বড় প্রকল্পের গতি কমায় আফ্রিকায় চীনা ভোক্তা ব্র্যান্ডের বিস্তার

পড়তে 10 মিনিট
বড় প্রকল্পের গতি কমায় আফ্রিকায় চীনা ভোক্তা ব্র্যান্ডের বিস্তার

আফ্রিকার ভোক্তা বাজারের জোয়ারে চীনা বিনিয়োগের নতুন ধরন

চীন ও আফ্রিকার বাণিজ্যে নতুন একটি ধারা গড়ে উঠছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বড় রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, খনি ও তেল চুক্তির দুই দশক পর এখন গতি সরে যাচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দিকে। ফোন ও ফ্রিজ থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুৎ কিট ও চিকিৎসাসামগ্রী—আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান ভোক্তা শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে চাইছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। কেনিয়া, উগান্ডা ও জাম্বিয়াসহ দ্রুত বর্ধনশীল আফ্রিকান অর্থনীতিগুলোতে আরও বেশি কোম্পানি নেতা যাচ্ছেন। তাঁরা সেখানে পণ্যের বাজার যাচাই করতে এবং স্থানীয় পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের পথ খুঁজতে চান।

সূচিপত্র
  1. আফ্রিকার ভোক্তা বাজারের জোয়ারে চীনা বিনিয়োগের নতুন ধরন
  2. প্রকল্প ও খনির পুরোনো মডেল কেন সরে যাচ্ছে
  3. ঋণ থেকে বাণিজ্য ও বেসরকারি পুঁজির দিকে
  4. আফ্রিকার শহরগুলোতে কী বিক্রি হচ্ছে
  5. স্থানীয় উৎপাদন ও আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠছে
  6. আফসিএফটিএ ও আফ্রিকার ভেতরে উৎপাদনের প্রয়োজন
  7. মুদ্রার প্রশ্ন ও চুক্তির অর্থ পরিশোধ
  8. স্থানীয় শিল্পের ঝুঁকি ও নীতিনির্ধারকদের নজর
  9. বিবেচনায় থাকা কিছু বাস্তব পদক্ষেপ
  10. অবকাঠামো হারিয়ে যায়নি, বরং লক্ষ্য বদলেছে
  11. যা জানা জরুরি

বিনিয়োগের ধরনেই এ পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট। মুনাফা কমে যাওয়া ও পণ্যদ্রব্য থেকে আয় হ্রাস পাওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে আফ্রিকার সম্পদ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চীনা বিনিয়োগ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে সরকারি বাণিজ্য উপাত্তে আফ্রিকায় চীনা রপ্তানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে; ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এসব পণ্যের বেশির ভাগই ইলেকট্রনিকস, প্লাস্টিক, বস্ত্র, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির মতো উচ্চমূল্যের উৎপাদিত পণ্য। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক জি২০ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, করপোরেট কৌশল বদলালেও শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ট্রান্সশান, হুয়াওয়ে ও মিদিয়ার মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। পাশাপাশি হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ই-কমার্স, ড্রপশিপিং ও সরাসরি খুচরা বিক্রিতে প্রবেশ করছেন।

এই আকর্ষণের পেছনে রয়েছে কাঠামোগত কারণ। অনেক চীনা প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশের ভেতরে মুনাফার হার কমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু অংশে শুল্কপ্রাচীর থাকায় আফ্রিকার তরুণ, নগরবাসী ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সংযুক্ত জনগোষ্ঠী বিনিয়োগের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মহাদেশটিতে গৃহস্থালি ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (আফসিএফটিএ) ৫৪টি অর্থনীতিকে আরও সমন্বিত বাজারে যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে, স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুয়াংজুর গুদাম থেকে আক্রা বা নাইরোবির দোকান পর্যন্ত দূরত্ব কমিয়ে আনছে। ফলে বাজেট ফোন ও ফ্যাশন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি—নিত্যদিনের চাহিদা পূরণে বাজার দখলের প্রতিযোগিতা চলছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প ও খনির পুরোনো মডেল কেন সরে যাচ্ছে

