কেন হিউম্যানয়েড রোবট যাচ্ছে গুয়াংসি সীমান্তে
চীন একটি সচল আন্তর্জাতিক সীমান্তে হিউম্যানয়েড রোবট কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউবিটেক রোবোটিকস ২৬৪ মিলিয়ন ইউয়ানের (প্রায় ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় ভিয়েতনামের সঙ্গে স্থলসীমান্ত থাকা দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ গুয়াংসির সীমান্ত পারাপারকেন্দ্রগুলোতে তাদের শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী ওয়াকার এস২ রোবট মোতায়েন করা হবে। উপকূলীয় শহর ফাংচেংগাংয়ের একটি হিউম্যানয়েড রোবট কেন্দ্রের মাধ্যমে ডিসেম্বরে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা। প্রকল্পটির আওতায় রোবটগুলো যাত্রীদের পথ দেখাবে, ভিড়ের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে, টহলে সহায়তা করবে, সরবরাহসংক্রান্ত কাজে সহযোগিতা করবে এবং সীমান্ত স্থাপনায় বাণিজ্যিক সেবা দেবে। ইউবিটেক জানিয়েছে, একই রোবট ইস্পাত, তামা ও অ্যালুমিনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকারী উৎপাদনকেন্দ্রেও পরিদর্শনের কাজ করবে।
সূচিপত্র
- কেন হিউম্যানয়েড রোবট যাচ্ছে গুয়াংসি সীমান্তে
- ওয়াকার এস২ কী করতে পারে
- বিদ্যুৎ এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম
- দৃষ্টিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- সীমান্তচৌকি ও কারখানায় কীভাবে প্রকল্পটি চালু হবে
- গুয়াংসিতে সীমান্ত কার্যক্রম
- ধাতু উৎপাদনকেন্দ্রে শিল্প পরিদর্শন
- দেহধারী এআই খাতে চীনের দ্রুত অগ্রযাত্রা
- ইউবিটেকের ব্যবসায়িক গুরুত্ব
- সুযোগ ও উদ্বেগ
- অন্যান্য হিউম্যানয়েড উদ্যোগের সঙ্গে তুলনা
- মূল বিষয়গুলো
চীনের সরকারি কার্যক্রমে হিউম্যানয়েড ব্যবস্থার বাস্তব ব্যবহারের বৃহত্তম প্রকল্পগুলোর একটি এই চুক্তি। এর ফলে জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে রোবটগুলোকে; কাজ করতে হবে ব্যস্ত ও অনিশ্চিত পরিবেশে, যেখানে চলাচল, চারপাশ বোঝার ক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্য কার্যক্রম জরুরি। এ কাজে শিল্পকারখানার জন্য তৈরি প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়া চীনে চলমান পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। দেশটিতে সরকারি সংস্থা, বিমানবন্দর, কারখানা ও নগরসেবায় দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে রোবট যুক্ত করা হচ্ছে; এর পেছনে রয়েছে দেহধারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দেশব্যাপী উদ্যোগ।
গুয়াংসির সীমান্তচৌকিগুলোতে আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তসীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের নিয়মিত চাপ থাকে। কর্মীরা ইতিমধ্যে কিয়স্ক, ক্যামেরা ও স্থির স্ক্যানারের ওপর নির্ভর করেন। হিউম্যানয়েড রোবট এমন চলমান উপাদান যুক্ত করবে, যা মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি বিদ্যমান বিন্যাসে চলাচল করতে পারে। যেখানে সহায়তা দরকার সেখানে গিয়ে তারা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে, নিরাপত্তা নির্দেশনা জানাতে, ছোটখাটো বোঝা বহন করতে এবং ব্যস্ত সময়ে কর্মীদের কাজের চাপ কমাতে পারবে। কারখানার জন্য তৈরি সাধারণ কাজে ব্যবহারযোগ্য একটি রোবট বড় ধরনের স্থান পরিবর্তন ছাড়াই জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে সম্মুখসারির দায়িত্ব পালন করতে পারে, এমনটাই দেখাতে চায় ইউবিটেক।
ওয়াকার এস২ কী করতে পারে
