক মূল গবেষণাগারের গবেষকেরা তাং রাজবংশের ‘সোনালি’ বর্মের একমাত্র জানা বাস্তব নমুনাটি উন্মোচন করেছেন। সোনার প্রলেপ দেওয়া এই ব্রোঞ্জের বর্মটি সতর্কতার সঙ্গে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে তিব্বতি মালভূমির একটি রাজকীয় সমাধি থেকে। পুনরুদ্ধারকারী দল বর্মটির প্রতিটি অংশ জুড়ে সেটি পুনর্গঠন করেছে এবং এর সম্ভাব্য আদি চেহারা দেখিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করেছে। এতে নিশ্চিত হয়েছে, তাং যুগের কবিরা বিপুল ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের বাস্তব বস্তু নিয়েই লিখেছিলেন।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব হলো, এটি সাহিত্য ও বস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যকার ব্যবধান ঘুচিয়েছে। এটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয় যে কবিতায় প্রশংসিত ‘সোনালি বর্ম’ নিছক কল্পনা ছিল না; বরং উন্নত ধাতুপ্রযুক্তিতে তৈরি উচ্চ মর্যাদার এক বিশেষ ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ছিল। এই আবিষ্কার তাং রাজবংশের যুদ্ধকৌশল, কারুশিল্প এবং সাম্রাজ্যের অস্থির পশ্চিম সীমান্তে সংঘটিত সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিচ্ছে।
সিল্ক রোডের সীমান্তে এক সমাধি
বর্মটি পাওয়া গেছে ছিংহাই প্রদেশের দুলান জেলার শুয়েই নং ১ সমাধি থেকে। অঞ্চলটি প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র ছিল। এখানে খননকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে; উদ্ধারকাজ চলে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। সমাধিটি অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের, যখন এই অঞ্চল ছিল বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল। এটি তাং সাম্রাজ্যের রাজধানী ছাংআনের সঙ্গে মধ্য এশিয়া ও পারস্যকে যুক্ত করত। ধারণা করা হয়, সমাধিটি তুয়ুহুনের এক রাজার, যারা একসময় চীনের পশ্চিম সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত।
তৎকালীন ভূরাজনীতিতে তুয়ুহুন রাজ্যের ভূমিকা ছিল জটিল। তৃতীয় শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত রাজ্যটি তিব্বতি মালভূমির কৌশলগত পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করত এবং সিল্ক রোডের বাণিজ্য সহজ করত। তবে তাদের স্বাধীনতা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সুই রাজবংশের হাতে এবং পরে তাং রাজবংশের কাছে রাজ্যটি পরাজিত হয়। এরপর তিব্বতি সাম্রাজ্য—যা তুবো সাম্রাজ্য নামেও পরিচিত—এর অধীনস্থ রাজ্যে পরিণত হয়। মিত্রতা ও বিজয়ের এই পালাবদলের ইতিহাস সমাধিটিকে অঞ্চলের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশের এক মূল্যবান সময়কোষে পরিণত করেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রথম সমাধিতে প্রবেশ করে দেখেন, ভেতরের সবকিছু এলোমেলো। সম্ভবত লুটেরা এবং আগের উদ্ধার অভিযানের কারণে সমাধিটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ব্রোঞ্জের বর্মের পাত ও বার্নিশ করা ঘোড়ার বর্ম একসঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে সেগুলো ভেঙে ও ক্ষয়ে গিয়েছিল। কিছু খণ্ড এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে সামান্য নাড়াচাড়াতেও অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি ছিল। এই বিশৃঙ্খল খণ্ডগুলোকে একটি সুসংহত নিদর্শনে রূপ দেওয়া ছিল দলের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।
পুনরুদ্ধারের বিজ্ঞান
