সীমান্ত পেরিয়ে বিরল মানহানি মামলা থাই আদালতে
মালয়েশিয়ার ইন্টারনেট ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে ফৌজদারি মানহানির অভিযোগে থাইল্যান্ডে অভিযুক্ত হওয়ার পর অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মারে হান্টারের ব্যাংককে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও আইনি অধিকারকর্মীরা এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কারণ, অভিযোগটি মালয়েশিয়া থেকে করা হয়েছে, লেখাগুলো তিনি নিজেই অনলাইনে প্রকাশ করেছেন এবং থাইল্যান্ডে তার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। দোষী সাব্যস্ত হলে হান্টারের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ২০০,০০০ বাত (প্রায় ৯,৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
সূচিপত্র
দক্ষিণ থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী হান্টার ২৯ সেপ্টেম্বর হংকং যাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর থেকে রওনা হওয়ার সময় আটক হন। তিনি এক রাত পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। ২০,০০০ বাত (প্রায় ৬০০ মার্কিন ডলার) জামিনে মুক্তি পেলেও তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং ব্যাংককে তার চলাচলে বিধিনিষেধ রয়েছে। থাই কর্তৃপক্ষ নভেম্বরের মাঝামাঝি তাকে অভিযুক্ত করে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিচার শুরুর কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সাবস্ট্যাকে প্রকাশিত তার চারটি নিবন্ধের ভিত্তিতে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। নিবন্ধগুলোতে অভিযোগ করা হয়, মালয়েশিয়ার যোগাযোগ ও মাল্টিমিডিয়া কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, সমালোচকদের ওপর সেন্সরশিপ চালিয়েছে এবং স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে কাজ করেছে।
মারে হান্টার কে, আর তিনি কী লিখেছিলেন
হান্টার একজন লেখক ও ব্লগার, পাশাপাশি সাবেক শিক্ষাবিদ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তিনি লিখেছেন এবং সাবস্ট্যাকের নিউজলেটারের মাধ্যমে পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। তিনি দক্ষিণ থাইল্যান্ডের হাট ইয়াই শহরে থাকেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি মালয়েশিয়ার যোগাযোগ ও মাল্টিমিডিয়া কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে চারটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সংস্থাটি এমসিএমসি নামে পরিচিত। নিবন্ধগুলোতে অভিযোগ করা হয়, মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সরকারের সমালোচনামূলক ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিচ্ছে এবং এর নেতৃত্বের স্বার্থের সংঘাত জনআস্থাকে ক্ষুণ্ন করছে।
এমসিএমসি বারবার বলেছে, তারা আইন মেনেই কাজ করে এবং রাজনৈতিক কারণে সেন্সরশিপ চালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করলেও সমালোচনা তথ্যভিত্তিক ও আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত। হান্টার বলেছেন, তিনি তার প্রতিবেদনগুলোর পক্ষে রয়েছেন। তার যুক্তি, ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান এবং মালয়েশিয়ায় অনলাইন বিধিনিষেধের প্রভাব খতিয়ে দেখার অধিকার জনগণের রয়েছে।
মালয়েশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে অভিযোগ
হান্টারের নিবন্ধগুলোতে এমসিএমসির বিরুদ্ধে ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া ও রাজনীতিকরণের অভিযোগ আনা হয়। তিনি লেখেন, সরকারের সমালোচনামূলক প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এমনভাবে কাজ করছে, যাতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিতর্ক নিরুৎসাহিত হতে পারে। নিবন্ধগুলোতে সংস্থার চেয়ারম্যানের স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও আনা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এসব বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এর আগে বলেছে, ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন, তবে সেই স্বাধীনতা দায়িত্বশীলভাবে ও আইন মেনে প্রয়োগ করতে হবে।
মালয়েশিয়ার অভিযোগ কীভাবে ব্যাংককে গড়াল
অনলাইনে পোস্টগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর মালয়েশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার এক প্রতিনিধি থাইল্যান্ডে মানহানির অভিযোগ দায়ের করেন। থাই পুলিশ ও কৌঁসুলিরা এই ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেন যে নিবন্ধগুলো থাইল্যান্ডে পড়া সম্ভব ছিল এবং সেখানকার পাঠকদের প্রভাবিত করতে পারত। হান্টারকে সহায়তা করা থাই লইয়ার্স ফর হিউম্যান রাইটসের ভাষ্য, কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, পোস্টগুলো দেখে থাইল্যান্ডের জনগণ মনে করতে পারে যে মালয়েশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বেআইনিভাবে কাজ করেছে, বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধী। থাই আইনে অভিযোগের ভিত্তিতে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিচার করা যায়। কোনো মামলা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে মনে হলে, অথবা অনলাইন প্রকাশনার মাধ্যমে থাইল্যান্ডে কথিত ক্ষতি হলে কৌঁসুলিরা মামলা চালাতে পারেন।
থাই ফৌজদারি মানহানির মামলা ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে এ আইন দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিচার চলতে পারে বছরের পর বছর; প্রমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও খালাস নিশ্চিত নয়, আর বিচারকরা প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযোগ খারিজ করেন খুব কমই। এ মামলায় অভিযোগ গ্রহণের আদালতের সিদ্ধান্ত বিদেশি একটি সরকারি সংস্থা সম্পর্কে থাইল্যান্ড থেকে অনলাইনে প্রকাশিত লেখার ক্ষেত্রে থাই আইনের অস্বাভাবিক প্রয়োগের নজির।
হান্টার বলেছেন, এ অভিজ্ঞতায় তার জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে। ডিসেম্বরের বিচার সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনি ভ্রমণ করতে পারছেন না। তার বক্তব্য, নিবন্ধগুলো জনস্বার্থে করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লেখা।
অভিযোগপত্র এবং সমালোচনার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা বলে তিনি যা মনে করেন, সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হান্টার বলেন, নিজের কাজের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।