ওয়াকার এস২ শিল্পকারখানার পরিবেশের জন্য তৈরি ইউবিটেকের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ আকারের হিউম্যানয়েড রোবট। এর উচ্চতা প্রায় ১.৭৬ মিটার এবং এতে ৫২টি স্বাধীনভাবে নড়াচড়ার মাত্রা রয়েছে। প্রতিটি হাতে আছে ১১টি নড়াচড়ার মাত্রা, যা সূক্ষ্মভাবে কাজ করার সক্ষমতা দেয় এবং সংযোজন ও কোনো বস্তু ধরার কাজে এক মিলিমিটারেরও কম ব্যবধানের নির্ভুলতা নিশ্চিত করে। মাটি থেকে প্রায় ১.৮ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত কর্মপরিসরে রোবটটি প্রতিটি বাহু দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ কিলোগ্রাম ওজন বহন করতে পারে। কোমরের উচ্চ টর্কযুক্ত জয়েন্টের কারণে এটি গভীরভাবে বসতে ও নিচু হতে পারে। ফলে নিচু তাক ও সংকীর্ণ স্থানে কাজ করতে পারে, যেখানে স্থির রোবটের চলাচলে সমস্যা হয়।
এর নকশায় চলাচল ও ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের মতো গভীরতা অনুধাবন ও মানচিত্র তৈরির জন্য ওয়াকার এস২-এ আরজিবি ক্যামেরাসহ দুই-চোখের স্টেরিও ভিশন ব্যবস্থা রয়েছে। গতিশীল ভারসাম্য রক্ষার অ্যালগরিদমের সহায়তায় রোবটটি দুই পায়ে চলার সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে; একই সঙ্গে বোঝা বহন, অসমতল পৃষ্ঠে পা ফেলা কিংবা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭.২ কিলোমিটার গতিতে চলাও সম্ভব। কারখানার সরু চলাচলের পথ, মালপত্র রাখার ঘর এবং এখন সীমান্তের এমন হল—যেখানে মানুষের চলাচল বদলাতে থাকে—এই সক্ষমতাগুলো এমন ঘন ও গতিশীল পরিবেশের জন্য তৈরি।
বিদ্যুৎ এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম
এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎব্যবস্থা। ওয়াকার এস২-এ দুটি ব্যাটারি রয়েছে, যা চালু অবস্থাতেই বদলানো যায়। রোবটটি নিজে একটি স্টেশনে যেতে, শেষ হয়ে আসা ব্যাটারি খুলে চার্জ করা ব্যাটারি বসাতে এবং প্রায় তিন মিনিটের মধ্যে কাজে ফিরতে পারে। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রায় সার্বক্ষণিক রোবটকে কাজে রাখার জন্যই স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারি বদলের ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পরিদর্শনের নিরবচ্ছিন্ন পালা বা ব্যস্ত সীমান্তচৌকির মতো কার্যক্রমে কাজ বন্ধ রাখার সময় কমানো হিউম্যানয়েড মোতায়েনের ব্যয়-সাশ্রয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দৃষ্টিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
চারপাশ বোঝা, কাজের পরিকল্পনা এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাল দেওয়ার জন্য ইউবিটেক তাদের ব্রেইননেট ২.০ ও কো-এজেন্ট এআই কাঠামো যুক্ত করেছে। সফটওয়্যার ব্যবস্থায় একাধিক ধরনের তথ্য বিশ্লেষণের সঙ্গে চলাচলের পরিকল্পনা একত্র করা হয়েছে। ফলে রোবট নির্দেশনা বুঝতে, সেগুলোকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করতে এবং অপ্রত্যাশিত বাধার মুখে পড়লে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বাস্তবে এর অর্থ, কোনো রোবটকে মালপত্র আনা-নেওয়া, নিয়মিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা যন্ত্রপাতির অবস্থা পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া যায়। এরপর যান চলাচল, কর্মীসংখ্যা বা পরিবেশের অবস্থা বদলালে সেটি নতুন করে পরিকল্পনা করতে পারে।
সীমান্তচৌকি ও কারখানায় কীভাবে প্রকল্পটি চালু হবে
বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব যাচাইয়ের জন্য গুয়াংসি প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। সীমান্তচৌকিতে ওয়াকার এস২ রোবটগুলো যাত্রীদের সারি ও কাউন্টারের পথ দেখাবে, চলমান তথ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এবং ব্যস্ত সময় বা বিশেষ অনুষ্ঠানে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। শান্ত সময়ে একই রোবট নির্ধারিত পথে টহল দিতে, ফেলে রাখা বস্তু শনাক্ত করতে এবং কাউন্টারের মধ্যে পার্সেল বা সরবরাহসামগ্রী আনা-নেওয়ার মতো সাধারণ কাজে কর্মীদের সহায়তা করতে পারবে। পথনির্দেশনা, প্রচারমূলক তথ্য বা প্রাথমিক গ্রাহকসেবার মতো বাণিজ্যিক কাজেও প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা যাবে।
গুয়াংসিতে সীমান্ত কার্যক্রম
ফাংচেংগাং ভিয়েতনামের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অবস্থিত। এই সীমান্ত পারাপারকেন্দ্রগুলো দিয়ে পর্যটক, অভিবাসী শ্রমিক ও পণ্য পরিবহনকারী দল যাতায়াত করে। কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং যানজট কমাতে এবং কর্মীদের জটিল যাচাইয়ের কাজে সময় দিতে মোবাইল ও ক্লান্তিহীন সহায়ক যুক্ত করাই এর উদ্দেশ্য। একটি সাধারণ কর্মপালায় হিউম্যানয়েড রোবট ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের সহায়তা এবং যাদের বিশেষ সাহায্য দরকার তাদের নির্দিষ্ট কাউন্টার বা বের হওয়ার পথ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কাজ পর্যায়ক্রমে করতে পারে। স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী কথোপকথনের সুবিধা ও একাধিক ভাষায় সহায়তা সাজানো যাবে। সময়ের সঙ্গে কার্যকারিতা ও মতামতের ভিত্তিতে কাজের পরিধি বাড়ানো সম্ভব।
ধাতু উৎপাদনকেন্দ্রে শিল্প পরিদর্শন
সীমান্তের হলের বাইরেও একই ওয়াকার এস২ রোবট ইস্পাত, তামা ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকেন্দ্রে পরিদর্শন চালাবে। এসব কাজে প্রায়ই একই পথ বারবার ঘোরা, মাপযন্ত্রের পাঠ নেওয়া, লেবেল স্ক্যান করা, ছিদ্র বা অস্বাভাবিক শব্দ খুঁজে দেখা এবং সিঁড়ি ও সরু পথ দিয়ে চলাচল করতে হয়। হিউম্যানয়েড রোবট মানুষের ব্যবহারের উপযোগী স্থানে চলাচল করতে পারে, যন্ত্রপাতির দিকে ক্যামেরা বা সেন্সর তাক করতে পারে এবং তদারককারীদের কাছে তথ্য পাঠাতে পারে। দীর্ঘ পথ বা উচ্চ তাপমাত্রার এলাকা থাকলে স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারি বদলের ব্যবস্থা ও মজবুত উপকরণ ঘন ঘন হাতে সহায়তা ছাড়াই রোবটকে কাজে রাখতে সাহায্য করে।
দেহধারী এআই খাতে চীনের দ্রুত অগ্রযাত্রা
সরকারি নীতিতে রোবোটিকস ও দেহধারী বুদ্ধিমত্তা খাতে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হিউম্যানয়েড রোবোটিকসের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে, যা মানদণ্ড, গবেষণা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিভিন্ন প্রদেশের সরকারি সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে দৈনন্দিন কাজে রোবট ব্যবহার করছে। শেনঝেন, সাংহাই ও চেংদুসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশি টহলে রোবট রয়েছে। হাংজৌ শিয়াওশান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি রোবট যাত্রীদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। বড় সম্মেলনে অভিবাসন বিভাগগুলো একাধিক ভাষায় কাজ করা ব্যবস্থা পরীক্ষা করেছে। শেনঝেনের শুল্ক কর্মকর্তারা পণ্য যাচাইয়ের জন্য ভাষার মডেলকে পরিদর্শন রোবটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। গুয়াংসির মোতায়েনও এমন বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারার অংশ, যেখান থেকে তথ্য ফিরে যায় উন্নয়নকারী ও সমন্বয়কারীদের কাছে।