বৃহৎ প্রকল্প ও খনিজ খাত থেকে সরে আসার পেছনে রয়েছে অর্থনীতি ও নীতিগত কারণ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের শুরুর বছরগুলোতে পরিবহন, বন্দর, বিদ্যুৎ ও উত্তোলন খাতে বিপুল অর্থায়ন করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া ও ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় চীনা ঋণদাতারা অর্থায়ন কমিয়ে দেন। আন্তর্জাতিক উপাত্ত অনুযায়ী, আফ্রিকার সরকারগুলোর জন্য নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ২০১৬ সালে কয়েক হাজার কোটি ডলার থেকে কমে ২০২২ সালে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। বিশ্লেষকেরা চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ভোগের দিকে সরে যাওয়ার কথাও বলছেন। এতে কাঁচামালের চাহিদা কমে এবং রপ্তানিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার অংশ বাড়ে। বহু আফ্রিকান দেশের জন্য চীন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ঋণদাতা ও বাণিজ্য অংশীদার। তবে সম্পৃক্ততার ধরন বদলাচ্ছে: সার্বভৌম ঋণ কমছে, বাড়ছে বাণিজ্য ঋণ, ইকুইটি ও বেসরকারি বিনিয়োগ।

জ্বালানির চাহিদার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোয় আফ্রিকা থেকে কম অপরিশোধিত তেল কিনছে চীন। এ প্রবণতায় মহাদেশটিতে নতুন তেলক্ষেত্রের উদ্যোগের যুক্তি দুর্বল হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব, চীনের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমলে সাধারণত এক বছরের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি এক-চতুর্থাংশ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যায়। এ হিসাব দেখায়, পণ্যবাজারের ওঠানামা ও চীনা নীতির পরিবর্তন পুরো অঞ্চলে প্রভাব ফেলে। এসব যোগসূত্র সরকার ও কোম্পানিগুলোকে সম্পদ উত্তোলনের বাইরে গিয়ে আফ্রিকার ভোক্তাদের চাহিদার পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করছে।

ঋণ থেকে বাণিজ্য ও বেসরকারি পুঁজির দিকে

আফ্রিকায় চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতির প্রধান চালিকাশক্তি এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জরিপে দেখা যায়, মহাদেশটিতে সক্রিয় চীনা প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশের বেশি বেসরকারি মালিকানাধীন। ২০২৪ সালে চীনের বহির্মুখী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বেড়েছে; এর মধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোডের অংশীদার বাজারগুলোতে বিনিয়োগ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে এক দশকের মধ্যে চুক্তির পরিমাণ সর্বনিম্নে নামলেও আফ্রিকায় বিদেশি একীভবন ও অধিগ্রহণ বেড়েছে। প্রকৌশল ও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়নি, তবে তা আরও পরিবেশবান্ধব, দক্ষ প্রকল্প ও ডিজিটাল অবকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। ইকুইটি অংশীদারত্ব, বাণিজ্য অর্থায়ন, স্থানীয় অংশীদারত্ব এবং অপেক্ষাকৃত ছোট উৎপাদন কারখানার এই সমন্বয় ২০১০-এর দশকের বৃহৎ, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ননির্ভর মডেলের চেয়ে বিকেন্দ্রীভূত ও বাজারনির্ভর পদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়।

বিজ্ঞাপন

আফ্রিকার শহরগুলোতে কী বিক্রি হচ্ছে

অনেক বাজারে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল বা অনিয়মিত। এ কারণে চালান তালিকায় সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি কিটের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সরকারি ক্লিনিক ও বেসরকারি ওষুধের দোকানগুলোতে চিকিৎসাসামগ্রী ও রোগনির্ণয় উপকরণের চাহিদা রয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল শহরতলির নতুন অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে পাখা, রেফ্রিজারেটর, ছোট রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি ও সাশ্রয়ী আসবাবের মতো গৃহস্থালি পণ্য জায়গা করে নিচ্ছে। মোবাইল ফোনের বাজারে স্থানীয় রুচির উপযোগী ফিচারের সঙ্গে সাশ্রয়ী দাম মেলানোর মাধ্যমে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এসব ফিচারের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি, উজ্জ্বল পর্দা এবং কম আলোয় ছবি তোলার উপযোগী ক্যামেরা সফটওয়্যার। আনুষঙ্গিক পণ্য, ফ্যাশন ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী নিত্যদিনের কেনাকাটার দীর্ঘ তালিকায় যোগ হয়েছে।

