কেন এখন ইয়োনাগুনি গুরুত্বপূর্ণ
তাইওয়ানের মাত্র প্রায় ১১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ছোট দ্বীপ ইয়োনাগুনিতে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে জাপান। সম্প্রতি ইয়োনাগুনি ও তাইওয়ানের মাঝখান দিয়ে উড়ে যাওয়া সন্দেহভাজন চীনা ড্রোনকে বাধা দিতে জাপানি যুদ্ধবিমান পাঠানোর পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাইওয়ান প্রণালি নিয়ে যেকোনো সংকটে এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। টোকিও বলছে, এই মোতায়েন প্রতিরক্ষামূলক। বেইজিংয়ের দাবি, এটি বিপজ্জনক। এই বিতর্ক দেখায়, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ছোট্ট একটি দ্বীপ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূচিপত্র
- কেন এখন ইয়োনাগুনি গুরুত্বপূর্ণ
- দ্বীপটিতে কী মোতায়েনের পরিকল্পনা জাপানের
- ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কী করতে পারে, আর কী পারে না
- চীনের প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি
- তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপকে কীভাবে দেখছে
- ইয়োনাগুনির জীবনযাত্রা ও স্থানীয় উদ্বেগ
- তাইওয়ান সংকটে দ্বীপটির জন্য কী ঘটতে পারে
- প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলজুড়ে বৃহত্তর সামরিক চিত্র
- প্রতিরোধ, উত্তেজনা বৃদ্ধি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
- যা জানা জরুরি
ইয়োনাগুনিতে প্রায় ১,৭০০ বাসিন্দা, দুটি ছোট বন্দর এবং একটি ছোট বিমানক্ষেত্র রয়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর একটি রাডার স্থাপনা রয়েছে, যেখান থেকে আশপাশের সমুদ্র ও আকাশপথ নজরদারি করা হয়। ২০২৪ সালে সেখানে একটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিটও গঠন করা হয়েছে। দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কর্পস একটি অগ্রবর্তী অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র স্থাপন করেছে, ফলে প্রণালির কাছেই মার্কিন উড়োজাহাজ জ্বালানি ভরে নিতে পারে। ইয়োনাগুনি রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এই দ্বীপমালা উত্তর-পূর্ব দিকে ওকিনাওয়া ও কিউশু পর্যন্ত বিস্তৃত। কৌশলবিদেরা এই দ্বীপমালাকে প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল বলে থাকেন। এই শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ, কিংবা কোনো প্রতিপক্ষকে এর নিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত করার সক্ষমতা, তাইওয়ানকে চাপে ফেলা বা রক্ষার যেকোনো পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে।
দ্বীপটিতে কী মোতায়েনের পরিকল্পনা জাপানের
প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ইয়োনাগুনি সফর করে বলেছেন, মোতায়েনের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ানোর বদলে প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।
সফরের সময় নিজের অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী টোকিওর যুক্তি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:
এই মোতায়েন আমাদের দেশের ওপর সশস্ত্র হামলার সম্ভাবনা কমাতে সহায়তা করতে পারে। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়বে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
ইয়োনাগুনির জন্য পরিকল্পিত ইউনিটটি হলো টাইপ ০৩ চু এসএএম, জাপানে নকশা করা মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। এটি একটি চলমান ব্যাটারি, যার উৎক্ষেপকগুলো ৮x৮ ট্রাকে বসানো। এর রাডারে ফেজড অ্যারে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যা একসঙ্গে অনেক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। ব্যবস্থাটি মাঝারি উচ্চতায় সর্বোচ্চ প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরের একাধিক উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ঝুঁকি কমাতে এটি দ্রুত সরানো, স্থাপন, নিক্ষেপ এবং এরপর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উপযোগী করে তৈরি।
জাপান টাইপ ০৩-কে বৃহত্তর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই নেটওয়ার্কে স্থলভিত্তিক প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ব্যাটারি এবং সমুদ্রে এসএম-৩ ক্ষেপণাস্ত্র ও ভবিষ্যতে এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্রসহ এজিস ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। ইয়োনাগুনিও ইতিমধ্যে এই নেটওয়ার্কে রাডারের তথ্য সরবরাহ করে। সেখানে নতুন ব্যাটারি স্থাপন করা হলে তা অগ্রবর্তী একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে; দ্বীপটির স্থানীয় প্রতিরক্ষা দেবে এবং তাইওয়ান ও রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী প্রণালিতে আকাশপথের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে।
ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কী করতে পারে, আর কী পারে না
টাইপ ০৩ তাইওয়ান বা চীনের মূল ভূখণ্ডের লক্ষ্যবস্তুকে হুমকি দিতে পারে না। এর কার্যকারিতা স্থানীয় প্রতিরক্ষায়। এটি ইয়োনাগুনির আশপাশের আকাশসীমা এবং দ্বীপটির পূর্ব ও দক্ষিণের সমুদ্রপথে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা দিতে পারে। ফলে দ্বীপটির কাছাকাছি চলাচলের চেষ্টা করা যেকোনো পাইলট, ড্রোন অপারেটর বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরিকল্পনাকারীর কাজ কঠিন হবে। সংকটের সময় দ্বীপটিতে থাকা সেন্সর বা জাহাজবিধ্বংসী ও দূরপাল্লার অস্ত্রের চলমান উৎক্ষেপকের মতো অন্যান্য স্থাপনাও এটি সুরক্ষা দিতে পারে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে এটি প্রতিপক্ষকে হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে—এমন আরও একটি প্রতিরক্ষা স্তর যোগ করে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি
চীন সরকার এই পরিকল্পনার নিন্দা করেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের যুক্তি, তাইওয়ানের এত কাছে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন সংঘাতকে উসকে দেবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সম্প্রতি বলেছেন, চীনের সামরিক বাহিনী তাইওয়ান অবরোধ করলে তা সংবিধান অনুযায়ী জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ আত্মরক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক অবনতির মধ্যে বক্তব্যের সুর আরও কঠোর হয়েছে।
নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং কড়া ভাষায় এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন:
চীনের তাইওয়ানের কাছে দক্ষিণ-পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে জাপানের আক্রমণাত্মক অস্ত্র মোতায়েন একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরি করে এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা উসকে দেয়। তাইওয়ান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির ভুল মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতিবেশী দেশগুলো ও বিশ্বের সতর্ক থাকা উচিত।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্যকারেরা টোকিওর বিরুদ্ধে সামরিকতাবাদ পুনরুজ্জীবিত করার অভিযোগ তুলেছেন। এই কঠোর সুর প্রণালির আশপাশে সামরিক পদক্ষেপ কতটা স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে, তা তুলে ধরে। চীনের একটি কোম্পানি নতুন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাপানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কাল্পনিক দৃশ্য দেখানো একটি ভিডিওও প্রকাশ করেছে। তথ্যক্ষেত্রে উত্তপ্ত বক্তব্যের এটি একটি উদাহরণ।
অন্যদিকে জাপানের বক্তব্য, এই পরিকল্পনা তাদের সংবিধান এবং ভূখণ্ড রক্ষার প্রকাশ্য ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গত এক দশকে টোকিও নিরাপত্তা আইন হালনাগাদ করে সীমিত পরিসরে যৌথ আত্মরক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে, যদিও তাদের অবস্থানকে এখনো প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করে। কাগজে-কলমে ইয়োনাগুনির ব্যাটারির উদ্দেশ্য জাপানের ভূখণ্ডে হামলার সম্ভাবনা কমানো, বাড়ানো নয়।
তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপকে কীভাবে দেখছে
তাইপের কর্মকর্তারা জাপানের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে প্রতিরক্ষা জোরদারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে, এটি প্রণালিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া উ সরাসরি বলেন, জাপানের নিজের ভূখণ্ড সুরক্ষিত করার অধিকার রয়েছে এবং ইয়োনাগুনিতে পদক্ষেপ তাইওয়ান প্রণালির নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে, যা তাইওয়ানের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে ইয়োনাগুনি প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সংকটের সময় অগ্রবর্তী ঘাঁটি গড়ে তোলার অনুশীলনের অংশ হিসেবে মার্কিন মেরিনরা ওকিনাওয়া থেকে ইয়োনাগুনিতে সরঞ্জাম সরানোর মহড়া চালিয়েছেন। ন্যাশনাল অ্যাডভান্সড সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম অনুমোদন এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা জোরদার করতেও সহায়তা করছে। জাপানের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ইউনিটগুলো চলমান উৎক্ষেপক এনেছে, যা সংকট দেখা দিলে তাইওয়ানের আরও কাছে মোতায়েন করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে টাইফনের মতো ব্যবস্থা, যা এসএম-৬ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও টমাহক স্থল-আক্রমণ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম। নেভাল স্ট্রাইক মিসাইল নিক্ষেপকারী নেভি মেরিন এক্সপেডিশনারি শিপ ইন্টারডিকশন সিস্টেমও চীনের সমুদ্রপথের দিকে মুখ করে থাকা দ্বীপগুলোতে কাজে লাগতে পারে।