এই জটিল ধাঁধার সমাধানে সিএএসএসের সংরক্ষণবিদেরা ‘পুরো বস্তুটিকে অংশে ভাগ করে, পরে অংশগুলো জুড়ে আবার পুরো বস্তু তৈরি’ করার কৌশল নেন। বর্মটি যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, তাতে শারীরিকভাবে নাড়াচাড়া করার মতো যথেষ্ট মজবুত ছিল না বলে এই পদ্ধতি জরুরি হয়ে পড়ে। তাই দলটি ডিজিটালভাবে বর্মটি খুলে ফেলে। প্রতিটি খণ্ডের আদি অবস্থান ও আকৃতি নথিবদ্ধ করতে সেটি ত্রিমাত্রিকভাবে স্ক্যান করা হয়। পাতগুলো কীভাবে তৈরি এবং সেগুলোতে কী ধাতু রয়েছে, তা জানতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ গুও ঝেংচেন এক সংবাদ সম্মেলনে এই সতর্ক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, দলটি ‘প্রতিটি বর্মের পাতের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে স্তর ধরে পরিষ্কার, উত্তোলন ও সংরক্ষণের কাজ করেছে।’ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধারণা অনুযায়ী বর্মটি শুধু সাধারণ ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি ছিল না, যেমনটি ব্যবহারিক যুদ্ধসরঞ্জামের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত হতে পারে। এতে সোনার প্রলেপ ছিল। ফলে নিশ্চিত হয়েছে, তাং কবিরা চোখধাঁধানো সৌন্দর্যের এক বাস্তব চিত্রই বর্ণনা করেছিলেন।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ গুও ঝেংচেন বলেন, “আমরা ‘পুরো বস্তুটিকে অংশে ভাগ করে, পরে অংশগুলো জুড়ে আবার পুরো বস্তু তৈরি’ করার কৌশল নিয়েছি।”
প্রকল্পটির সাফল্যে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ও আলট্রা-ডেপথ মাইক্রোস্কোপির মতো কৌশলে গবেষকেরা কোনো ক্ষতি না করেই পাতগুলোর নির্মাণপদ্ধতি ও উপাদান বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন। এই তথ্য দিয়ে বর্মটির ডিজিটাল মডেল তৈরি করা হয়, যা পরে বাস্তব পুনর্গঠন এবং ভিডিও সিমুলেশনে কাজে লাগে। ভিডিওতে বর্মটিকে তার সম্ভাব্য আদি রূপে, আলোয় ঝলমল করতে দেখা যায়।
আনুষ্ঠানিক জাঁকজমক বনাম যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবহারিকতা
বর্মটি মরুভূমির সীমান্তে তীব্র যুদ্ধের ছবি মনে করিয়ে দিলেও গবেষকদের ধারণা, এটি সম্ভবত সামরিক ব্যবহারের চেয়ে আনুষ্ঠানিক কাজেই বেশি ব্যবহৃত হতো। সমাধিতে সোনার নিদর্শন ও রেশমি বস্ত্রের উপস্থিতি অভিজাত মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায়, বর্মটি ব্যবহারিক সুরক্ষার চেয়ে রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক ছিল। তাং রাজবংশের বস্তুগত সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মর্যাদার সমাধিতে ব্যবহারিক প্রয়োজনের চেয়ে দৃশ্যমান জাঁকজমক ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেত।
তবে সমাধিতে এমন কিছু জিনিসও ছিল, যা সামরিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয়। সোনার প্রলেপ দেওয়া বর্মের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ঘোড়ার সরঞ্জাম, লোহার বর্ম এবং বার্নিশ করা ঘোড়ার বর্ম পেয়েছেন। এসব আবিষ্কার লিখিত ঐতিহাসিক নথির সঙ্গে মেলে। একাদশ শতাব্দীতে ইতিহাসবিদ ওয়াং আনশি সংকলিত ‘নিউ বুক অব তাং’-এ তিব্বতি বাহিনীর বর্মের এমন বর্ণনা রয়েছে, যা এতটাই পূর্ণাঙ্গ ছিল যে ‘শক্তিশালী ধনুক ও ধারালো অস্ত্র গুরুতর ক্ষতি করতে পারত না।’ এতে বোঝা যায়, সোনালি বর্মটি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকলেও এই অঞ্চলের মানুষের উন্নত যুদ্ধপ্রযুক্তিও ছিল।
আনুষ্ঠানিক সোনার প্রলেপ দেওয়া বর্মের পাশে ব্যবহারিক লোহার ও বার্নিশ করা বর্মের উপস্থিতি তুয়ুহুন অভিজাতদের একটি সূক্ষ্মতর ছবি তুলে ধরে। তাঁরা ছিলেন যোদ্ধা; মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও ক্ষমতার প্রদর্শনের মূল্য যেমন তাঁরা বুঝতেন, তেমনি শারীরিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বুঝতেন। সোনালি বর্মটি ছিল ভীতিকর ও বিস্ময়জাগানিয়া এক দৃশ্য। প্রতিদ্বন্দ্বী ও মিত্র—উভয়ের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় এটি হয়তো আচার-অনুষ্ঠান বা শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হতো।
তাং রাজবংশের কারুশিল্প সম্পর্কে নতুন ধারণা
পুনরুদ্ধার প্রকল্পটি তাং রাজবংশের উচ্চমানের কারুশিল্প সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে। বর্মের পাত বিশ্লেষণে উন্নত ধাতুবিদ্যাগত জ্ঞানের প্রমাণ মিলেছে। ব্রোঞ্জে সোনার প্রলেপ দিতে পৃষ্ঠের ওপর সোনার পাতলা স্তর বসাতে হয়; এ কাজে দক্ষতা ও নিখুঁততার প্রয়োজন। এই আবিষ্কার নিশ্চিত করে যে লিখিত বিবরণে উল্লেখ করা ‘সোনালি বর্ম’ সম্ভবত খাঁটি সোনার নয়, বরং সোনার প্রলেপ দেওয়া ব্রোঞ্জের তৈরি ছিল। এতে ঐতিহাসিক বর্ণনার একটি দিক স্পষ্ট হয়েছে।
বর্ম ছাড়াও সমাধিতে এমন কিছু মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা সে সময়ের শৈল্পিক সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়। আঙুর রাখার কাজে ব্যবহৃত একটি বার্নিশ করা থালায় তাং রাজবংশের সেরা সোনা ও রুপার তারের কাজের নকশা রয়েছে। এ ছাড়া, ৭৫০ সালের আগের সময়ের বলে নির্ধারিত টাই-ডাই করা কাপড়ের একটি খণ্ড এই বস্ত্র-প্রযুক্তির প্রাচীনতম জানা বাস্তব নমুনাগুলোর একটি। বর্মের পাশে পাওয়া এসব জিনিস এমন এক সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে সামরিক শক্তির মতোই সৌন্দর্য ও বিলাসিতার মূল্য ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে দুলান জেলার অবস্থানের কারণে স্থানীয় কারিগরদের ইউরেশিয়ার নানা প্রান্তের ধারণা ও উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ ছিল। অঞ্চলটি ছিল সাংস্কৃতিকভাবে প্রাণবন্ত; চীনা, তিব্বতি ও মধ্য এশীয় প্রভাবের মিলনস্থল। বিভিন্ন শৈল্পিক ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটেছে—এমন নানা নিদর্শন সমাধিতে পাওয়া যাওয়ায় এই বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রতিফলন দেখা যায়। বর্মটি নিজেও হয়তো এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফল; এতে চীনা ধাতুশিল্পের কৌশলের সঙ্গে তৃণভূমির যাযাবরদের নান্দনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে।
সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্বের সংযোগ
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো তাং রাজবংশের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এর যোগসূত্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পণ্ডিতেরা কবিতায় সোনালি বর্মের উল্লেখ আক্ষরিক, নাকি রূপক—তা নিয়ে বিতর্ক করেছেন। এই আবিষ্কার জোরালো প্রমাণ দেয় যে ওয়াং চাংলিংয়ের মতো কবিরা তাঁদের কবিতা লেখার সময় সমকালীন বাস্তবতার ওপর নির্ভর করেছিলেন। তাং যুগের কবিতায় সূর্যের আলোয় ঝলমলে ‘সোনালি আঁশের’ যে চিত্র পাওয়া যায়, তা এখন বাস্তব বস্তুগত সংস্কৃতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো বলে মনে হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্বে লিখিত বিবরণ ও নিদর্শনের এমন মিল বিরল। এর ফলে ইতিহাসবিদেরা সেই সময়ের সাহিত্যে থাকা অন্যান্য বর্ণনাও আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন করে যাচাই করতে পারবেন। সোনালি বর্ম যদি বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে তাং কবিতার আর কোন কোন দিক প্রকৃত ঐতিহাসিক পরিস্থিতির প্রতিফলন? এই আবিষ্কার সমকালীন উৎসগুলো নতুন করে পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করেছে; এর ফলে সে সময়ের দৈনন্দিন জীবন, মূল্যবোধ ও দৃশ্যসংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পুনরুদ্ধার করা বর্মটি অতীতের সঙ্গে এক স্পর্শযোগ্য যোগসূত্র, কবিরা যে চেতনাকে উদ্যাপন করেছিলেন তারই বাস্তব রূপ। এতে তাং রাজবংশের সহনশীলতা ও মহিমা মূর্ত হয়ে উঠেছে—যে যুগকে প্রায়ই চীনা সভ্যতার স্বর্ণযুগ বলে বিবেচনা করা হয়। বর্মটিকে আবার প্রাণ ফিরে পেতে দেখা আধুনিক মানুষকে পাঠ্যবই ও সংকলনে বর্ণিত ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করে।
বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সমাধি ও এর ভেতরের জিনিসপত্রকে অষ্টম শতকের পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। এ সময় তাং রাজবংশ, তিব্বতি সাম্রাজ্য এবং বিভিন্ন তৃণভূমিভিত্তিক কনফেডারেশনের মধ্যে তীব্র যোগাযোগ ও সংঘাত চলছিল। এই বৃহৎ শক্তিগুলোর মাঝখানে পড়ে তুয়ুহুনকে বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হতো। তাদের বস্তুগত সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী অবস্থান ও দুর্বলতার এই যুগল চিত্র ফুটে ওঠে।