বড় উৎপাদকেরা রপ্তানির সঙ্গে স্থানীয় সংযোজন ও বিতরণব্যবস্থাও গড়ে তুলছে। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি নির্মাতা মিদিয়া উত্তর আফ্রিকা ও বৃহত্তর অঞ্চলকে সেবা দিতে মিসরে কারখানায় বিনিয়োগ করেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন, আঞ্চলিক কেন্দ্র ও শেষ ধাপের সরবরাহ নেটওয়ার্কের এ সমন্বয় একটি সহজ বাস্তবতাকে তুলে ধরে: দাম ও নৈকট্য গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কোম্পানি পণ্য পৌঁছানোর সময় কমায় এবং বিক্রয়-পরবর্তী নির্ভরযোগ্য সেবা দেয়, তারা ইট-কাঠের দোকান ও ই-কমার্স অ্যাপে পণ্যের মূল্য তুলনা করা ভোক্তাদের কাছে এগিয়ে থাকে।

ক্রেতাদের সামনে বাছাই করা চীনা ব্র্যান্ড তুলে ধরতে খুচরা বিক্রিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে। নাইরোবিতে নতুন একটি ‘ইউউ সিলেকশন’ স্টোর কেনিয়ার রাজধানীতে চীনের বিশাল ভোগ্যপণ্য ব্যবস্থার এক ঝলক নিয়ে এসেছে। ঝেজিয়াং প্রদেশের উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র ইউউয়ের ২০টির বেশি ব্র্যান্ডের পণ্য রয়েছে এ দোকানে। এর মধ্যে আছে গৃহস্থালি সামগ্রী ও ডিজিটাল আনুষঙ্গিক পণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনী, সমুদ্রসৈকতের পোশাক ও ফ্যাশন গয়না। ২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের পছন্দের সঙ্গে মান, বৈচিত্র্য ও দাম মেলানো এবং স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের জন্য নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

নাইরোবিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউউয়ের ভাইস মেয়র শাও ছুনহং ব্যাখ্যা করেন, বর্তমান চাহিদার সঙ্গে ব্র্যান্ডের সমাহারভিত্তিক এ মডেল কেন মানানসই।

আফ্রিকার বাজারের জন্য ইউউয়ের পণ্যগুলো বেশ উপযোগী।

খুচরা বিক্রির পাশাপাশি উৎপাদন খাতে আরও গভীর অংশীদারত্বের সুযোগ দেখছেন কেনিয়ার কর্মকর্তারা। কেনিয়া ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির আইন ও করপোরেট বিষয়ক মহাব্যবস্থাপক অলিভিয়া রাচিয়ার নতুন দোকানটিকে স্বাগত জানিয়ে আরও বৃহত্তর সম্ভাবনার কথা বলেন।

বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় কেনিয়া।

দোকানটির পেছনে থাকা নির্বাহীরা বলছেন, স্থানীয় শপিং মলের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং কেনীয় খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তির বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। জনপ্রিয় চীনা ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য বিক্রয় চ্যানেল তৈরির বৃহত্তর উদ্যোগেরই অংশ এটি।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় উৎপাদন ও আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠছে

আফ্রিকার নেতারা চান না, মহাদেশটি তার প্রয়োজনীয় সব পণ্য আমদানি করুক। পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণগুলোর একটি হলো চীনা কোম্পানির মালিকানাধীন বা সরবরাহ করা স্থানীয় উৎপাদনের বিস্তার। উদাহরণ হিসেবে, সুন্দা ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকার একাধিক দেশে ২০টির বেশি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মনোযোগ দিচ্ছে। শিল্প খাতের সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন মানুষের কেনা পণ্য তৈরি করে বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার আয় করে। এ ধরনের স্থানীয় কারখানা কর্মসংস্থান তৈরি করে, পরিবহন ব্যয় ও বিলম্ব কমায় এবং সরবরাহব্যবস্থা অনিশ্চিত এমন বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।

আফসিএফটিএ ও আফ্রিকার ভেতরে উৎপাদনের প্রয়োজন

২০২১ সালে চালু হওয়া আফসিএফটিএর লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৭ বিলিয়ন মানুষ এবং সম্মিলিতভাবে ৬.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মহাদেশব্যাপী একক বাজার গড়ে তোলা। এ চুক্তি শুল্ক কমায় এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিভাজন তৈরি করা অশুল্ক বাধা দূর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এটি অভিন্ন মানদণ্ড ও সহজতর শুল্কপ্রক্রিয়াকেও উৎসাহিত করে, যা এক দেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত পরিবহন সংযোগ ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলে এ কাঠামো উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খলে সংযুক্তি বাড়াতে পারে। আফসিএফটিএর অগ্রাধিকারের সঙ্গে আন্তসীমান্ত অবকাঠামো পরিকল্পনার সমন্বয় হলে কারখানা ও সরবরাহকেন্দ্র সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