এসব পদক্ষেপ যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা নির্বিঘ্ন হবে—এমন নিশ্চয়তা দেয় না। বিদেশি বাহিনীকে দূরে রাখতে চীন নজরদারি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধে বিনিয়োগ করেছে এবং বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করেছে। তবু প্রতিটি অতিরিক্ত রাডার স্থাপনা, চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট ও রসদকেন্দ্র তাইওয়ানের আশপাশের আকাশ ও সমুদ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের হাতে আরও বিকল্প তুলে দেয়।
ইয়োনাগুনির জীবনযাত্রা ও স্থানীয় উদ্বেগ
এই বিতর্ক কেবল কৌশলগত নয়। দ্বীপে বসবাসকারীদের কাছে এটি ব্যক্তিগত বিষয়ও। ইয়োনাগুনির মেয়র টোকিওর কাছে বিমান হামলা থেকে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়নের অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে সংকট দেখা দিলে বাসিন্দারা সুরক্ষা পান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে স্থানীয় কর্মকর্তা ও বাসিন্দাদের তা জানানো হবে। কর্মকর্তাদের আলোচনায় থাকা জরুরি পরিকল্পনার মধ্যে সময় থাকলে মানুষকে কিউশুতে সরিয়ে নেওয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত। যারা চলে যেতে পারবেন না, এসব আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁদের দুই সপ্তাহ পর্যন্ত রাখা যাবে। ইয়োনাগুনি পর্যটনকেন্দ্রও, যা স্বচ্ছ পানি ও স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য পরিচিত। বাসিন্দারা নিজেদের সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য না হারিয়ে নিরাপদ থাকতে চান।
দ্বীপটি এরই মধ্যে কাছাকাছি সামরিক তৎপরতার প্রভাব অনুভব করেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতার বহুল আলোচিত সফরের পর চীন যখন তাইওয়ানের আশপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালায়, তখন ইয়োনাগুনির কাছে কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সমুদ্রে পড়ে। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, তাইওয়ান ঘিরে যেকোনো সংঘাতের সঙ্গে দ্বীপটি কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এর পর রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জজুড়ে বেসামরিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার হয়। স্থানীয় সরকারগুলো মহড়া, সাইরেন ব্যবস্থা ও সুরক্ষিত স্থাপনা নিয়ে ভাবছে।
তাইওয়ান সংকটে দ্বীপটির জন্য কী ঘটতে পারে
তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা অচলাবস্থা বা সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিলে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল ও রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী জলসীমা ও আকাশসীমা দ্রুত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইয়োনাগুনির রাডার এবং দ্বীপে থাকা যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আগাম সতর্কবার্তা দেবে। টাইপ ০৩ ব্যাটারি কিছু সময়ের জন্য নিম্ন-উড্ডয়নকারী উড়োজাহাজ ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে দ্বীপটিকে রক্ষা করতে পারে, বিশেষ করে পরিচালকেরা সেটিকে আড়ালে রাখলে, ঘন ঘন স্থান বদলালে এবং শত্রুপক্ষের সেন্সরকে বিভ্রান্ত করতে নকল লক্ষ্য ব্যবহার করলে।
টিকে থাকাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ড্রোনসহ স্থির স্থাপনায় হামলার বহু উপায় চীনের রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য টাইপ ০৩ বিশেষভাবে তৈরি নয়, তাই স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ এবং এজিস জাহাজগুলো এই কাজের বড় অংশ সামলাবে, আর টাইপ ০৩ নজর দেবে উড়োজাহাজ ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে। তবু প্রতিপক্ষ বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে একটি ব্যাটারির প্রতিরোধক্ষমতা ছাপিয়ে যেতে পারে। সংকটের সময় এর জবাব হলো বাহিনী ছড়িয়ে মোতায়েন এবং সমন্বয়। তথ্য বিনিময়কারী অনেক ছোট, চলমান ইউনিটকে নিষ্ক্রিয় করা কয়েকটি বড়, স্থির লক্ষ্যবস্তুর চেয়ে কঠিন হতে পারে।
প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলজুড়ে বৃহত্তর সামরিক চিত্র