তিব্বতি মালভূমিতে রাজকীয় সমাধির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তিব্বতের ‘রাজাদের উপত্যকা’ নামে পরিচিত ছোংয়ে উপত্যকায় ইয়ারলুং রাজবংশের রাজাদের বলে মনে করা হয়, এমন বহু সমাধির ঢিবি রয়েছে। দুলানের সমাধিটি এগুলোর থেকে আলাদা হলেও, পরলোকে সঙ্গী হওয়ার জন্য শাসকদের সঙ্গে মূল্যবান কবরসামগ্রী সমাহিত করার একই ঐতিহ্যের অংশ। অভিজাতদের বর্ম, অস্ত্র ও বিলাসদ্রব্যসহ সমাহিত করার রীতি পুরো অঞ্চলেই প্রচলিত ছিল; এতে ক্ষমতা ও পরলোক সম্পর্কে অভিন্ন বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
এই আবিষ্কার সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানের পথ হিসেবে ছিংহাই-তিব্বত মালভূমির গুরুত্বও তুলে ধরে। সিল্ক ও মসলার মতোই এই পথ ধরে ধারণা, ফ্যাশন ও প্রযুক্তি চলাচল করত। সমাধিতে পাওয়া বর্মটি সেই সাংস্কৃতিক প্রবাহের সাক্ষ্য; এতে চীনা ধাতুশিল্প ও সীমান্ত অঞ্চলের সামরিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটেছে।
ভবিষ্যৎ গবেষণা ও জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন
সোনালি বর্মের পুনরুদ্ধার কাজের শেষ নয়, বরং গবেষণার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। গবেষকেরা এখন বর্মটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে তাং রাজবংশের সামরিক সরঞ্জামের অন্য জানা নমুনার সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন। পুনরুদ্ধারে ব্যবহৃত কৌশল, বিশেষ করে ডিজিটাল স্ক্যানিং ও পুনর্গঠন, ভঙ্গুর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে।
জনসাধারণের সামনে বর্মটি প্রদর্শনের ফলে শিক্ষার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রাচীন কারিগরদের শিল্পদক্ষতা ও প্রকৌশলজ্ঞান মানুষ নিজের চোখে দেখতে পারবে। বিশেষ করে ভিডিও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দর্শকেরা কল্পনা করতে পারবেন, নড়াচড়ার সময় বর্মটি কেমন দেখাত—এর সোনার প্রলেপ দেওয়া পাতগুলো কীভাবে আলো প্রতিফলিত করত। বইয়ের স্থির বর্ণনা কখনোই এই দৃশ্যগত অনুভূতি পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না।
পুনরুদ্ধার করা বর্মটি জাদুঘরের প্রদর্শনীতে স্থান পেলে তাং রাজবংশের ইতিহাস, চীন-তিব্বত সম্পর্ক এবং সামরিক প্রযুক্তির বিবর্তন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হবে। এটি মানুষের কারুশিল্পের দীর্ঘস্থায়ী শক্তি এবং আমাদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
মূল তথ্য
- রাজকীয় সমাধিতে পাওয়া খণ্ডাংশ থেকে তাং রাজবংশের ‘সোনালি’ বর্মের একমাত্র জানা বাস্তব নমুনাটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
- সোনার প্রলেপ দেওয়া ব্রোঞ্জের বর্মটি তিব্বতি মালভূমির ছিংহাই প্রদেশের দুলান জেলার শুয়েই নং ১ সমাধি থেকে উদ্ধার করা হয়।
- সমাধিটি তুয়ুহুনের এক রাজার ছিল। সিল্ক রোডে তাং ও তিব্বতি সাম্রাজ্যের মাঝখানে অবস্থিত ছিল এই রাজ্য।
- বর্মটি অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের; এটি ধ্রুপদি তাং কবিতার বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করে।
- রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে আনুষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বর্মটি; তবে সমাধিতে ব্যবহারিক লোহার ও বার্নিশ করা বর্মও ছিল।
- এই আবিষ্কার ঐতিহাসিক নথির সত্যতা সমর্থন করে এবং তাং রাজবংশের উচ্চ মর্যাদার বস্তুগত সংস্কৃতির অকাট্য প্রমাণ দেয়।
গবেষকেরা ত্রিমাত্রিক স্ক্যানিং ও অণুবীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে ১,২০০টিরও বেশি খণ্ড ডিজিটালভাবে খুলে আবার জুড়েছেন।