স্থানীয় উৎপাদন কোম্পানিগুলোকে মুদ্রা ও নীতিগত ঝুঁকি সামলাতেও সাহায্য করে। মিদিয়ার মতো কোম্পানি প্রতিবেশী বাজারে সরবরাহের জন্য মিসরে উৎপাদন বাড়ালে পরিবহন সময় কমে, বিনিময় হারের ওঠানামায় ঝুঁকি সীমিত হয় এবং স্থানীয় পছন্দ সম্পর্কে দ্রুত জানা যায়। সরকারের ক্ষেত্রে, সংযোজন ও সরবরাহকারী উন্নয়ন উৎসাহিত করার নীতি—একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সুযোগ অক্ষুণ্ণ রেখে—শুধু আমদানিনির্ভরতা থেকে দেশীয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা তৈরির দিকে ভারসাম্য আনতে পারে। উত্তর আফ্রিকার শিল্পাঞ্চলগুলো দেখায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বন্দর ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কীভাবে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও মোটরগাড়ি নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে পারে, যারা আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান শহরগুলোতে পণ্য বিক্রি করে।

বিজ্ঞাপন

মুদ্রার প্রশ্ন ও চুক্তির অর্থ পরিশোধ

বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি নির্ধারণ করে, কে লাভবান হবে এবং কে ঝুঁকি নেবে। আফ্রিকায় চীনা ইউয়ানের ব্যবহার কম ভিত্তি থেকে বাড়ছে, তবে বিশেষ করে চীনের অনুকূলে বাণিজ্য ভারসাম্যহীন এমন বাজারে এখনো মার্কিন ডলারের আধিপত্য রয়েছে। কিছু আফ্রিকান সরকার ও ঋণদাতা বিকল্প পদ্ধতি পরীক্ষা করেছে; এর মধ্যে চীনের বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুও রয়েছে। অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তসীমান্ত লেনদেনের খরচ কমাতে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। বহু দেশে ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল মানি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও বড় চালান ও যন্ত্রপাতির অধিকাংশ চুক্তির অর্থ এখনো ডলারে পরিশোধ করা হয়। আমদানি বাড়লে দেশগুলো বাণিজ্য ঘাটতির দিকে কড়া নজর রাখে, এর এটিও একটি কারণ।

স্থানীয় শিল্পের ঝুঁকি ও নীতিনির্ধারকদের নজর

সস্তা আমদানি পরিবারগুলোর বাজেট সামলাতে সাহায্য করে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও রাখতে পারে। তবে চীনের উৎপাদনমাত্রা ও সরবরাহশৃঙ্খলের সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাওয়া স্থানীয় কারখানার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ভোগ্যপণ্যে বাজার সয়লাব হলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। অর্থায়নের ধরনও বদলাচ্ছে। আফ্রিকার সরকারগুলোর জন্য চীনা নীতিনির্ধারণী ব্যাংকের ঋণ কমেছে এবং কিছু দেশে বাজেটের বড় অংশ এখন ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর ধারণা, চীনা অর্থায়ন আরও বাছাইভিত্তিক থাকবে; প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ স্থিতিশীল হলেও সীমিত থাকবে এবং বেসরকারি পুঁজির ভূমিকা বাড়বে।

বিবেচনায় থাকা কিছু বাস্তব পদক্ষেপ

অঞ্চলজুড়ে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমন একটি মধ্যপন্থার দিকে এগোচ্ছে, যাতে ভোক্তাদের জন্য দাম সাশ্রয়ী রাখা যায় এবং একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠে। বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তিশালী পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

  • স্পর্শকাতর আমদানিতে আকস্মিক বৃদ্ধি সামলাতে আফসিএফটিএর সুরক্ষাব্যবস্থা ও মানদণ্ড কাজে লাগানো, পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদনকারীদের খরচ বাড়ায় এমন অশুল্ক বাধা মোকাবিলা করা।
  • বন্দর ও রেলপথের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্ক সম্প্রসারণ করা, যাতে সরবরাহকারীরা কাছাকাছি অবস্থান করে সেবা ভাগাভাগি করতে পারে।
  • প্রধান বিনিয়োগে স্থানীয় উপাদান ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা, যাতে বড় কারখানাকে কেন্দ্র করে সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
  • নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোগ, সরবরাহব্যবস্থার সমাধান ও অর্থায়নের সুযোগ দিয়ে ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের সহায়তা করা।
  • শুল্কপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তসীমান্ত অর্থ পরিশোধ উন্নত করা, যাতে উপকরণ ও তৈরি পণ্যের আঞ্চলিক বাণিজ্য দ্রুত হয়।
  • কারখানা ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস এবং যন্ত্রপাতির সেবা নেটওয়ার্কে কর্মী নিয়োগের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা।