বাজারের সম্ভাবনা বাড়ছে। চায়না একাডেমি অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস টেকনোলজির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ছোট পরিসরে থাকা চীনের হিউম্যানয়েড রোবটের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যেতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকস রিসার্চের পূর্বাভাস, মাঝারি পরিস্থিতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বাজারের আকার প্রায় ১৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। দীর্ঘ পথ হেঁটে চলার পরীক্ষা ও জাতীয় প্রতিযোগিতাসহ জনসমক্ষে প্রদর্শনী মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে মূল বিষয় হলো প্রদর্শনী থেকে প্রতিদিনের কাজে যাওয়া, যেখান থেকে পরিমাপযোগ্য সুফল পাওয়া যায়। সীমান্তের হল ও কারখানার মেঝে সেই পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দেবে।
ইউবিটেকের ব্যবসায়িক গুরুত্ব
ইউবিটেকের কাছে এই চুক্তি একদিকে নিজেদের সক্ষমতা দেখানোর সুযোগ, অন্যদিকে উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, চলতি মাসে সরবরাহ শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াকার সিরিজের মোট অর্ডারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.১ বিলিয়ন ইউয়ান। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৫০০টি শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী হিউম্যানয়েড সরবরাহ, পরের বছর উৎপাদন দশ গুণ বাড়ানো এবং ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে ১০ হাজার ইউনিট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে ব্যবস্থাপনার। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানোর কাজও করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সম্প্রসারণে নতুন মূলধন সংগ্রহের জন্য হংকংয়ে শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন শেয়ার ছাড়ার খবরের পর তাদের শেয়ারের দাম সামান্য কমেছে, যা এ ধরনের ঘোষণার পর সাধারণত দেখা যায়।
দেশীয় গ্রাহকেরা ইতিমধ্যে সম্মুখসারির কাজে হিউম্যানয়েড রোবট পরীক্ষা করছেন। বিওয়াইডি, জিলি অটো, এফএডব্লিউ ফোকসওয়াগেন, অডি এফএডব্লিউ ও বেইজিং অটোমোটিভের মতো বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উৎপাদন লাইনে বেশি চলাচলনির্ভর কাজে ইউবিটেকের রোবট যুক্ত করতে শুরু করেছে। ফক্সকন ও এসএফ এক্সপ্রেসের মতো সরবরাহসেবা খাতের বড় প্রতিষ্ঠান গুদাম এবং স্মার্ট কারখানার কাজে রোবট মোতায়েন করছে। প্রাথমিক ফলাফল থেকে বোঝা যায়, ব্যস্ত শিল্পাঞ্চলে রোবটগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করছে। ওয়াকার এস২-কে এমন পরিবেশের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ইউবিটেক একক রোবট বিক্রি থেকে সরে এসে মোতায়েন পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট কাজের পরিস্থিতি সাজানোসহ পূর্ণাঙ্গ পরিচালন প্যাকেজ সরবরাহের দিকেও এগোচ্ছে।
চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অর্ডারের অপেক্ষমাণ তালিকা বাড়ছে। চলতি মাসে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউবিটেকের নির্বাহী তান মিন গ্রাহকদের আগ্রহের ব্যাপকতা নিয়ে কথা বলেন।
“আমরা যে অর্ডারগুলো পেয়েছি, সেগুলোর পরিমাণ ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি,” বলেন তান। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবহারিক কাজে লাগানো যায় এমন হিউম্যানয়েডের বাজার প্রাথমিক পরীক্ষামূলক প্রকল্পের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে।
সুযোগ ও উদ্বেগ
গুয়াংসির পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি স্পষ্টভাবে দেখাবে, কোন কাজে হিউম্যানয়েড রোবট সবচেয়ে উপযোগী। দরজা, কাউন্টার থেকে শুরু করে সিঁড়িঘর পর্যন্ত মানুষের ব্যবহারের উপযোগী স্থানে কাজ করতে পারে প্ল্যাটফর্মটি। তাই বিদ্যমান বিন্যাসেই এটি ব্যবহার করা সম্ভব। ব্যাটারি বদলের সুবিধা দীর্ঘ কর্মপালায় রোবটকে সচল রাখে। জনসমাগমের স্থানে একটি রোবট পর্যায়ক্রমে পথ দেখানো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ সরবরাহের কাজ করতে পারে; এরপর দীর্ঘ বিরতি না নিয়ে নতুন ব্যাটারি নিয়ে কাজে ফিরতে পারে। কারখানায় একই নকশার কারণে রোবটটি মেঝের কাছাকাছি থাকা বস্তুতে পৌঁছাতে, মাঝারি ওজনের বোঝা তুলতে এবং এমন এলাকায় বারবার পরীক্ষা চালাতে পারে, যেখানে মানুষের কাজ ক্লান্তিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ।
উদ্বেগও রয়েছে। সীমান্ত স্থাপনায় সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সেখানে কঠোর নিয়মকানুন মানতে হয়। চলাচল, চারপাশের তথ্য সংগ্রহ ও জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন যেকোনো ব্যবস্থাকে তথ্যের ব্যবহার, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতি মেনে চলতে হবে। স্বচ্ছ সুরক্ষাব্যবস্থা ও মানুষের তদারকি অত্যাবশ্যক। রোবটগুলো কোন তথ্যে প্রবেশ করতে পারবে, তা পরিচালনাকারীদের নির্ধারণ করতে হবে এবং তথ্য বিশ্লেষণ নিরীক্ষাযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় যন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে হঠাৎ ভিড় বেড়ে যেতে পারে এবং আর্দ্রতা, বৃষ্টি ও গরমের মুখে পড়তে হয়।
শিল্পকারখানায় চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, বারবার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে কার্যকারিতা বাড়ে। ২০২৪ সালে ইউবিটেকের প্রাথমিক নমুনা রোবটগুলো ধীরগতির চলাচল ও দৃশ্যমান চিহ্নের ওপর নির্ভরতার কারণে সমস্যায় পড়েছিল। দক্ষতার দিক থেকেও সেগুলো মানুষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। পরের প্রজন্মে হাঁটার সময় ভারসাম্য, হাতের সক্ষমতা ও দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা হয়; এতে আরও বিস্তৃত ধরনের কাজে রোবট ব্যবহার সম্ভব হয় এবং উৎপাদন বাড়ে। ওয়াকার এস২-তে এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী জয়েন্ট, উন্নত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারি বদলের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন স্তরের এআই ব্যবস্থাও ব্যবহার করে, যাতে এক স্থানে শেখা দক্ষতা পুরো রোবট বহরের সঙ্গে ভাগ করা যায় এবং নতুন স্থানে মোতায়েনের সময় প্রশিক্ষণ কম লাগে।
বাজারের ঝুঁকিও একটি আলোচ্য বিষয়। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, বাস্তব অর্ডারের চেয়ে দ্রুত উৎপাদন বাড়লে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা তৈরি হতে পারে। ইউবিটেকের জবাব, তাদের অর্ডারের তালিকা শক্তিশালী এবং কারখানা, সরবরাহসেবা ও জনসেবায় চাহিদা বিস্তৃত হচ্ছে। বাড়তে থাকা শিল্পখাতের চুক্তির সঙ্গে গুয়াংসির পরীক্ষামূলক প্রকল্পও যাচাই করবে, মোতায়েনের পরিসর বাড়লে প্রতি ইউনিটের খরচ ও আয়ের হিসাব ঠিক থাকে কি না। রোবটগুলো উৎপাদনশীলতা বজায় রেখে ব্যয় কমাতে পারলে বেশি পরিমাণে উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে তা সহায়তা করবে।
অন্যান্য হিউম্যানয়েড উদ্যোগের সঙ্গে তুলনা
বিশ্বজুড়ে হিউম্যানয়েড রোবটে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে, কিন্তু পরীক্ষাগার থেকে দৈনন্দিন ব্যবহারে পৌঁছেছে এমন প্রকল্পের সংখ্যা কম। যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাজিলিটি রোবোটিকস গুদামে ডিজিট রোবট মোতায়েন করছে। বোস্টন ডায়নামিকস তাদের অ্যাটলাস রোবটকে গবেষণা ও শিল্পকারখানার কাজের উপযোগী নতুন প্রজন্মে রূপ দিয়েছে। চীনে প্রতিদ্বন্দ্বী এক নির্মাতা সম্প্রতি হিউম্যানয়েডের হাঁটার দূরত্বে রেকর্ড করেছে। এসব অর্জন চলাচল ও টেকসই সক্ষমতা প্রমাণে সাহায্য করে, তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাপক পরিসরে কার্যকর কাজ করানো। ইউবিটেকের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী একটি প্ল্যাটফর্ম, যা মানুষের ব্যবহারের জায়গায় চলতে, মাঝারি ওজনের বোঝা বহন করতে এবং কাজ বন্ধ রাখার সময় খুব কমিয়ে সচল থাকতে পারে। ব্যাটারি বদল, বল শনাক্তকারী জয়েন্ট ও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে সক্ষম হাত—সবই তৈরি করা হয়েছে পুনরাবৃত্তিমূলক ও চলমান কাজের উপযোগী করে।
জ্ঞান ভাগাভাগির ব্যবস্থাও এগোচ্ছে। ইউবিটেক ‘বড় মস্তিষ্ক ও ছোট মস্তিষ্ক’ মডেল ব্যবহার করে। এতে ক্লাউডভিত্তিক পরিকল্পনাকারী কাজ ভাগ করে এবং কৌশল উন্নত করে, আর স্থানীয় নিয়ন্ত্রকেরা তাৎক্ষণিক ভারসাম্য ও চলাচল সামলায়। একটি রোবট কোনো কাজ শিখলে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য রোবটগুলোও সেই দক্ষতা পেতে পারে। এতে নতুন স্থানে মোতায়েনের সময় কমে। গুয়াংসির পরীক্ষামূলক প্রকল্পে জনাকীর্ণ স্থানে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। এসব স্থানের চ্যালেঞ্জ কারখানার উৎপাদন লাইনের চেয়ে আলাদা। সীমান্তে রোবটের কার্যকারিতা এবং ধাতু উৎপাদনকেন্দ্রে পরিদর্শনের কাজ থেকে বোঝা যাবে, কোথায় হিউম্যানয়েড সবচেয়ে বেশি সুফল দেবে এবং কোথায় মানুষের কর্মীরা অপরিহার্য থাকবেন।
মূল বিষয়গুলো
- ভিয়েতনাম সীমান্তের কাছে গুয়াংসির সীমান্ত পারাপারকেন্দ্রগুলোতে ওয়াকার এস২ হিউম্যানয়েড রোবট মোতায়েনের জন্য ইউবিটেক ২৬৪ মিলিয়ন ইউয়ানের (৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) চুক্তি করেছে।
- ফাংচেংগাংয়ের একটি হিউম্যানয়েড রোবট কেন্দ্রের মাধ্যমে ডিসেম্বরে সরবরাহ শুরু হবে। রোবটগুলো যাত্রীদের পথ দেখানো, ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা, টহলে সহযোগিতা, সরবরাহের কাজ ও বাণিজ্যিক সেবা দেবে।
- একই রোবটগুলো ওই অঞ্চলের ইস্পাত, তামা ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকেন্দ্রে পরিদর্শনের কাজ করবে।
- ওয়াকার এস২-তে রয়েছে ৫২টি নড়াচড়ার মাত্রা, সূক্ষ্ম কাজের উপযোগী হাত, প্রতিটি বাহুতে ১৫ কিলোগ্রাম বোঝা বহনের সক্ষমতা, স্টেরিও ভিশন এবং প্রায় তিন মিনিটে ব্যাটারি বদলের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।
- ইউবিটেক জানিয়েছে, ওয়াকার সিরিজের মোট অর্ডারের পরিমাণ ১.১ বিলিয়ন ইউয়ান। এ বছর প্রায় ৫০০টি ইউনিট সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে ১০ হাজার ইউনিট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
- চীন হিউম্যানয়েড রোবোটিকসের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে এবং বিমানবন্দর, অভিবাসন কার্যালয় ও শহরের টহলে বাস্তব ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
- বিশ্লেষকেরা এ খাতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন, তবে অর্ডারের চেয়ে দ্রুত উৎপাদন বাড়লে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করছেন। ইউবিটেকের দাবি, চাহিদা শক্তিশালী।
- গুয়াংসির পরীক্ষামূলক প্রকল্পে জনাকীর্ণ জনপরিসর ও শিল্পকারখানার পরিদর্শনে হিউম্যানয়েডের কার্যকারিতা যাচাই হবে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ক্ষেত্রে দুটিই চ্যালেঞ্জিং ব্যবহারক্ষেত্র।