বৃহত্তর মানচিত্রের একটি অংশ মাত্র ইয়োনাগুনি। নানসেই দ্বীপপুঞ্জজুড়ে কয়েক বছর ধরে ইউনিট বাড়িয়েছে জাপান। ইশিগাকিতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ওকিনাওয়ার দক্ষিণের সমুদ্রপথের দিকে তাক করা। মিয়াকো আকাশপথে নজরদারি ও গোলাবারুদ মজুতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আরও পূর্বে অবস্থিত ওকিনাওয়ায় জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘাঁটিগুলো রয়েছে। টোকিও প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে এবং পাল্টা হামলার সক্ষমতা গড়ে তুলছে। তাদের যুক্তি, নিজ ভূখণ্ডের ওপর হামলা ব্যাহত করার সক্ষমতা থাকা দরকার।
আরও বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার নতুন পদ্ধতিও পরীক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। মেরিন ও সেনাসদস্যরা প্রতিকূল দ্বীপে ছোট ইউনিট মোতায়েন এবং হুমকির মধ্যে রসদ সরবরাহের অনুশীলন করছেন। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের সেন্সরগুলোকে যুক্ত করে অভিন্ন পরিস্থিতিচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। স্থলভিত্তিক উৎক্ষেপক থেকে ছোড়া এসএম-৬ ও টমাহকের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উপকূলে চলমান ব্যাটারিতে থাকা নেভাল স্ট্রাইক মিসাইল চীনা নৌবহরের চলাচল জটিল করে তুলতে পারে। শান্তিকালে এসব ব্যবস্থা ইয়োনাগুনিতে না থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে দ্রুত পাঠানো হতে পারে।
প্রতিরোধ, উত্তেজনা বৃদ্ধি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ইয়োনাগুনিতে টাইপ ০৩ ইউনিট মোতায়েনের কৌশলগত যুক্তি হলো প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখা। জাপান চায়, সম্ভাব্য আগ্রাসী পক্ষ বুঝুক—দ্বীপটির কাছে তৎপরতা চালালে ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। তবে এর বিনিময়মূল্যও আছে। যেকোনো সংঘাতে অগ্রবর্তী অবস্থানগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে, আর বেইজিং এরই মধ্যে এই পরিকল্পনাকে উসকানি হিসেবে দেখছে। এই উত্তেজনা সামাল দিতে সরকারগুলোর মধ্যে স্পষ্ট যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থা এবং ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি কমায়—এমন প্রশিক্ষণ দরকার।
ভৌগোলিক অবস্থান বদলানো সম্ভব নয়। তাইওয়ান সংকটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর কাছেই ইয়োনাগুনি। এ কারণেই দ্বীপটি ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর ও মনোযোগ আকর্ষণ করছে। টোকিও ও তার অংশীদারেরা দেখাতে চায়, প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি সংঘাতের সম্ভাবনা কমায়; একই সঙ্গে তারা উত্তেজনা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যা জানা জরুরি
- তাইওয়ানের প্রায় ১১০ কিলোমিটার পূর্বে ইয়োনাগুনিতে টাইপ ০৩ চু এসএএম আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট মোতায়েন করবে জাপান।
- প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, এই মোতায়েন জাপানের ওপর হামলার সম্ভাবনা কমাবে এবং উত্তেজনা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে না।
- চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য জাপানকে অভিযুক্ত করেছে।
- তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া উ বলেছেন, জাপানের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে প্রতিরক্ষা জোরদার হলে প্রণালির নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা হবে।
- ইয়োনাগুনিতে ইতিমধ্যে একটি রাডার স্থাপনা ও একটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিনরা সেখানে অগ্রবর্তী অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্রও স্থাপন করেছেন।
- টাইপ ০৩ প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরের উড়োজাহাজ ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, তবে এটি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য নয়, স্থানীয় প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি।
- জাপানের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ব্যাটারি এবং এসএম-৩ ও এসএম-৬ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রসহ এজিস ডেস্ট্রয়ারও রয়েছে।
- সংকটের সময় চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইয়োনাগুনি। তাই চলমান অবস্থান, আড়াল এবং স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা অত্যাবশ্যক।
- জাপান দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্যান্য দ্বীপে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও নজরদারি কেন্দ্র জোরদার করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে রসদ সরবরাহ ও চলমান বাহিনী মোতায়েনের মহড়া চালাচ্ছে।
- কর্মকর্তারা ইয়োনাগুনিতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণসহ বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সময় থাকলে কিউশুতে সম্ভাব্য সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।