অবকাঠামো হারিয়ে যায়নি, বরং লক্ষ্য বদলেছে

রেলপথ, বন্দর ও বিদ্যুৎ এখনো এ গল্পের অংশ, কারণ এগুলো ভোক্তাদের কেনা পণ্য পরিবহনের খরচ কমায়। জাম্বিয়ায় রেলপথ আধুনিকায়নে সাম্প্রতিক ১.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেখায়, বাণিজ্যপথ খুলে দিতে পারে এমন প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরের শহর থেকে বন্দরে উন্নত পণ্য পরিবহনব্যবস্থা ফোন থেকে ওয়াশিং মেশিন—সব ধরনের পণ্য পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় কমাতে পারে। তাতে ভোক্তাপণ্যকেন্দ্রিক ব্যবসা আরও কার্যকর হয় এবং লাভ একটি শহর বা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিবেশবান্ধব ও ডিজিটাল অবকাঠামো এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও আফ্রিকার অংশীদারেরা ১.৫ গিগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছেন। বিভিন্ন শহরে কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার তৈরি করছে এবং যান চলাচল ও নাগরিক সেবা পরিচালনায় ফাইভজি ব্যবহার করছে। বিদেশে প্রকৌশল চুক্তির পরিমাণ এখনো বড়, আর জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাজের অর্ডার বাড়ছে। এতে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়: বড় নির্মাণকাজ আর আফ্রিকায় চীনের কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র নয়, তবে পণ্য, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রবাহ সচল রেখে ভোক্তাপণ্যের দিকে পরিবর্তনে তা এখনো সহায়তা করছে।

যা জানা জরুরি

  • চীন-আফ্রিকা বাণিজ্যের কেন্দ্র এখন রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন বৃহৎ প্রকল্প ও সম্পদ খাত থেকে সরে বেসরকারি খাতের ভোগ্যপণ্য ও সেবার দিকে যাচ্ছে।
  • ২০১৫ সাল থেকে আফ্রিকার সম্পদ খাতে চীনা বিনিয়োগ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে ২০২৫ সালে আফ্রিকায় উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
  • ব্র্যান্ডগুলো ফোন, সৌরবিদ্যুৎ কিট, চিকিৎসাসামগ্রী ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির বাড়তি শহুরে চাহিদা লক্ষ্য করছে; ই-কমার্স ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাজারে প্রবেশ দ্রুত করছে।
  • চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে। মিসরে মিদিয়া এবং একাধিক দেশে সুন্দা ইন্টারন্যাশনালের মতো কোম্পানি আঞ্চলিক বাজারের জন্য পণ্য তৈরি করছে।
  • আফসিএফটিএর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে একক আফ্রিকান বাজার গড়ে তোলা। উন্নত সরবরাহব্যবস্থা ও বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত হলে তা আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে পারে।
  • বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে, তবে এখনো সীমিত; বড় চুক্তির বেশির ভাগই ডলারে পরিশোধ করা হয় এবং অনেক দেশে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা রয়ে গেছে।
  • সস্তা আমদানি ভোক্তাদের উপকার করলেও স্থানীয় কারখানার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ঘাটতি বাড়াতে পারে। দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে উন্মুক্ত বাজারের ভারসাম্য রাখছে সরকারগুলো।
  • ২০১০-এর দশকের তুলনায় চীনা অর্থায়ন এখন বেশি বাছাইভিত্তিক; বড় সার্বভৌম ঋণ কমেছে, বেড়েছে বেসরকারি পুঁজি, বাণিজ্য ঋণ ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প।
  • অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ হয়নি। বাণিজ্য ও আরও সংযুক্ত ভোক্তা অর্থনীতিকে সহায়তা করতে রেলপথ, বন্দর, ডেটা সেন্টার ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো তৈরি হচ্ছে।
  • ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকায় গৃহস্থালি ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা চীনা ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোর কৌশলে মহাদেশটির গুরুত্ব ধরে রাখবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে